মাইলস্টোনে শিশুদের উদ্ধার করতে গিয়ে নিজের জীবন দেওয়া শিক্ষক মাহরীন শেষ মুহূর্তে যা বলেছিলেন

ছবির উৎস, BBC/MUKIMUL AHSAN
- Author, জান্নাতুল তানভী
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
"ওই বাচ্চাগুলোও আমার বাচ্চা। ওদের মুখে আমার বাচ্চাগুলোর ছবি ভাসতেছিল। আমি আমার সর্বোচ্চ দিয়ে যতগুলা পারছি প্রায় ২০-২৫ জনকে টেনে বের করে দিছি। এরপরে কী হলো আমি জানি না"–– জীবনের শেষ মুহূর্তে এই কথাগুলো নিজের স্বামীকে বলেছিলেন মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষিকা মাহরীন চৌধুরী।
জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) ভেন্টিলেশনে দেওয়ার পূর্ব মুর্হূতে স্বামী মনসুর হেলালের কাছে এই কথাগুলো বলে ক্ষমা চান নিহত এই শিক্ষিকা।
রাজধানীর উত্তরায় সোমবার স্কুলটির যে ভবনে বিমান বাহিনীর যুদ্ধবিমানটি বিধ্বস্ত হয়, সেদিন সেই ভবনের গেটেই দাঁড়ানো ছিলেন তিনি।
কারণ ওই সময় বেলা একটা থেকে দেড়টা পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে ওই স্কুলের দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ছুটি হয়। দায়িত্ব পালনের জন্য সেখানেই ছিলেন তিনি। প্রতিটি শিক্ষার্থীকে অভিভাবকের হাতে বুঝিয়ে দেওয়া ছিল তার দায়িত্ব।
মিজ চৌধুরী ওই প্রতিষ্ঠানের বাংলা ভার্সনের ক্লাস টু থেকে ক্লাস ফাইভের কো-অর্ডিনেটর ছিলেন।
তিনি ১৭ বছর ধরে ওই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। শিক্ষক হিসেবে যোগদান করে পদোন্নতি পেয়ে সবশেষে কো-অর্ডিনেটর হয়েছিলেন।
বিমানটি যখন সেখানে পড়ে তখন তিনি আহত হলেও বাঁচার জন্য ভবন থেকে বের হয়ে যাননি, বরং শ্রেণি কক্ষগুলোতে আরও শিক্ষার্থী রয়েছে বুঝতে পেরে ভবনটির ভেতরে ঢুকে যান বলে জানিয়েছেন তার স্বামী।
এই শিক্ষিকার স্বামী মনসুর হেলাল, যিনি বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত, তিনি বিবিসি বাংলাকে জানান, বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার খবর পেয়ে প্রথমেই স্ত্রীকে ফোন করেন।
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
কিন্তু ফোনে না পেয়ে বড় ছেলেকে দুর্ঘটনার খবর জানিয়ে মায়ের স্কুলে গিয়ে খোঁজ নিতে বলেন।
পরে তিনি জানতে পারেন মিজ চৌধুরীকে দুর্ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে প্রথমে উত্তরা আধুনিক হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। পরে তাকে জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়।
মিজ চৌধুরীকে বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সের চালকই ফোন করে তাদের সেখানে যাওয়ার অনুরোধ করেন বলে জানান মি. হেলাল।
বিবিসি বাংলাকে মি. হেলাল বলেন, "যখন ওকে রেসকিউ করে উত্তরা আধুনিক মেডিকেল হাসপাতালে নিয়ে গেছে, ওখান থেকে যখন অ্যাম্বুলেন্সে করে বার্ন ইউনিটের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল তখন আমাকে অ্যাকচুয়েলি অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভার ফোন দিয়ে বলে, আপনি কি মাহরীন মিসের হাসব্যান্ড নাকি? ওনাকে বার্ন ইউনিটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আপনি বার্ন ইউনিটে আসেন।"
তিনি জানান, প্রথমে জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের পাঁচ তলায় নিয়ে যাওয়া হয় নিহত মিজ চৌধুরীকে। পরে সেখান থেকে আইসিইউতে নেওয়া হয়।
ভবনটির ভেতরে ঢুকে পড়ায় শরীরের প্রায় শতভাগই পুড়ে গিয়েছিল মিজ চৌধুরীর।
ওই সময়ও তিনি জীবিত ছিলেন এবং মানসিকভাবে প্রচণ্ড শক্ত ছিলেন বলে উল্লেখ করেন মি. হেলাল।
"সেই মুহূর্তে আমার যতটুকু ওর সাথে (কান্নায় ভেঙে পড়েন, কথা জড়িয়ে যায়)......তখনও সে অ্যালাইভ। প্রচণ্ড মানসিক শক্তি দিয়ে সে সর্বোচ্চ কথাগুলো বলতেছিল। কারণ অলমোস্ট তার হান্ড্রেড পারসেন্ট বার্ন ইনার ও আউটার," বলেন তিনি।
এই স্কুলেরই আরেক জন শিক্ষিকা পূর্ণিমা দাস, যিনি দুর্ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে ছিলেন, তিনি আজ বুধবার ফেসবুকে এক পোস্টে কোন ক্লাসে কতজন শিক্ষার্থী ছিল তা লিখেছেন।
কীভাবে মাহরীন চৌধুরীসহ অন্যান্য শিক্ষিকারা বাচ্চাদের বের করতে গিয়ে নিজেরাই আগুনে ঝলসে যান তাও তিনি উল্লেখ করেছেন তার পোস্টে।
মিজ দাস ওই স্কুলের ট্রেইনি শিক্ষিকা। প্রায় ১৫ দিন আগে ওই স্কুলে যোগদান করেন তিনি।
ফেসবুকের এই পোস্টে তিনি নিহত ও আহতের সংখ্যা নিয়ে ভুল তথ্য না ছড়াতে অনুরোধ করেন।

ছবির উৎস, Reuters
"আমি হয়তো আর বেশিক্ষণ থাকব না"
"আমি হয়তো আর বেশিক্ষণ থাকবো না। তোমার সাথে হয়তো আমার জীবনের এটাই শেষ মুহূর্ত। আমি আর বেশিক্ষণ থাকব না। তুমি আমারে ক্ষমা কইরা দিও, আমি চলে যাচ্ছি"––বার্ন ইনস্টিটিউটের আইসিইউতে নেওয়ার আগে মাহরীন চৌধুরী শেষ বারের মতো এই কথাগুলো বলছিলেন বলে জানান মি. হেলাল।
কান্নায় ভেঙে পড়ে মি. হেলাল জানান, নিজের দুই সন্তানের কথা ভেবে কেন স্বার্থপর হননি- স্ত্রীকে এমন প্রশ্ন করেছিলেন তিনি।
যেহেতু গেটের সামনেই ছিলেন, তাই সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও কেন বের হয়ে যাননি এমন প্রশ্নে মিজ চৌধুরী তাকে বলেন, "ওই বাচ্চাগুলোও আমার বাচ্চা। ওই বাচ্চাগুলার মুখে আমার বাচ্চাগুলোর ছবি ভাসতেছিল। আমি আমার সর্বোচ্চ দিয়ে যতগুলা পারছি প্রায় ২০-২৫ জনকে টেনে বের করে দিছি। এরপরে কী হলো আমি জানি না (দ্বিতীয় বিস্ফোরণের সময়)।"
মি. হেলাল জানান মাহরীন চৌধুরী বিমানটি বিধ্বস্ত হয়ে পড়ার পর প্রথমবার আহত হন। কিন্তু ভবনটির নিচতলার শ্রেণিকক্ষে থাকা বাচ্চাদের উদ্ধার করতে ভেতরের দিকে এগিয়ে যান তিনি।
ছোট ছোট শিশুদের অভয় দিয়ে "তোমাদের মিস তোমাদের সাথেই আছে, তোমরা শুধু দৌড়াও" মাহরীন এমন কথা বলেন বলে উল্লেখ করেন মি. হেলাল।
ভবন থেকে বের হওয়ার গেটেই বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ায় কিছু শিক্ষার্থী সেখানে আহত হয়।
বেশ কিছু শিক্ষার্থী বের হতে পারলেও বিধ্বস্ত বিমানে দ্বিতীয়বার বিস্ফোরণ ঘটার পরে কী হয় তা আর টের পাননি বলে স্বামীকে জানিয়েছিলেন এই শিক্ষিকা। এ সময়ই তার সারা শরীর দগ্ধ হয়।
মনসুর হেলাল জানান, যখন আইসিইউতে ভেন্টিলেশনে নিয়ে যাওয়া হবে সেই মুহূর্তে শেষবারের মতো তার হাত ধরার অনুরোধ করেন তার স্ত্রী।
"যখন তাকে ভেন্টিলেশনে দেবে তার ঠিক আগ মুহূর্তে বলে–– তুমি আমার ডান হাতটা শক্ত করে ধরো। আমার হাতটা বুকের মধ্যে নিয়ে বলে–– তোমার সাথে এ জীবনে আমার আর দেখা হবে না," বিবিসি বাংলাকে ফোনে এ কথা বলার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন মি. হেলাল।
নিহত মাহরীন চৌধুরীর দুই ছেলে। ১৫ বছর বয়সী বড় ছেলে এ বছর মাস্টার মাইন্ড স্কুল থেকে ও লেভেল পরীক্ষা দিয়েছে।
আর ১৩ বছর বয়সী ছোট ছেলেও একই স্কুলের ক্লাস নাইনের শিক্ষার্থী বলে জানান মি. হেলাল।
শেষবারের মতো মা মাহরীন চৌধুরী বড় ছেলেকে "মানুষের মতো মানুষ" হতে বলেন।
নিহত মিজ চৌধুরীকে রাষ্ট্রীয় যথাযথ মর্যাদা দেওয়া হবে এমন আশা করেন তার স্বামী মি. হেলাল।
সোমবার বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর দগ্ধ অবস্থায় মাহরীন চৌধুরীকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে ওইদিনই সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।
পরদিন মঙ্গলবার নীলফামারী জেলার জলঢাকার বগুলাগাড়িতে পারিবারিক কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়।
বাংলাদেশের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের খালাতো ভাই মহিতুর রহমান চৌধুরীর মেয়ে নিহত মাহরীন চৌধুরী।

ছবির উৎস, Getty Images
"ভুল তথ্য ছড়াবেন না" ফেসবুক পোস্টে আরেক শিক্ষিকা
মাইলস্টোন স্কুলের ট্রেইনি শিক্ষক পূর্ণিমা দাস ফেসবুকে এক পোস্টে দোতলা ভবনটির নিচতলা ও দোতলার বিভিন্ন সেকশনে কত জন শিক্ষার্থী ছিল সে বিষয়ে উল্লেখ করেন।
ওই পোস্টে ভুল তথ্য না ছড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
একই সাথে নিচ তলার ক্লাউড সেকশনে বাচ্চার সংখ্যা আট থেকে দশজন ছিল বলে উল্লেখ করেন এই শিক্ষক।
আর এই সেকশন থেকেই মাহরীন চৌধুরীসহ তিন জন শিক্ষক বাচ্চাদের বের করার চেষ্টা করেছিলেন বলে লেখেন তিনি।
ফেসবুকে তিনি লিখেছেন, "এরপর আসেন ক্লাউডে, ওখানে বাচ্চার সংখ্যা (৮-১০) স্কাই এর চেয়ে বেশি ছিল। আমার ধারনা মাহরীন মিস, মাসুকা মিস ও মাহ্ফুজা মিস ওখান থেকেই বাচ্চা বের করার চেষ্টা করছিলো।"
"এবং তাদের বের করতে করতে নিজেরা ঝলসে যায়। যার মধ্যে মাহরীন মিস এবং মাসুকা মিসকে আমরা হারিয়ে ফেলেছি। মাহফুজা মিসের অবস্থা এখন গুরুতর, উনি লাইফ সাপোর্টে আছেন। উনার জন্য আপনারা দোয়া করবেন।"
একই সাথে অন্যান্য সেকশন ময়না, দোয়েল, টিউবার রোজ, ওয়াটার লিলিতে থাকা শিক্ষার্থীদের অবস্থানও তুলে ধরেন তিনি।
শিক্ষার্থীদের লাশ গুম হওয়ার যে গুজব ছড়ানো হয়েছে তাতে ক্ষোভ প্রকাশ করেই এই স্ট্যাটাস দিয়েছেন মিজ দাস।
"আপনাদের কোনো ধারণা নেই এই শিক্ষক-শিক্ষিকাগুলো কীভাবে বাচ্চাদেরকে সারাদিন আগলে রাখে। ছুটি হওয়ার সময় মাহরীন মিস গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে প্রতিদিন বাচ্চাদেরকে অভিভাবকদের হাতে বুঝিয়ে দেয়। যতক্ষণ একটা বাচ্চারও অভিভাবক থাকে উনি গেট থেকে নড়েন না," উল্লেখ করেছেন এই শিক্ষিকা।
তিনি ভুল তথ্য না ছড়ানোর জন্য সবাইকে অনুরোধ করেন।








