ব্রিটেনের নাগরিকত্ব ফিরে পাননি শামীমা বেগম, সিরিয়াতেই থাকতে হবে

তথাকথিত ইসলামিক স্টেট (আইএস) জঙ্গী গোষ্ঠীতে যোগ দিতে ২০১৫ সালে যুক্তরাজ্য থেকে সিরিয়ায় পালিয়ে যাওয়া শামীমা বেগম ব্রিটেনে ফিরতে পারবেন না। শুক্রবার যুক্তরাজ্যের আদালত নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়া নিয়ে শামীমা বেগমের আপিল খারিজ করে দিয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে, তিনি ব্রিটেনের নাগরিক নন।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শামীমা বেগমের জন্ম ও বেড়ে ওঠা যুক্তরাজ্যে। কিন্তু আট বছর আগে ব্রিটেন থেকে পালিয়ে সিরিয়ায় গিয়ে জঙ্গী গোষ্ঠি আইএস-এর সাথে যোগ দেবার কারণে তার নাগরিকত্ব বাতিল করেছিল ব্রিটিশ সরকার।
সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গত বছরের অক্টোবরে লন্ডনের আপিল আদালতে মামলা করেন শামীমা।
শুক্রবার বাংলাদেশ সময় বিকেল চারটার পর শামীমার আপিল মামলার রায় দেয় ব্রিটিশ আদালত। রায়ে জানানো হয় যে আইনগতভাবেই শামীমা বেগমের নাগরিকত্ব বাতিল করেছিলো ব্রিটিশ সরকার এবং বর্তমানে সিরিয়ায় বসবাসরত শামীমা বেগমের যুক্তরাজ্যে ফেরত আসার আর কোনও সম্ভাবনা নেই।
প্রধান বিচারপতি বলেছেন, শামীমা বেগমের মামলায় বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেয়া কঠিন হলেও, তিনি নিজেই তার দুভার্গ্যের ভিত্তি রচনা করেছেন।
আদালতের এই রায়ের পর সন্তোষ প্রকাশ করেছে ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
"ব্রিটেনের জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা করাটাই হচ্ছে আমাদের সবচেয়ে অগ্রাধিকার। এবং সেটি করতে গিয়ে আমরা যে কোন ধরণের বড় সিদ্ধান্ত নেব," বলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র।

ছবির উৎস, Getty Images
কে এই শামীমা বেগম?
বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত শামীমা বেগম যখন যুক্তরাজ্য থেকে পালিয়ে যান, তখন তার বয়স ছিলো মাত্র ১৫ বছর।
তিনি একা যান নি। তার সঙ্গে আরও গিয়েছিলো তার বন্ধু খাদিজা সুলতানা ও আমিরা আবাসি।ক খাদিজার বয়স ছিলো ১৬ ও আমিরার ১৫ বছর। মনে করা হয় যে খাদিজা মারা গেছেন। কিন্তু আমিরার বিষয়ে কিছু জানা যায়নি।
শামীমার বাবা-মা যুক্তরাজ্যে থাকার সুবাদে ওখানেই শামীমা জন্মগ্রহণ করেন। তবে তার বাংলাদেশি নাগরিকত্ব নেই।
২০১৯ সালে সিরিয়ার একটি শরণার্থী শিবিরে শামীমাকে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় পাওয়া যায়, যখন তার বয়স ছিলো ১৯ বছর। শামীমা একতা সন্তান জন্ম দিয়েছিলো। কিন্তু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে সেই শিশুটি মারা যায়।

ছবির উৎস, Getty Images
ঐসময় জাতীয় নিরাপত্তার কারণে ব্রিটিশ সরকার শামীমার নাগরিকত্ব কেড়ে নিলে শামীমা সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মামলা করেন এবং জানান যে তিনি যুক্তরাজ্যে ফিরে আসতে চান।
শামীমা বেগম তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে আইএস-এর নিয়ম-কানুন ও শাসনের অধীনে ছিলেন। শামীমা বেগম তুরস্ক হয়ে সিরিয়ার রাক্কায় পৌঁছানোর পর একজন ডাচ -বংশোদ্ভূত আইএস যোদ্ধার সাথে তার বিয়ে হয় এবং সেখানে তার তিনটি সন্তান হয় – যাদের সবাই মারা গেছে।
উল্লেখ্য, শামীমা এটি স্বীকার করেছিলেন যে নিষিদ্ধ সংগঠন জেনেই তিনি আইএসে যোগ দিয়েছিলেন এবং পরে তিনি এও বলেছিলেন যে এই দলে যোগ দেওয়ার জন্য তিনি লজ্জিত ও দুঃখিত।
‘জিহাদি বধূ’ হিসেবে সংবাদমাধ্যমে পরিচিত শামীমার বর্তমান বয়স ২৪ বছর এবং তিনি সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আল-রোজ নামক এক বন্দিশিবিরে বসবাস করছেন।

ছবির উৎস, Getty Images
কিভাবে সিরিয়ায় গিয়েছিল?
ইসলামিক স্টেট জঙ্গী গোষ্ঠীতে যোগ দেয়ার জন্য যুক্তরাজ্য থেকে পালিয়ে যাওয়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শামীমা বেগমকে কানাডার নিরাপত্তা সংস্থার এক গুপ্তচর সিরিয়ায় পাচার করেছিলো।
২০২২ সালে বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিলো যে এই গুপ্তচর শামীমা বেগমের পাসপোর্টের বিস্তারিত তথ্য কানাডাকে জানিয়েছিলেন এবং আরও ব্রিটিশ নাগরিককে ইসলামিক স্টেটের হয়ে লড়াই করার জন্য পাচার করেছেন।
২০২২ সালে বিবিসি’র 'আই এম নট এ মনস্টার'-এ কথা বলেছেন শামীমা বেগম।

ছবির উৎস, Getty Images
সেখানে তিনি বলেছেন, “মোহাম্মদ আল রশিদ তুরস্ক হতে সিরিয়া পর্যন্ত যাওয়ার সম্পূর্ণ ব্যবস্থা করে দিয়েছিল..আমার মনে হয় না পাচারকারীদের সাহায্য ছাড়া কারও পক্ষে সিরিয়ায় যাওয়া সম্ভব ছিল। উনি আরও বহু মানুষকে আসতে সাহায্য করেন...তিনি আমাদের যা যা করতে বলেছিলেন, আমরা তাই করছিলাম। কারণ তিনি সব জানতেন, আমরা তো কিছু্ই জানতাম না।”
শামীমা বেগমকে পাচারে সাহায্য করার কিছুদিনের মধ্যেই মোহাম্মদ আল রশিদ তুরস্কের সানলিউরফা শহর থেকে গ্রেফতার হন।
এক বিবৃতিতে মি. আল রশিদ জানিয়েছিলেন, তিনি শামীমা বেগম সহ যাদেরকে পাচারে সহযোগিতা করেন, তাদের সবার তথ্য তিনি সংগ্রহ করতেন, কারণ এসব তথ্য তিনি জর্দানে কানাডার দূতাবাসে পাঠাচ্ছিলেন।

বাংলাদেশে ফিরতে পারবে শামীমা?
ব্রিটিশ সরকার তার নাগরিকত্ব বাতিল করার পর বিষয়টি নিয়ে নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছিল ২০১৯ সালে।
কাউকে রাষ্ট্রবিহীন করা আন্তর্জাতিক আইনের বরখেলাপ- সে সময় এই বিতর্ক উঠলে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল শামীমা বেগম তার বাব-মার সূত্রে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব নিতে পারেন।
কিন্তু ২০১৯ সালের মে মাসে লন্ডনে বিবিসি বাংলার স্টুডিওতে এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেছিলেন , শামীমা বেগমকে নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
"শামীমা বেগমকে আমরা চিনি না। শামীমা বেগমের জন্ম ব্রিটেন। ব্রিটেনে বড় হয়েছে, শিক্ষা দীক্ষা ব্রিটেন। সে কোনোদিন বাংলাদেশে যায়নি। কখনো বাংলাদেশের নাগরিকত্বও চায়নি... তার বাব-মাও ব্রিটিশ নাগরিক।"

ছবির উৎস, Getty Images
মন্ত্রী বলেন, শামীমা বেগমের দায়িত্ব ব্রিটিশ সরকারের এবং তাকে নিয়ে তারা কী করবে সেটা তাদেরই দায়িত্ব। "আমাদের এর সাথে জড়ানো খুবই দু:খজনক।"
এরপরও যদি শামীমা বেগম বাংলাদেশে গিয়ে হাজির হয়, তাহলে সরকার কী করবে? - বিবিসির এই প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন বলেন, "আইন অনুযায়ী শাস্তি দেব, জেলে নিয়ে যাবো, সর্বোচ্চ শাস্তি হবে তার।"
কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত তো আদালতের? এই প্রশ্নে মি মোমেন বলেন, "বাংলাদেশের আইনেই মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। আপনারাই (ব্রিটেন) বলছেন সে সন্ত্রাসী। এ ধরনের সন্ত্রাসীদের কি এদেশে আদালতে নেওয়া হয়? আমেরিকাতে তো তাদের সোজা গুয়ানতানামো বে বন্দী শিবিরে নেওয়া হয়।"
"আর প্রথম কথা তাকে (শামীমাকে) বাংলাদেশে ঢুকতেই দেওয়া হবে না।"











