বাংলায় যেভাবে প্যাডেল স্টিমার চালু হয়েছিল

ছবির উৎস, BIWTC
- Author, সাইয়েদা আক্তার
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
যোগাযোগ ব্যবস্থা যখন এখনকার মত গতিশীল ছিল না, সে সময় ঢাকার বাদামতলী ঘাট থেকে রোজ সন্ধ্যায় ছেড়ে যেত কমলা রঙয়ের বিশালাকৃতি প্যাডেল স্টিমার। একে রকেট নামে চেনেন অধিকাংশ মানুষ, তাতে চেপে দেশ-বিদেশে গেছেন বহু মানুষ।
তৎকালীন পূর্ব বাংলার দক্ষিণাঞ্চলের মোংলা থেকে কলকাতা পর্যন্ত যেত অতিকায় সে জলযান। এসব প্যাডেল স্টিমার বা রকেটে যাতায়াত ছিল নিরাপদ আর আরামদায়ক, ফলে চাকরি-ব্যবসা-ভ্রমণসহ নানাবিদ প্রয়োজনে তাতে চলাচল করতেন বহু মানুষ।
কেবল যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ আর আরামদায়ক করাতেই ভূমিকা রাখেনি রকেট - কমলা রংয়ের বিশাল রকেটকে নিয়ে বাংলা সাহিত্য আর সঙ্গীতেও চর্চা কম হয়নি।
বাংলায় সবসময়কার জনপ্রিয় গানগুলোর একটি - 'ওরে নীল দরিয়া', সেটি 'সারেং বৌ' নামে কালজয়ী এক সিনেমার গান। বাড়িতে ফেলে আসা স্ত্রীর জন্য জাহাজের চালক বা সারেংয়ের তীব্র আবেগ আর আকুলতা যেন গানটিতে ফুটে উঠেছিল।
তবে রোমান্টিকতার দিন ফুরিয়েছে বহুদিন আগেই, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়াসহ নানা সংকটে রকেটের জনপ্রিয়তা কমে গিয়েছিল সাম্প্রতিক বছরগুলোতে।
সর্বশেষ তিনটি প্যাডেল স্টিমারের বহর নিয়ে শতবর্ষেরও বেশি পুরনো এসব নৌযানের সেবা ২০২২ সালে সাময়িকভাবে বন্ধ হয়। তারপর আর স্টিমারগুলো একেবারেই চালু করেনি কর্তৃপক্ষ।
যদিও ২০২৩ সালের এক ঈদে চালু করা হয়েছিল কয়েকদিনের জন্য, তবে তা স্থায়ী হয়নি।
কিন্তু এই প্যাডেল স্টিমার চালু হয়েছিল কবে আর কীভাবে?

ছবির উৎস, BIWTC
প্যাডেল স্টিমারের যাত্রার গল্প
আঠার শতকের শেষের দিকে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের হাত ধরে এ অঞ্চলে স্টিমার বা জাহাজ চলাচল শুরু হয়।
শুরুতে এ অঞ্চলে চালু হয়েছিল প্যাডেল স্টিমার।
এসব জাহাজে জ্বালানি হিসেবে এক সময় কয়লা ব্যবহার করা হত। কয়লা থেকে উৎপন্ন হওয়া স্টিম বা বাষ্পে এই নৌযান চলত বলে এর নাম হয় স্টিমার।
প্যাডেল স্টিমারে নৌযানের দুই পাশে বড় বড় চাকা বা প্যাডেল থাকত বলে এর নাম প্যাডেল স্টিমার। এই প্যাডেলের কারণেই এটি দ্রুতগতি সম্পন্ন নৌযান ছিল।
যে সময় এসব জাহাজ নদীতে নেমেছিল, সেসময় অন্য নৌযানের চাইতে এগুলো অনেক বেশি দ্রুত গতিতে চলত, যে কারণে লোকের মুখে মুখে এর নাম হয়ে যায় রকেট।
পরবর্তীতে আনুষ্ঠানিকভাবেই একে সবাই রকেট স্টিমার বলে ডাকতে শুরু করে।
কালের পরিক্রমায় পরবর্তীতে স্টিমারের নকশায় পরিবর্তন করে চাকা পেছনে নিয়ে যাওয়া হয়।

ছবির উৎস, BIWTC
বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ায় বলা হয়েছে, আঠারোশো শতকের গোঁড়ার দিকে ভারতের জলপথে স্টিমারের প্রচলন শুরু হয়।
সেই সাথে তখন কলকাতায় বেসরকারি খাতে জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে থাকে।
শুরুর দিকে মেসার্স কিড অ্যান্ড কোম্পানি নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ১৮২৩ সালে প্রথম যাত্রীবাহী স্টিমার 'ডায়না' দিয়ে হুগলী নদীতে পরিবহন ব্যবস্থা চালু করে।
এরপর ইন্ডিয়ান জেনারেল স্টিম নেভিগেশন কোম্পানি গঙ্গায় একটি স্টিমার সার্ভিস চালু করেছিল।
তবে ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে, অচিরেই সেটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে তারা ব্রহ্মপুত্র নদে ভিন্ন একটি সার্ভিস চালু করে।
এসব স্টিমার মূলত যাত্রী পরিবহনের জন্যই ব্যবহার হত।
কিন্তু উত্তর আসামের চা ধীরে ধীরে বিদেশের বাজারে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে থাকলে, তৎকালীন সরকার ১৮৪৭ সালে কলকাতা ও গৌহাটির মধ্যে একটি নতুন রুটে বা পথে স্টিমার সার্ভিস চালু করে বলে বাংলাপিডিয়া উল্লেখ করেছে।
এরপর ১৮৬২ সালে স্টিমারে করে কলকাতা থেকে মূলত এখনকার বাংলাদেশ অংশে যাত্রী এবং পণ্য পরিবহনের কাজ শুরু হয়।

ছবির উৎস, BIWTC
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ বিআইডব্লিউটিএ'র একজন সাবেক সচিব সৈয়দ মনোয়ার হোসেন বিবিসিকে বলেছেন, ওই সময় কোলকাতা থেকে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে, চাঁদপুর হয়ে নারায়ণগঞ্জে পৌঁছাত প্রথম চালু হওয়া প্যাডেল স্টিমার।
পরবর্তীতে কোলকাতা থেকে আসামের করিমগঞ্জ পর্যন্ত যাওয়ার একটি এবং কোলকাতা থেকে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের সংযোগস্থল বর্তমান বাংলাদেশের রাজবাড়ি জেলার গোয়ালন্দ পর্যন্ত পৌঁছানোর আরেকটি রুটে স্টিমার সার্ভিস চালু হয়।
গোয়ালন্দ পর্যন্ত যাওয়ার রুটটি চালু হয় ১৮৭০ সালে এবং সেসময় ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে চালু হয়ে যাওয়ায় তখন কলকাতা থেকে ঢাকায় যাতায়াতের সাধারণ মাধ্যমে পরিণত হয় এই সার্ভিস।
প্রথমে কলকাতা থেকে ট্রেনে চেপে গোয়ালন্দ পৌঁছে একজন যাত্রী গোয়ালন্দ থেকে স্টিমারে চড়তেন, সেটি ঢাকা হয়ে পৌঁছাত নারায়ণগঞ্জ।
একই সাথে যাত্রী এবং পণ্য পরিবহনের সহজ রুট বলে গোয়ালন্দ তখন বড় ব্যবসায়িক কেন্দ্রে পরিণত হয় বলে উল্লেখ করেছেন বিআইডব্লিউটিএর সাবেক কর্মকর্তা মি. হোসেন।
নদী প্রধান অঞ্চলে সহজ, নিরাপদ এবং সুলভ ভাড়ার কারণে স্টিমার দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং সে জনপ্রিয়তা বহাল ছিল বহু বছর।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন

ছবির উৎস, BIWTC
এমনকি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পরও অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহনে স্টিমার সার্ভিস জনপ্রিয় ছিল, যদিও তা সাম্প্রতিক দশকগুলোতে ধরে রাখা যায়নি।
যেভাবে বাংলাদেশে স্টিমারের যাত্রা বন্ধ হয়
সর্বশেষ ২০২২ সালে রকেট সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ করার পর বিআইডব্লিউটিসির মুখপাত্র মোঃ নজরুল ইসলাম মিশা বিবিসিকে বলেছেন, যাত্রী সংকট এবং আর্থিক লোকসান সামাল দিতে না পারার কারণে স্টিমার সার্ভিস সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে কর্তৃপক্ষ।
সর্বশেষ বিআইডব্লিউটিসির বহরে তিনটি প্যাডেল স্টিমার ছিল।
তিনটি স্টিমারের একটি পিএস মাহসুদের বয়স ৯৪ বছর, ১৯২৮ সালে কলকাতার গার্ডেন রিচ ওয়ার্কশপে এই প্যাডেল স্টিমারটি নির্মাণ করা হয়।
দেশীয় প্যাডেল স্টিমার বহরের মধ্যে সবচেয়ে বড় দুটি স্টিমারের একটি পিএস মাহসুদ।
এছাড়া বহরের বাকি দুইটি স্টিমার পিএস লেপচা ১৯৩৮ সালে এবং পিএস টার্ন ১৯৫০ সালে কলকাতার গার্ডেন রিচ শিপইয়ার্ডে নির্মিত হয়।
বিআইডব্লিউটিএর সাবেক কর্মকর্তা মি. হোসেন বলেছেন, এক সময় বিআইডব্লিউটিসির বহরে ১৫টির মত প্যাডেল স্টিমার ছিল।
সেই বহর তৈরি হয়েছিল, ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ভারতের সরকারি ও বেসরকারি খাতে চলা রকেট স্টিমারগুলোকে নিয়ন্ত্রণে নেয় তৎকালীন ন্যাশনাল শিপিং কর্পোরেশন। এই প্রতিষ্ঠানটিই ১৯৭২ সালে বিআইডব্লিউটিসিতে রূপান্তরিত করা হয়।
এসব স্টিমারে আশির দশক পর্যন্ত জ্বালানি হিসেবে কয়লা ব্যবহার করা হত। কিন্তু ১৯৮৩ সালে কয়লার পরিবর্তে ডিজেল ইঞ্জিনে রূপান্তরিত হয় এগুলো।

ছবির উৎস, BIWTC
বাংলাদেশের এসব স্টিমারে চেপে নদী ভ্রমণ করেছেন ব্রিটেনের প্রয়াত রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। ১৯৬১ সালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে সফরের সময় তিনি রকেটে চড়েন।
এ ছাড়া বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মহাত্মা গান্ধী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, যুগোস্লাভিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান মার্শাল টিটোসহ দেশ-বিদেশের বরেণ্য বহু অতিথি এই জলযানে চেপে বাংলাদেশের সৌন্দর্য উপভোগ করেছেন।
প্রায় দুই বছর আগে ২০২২ সালে বন্ধের সময় বিআইডব্লিউটিসি প্যাডেল স্টিমার পিএস মাহসুদ, পিএস লেপচা এবং পিএস টার্ন -এই তিন জাহাজকে রাষ্ট্রীয় ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে।
সেসময় প্রতিষ্ঠানটির একজন কর্মকর্তা মি. ইসলাম বিবিসিকে বলেছিলেন, এখন একটি মাত্র জাহাজ পিএস মাহসুদ 'ন্যাশনাল ক্রুজ' হিসেবে রাষ্ট্রীয় অতিথিদের ভ্রমণের কাজে ব্যবহারের জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছে।
বাকি দুইটি স্টিমার চার্টার্ড অর্থাৎ বেসরকারি পর্যটনের জন্য ভাড়া দেয়ার পরিকল্পনা করেছে বিআইডব্লিউটিসি।
সর্বশেষ রকেট স্টিমার ঢাকা থেকে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ পর্যন্ত যেত আর পথে চাঁদপুর, বরিশাল, ঝালকাঠি, কাউখালী, হুলারহাটসহ বেশ কয়েকটি স্টেশন বা ঘাটে থামত।
তার আগে ২০১৯ সালের এপ্রিলে নাব্যতা-সংকটের কারণে ঢাকা থেকে খুলনা পর্যন্ত যাওয়ার রুট বন্ধ হয়ে যায়।

ছবির উৎস, BIWTC








