ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনায় ইসরায়েলের হামলা

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরানের রাজধানী তেহরানে পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনাকে মূল লক্ষ্যবস্তু করে একাধিক হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল।

ইরানের স্থানীয় সময় ভোর ৪টার দিকে তেহরানে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।

এর কিছু সময় পর, তেহরানে তখন ভোর ৫টা ৩০ মিনিট এবং ইসরায়েলের অন্যতম প্রধান শহর তেল আবিবে ভোর ৫টা, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

পাশাপাশি, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ তাদের দেশে জরুরি অবস্থাও ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, "খুব শীঘ্রই ইসরায়েলের ওপর পাল্টা হামলা" চালাতে পারে ইরান।

ইসরায়েল ইরানের ওপর যখন এই হামলা চালায়, ইসরায়েলের মানুষ তখন ঘুমাচ্ছিলেন। কিন্তু সাইরেণের বিকট শব্দে এবং মোবাইলে জরুরি সতর্কবার্তা পেয়ে তারা জেগে ওঠেন।

এই তালিকায় জেরুজালেমে অবস্থানরত একজন বিবিসি সংবাদদাতাও রয়েছেন।

এদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এ বিষয়ে বলেছেন, "এই হামলা ইরানের পরমাণু সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচির কেন্দ্রে আঘাত হেনেছে" এবং "এটি অনির্দিষ্টকাল চলবে।"

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিবিসিকে জানিয়েছেন, এই হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ও অন্যান্য সামরিক ঘাঁটি।

তিনি আরও বলেন, "ইরানের কাছে এত বেশি পরিমাণে পরমাণু উপাদান মজুত রয়েছে, যা দিয়ে তারা কয়েক দিনের মধ্যেই পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে পারে।"

'এই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের কোনও সম্পৃক্ততা নেই'

এ হামলায় যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবেই জড়িত নয় বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউজ।

ইরানে ইসরায়ল হামলা চালানোর পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও একটি বিবৃতি দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন যে, এই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

তিনি বলেন, "আজ রাতে ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে একতরফাভাবে সামরিক পদক্ষেপ নিয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে এই হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন আমাদের শীর্ষ অগ্রাধিকার এখন।"

তিনি আরও বলেন, "ইসরায়েল আমাদের জানিয়েছে যে তারা আত্মরক্ষার্থে এই পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তার প্রশাসন ইতোমধ্যে আমাদের সেনাদের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিয়েছে। পাশাপাশি, আমরা আমাদের আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখেছি।"

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সবশেষে সতর্ক করে বলেন, "আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, ইরান যেন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ বা কোনো মার্কিন নাগরিককে লক্ষ্য না করে।"

এদিকে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তরফ থেকে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য আসেনি।

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর প্রেক্ষিতে সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চায় না ইসরায়েল ইরানে কোনো হামলা করুক।

"যতক্ষণ পর্যন্ত একটি চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, ততক্ষণ আমি চাই না তারা (ইসরায়েল) সেখানে ঢুকে যাক," বলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি সতর্ক করে আরও বলেন, "এই মুহূর্তে হামলা হলে তা আলোচনার সম্ভাবনাকে নষ্ট করে দিতে পারে।"

তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প তখন এটি স্বীকার করেন যে, হামলার বিষয়টি খুব "সন্নিকটে" চলে এসেছে।

"আমি বলছি না এটা অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু যেভাবে পরিস্থিতি এগোচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে যে এটা হবে" উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, তিনি "সংঘাত এড়াতে আগ্রহী।"

একইসঙ্গে তিনি জোর দিয়ে এও বলেন, "আমরা চাই, এমন কিছু তাদেরকে (ইরান) দিতে রাজি হতে হবে। তারা এখনও সেগুলো দিতে রাজি না।"

ইরানের ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা

হামলার পরপরই তেহরানের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সব ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, হামলায় আবাসিক এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং শিশুদের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

এছাড়া, ইরানের ইসলামিক রেভল‍্যুশনারি গার্ডের প্রধান কার্যালয়ের ওপরও হামলা হয়েছে। এতে নিহত হয়েছেন আইআরজিসি'র কমান্ডার হোসেইন সালামি।

শুক্রবার ভোরের ওই হামলায় নিহত ইরানি কর্মকর্তাদের মধ্যে তিনিই সম্ভবত জ্যেষ্ঠ পদাধিকারী।

ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক কর্মসূচিতে জড়িত থাকার জন্য ২০০০ সাল থেকে মি. সালামির ওপর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রয়েছে।

সালামি ১৯৮০ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় প্রথম রেভল্যুশনারি গার্ডে যোগ দেন।

বাহিনীতে তার নেতৃত্বের সময়কালেই গত বছর ইরান ইসরায়েলের উপর প্রথমবারের মতো সরাসরি সামরিক আক্রমণ চালায়।

৩০০ টিরও বেশি ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করা হয়েছিল ওই হামলায়।

ইসরায়েলের সাথে ক্রমশ উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে একদিন আগেই মি. সালামি মন্তব্য করেছিলেন, ইরান "যেকোনো পরিস্থিতির জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত"।

এর বাইরে হামলায় ইরানের শীর্ষস্থানীয় দুই পারমাণবিক বিজ্ঞানীও নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলি হামলায় নিহত দুই জ্যেষ্ঠ পরমাণু বিজ্ঞানীর নাম প্রকাশ করেছে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন।

তাদের একজন হলেন, ফেরেয়দুন আব্বাসি। মি. আব্বাসি ইরানের পারমাণবিক শক্তি সংস্থা, এইওআই-এর সাবেক প্রধান। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা দায়িত্বে আছে এইওআই।

মি. আব্বাসিকে ২০১০ সালে একবার হত্যার চেষ্টা হয়েছিল। সেই দফায় বেঁচে যান তিনি।

ইসরায়েলের হামলায় নিহত অপর বিজ্ঞানীর নাম মোহাম্মদ মেহেদী তেহরানচি। তিনি তেহরানের ইসলামিক আজাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি।