আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
মোদী ও শি-র বৈঠকে যা বলেছেন দুই নেতা
- Author, লরা বিকার, স্টিভেন ম্যাকডোনেল ও ডানাই নেস্টা কুপেম্বা
- Role, বিবিসি নিউজ (যথাক্রমে বেইজিং, তিয়ানজিন ও লন্ডন থেকে)
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেছেন যে তাদের দুই দেশ এখন নিজেদের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ককে গভীর করতে চাইছে। বিগত বহু বছর ধরে এই দুটি দেশের মধ্যে উত্তেজনা চলছে, চীন ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত বিরোধের ইতিহাসও খুব পুরনো।
চীনের বন্দর শহর তিয়ানজিনে সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) শীর্ষ সম্মেলনের অবকাশে এই দুই নেতা আজ (রোববার) নিজেদের মধ্যে বৈঠকে মিলিত হন। গত সাত বছরের মধ্যে এই প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী মোদী চীনে সফর করছেন।
চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস রিপোর্ট করেছে, বৈঠকে প্রেসিডেন্ট শি প্রধানমন্ত্রী মোদীকে বলেন, চীন ও ভারত পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয় – বরং তারা হল সহযোগিতার অংশীদার ('কোঅপারেশন পার্টনারস')।
দুই দেশ যে পরস্পরের কাছে হুমকি নয়, বরং একে অন্যের কাছে 'উন্নয়নের সুযোগ', সে কথাও বলেন তিনি।
অন্য দিকে প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেন, দুই দেশের মধ্যে এখন একটা 'শান্তি ও স্থিতিশীলতার পরিবেশ' বিরাজ করছে।
তিয়ানজিনে এই এসসিও জোটের সম্মেলনে এবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও এসেছেন, উপস্থিত আছেন ২০জনেরও বেশি বিশ্বনেতা।
'ট্রাম্প ট্যারিফে'র ছায়াপাত
কিন্তু আমেরিকার সাথে বাকি দুনিয়ার বাণিজ্য যুদ্ধই যথারীতি সম্মেলনের বাকি সব এজেন্ডাকে ছাপিয়ে গিয়েছে।
রাশিয়ার থেকে জ্বালানি তেল কেনার 'শাস্তি' হিসেবে মোটা পেনাল্টি-সমেত ভারতের ওপর মোট ৫০% হারে চড়া শুল্ক (ট্যারিফ) আরোপ করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
পুতিন নিজেও ইউক্রেনের বিরুদ্ধে তার যুদ্ধর কারণে আমেরিকা-সহ পশ্চিমা বিশ্বের নিষেধাজ্ঞার (স্যাংশন) মুখে পড়েছেন।
ওদিকে মার্কিন-ভারত সম্পর্ক যতই অস্বস্তি ও বাধার মুখে পড়ছে, প্রধানমন্ত্রী মোদী ততই প্রেসিডেন্ট শি-র দিকে ঝুঁকছেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
চীন ও ভারত বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দু'টি দেশই শুধু নয় – বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিগুলোরও অন্যতম।
প্রেসিডেন্ট শি-র সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী মোদী আরও জানান, দুদেশের মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচলও আবার শুরু হতে যাচ্ছে – যদিও এর জন্য তিনি কোনও নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করেননি।
২০২০ সালের গ্রীষ্মে গালওয়ান ভ্যালিতে ভারত ও চীনের সেনাবাহিনীর মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর থেকেই দুদেশের মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচল বন্ধ ছিল।
প্রেসিডেন্ট শি বলেন, "আমাদের দু'দেশের সম্পর্ককে যাতে একটি স্ট্র্যাটেজিক দৃষ্টিকোণ ও দীর্ঘমেয়াদী মানসিকতা দিয়ে দেখা হয় এবং সেভাবেই সামলানো হয়, দু'পক্ষকেই সেটা দেখতে হবে।"
তিনি আরও যোগ করেন, "পরস্পরের বন্ধু হওয়াটাই পরস্পরের জন্য সঠিক পছন্দ হবে।"
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী মোদী কৈলাস মানসরোবর যাত্রা ও পর্যটক ভিসা-র কথাও উল্লেখ করেন।
প্রসঙ্গত, কোভিডের সময় থেকে বন্ধ থাকলেও ভারতীয় তীর্থযাত্রীরা আগে যে চীনের তিব্বতে অবস্থিত কৈলাস ও মানসরোবারে যাওয়ার অনুমতি পেতেন – তা এবছর থেকে আবার শুরু হয়েছে।
ভারতও সম্প্রতি চীনের নাগরিকদের জন্য পর্যটক ভিসা আবার দিতে শুরু করেছে।
এসসিও শীর্ষ সম্মেলনে যা হচ্ছে
এসসিও বা সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন হলো এমন একটি জোট যা ২০০১ সালে তৈরি হয়েছিল মূলত চীন, রাশিয়া ও সেন্ট্রাল এশিয়ার আরও চারটি দেশের উদ্যোগে।
নেটো-র মতো পশ্চিমা জোটের প্রভাব প্রতিহত করতেই এসসিও-র অবতারণা করা হয়েছিল।
এখন অবশ্য এই জোটে মোট দশটি সদস্য দেশ রয়েছে, যার মধ্যে চীন ও রাশিয়া ছাড়াও পরে ভারত, পাকিস্তান ও ইরান অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
এছাড়াও এসসিও-তে সংলাপের অংশীদার ('ডায়ালগ পার্টনার') ও পর্যবেক্ষক (অবজার্ভার) হিসেবেও রয়েছে আরও ১৬টি দেশ।
তবে এবারে তিয়ানজিনে যে বিরাট আকারে শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, জোট প্রতিষ্ঠার পর থেকে সেটাই বৃহত্তম।
স্বাগতিক দেশ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ছাড়াও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ সকলেই সশরীরে এই সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন।
এসসিও শীর্ষ সম্মেলনকে অনেকটা প্রতীকী ('সিম্বলিক') বলে ধরা হলেও উপস্থিত বিশ্বনেতারা এখানে তাদের অভিন্ন স্বার্থ বা অভিন্ন অভিযোগগুলো তুলে ধরার সুযোগ পেয়ে থাকেন।
এই সামিট শেষ হওয়ার ঠিক পরই বেইজিংয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার ৮০তম বার্ষিকী উদযাপিত হবে – যে অনুষ্ঠানে চীন বর্ণাঢ্য সামরিক কুচকাওয়াজের মধ্যে দিয়ে জাপানের বিরুদ্ধে তাদের 'বিজয় দিবস'ও পালন করবে।
প্রধানমন্ত্রী মোদী অবশ্য সেই অনুষ্ঠানে থাকছেন না। জাপানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কও খুব মধুর, বস্তুত মোদী এই চীন সফরেও এসেছেন সরাসরি জাপান থেকেই।
তিয়ানজিনে এখন পরিস্থিতি যেমন
তিয়ানজিনের জন্য এই এসসিও শীর্ষ সম্মেলন একটি বিরাট অনুষ্ঠান হয়ে উঠেছে। চীনের উত্তরাঞ্চলীয় এই বন্দর নগরীতে অজস্র ব্যানার এবং বিলবোর্ডের মাধ্যমে সম্মেলনের প্রচার চালানো হচ্ছে।
সম্মেলন উপলক্ষে শহরে রাতে আলোকসজ্জা ও লেসার শো প্রদর্শনীরও আয়োজন করা হয়েছে।
রাতে হাজার হাজার স্থানীয় দর্শক নদীর তীরবর্তী এলাকায় ভিড় জমাচ্ছেন টাওয়ার ব্লকগুলিতে প্রদর্শিত এই সব লাইট শো দেখার জন্য। তিয়ানজিনের বাসিন্দাদের মধ্যে প্রচন্ড উৎসাহ উদ্দীপনাও দেখা যাচ্ছে।
শহরের রাস্তাগুলোতেও এখন প্রচণ্ড ভিড় – এতটাই যে মানুষের চলাফেরা পর্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে ঐতিহাসিক জিয়েফাং সেতুর ওপর ও আশপাশের এলাকায়।
মাঝে মাঝেই তিয়ানজিনের বিভিন্ন রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে, যাতে শহরে আগত বিশ্বনেতাদের গাড়িবহর দ্রুত পার হতে পারে। এর জন্য দিনের অনেকটা সময় পথচারীদের অপেক্ষাও করতে হচ্ছে।
ডাউনটাউন বা শহরের কেন্দ্রীয় এলাকায় ট্যাক্সি ও অন্যান্য রেন্টাল গাড়ির পরিষেবা পর্যন্ত সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
তবে এর ফলে স্থানীয় মানুষজনের বেশ অসুবিধা হলেও তাদের উৎসাহ একেবারেই কমে যায়নি। এটা পরিষ্কার যে তিয়ানজিনের বিপুল সংখ্যক মানুষ এই ঐতিহাসিক শীর্ষ সম্মেলনের অংশ হতে চাইছেন।
তবে, পুলিশ তিয়ানজিনের প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ বাসিন্দাকে পরামর্শ দিয়েছে যে সম্ভব হলে তারা শহরের ভেতরে চলাফেরা এড়িয়ে চলুন এবং বাড়ির কাছের দোকান থেকেই প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে নিন।