আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
ছোট ভাইয়ের সঙ্গে কেন সম্পর্ক ছিন্ন করলেন মমতা ব্যানার্জী?
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর পরিবারের ভেতরে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা এক বিবাদ প্রকাশ্যে এসে পড়েছে। তার ছোট ভাই স্বপন ব্যানার্জী, যাকে মানুষ বাবুন ব্যানার্জী বলেই চেনেন, তার সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন মমতা ব্যানার্জী।
মুখ্যমন্ত্রী বুধবার শিলিগুড়ি শহরে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, “আজ থেকে আমি শুধু নয়, মা মাটি মানুষের সঙ্গে ওর সম্পর্ক বিচ্ছেদ হয়ে গেল। ভাই বলে পরিচয় দেবেন না। নো রিলেশন, সব সম্পর্ক ছিন্ন করলাম।“
ঘটনার সূত্রপাত তৃণমূল কংগ্রেস লোকসভা নির্বাচনে তাদের প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করার পরেই।
মমতা ব্যানার্জীর ভাই স্বপন, ওরফে বাবুন ব্যানার্জী ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন যে তিনি হাওড়া লোকসভা কেন্দ্র থেকে প্রার্থী হতে চান।
ওই কেন্দ্রে যাকে প্রার্থী করেছে তৃণমূল কংগ্রেস, গত দশ বছরের সংসদ সদস্য, প্রাক্তন ফুটবলার প্রসূন ব্যানার্জী যে তার ঘোর অপছন্দের, সে কথাও বলেছিলেন মমতা ব্যানার্জির ছোট ভাই।
ঘটনাচক্রে পশ্চিমবঙ্গের একাধিক ক্রীড়া সংস্থার শীর্ষে রয়েছেন মমতা ব্যানার্জীর এই ছোট ভাই। সেগুলির মধ্যে রয়েছে বেঙ্গল অলিম্পিকস অ্যাসোসিয়েশন, রাজ্য হকি এবং বক্সিং সংস্থা।
‘দিদি’ মমতা ব্যানার্জীর ‘আশীর্বাদ’ নিয়ে তিনি হাওড়ায় নির্দল প্রার্থী হবেন, এরকমও বলেছিলেন বাবুন ব্যানার্জী।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন
ওই কথা ঘোষণার পরে তিনি দিল্লি চলে গিয়েছিলেন। মি. ব্যানার্জী বিজেপিতে যোগ দিতে পারেন, এরকম খবরও চাউর হয়ে গিয়েছিল।
এর পরেই মমতা ব্যানার্জীকে সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি নিয়ে জানতে চাওয়া হয়।
‘সব সম্পর্ক ছিন্ন করলাম’
মমতা ব্যানার্জী এবং তার পরিবারকে খুব ঘনিষ্ঠভাবে চেনেন, এরকম অন্তত দুজন সিনিয়র সাংবাদিক বিবিসি বাংলাকে বলেছেন সব থেকে ছোট ভাই স্বপন, ওরফে বাবুন ব্যানার্জীর সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই খারাপ।
একবার এই ছোট ভাইয়ের সঙ্গে অশান্তির কারণে মমতা ব্যানার্জী তার মাকে নিয়ে বাড়ি ছেড়েও চলে গিয়েছিলেন। সাময়িকভাবে তৃণমূল কংগ্রেসের দফতরে থাকতে শুরু করেছিলেন তিনি।
পরে অবশ্য বাড়ি ফিরে আসেন, তবে ভাই আর দিদির সম্পর্ক জোড়া লাগেনি কখনওই।
মাঝে মাঝে নিজের পরিবার এবং ছোট ভাইয়ের ব্যাপারে কিছু কথা বললেও শিলিগুড়ির সংবাদ সম্মেলনে বুধবার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী যতটা আবেগ-তাড়িত হয়ে কথা বলেছেন, সেরকমটা আগে কখনও ঘটে নি, এমনই বলছেন সিনিয়র সাংবাদিকরা।
মিজ. ব্যানার্জী ছোট ভাইয়ের সম্পর্কে বলেন, "অনেক কষ্ট করে ছোট ভাই-বোনদের মানুষ করেছি আমি। কিন্তু ওকে মানুষ করতে পারিনি।"
"আমার পরিবারে ৩২ জন সদস্য আছেন। সবাই ওর উপর ক্ষুব্ধ, প্রত্যেকবার ভোটের সময় অশান্তি করে। বড় হলে অনেকের লোভ বেড়ে যায়।"
"আজ থেকে আমি শুধু নয়, মা মাটি মানুষের সঙ্গে ওর সম্পর্ক বিচ্ছেদ হয়ে গেল। ভাই বলে পরিচয় দেবেন না। নো রিলেশন, সব সম্পর্ক ছিন্ন করলাম।“
তিনি এও বলেছেন, “ও ভুলে গেছে বাবা মারা যাওয়ার পরে কীভাবে ওকে বড় করেছি আমি। মাত্র আড়াই বছর বয়স ছিল তখন ওর। আমি দুধের ডিপোয় কাজ করে ৪৫ টাকা মাইনে পেয়ে ওদের বড় করেছি।“
ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা মমতা ব্যানার্জী প্রকাশ্যে ঘোষণা করার পরেই বুধবার রাতে দিল্লি থেকে ফিরে এসেছেন স্বপন, ওরফে বাবুন ব্যানার্জী।
সংবাদ মাধ্যমকে তিনি বলেন, “দিদি আমার ভগবান। দিদি-ভাইয়ের ব্যাপার, দিদি আজকে বকল। কাল দিদিকে যতই হোক, আমি পায়ে ধরে নেব। দিদি যদি আমায় মারে-ধরে, এটা পরিবারের ব্যাপার।“
পরিবারতন্ত্রের অভিযোগ
প্রধানমন্ত্রী-সহ বিজেপি নেতারা বারে বারেই বিরোধী দলগুলিতে পরিবারতন্ত্র চলছে বলে মন্তব্য করে থাকেন।
তাদের নিশানায় যে কয়েকটি রাজনৈতিক পরিবার থাকে, তার মধ্যে যেমন কংগ্রেসের গান্ধী পরিবার রয়েছে, তেমনই আছে মমতা ব্যানার্জীর পরিবারের নামও।
ঘটনাচক্রে মমতা ব্যানার্জীর পরিবারে তার ভাইপো অভিষেক ব্যানার্জী রাজনীতিতে এসেছেন আর তার পরিবারের আরেক সদস্য কাজরী ব্যানার্জী কয়েক বছর আগে কলকাতা পৌর সংস্থার নির্বাচনে নেমে কাউন্সিলার হয়েছেন।
মমতা ব্যানার্জীকে তার রাজনৈতিক জীবনের প্রায় শুরু থেকে দেখছেন, এমন এক সিনিয়র সাংবাদিক রন্তিদেব সেনগুপ্ত বলছিলেন, “মমতা একেবারেই সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।"
“তিনি যদি বাবুনের দাবি মেনে নিতেন, তাহলে তো পরিবারের আরও অনেক সদস্যও বিধায়ক, সংসদ সদস্য বা কাউন্সিলার হওয়ার দাবি জানাতে পারতেন। ভাইয়ের অভিমানকে পাত্তা না দিয়ে তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে একদম ঠিক কাজ করেছেন। বিজেপি তার বিরুদ্ধে পরিবারতন্ত্রের যে অভিযোগ করে, তার জবাব দিয়েছেন তিনি।“
মি. সেনগুপ্ত বলছিলেন যে খুব কম বয়সে বাবাকে হারানোর পরে খুবই কষ্ট করে ভাই বোনেদের বড় করেছেন মমতা ব্যানার্জী।
একটা সময় সরকারি দুধের দোকানে অস্থায়ী কাজ করতেন তিনি।
“ভাই বোনেদের মমতা খুবই স্নেহ করেন। তাই হয়তো এর আগে প্রকাশ্যে কিছু বলতে পারেননি ছোট ভাইয়ের ব্যাপারে। তবে একটা সময়ের পরে তো ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যায়। শেষমেশ তিনিও তো মানুষ।"
"কেউ অন্যায্য চাপ তৈরি করবে, সেটা হয়তো তিনি আর সহ্য করতে পারছিলেন না”, বলছিলেন রন্তিদেব সেনগুপ্ত।
End of বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর
‘দলই আমার পরিবার’
মমতা ব্যানার্জী সব সময়েই বলে থাকেন যে দলই তার পরিবার। বুধবারের সংবাদ সম্মেলনেও সে কথা উল্লেখ করেন তিনি।
“কিন্তু নিজের রক্তের সম্পর্কের যে পরিবার, এবং পরিবারতন্ত্র নিয়ে তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ ওঠে, তার এত বিস্তারিত জবাব মমতা ব্যানার্জিকে আগে দিতে দেখিনি,” বলছিলেন সিনিয়র সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরী।
তিনিও অনেক দশক ধরে মমতা ব্যানার্জীর রাজনীতি খুব কাছ থেকে লক্ষ্য করে আসছেন।
“একজন দক্ষ রাজনীতিবিদ হিসাবে সম্ভবত তিনি বুঝতে পারছিলেন যে বিজেপি তার বিরুদ্ধে যে পরিবারতন্ত্রের অভিযোগ তোলে, সেটা হয়তো মানুষ ভালভাবে নিচ্ছে না।"
"তাই তাকে একটা দীর্ঘ ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে যে তিনি রক্তের সম্পর্কের পরিবারের সদস্যদের বাড়তি সুবিধা দেন না, পরিবারতন্ত্রে বিশ্বাস করেন না। বাবুন ব্যানার্জীর এই ঘটনাটি একটা অনুঘটকের কাজ করেছে এখানে”, বলছিলেন মি. চৌধুরী।
তবে অভিষেক ব্যানার্জীর রাজনৈতিক কেরিয়ার শুরু করার জন্য মমতা ব্যানার্জি যে পৃথক একটি সংগঠন গড়ে দিয়েছিলেন, সেটাও উল্লেখ করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
তারা বলছেন, তৃণমূল কংগ্রেসর গঠনতন্ত্রে যে সব শাখা সংগঠনের উল্লেখ আছে, তার মধ্যে ‘তৃণমূল যুবা’ বলে কোনও সংগঠনের কথা নেই।
কিন্তু ভাইপো অভিষেক ব্যানার্জীকে রাজনীতিতে নিয়ে আসার জন্য মিজ. ব্যানার্জী ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পরে কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড ময়দানের জনসভায় ওই সংগঠনটির সূচনা করেছিলেন। শীর্ষে ছিলেন অভিষেক ব্যানার্জী।
পরে তৃণমূল কংগ্রেসের যুব শাখার সঙ্গে মিশে যায় ‘তৃণমূল যুবা’ নামের সংগঠনটি।
ততদিনে অবশ্য রাজনীতিবিদ হিসাবে অভিষেক ব্যানার্জী প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছেন।
সিনিয়র সাংবাদিক রন্তিদেব সেনগুপ্ত বলছিলেন, “এটা ঠিকই যে মমতার হাত ধরেই অভিষেকের রাজনীতিতে আসা। সেই প্রথম নিজের পরিবারের কোনও সদস্যকে রাজনীতিতে নিয়ে এসেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী।"
"কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে সংসদ সদস্য হওয়ার পরে কিন্তু অভিষেক ব্যানার্জি নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেছেন।
“এখন পুরোদস্তুর রাজনীতিবিদ হয়ে উঠেছেন তিনি। মমতা ব্যানার্জীর পরিবারের অন্য কোনও সদস্যর মধ্যে কিন্তু দক্ষ রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠার লক্ষণ ছিল বলে আমার কখনওই মনে হয়নি,” বলছিলেন মি. সেনগুপ্ত।