আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
গাজীপুরে মুফতি মুহিবুল্লাহর কথিত 'অপহরণ' নিয়ে এখনো যেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ
- Author, মুকিমুল আহসান
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
বাংলাদেশের গাজীপুরের একটি মসজিদের ইমাম মুফতি মুহিবুল্লাহ মিয়াজীর কথিত 'অপহরণ' ঘটনা নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন সামনে আসছে। পুলিশের কাছে 'অপহরণের' অভিযোগ আসার একদিন পর ঐ ব্যক্তিকে উদ্ধার করে এ নিয়ে তদন্ত শুরু করে পুলিশ।
কয়েকদিনের তদন্তের পর মুফতি মুহিবুল্লাহকে পুলিশ হেফাজতে এনে বেশ কিছু তথ্য প্রমাণ তার কাছে উপস্থাপন করা হয়। সে সব তথ্য প্রমাণ হাজির করার পর পুলিশের কাছে তিনি কথিত 'অপহরণ' নিয়ে বেশ কিছু তথ্য দিয়েছেন।
এ নিয়ে মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ দাবি করেছে- মুফতি মহিবুল্লাহ নিজেই অপহরণের নাটক সাজিয়েছিলেন।
তবে, এই ঘটনার তদন্তে নেমে বেশ কয়েকজন ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। তথ্য প্রযুক্তি ও সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে কিছু তথ্যের সত্যতা পেয়েছে।
তবে, কিছু তথ্যের গড়মিল পাওয়া গেছে। আর কিছু বিষয় এখনো পুলিশের কাছে স্পষ্ট না। যে বিষয়গুলোর উত্তর এখনো খুঁজছে পুলিশ।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ তাহেরুল হক চৌহান বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "তাকে যে জোরপূর্বক অপহরণ করা হয়নি সেটিও যেমন আমাদের তদন্তে স্পষ্ট। অন্যদিকে, কিছু তথ্যের উত্তর এখনো আমরা পাই নি। সেই সব প্রশ্নের উত্তরও আমরা খুঁজছি"।
মঙ্গলবার বিকেলে মুফতি মহিবুল্লাহকে পরিবারের জিম্মায় বাসায় ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সন্ধ্যায় মহিবুল্লাহর ভাগ্নে আসাদ সিদ্দিকী বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, মঙ্গলবার তাকে (মহিবুল্লাহকে) বাসায় পাঠানোর পর এখন তিনি বাসায় বিশ্রামে আছেন। তবে এর চাইতে বিস্তারিত কিছু বলতে চাননি।
মামলার এজাহার ও প্রকৃত ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন
গাজীপুরের টঙ্গী টিএন্ডটি এলাকার বিটিসিএল জামে মসজিদের পেশ ইমাম ও খতিব মুফতি মুহিবুল্লাহ মিয়াজি থাকতেন সেখানকার কলোনি মসজিদের কোয়ার্টারে।
গত ২২শে অক্টোবর সকাল সাতটার দিকে মহিবুল্লাহ হাটতে বের হওয়ার পর তার আর হদিস পাওয়া যায় নি। পরদিন সকাল সাড়ে ৬টায় উত্তরের জেলা পঞ্চগড় সদর ইউনিয়নের সিতারাম হেলিপ্যাড এলাকায় পঞ্চগড়-বাংলাবান্ধা মহাসড়কের পাশ থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়।
ওইদিন রাতেই পরিবারের সদস্যরা টঙ্গী থেকে পঞ্চগড় গিয়ে মহিবুল্লাহকে ঢাকায় নিয়ে আসেন।
এই ঘটনার একদিন পর গত শুক্রবার টঙ্গী পূর্ব থানায় বাদী হয়ে মামলা করেন মি. মহিবুল্লাহ। সেখানে তিনি অভিযোগ করেন, বুধবার সকাল সাতটার দিকে তিনি হাঁটতে বের হলে অ্যাক্সস লিংক ফিলিং স্টেশনের সামনে একটি অ্যাম্বুলেন্স তার পথরোধ করে দাঁড়ায়।
এক পর্যায়ে চার-পাঁচজন ব্যক্তি তাকে জোরপূর্বক অ্যাম্বুলেন্সে উঠায় এবং সাথে সাথে কালো কাপড়ে চোখ মুখ বেঁধে নির্যাতন করতে থাকে। একই সাথে ওই অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরই তাকে নির্যাতন করা হয়। তখন গাড়িটি বিরতিহীনভাবে চলতে থাকে।
এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন- প্রায় একদিন গাড়ি চলার পর তাকে মারধর করে বিবস্ত্র অবস্থায় অজ্ঞাত স্থানে গাড়ি থেকে নামিয়ে গাছের সাথে শিকল দিয়ে বেধে ফেলে রেখে যায়।
মূলত মুহিবুল্লাহর ওই এজাহার পাওয়ার পরই এ নিয়ে তদন্তে নামে পুলিশ। যে এলাকা থেকে তিনি নিখোঁজ হন সেখানকার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ।
টানা চার পাঁচদিন তদন্ত, ফুটেজ বিশ্লেষণ ও মি. মহিবুল্লাহকে জিজ্ঞাসাবাদ করার পর মঙ্গলবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে গাজীপুর মহানগর পুলিশ।
পুলিশ কমিশনার তাহেরুল হক চৌহান সংবাদ সম্মেলনে জানান, "তদন্তের পর আমরা জানতে পারি- উনি সকালে হাঁটতে বের হওয়ার পর একটানা হাঁটতে থাকেন। একটা পর্যায়ে উনি নিজে নিজেই মনে করেন ওনার আরো অনেক দূর এগিয়ে যাওয়া দরকার। এরকমভাবে করতে করতে উনি জয়দেবপুর চৌরাস্তায় আসেন। কোনো সময়ে সিএনজি, কোনো সময়ে অটো, এক পর্যায়ে উনি বাসযোগে সোবহানবাগ হয়ে গাবতলী যান"।
প্রাথমিক তথ্য উপাত্ত পেয়ে গতকাল সোমবার সকালে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মি. মহিবুল্লাহকে পুলিশ হেফাজতে আনা হয়। তখন তাকে বেশ কিছু ফুটেজও দেখানো হয়। এক পর্যায়ে মহিবুল্লাহ পুলিশকে নানা ধরনের তথ্য দেন।
পুলিশ কমিশনার মি. চৌহান বিবিসি বাংলাকে বলেন, "উনি বলছেন ওনাকে জোর জবরদস্তি করে অ্যাম্বুলেন্সে ওঠানো হয়েছে। পিটানো হয়েছে শক্ত পানির বোতল দিয়ে। কিন্তু আমরা তার নরমাল মুভমেন্ট পেয়েছি"।
পুলিশ বলছে- এজাহারের সাথে তার দেয়া তথ্যে গড়মিল পাওয়ার বিষয়গুলো যখন তাকে বলা হয়েছে। সে তার ভুল স্বীকার করেছে। তবে এর পেছনে অন্য কারো ইন্ধন আছে কী-না সেই তথ্যও খুঁজছে পুলিশ।
মুহিব্বুল্লাহ'র ফোন নম্বরে বাস টিকেটের ম্যাসেজ
মামলার এজাহারে মুফতি মহিবুল্লাহ তাকে চোখ মুখ বেঁধে অ্যাম্বুলেন্সে করে উত্তরবঙ্গে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন।
তবে, এ নিয়ে তদন্তে নেমে পুলিশ পেয়েছে বেশ কিছু অবাক করা তথ্য। সেই তথ্য নিয়ে গত কয়েকদিন অনুসন্ধান চালিয়েছে গাজীপুরের পুলিশ।
মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার জানান, মি. মহিবুল্লাহ গাবতলী থেকে পঞ্চগড়গামী শ্যামলী পরিবহনের বাসের একটা টিকেট কিনেন। বাসটি সন্ধ্যায় বগুড়ার শেরপুর থানাধীন পেন্টাগন হোটেলে যাত্রা বিরতি করে। সেখানে উনি বাস থেকে নামেন। ওজু করে নামাজ পড়ে আবার বাসে ওঠেন।
পুলিশ কীভাবে এই তথ্য পেয়েছে, কিংবা তারা কীভাবে এই বিষয়টি জানলো, সেই প্রশ্ন করা হয়েছিল গাজীপুরের পুলিশ কমিশনারের কাছে।
কমিশনার মি. চৌহান বিবিসি বাংলাকে জানান, একটি ফোন ম্যাসেজের সূত্র ধরেই গাবতলীর শ্যামলী বাস কাউন্টারে যান। সেখানে কাউন্টার, ওই বাসের সুপারভাইজার ও তার পাশের সিটে যে যাত্রী বসেছিল তাদের সবার সাথে কথা বলেছে পুলিশ।
মি. চৌহান বলেন, "মুহিবুল্লাহ সাহেবের ফোন নম্বর দিয়েই ওই টিকেটটি কাটা হয়েছিল। টিকেটের তথ্য তার মোবাইলের ম্যাসেজে গিয়েছে। সেখান থেকেই আমরা ক্লু পাই"।
তবে পুলিশ বলছে তারা এটি এখনও নিশ্চিত হতে পারেনি এই টিকেট কি মি. মহিবুল্লাহ নিজেই কেটেছেন নাকি তাকে কেউ কেটে দিতে সহযোগিতা করেছে।
মি. চৌহান বিবিসি বাংলাকে বলেন, ''যখন আমরা জানতে পেরেছি তিনি ওই বাসে গেছেন তখন আমরা বাসের সুপারভাইজারকে চিহ্নিত করেছি। সুপারভাইজার ওই লোকটাকে চিহ্নিত করেছে। সুপারভাইজারই কনফার্ম করেছে"।
শুধুমাত্র সুপারভাইজারের কথা না, এরপর পুলিশ খোঁজ করে বের করেছে বাসের পাশের যাত্রীকে।
পুলিশ জানিয়েছে, "শ্যামলী পরিবহনের ওই বাসে মুফতি মহিবুল্লাহ বসেছিলেন ই-ওয়ান সিটে। তার পাশের সিট অর্থাৎ ই-টু এ যে ব্যক্তি বসেছিলেন তাকেও খুঁজে বের করে পুলিশ। এরপর ই-টু সিটের ব্যক্তিকে দেখানো হয় মহিবুল্লাহকে। তিনিও পুলিশকে নিশ্চিত করেন গত বুধবার তার পাশের সিটেই বসেই ওই ব্যক্তি যাত্রা করেছিলেন।
মি. চৌহান বলেন, "ওই যাত্রীর জবানবন্দিও নিয়েছি আমরা। সুপারভাইজার ও যাত্রীর কথার সাথে খুব বেশি অমিল আমরা খুঁজে পাইনি।
পঞ্চগড়ে যে সব গড়মিল
টঙ্গী পূর্ব থানায় গত শুক্রবার মুফতি মুহিব্বুল্লাহ যে মামলা করেছেন তার এজাহারে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, তাকে পঞ্চগড়ের একটি অজ্ঞাত স্থানে রাস্তার পাশে একটি গাছের সাথে বেঁধে রেখে চলে যায় 'অপহরণকারীরা'। পরে পঞ্চগড় সদর থানা পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়।
কিন্তু এই প্রশ্নে এসে দুই বাসের সুপার ভাইজার এবং মুহিব্বুল্লাহর কথায় বেশ কিছু গড়মিল খুঁজে পেয়েছে পুলিশ।
পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ তাহেরুল হক চৌহান বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "আমরা যখন জিজ্ঞাসাবাদ করি তখন বাসের সুপারভাইজার আমাদেরকে জানায় মি. মুহিব্বুল্লাহকে রাতে দিনাজপুরের বীরগঞ্জে বাস থেকে নিজে নামিয়ে দিয়েছেন"।
"সুপারভাইজার আমাদের এটাও বলেছেন যে, যখন তিনি নামছিলেন তার শরীর অনেক ব্যথা করছিল বলে মি. মুহিব্বুল্লাহ সুপারভাইজারকে জানিয়েছিলেন। সুপারভাইজার আমাদেরকে নিশ্চিত করে বলেন যে তিনি খুব সাবধানে তাকে বীরগঞ্জে নামিয়েছেন"।
পুলিশের প্রশ্ন, যদি পঞ্চগড়ে যাওয়ার টিকেট কেটে থাকেন মি. মুহিব্বুল্লাহ, তাহলে উনি কেন দিনাজপুরের বীরগঞ্জে নামবেন?
"এই প্রশ্ন আমরা সুপারভাইজারকে বারবার করেছি। এর কোনো উত্তর আমরা নিজেরাও পাই নাই। সেই প্রশ্নের উত্তরও আমরা খুঁজছি", বলছিলেন মি. চৌহান।
পুলিশ জানিয়েছে- এই বিষয়টি নিয়ে তার পাসের সিটের সেই যাত্রী কিছু বলতে পারেননি। কারণ বাসের ওই স্টপেজের আগেই নেমে গিয়েছিলেন তার পাশের সিটের যাত্রী।
দ্বিতীয়ত- পুলিশের প্রশ্ন যদি রাতে মি. মুহিব্বুল্লাহ দিনাজপুরের বীরগঞ্জে নেমেই থাকে তাহলে তিনি কিভাবে পঞ্চগড়ের তেতুলিয়া সড়কে গেলেন? কে তাকে সেখান থেকে নিয়ে গেলো?
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ আরেকটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে কোনো কুল কিনারা খুঁজে পাচ্ছে না বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছে।
পুলিশ বলছে- বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে তাকে হাত পায়ে শিকল বাধা অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। সে সব ছবিও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এই বিষয়টি মি. মুহিবুল্লাহ থানায় মামলার এজাহারেও উল্লেখ করেছেন।
যদি স্বেচ্ছায় অন্তর্ধানে যানও মি. মহিব্বুল্লাহ তাহলে সে ওই রাতে কোথা থেকে তালা বা শিকল সংগ্রহ করলো, সেই প্রশ্নের কোন উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ।
গাজীপুরের পুলিশ কমিশনার মি. চৌহান বিবিসি বাংলাকে বলেন, "শিকল কোথায় পাইছে এগুলোর উত্তর আমরা পাইনি। এর পেছনে হয়তো কেউ একজন থাকতেও পারে। এটা নিয়ে আমরা তদন্ত করছি"।
এ নিয়ে আরো তদন্ত চলছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।