গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের হুমকির মুখে কী করবে নেটো আর ইউরোপীয় ইউনিয়ন

ডোনাল্ড ট্রাম্প

ছবির উৎস, Getty Images

    • Author, কাটিয়া অ্যাডলার
    • Role, ইউরোপ এডিটর

ইউক্রেনের জন্য স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে আরও অগ্রগতি আনার লক্ষ্যে মঙ্গলবার তথাকথিত 'কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং'—যার সদস্যদের বড় অংশই ইউরোপীয় নেতা—ফ্রান্সের প্যারিসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দূতদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন।

রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের অবসান ঘটানোর একটি পরিকল্পনা '৯০ শতাংশ এগিয়ে গেছে'—এমন জোরালো দাবি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির। ফলে ওই কক্ষে উপস্থিত কেউই আমেরিকানদের পাশে রাখার বিষয়টি ঝুঁকির মুখে ফেলতে চাননি।

প্যারিসের জাঁকজমকপূর্ণ বৈঠকে গ্রিনল্যান্ড ইস্যু ছিল সেই বড় অস্বস্তিকর বাস্তবতা; অস্বীকার করা যায় না এমন সমস্যা হলেও সেটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করা হচ্ছিল।

গ্রিনল্যান্ড পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দ্বীপ—এর আয়তন জার্মানির ছয় গুণ। এটি আর্কটিক অঞ্চলে অবস্থিত, তবে এটি ডেনমার্কের একটি স্বায়ত্তশাসিত ভূখণ্ড।

আর ডোনাল্ড ট্রাম্প জোর দিয়ে বলছেন, তিনি গ্রিনল্যান্ড চান। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সেটি প্রয়োজন।

প্যারিসের বৈঠকে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন উপস্থিত ছিলেন। সেখানে অংশ নেওয়া বহু নেতার ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত এলাকার গুরুত্বপূর্ণ মিত্র তিনি। যুক্তরাজ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ ন্যাটো-মিত্র তিনি।

এই দেশগুলোর কোনোটিই ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বিরূপ করতে চায় না, কিন্তু ওয়াশিংটন ও কোপেনহেগেনের রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়তে থাকায় ইউক্রেন নিয়ে আলোচনার ফাঁকে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানিসহ ইউরোপের শক্তিধর ছয়টি দেশ একটি যৌথ বিবৃতি দেয়।

বিবৃতিতে তারা বলেন, আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা যুক্তরাষ্ট্রসহ নেটো মিত্রদের সঙ্গে মিলেই যৌথভাবে নিশ্চিত করতে হবে এবং ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড–সংক্রান্ত বিষয়গুলোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কেবল ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডেরই।

কিন্তু ট্রাম্পের উচ্চাকাঙ্ক্ষা সামাল দিতে কি এটুকুই সত্যিই যথেষ্ট ছিল?

ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ডেনমার্ক যাতে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শত্রুতা তৈরি না করে সেজন্য দেশটির প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেনের ওপর চাপ বাড়াচ্ছেন ইউরোপীয় নেতারা

উত্তরটি আসে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই: না।

হোয়াইট হাউস এক বিবৃতিতে জানায়, তারা গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের জন্য 'বিভিন্ন বিকল্প' নিয়ে আলোচনা করছে—সবই একতরফা, দ্বীপটি কেনার বিষয়টিও এর মধ্যে রয়েছে।

ইউরোপীয় নেতাদের জন্য ভীতিকর বার্তা হিসেবে হাজির হলো হোয়াইট হাউসের সেই বিবৃতি, যা প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট উপস্থাপন করেন। এতে বলা হয়, "কমান্ডার-ইন-চিফের হাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ব্যবহার সবসময়ই একটি বিকল্প"।

এটি অবশ্য প্রথমবার নয় যে ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখলের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তবে বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার প্রথম মেয়াদে ইউরোপে—বন্ধ দরজার আড়ালে—অনেকে এই ধারণা নিয়ে ঠাট্টা করেছিলেন।

কিন্তু সপ্তাহান্তে ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্প প্রশাসনের বিতর্কিত সামরিক হস্তক্ষেপের পর কেউ আর হাসছে না।

অবদমিত হওয়ার ঝুঁকিতে ইউরোপ

ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের অভিপ্রায়কে গুরুত্ব দিতে হবে এবং ইউক্রেন, বৈঠক শেষ করে নেতারা সত্যিই গভীর উদ্বেগ নিয়ে বেরিয়ে যান।

এখানে হাস্যকর যে বৈপরীত্য কাজ করছে তা ভেবে দেখুন।

বহিরাগত শক্তি রাশিয়ার আগ্রাসী ভূখণ্ডগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে ইউক্রেন নামের একটি ইউরোপীয় দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নেটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতৃত্বসহ একাধিক ইউরোপীয় রাষ্ট্রনেতা ট্রাম্প প্রশাসনকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করছেন। ঠিক সেই সময় যুক্তরাষ্ট্র সার্বভৌম ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে তার প্রেসিডেন্টকে আটক করেছে এবং একই সঙ্গে আরেকটি ইউরোপীয় দেশের (ডেনমার্ক) সার্বভৌমত্বকে সক্রিয়ভাবে হুমকি দিয়ে চলেছে।

ম্যানহাটনের একটি হেলিপ্যাডে অবতরণের পর নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে হাতকড়া পরা অবস্থায় দেখা যাচ্ছে, ফেডারেল এজেন্টরা তাদের পাহারা দিচ্ছেন।

ছবির উৎস, XNY/Star Max/GC Images

ছবির ক্যাপশান, আকস্মিকভাবে ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই ট্রান্সআটলান্টিক জোট ন্যাটোর সদস্য যা পরিস্থিতিকে আরও গুরুতর করে তুলছে।

কোপেনহেগেনের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মিত্র কিংবা ছিল।

ডেনমার্ক বলছে, ট্রাম্প প্রশাসন যদি একতরফাভাবে গ্রিনল্যান্ড দখল করে, তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে নিরাপত্তার জন্য ইউরোপ যে ট্রান্সআটলান্টিক প্রতিরক্ষা জোটের ওপর নির্ভর করে এসেছে সেটির ইতি ঘটবে।

অনেকে মনে করিয়ে দিতে পারেন, ট্রাম্প কখনোই নেটোর বড় ভক্ত ছিলেন না। এভাবে বললেই কম বলা হবে।

গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে কোপেনহেগেন।

দ্বিপক্ষীয় একটি চুক্তির আওতায়, গ্রিনল্যান্ডে ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে—স্নায়ুযুদ্ধের শুরুতে যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। স্নায়ুযুদ্ধের চূড়ান্ত সময়ে সেখানে প্রায় ১০ হাজার সেনা থাকলেও এখন তা কমে প্রায় ২০০ জনে নেমেছে।

দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আর্কটিক নিরাপত্তা বিষয়ে নজরদারি শিথিল করার অভিযোগ ছিল যা এখন পর্যন্ত আছে।

ডেনমার্কও সম্প্রতি গ্রিনল্যান্ডের প্রতিরক্ষায় নৌযান, ড্রোন ও বিমানসহ ৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের অঙ্গীকার করেছে।

কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন ডেনমার্কের সঙ্গে কথা বলার কোনো আগ্রহই দেখায়নি।

রোববার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেন, গ্রিনল্যান্ড "অত্যন্ত কৌশলগত অবস্থানে আছে। চারদিকে রুশ ও চীনা জাহাজে ভরা। জাতীয় নিরাপত্তার খাতিরে গ্রিনল্যান্ড আমাদের দরকার, আর ডেনমার্ক এটা (যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত) করতে পারবে না"।

ডেনমার্ক এই শেষ বক্তব্যটি প্রত্যাখ্যান করেছে।

পরিচয় গোপন রাখার শর্তে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক কর্মকর্তা আমাকে বলেন, "এই পুরো পরিস্থিতি আবারও দেখিয়ে দিল—ট্রাম্পের মুখোমুখি হলে ইউরোপ মৌলিকভাবে কতটা দুর্বল"।

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের সপ্তাহান্তের মন্তব্যের পর ডেনমার্কের নর্ডিক প্রতিবেশীরা দ্রুত মৌখিকভাবে পক্ষে দাঁড়ালেও, ইউরোপের তথাকথিত 'বিগ থ্রি'—লন্ডন, প্যারিস ও বার্লিন—প্রথমে ছিল নীরব।

শেষ পর্যন্ত সোমবার যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার বলেন, দ্বীপটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার কেবল ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের। জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেৎস আগেও একই কথা বলেছেন।

কোপেনহেগেনের প্রতি সংহতি জানাতে ডিসেম্বর মাসে এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ গ্রিনল্যান্ড সফর করেছিলেন। আর মঙ্গলবার এলো সেই যৌথ বিবৃতি।

তবে বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সমালোচনার অনুপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসের এক বিবৃতিতে, প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেন, 'কমান্ডার-ইন-চিফের হাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ব্যবহার সবসময়ই একটি বিকল্প'

ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের কামিল গঁদ আমাকে বলেন, "ডেনিশ সার্বভৌমত্বের পক্ষে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি অংশীদার দেশ এবং নেটো মিত্র যুক্তরাজ্য—সবার একটি অভিন্ন বিবৃতি থাকলে সেটি ওয়াশিংটনের কাছে শক্তিশালী বার্তা পাঠাত"।

তিনি ২০১৬ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত নেটোর প্রতিরক্ষা বিনিয়োগবিষয়ক সহকারী মহাসচিব ছিলেন।

কিন্তু একসঙ্গে সেই বিবৃতি দিয়েছে ডেনমার্কের মাত্র ছয়টি ইউরোপীয় মিত্র।

আর এখানেই মূল সমস্যা। ট্রাম্পের সোজাসাপ্টা ভঙ্গি যেটিকে কেউ কেউ তার দমনমূলক কৌশল বলেন, সেটি ইউরোপীয় নেতাদের অত্যন্ত উদ্বিগ্ন করে ফেলেছে।

তারা সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে সামলানোর পথই বেছে নিয়েছেন যা প্রায়শই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক রক্ষার স্বার্থে এবং এককভাবে বা সম্মিলিতভাবে তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সম্ভাব্য পরিণতির মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি এড়িয়ে।

আমরা এখন যে বিগ পাওয়ার পলিটিক্সের দুনিয়ায় বাস করছি যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন, পাশাপাশি রাশিয়া ও ভারতের মতো অন্যরা প্রাধান্য বিস্তার করছে, সেখানে ইউরোপ কেবল দর্শকের ভূমিকা পালন করছে এবং অবদমিত হওয়ার ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

ট্রাম্পের কাছে কীভাবে নতি স্বীকার করল ইউরোপীয় ইউনিয়ন

ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাজনীতি আমি যত বছর কভার করেছি, প্রতি বছরই এই জোট বিশ্বমঞ্চে বড় ভূমিকা রাখার অঙ্গীকার করেছে, কিন্তু ট্রাম্পের বেলায় তাদের অবস্থান ছিল স্পষ্টতই দুর্বল।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন গত বছরের শেষ দিকে জোটের জব্দ করা রুশ রাষ্ট্রীয় সম্পদ দিয়ে ইউক্রেনকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয়। অন্য পথে তারা অর্থ জোগাড় করলেও সমালোচকদের মতে, যারা বারবার জোটটিকে দুর্বল বলে উড়িয়ে দিয়েছে–– সেই মস্কো ও ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে একটি শক্ত বার্তা দেওয়ার সুযোগ ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রকাশ্যেই হাতছাড়া করেছে।

আর যে ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়ন দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দাপট দেখিয়েছে বিশাল বাণিজ্যিক শক্তি হিসেবে—সেখানেও তারা আবার ট্রাম্পের কাছে নতি স্বীকার করেছে।

গত বছর তিনি যখন ইইউ পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন, ব্লকটি আত্মসম্মান গিলে প্রতিশোধ না নেওয়ার অঙ্গীকার করে।

অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, মূল কারণ হলো ইউরোপ তার নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষায় যে মার্কিন সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল তা হারানোর আশঙ্কা ছিল।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ

ছবির উৎস, EPA Shutterstock

ছবির ক্যাপশান, ট্রাম্পের মুখোমুখি হলে ইউরোপ মৌলিকভাবে কতটা দুর্বল, তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে বলে মনে করছেন অনেকে

আর এখন গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক—যেখানে ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ইইউ দেশগুলোর মধ্যে গভীর বিভাজন আছে। ফলে কোপেনহেগেনের পক্ষে সেই দেশগুলো কতটা ঝুঁকি নেবে তা নিয়েও দ্বিধা রয়েছে।

কাজেই ট্রাম্পের পুনর্নির্বাচনের আগ পর্যন্ত নেটোতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত জুলিয়ান স্মিথ আমাকে বলেছিলেন, এই পরিস্থিতি "ইইউ ভেঙে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে" এবং একই সঙ্গে নেটোর জন্যও এক অস্তিত্বগত সংকট।

"গ্রিনল্যান্ড 'দখলের' বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার টিম যা বলছে, ইউরোপের তা গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া উচিত," জুলিয়ান স্মিথ আমাকে বলেছিলেন।

"এর মানে শুধু সংযমের আহ্বান নয়। ইউরোপের শীর্ষ শক্তিগুলো হয়তো জরুরি বিকল্প পরিকল্পনা শুরু করতে পারে। আসন্ন মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্স ও দাভোসের মতো আন্তর্জাতিক ফোরাম—যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন—সেগুলোকে কীভাবে সর্বোত্তমভাবে কাজে লাগানো যায় তা ভাবতে পারে এবং নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তির মতো সাহসী ও উদ্ভাবনী ধারণাও বিবেচনায় নিতে পারে"।

নেটো চুক্তিগুলোতে বাইরের দেশ বা আরেকটি নেটো মিত্রের আক্রমণের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হয়নি। তবে জোটের অনুচ্ছেদ ৫—যেটিকে 'একজনের জন্য সবাই, সবার জন্য একজন' ধারা বলা হয়, সে অনুযায়ী বোঝাপড়া আছে যে এক নেটো দেশ আরেক নেটো দেশকে আক্রমণ করলে তা প্রযোজ্য নয়।

উদাহরণ হিসেবে নেটো সদস্য তুরস্ক ও গ্রিসের মধ্যে সাইপ্রাস ইস্যুতে সংঘাতের কথা ধরা যায়। সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতা ঘটে ১৯৭৪ সালে, যখন তুরস্ক আগ্রাসন চালায়। নেটো হস্তক্ষেপ করেনি, তবে জোটের সবচেয়ে শক্তিশালী সদস্য যুক্তরাষ্ট্র সেবার মধ্যস্থতায় সহায়তা করতে পেরেছিল।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, ইইউতে জব্দ রুশ রাষ্ট্রীয় সম্পদ দিয়ে ইউক্রেনকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয়েছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন

ভূগোলের কথায় ফিরলে, ডেনমার্ক নেটোর ছোট সদস্যদের একটি—যদিও অত্যন্ত সক্রিয়। আর যুক্তরাষ্ট্র নেটোর সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে শক্তিশালী সদস্য—অপ্রতিদ্বন্দ্বীভাবে।

এই মুহূর্তে ইউরোপে যে গভীর স্নায়ুচাপ বিরাজ করছে, তা স্পষ্ট বোঝা যায়।

নেটোকে আর্কটিক নিরাপত্তা আলোচনার মঞ্চ হিসেবে তুলে ধরে এবং দ্বীপটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার কেবল ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের—এ কথা জোর দিয়ে বড় ইউরোপীয় শক্তিগুলো যৌথ বিবৃতি দিলেও সেই সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও অন্যরা বাস্তবে কতদূর যাবে?

সোমবার সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার বলেন, "গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সামরিক লড়াইয়ে কেউই যাবে না"।

ইসিএফআর-এর কামিল গঁদ আমাকে বলেন, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে উত্তেজনা স্পষ্টত "ইউরোপীয়দের যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নিরাপত্তা-নির্ভরতা কমিয়ে এক কণ্ঠে কথা বলার প্রয়োজনীয়তার" ওপর আবারও জোর দিচ্ছে।

গত গ্রীষ্মে স্পেন ছাড়া সব নেটো মিত্রকে নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যয় ব্যাপকভাবে বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য করেছিলেন ট্রাম্প।

তবু গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ এবং আকাশ সক্ষমতাসহ বহু ক্ষেত্রে ইউরোপ এখনো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। ওয়াশিংটন এটি ভালোভাবেই জানে।

নেটো সূত্রগুলো বলছে, এই মুহূর্তে জোটের ইউরোপীয় সদস্যরাষ্ট্রগুলো —এমনকি রুদ্ধদ্বার বৈঠকেও —গ্রিনল্যান্ডে ওয়াশিংটন যদি সামরিকভাবে এগোয়, তাহলে কী হতে পারে তা ভাবতেই পারছে না।

তবে তাদের হয়তো ভাবতেই হবে।