ভারতে নতুন করে কোভিড ছড়াচ্ছে, দু দিনে মৃত ৭ জন

ভারতে গত ৪৮ ঘন্টায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সাত জন মারা গেছেন। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী নতুন করে ৬৪০ জন করোনা সংক্রমিত খুঁজে পাওয়া গেছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ভারতে এখন ২,৯৯৭ জন কোভিড আক্রান্ত রয়েছেন।

যারা মারা গেছেন গত দুদিনে, তাদের বেশিরভাগই গুরুতর অসুস্থ ছিলেন আগে থেকেই।

তবে এখনও এটিকে কোভিডের নতুন ঢেউ বলে চিহ্নিত করছেন না বিজ্ঞানীরা।

সবথেকে বেশি মৃত এবং সংক্রমিত কেরালায়। ওই রাজ্যে বিগত ২৪ ঘন্টায় ২৬৫ জন নতুন কোভিড রোগী পাওয়া গেছে।

কেরালা ছাড়াও তামিলনাডু, কর্ণাটক, মহারাষ্ট্র, গোয়া, রাজস্থান এবং পাঞ্জাবেও কোভিড রোগী পাওয়া গেছে। নতুন করে যারা আক্রান্ত হচ্ছেন, তাদের মধ্যে কতজন করোনাভাইরাসের নতুন ভ্যারিয়েন্ট জেএন১ – এ আক্রান্ত, তা জানার জন্য লালারসের নমুনা জেনোম সিকোয়েন্সিংয়ে পাঠানো হচ্ছে নিয়মিত।

যদিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবারের সংক্রমণ, চিকিৎসকেরা বলছেন আতঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই, কিন্তু মাস্ক পড়া আবারও শুরু করা উচিত।

কেরালাতেই সবথেকে বেশি সংক্রমণ

কোভিড মহামারীর শুরুর সময়, ২০২০ সাল থেকে বারে বারে কেরালাতেই এই ভাইরাসের সংক্রমণ ব্যাপকভাবে হতে দেখা গেছে। এবারেও ওই রাজ্যেই সবথেকে বেশি সংক্রমিত পাওয়া যাচ্ছে।

রাজ্য কোভিড এক্সপার্ট কমিটির সদস্য ডা. অনীশ টি এম বিবিসিকে জানিয়েছেন, “যতজন কোভিড পজিটিভ রোগী পাওয়া যাচ্ছে, তাদের ৫০% এরই কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। আবার এরকম সংক্রমিতও দেখা যাচ্ছে যার এক আত্মীয় হয়তো পজিটিভ হয়েছেন এবং সেই ব্যক্তির সঙ্গে তিনি দূর থেকে দেখা করেছিলেন। দ্বিতীয় ব্যক্তি যখন টেস্ট করালেন, দেখা গেল তার কোভিড পরীক্ষার ফলও পজিটিভ।

“মানুষের মনে একটা ভয় ঢুকেছে। তারা সরকারি আর বেসরকারি কেন্দ্রগুলোতে নিজের থেকেই পরীক্ষা করাতে আসছেন,” বলছিলেন ডা. অনীশ।

কেরালার চিকিৎসকরা বলছেন, যতজন রোগীর মধ্যে সংক্রমণ পাওয়া যাচ্ছে, তাদের অর্ধেকের মধ্যেই নতুন জেএন১ ভ্যারিয়েন্টের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।

কতটা সংক্রামক নতুন ভ্যারিয়েন্ট?

কলকাতার আমরি হাসপাতালের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সায়ন চক্রবর্তী বিবিসিকে বলছিলেন, “নতুন যে ভ্যারিয়েন্টটা দেখা যাচ্ছে, সেটার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা আগের অমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের থেকে অনেকটাই বেশি। কিন্তু এই ভ্যারিয়েন্টটার ধার অনেকটাই কম, খুব বেশি যে অসুস্থ করে ফেলতে পারবে করোনার এই ভ্যারিয়েন্ট, তা নয়।

“আগের কয়েকবার যেমন দেখা গেছে প্রচুর মানুষকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হচ্ছে, আইসিইউতে দিতে হচ্ছে, এই ভ্যারিয়েন্টে সেরকমটা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এই ভ্যারিয়েন্টের করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে তা সাধারণ সর্দি, কাশি, জ্বরের মতোই লক্ষণ দেখা দেবে," বলছিলেন ডা. চক্রবর্তী।

তিনি আরও বলছিলেন, "শুধু বয়স্ক মানুষ বা অন্যান্য রোগে ভুগছেন, তাদের ক্ষেত্রে হয়তো হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন হলেও হতে পারে। অন্যদের আমরা চিকিৎসা করছি সর্দি, কাশি, জ্বরের রোগীদের মতো করেই।”

আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই

নতুন ভ্যারিয়েন্টের করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার মধ্যেই বিজ্ঞানীরা বলছেন এখনই আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নতুন ভ্যারিয়েন্ট জেএন১ কে এখনও উদ্বেগজনক আখ্যা দেয় নি, তারা নজর রাখছে এই ভ্যারিয়েন্টটির দিকে।

কোভিড মহামারীর পুরো সময়টা জুড়েই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান বৈজ্ঞানিক ছিলেন যিনি, সেই ড. সৌমিয়্যা স্বামীনাথন সংবাদ সংস্থা এএনআইকে বলেছেন, “আমাদের সতর্ক থাকতে হবে, কিন্তু আতঙ্কের কিছু নেই। আমাদের কাছে এখনও এই তথ্য নেই যে নতুন জেএন১ ভ্যারিয়েন্টটি কতটা গুরুতর অভিঘাত হানতে পারে অথবা এটি অনেক বেশি নিউমোনিয়া বা মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠতে পারে কী না।

“সাধারণ কিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিলেই চলবে। এইসব ব্যবস্থাগুলো সঙ্গে তো আমরা ইতিমধ্যেই পরিচিত হয়ে গেছি। অমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের সঙ্গে আমরা পরিচিত, এটিও সেই ধরনেরই ভ্যারিয়েন্ট,” জানিয়েছেন ড. স্বামীনাথন।

কলকাতার চিকিৎসক ডা. সায়ন চক্রবর্তী বলছেন, “গত কয়েক বছরে আমরা সবাই জানি কোভিডের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে গেলে কী কী করতে হবে। মাস্ক পড়া বা বেশি ভিড়ের মধ্যে যাওয়া এড়িয়ে চলা ইত্যাদি। মাস্ক পড়লে শুধু কোভিড নয়, যে ধরণের সাধারণ সর্দি, জ্বর, কাশি ইত্যাদি হচ্ছে, সেসবের থেকেও রক্ষা পাওয়া যায়। তাই মাস্ক পড়লে অনেকটাই সুরক্ষিত থাকা যাবে।“

ভারতের কয়েকটি রাজ্য ইতিমধ্যেই মাস্ক পড়ার নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু মাস্ক পড়া বাধ্যতামূলক করা হয় নি কোথাও।

আবার ড. স্বামীনাথন বলছেন, “মাস্ক পড়া এখনই বাধ্যতামূলক করার দরকার নেই। বয়স্ক মানুষ, সন্তান সম্ভবা নারী এবং অন্য যারা জটিল রোগে ভুগছেন, তারা মাস্ক পড়লেই আপাতত চলবে।“

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যা বলছে

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, জেএন.১ সব এলাকায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, কারণ এর একটি অতিরিক্ত স্পাইক প্রোটিন রয়েছে।

যদিও নতুন এই ভ্যারিয়েন্টের উৎপত্তি বিএ.২.৮৬ ভ্যারিয়েন্ট থেকে, তবে ওই ভ্যারিয়েন্টের তুলনায় এটি দ্রুত ছড়ায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “ধারণা করা হচ্ছে যে, এ ভ্যারিয়েন্টটি অন্যান্য ভাইরাল ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের সাথে সাথে সার্স-কভ-২ (করোনাভাইরাসের) এর সংক্রমণ বাড়াতে পারে। বিশেষ করে যে দেশগুলোতে শীতকাল শুরু হচ্ছে সেখানে এর সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।”

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, টিকা দেয়ার ফলে যে দেহে সুরক্ষা তৈরি হয়েছে সেটি ভাঙতে এই জেএন.১ ভ্যারিয়েন্ট কতটা সক্ষম, সে সম্পর্কিত তেমন কোন নথি-প্রমাণ নেই।

এছাড়া মানুষ আগের ভ্যারিয়েন্টগুলোর তুলনায় এটি আরো বেশি অসুস্থ করে তোলে কিনা তারও কোন তথ্য নেই।

ডাব্লিউএইচও বলছে, মানুষের স্বাস্থ্যের উপর এর প্রভাব কেমন হয় তা বুঝতে আরো বেশি গবেষণা করা দরকার। কারণ কোভিড আক্রান্ত হয়ে মানুষের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য দেয়ার হার বিভিন্ন দেশে নাটকীয়ভাবে কমে গেছে।