ওসমান হাদির জানাজায় অগণিত মানুষ ও ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম ইনকিলাব মঞ্চের

ছবির উৎস, Drik/Getty Images
বাংলাদেশের অন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, রাজনীতিবিদ এবং বিপুল সংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণে জানাজার পর ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও গুলিতে নিহত ওসমান হাদির জানাজা শেষে তার দাফন সম্পন্ন হয়েছে। তবে প্রথমে জানাজার জায়গায় এবং পর শাহবাগ থেকে মি. হাদির খুনিদের বিষয়ে 'সুনির্দিষ্ট' তথ্য চেয়ে ২৪ ঘণ্টার সময় বেঁধে দিয়ে কর্মসূচি শেষ করে ইনকিলাব মঞ্চ।
ওসমান হাদিকে দাফন করা হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে। দাফনের সময় ওসমান হাদির পরিবারের সদস্য, ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মী, ডাকসু প্রতিনিধি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ প্রশাসনের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় শনিবার বেলা আড়াইটায় ওসমান হাদির জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেও দেখা গেছে বিপুল সংখ্যক মানুষ।
নামাজে জানাজা শুরুর আগে দেওয়া বক্তব্যে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের সরকারের উদ্দেশে প্রশ্ন করেন, "ওসমান হাদির হত্যাকারীদের ধরতে কী করেছেন?"
তিনি বলেন, এ বিষয়ে সবার সামনে এসে না জানালে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী খোদা বখস চৌধুরীকে পদত্যাগ করতে হবে।
এসময় নিহত ওসমান হাদির ভাই আবু বকর সিদ্দিক প্রশ্ন তোলেন, রাজধানীতে প্রকাশ্য দিবালোকে ওসমান হাদিকে গুলি করার পর তার হত্যাকারীরা কীভাবে পালিয়ে গেলো?
জানাজার আগে কথা বলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
নিহত ওসমান হাদিকে নিয়ে আবেগপ্রবণ বক্তব্য দেন করে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস, ইনকিলাব মঞ্চের দাবির বিষয়ে কিছু বলেননি।
জানাজা শেষে মরদেহবাহী ফ্রিজিং ভ্যান নেওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। অতিরিক্ত মানুষের ভীড় সামলাতে বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য নিয়োজিত ছিল সংসদ ভবন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়।
ওসমান হাদির মৃত্যুতে বাংলাদেশে শনিবার রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের ঘোষণা অনুযায়ী, দেশের সব সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সব সরকারি-বেসরকারি ভবন এবং বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোতে শনিবার অর্ধনমিত রাখা হয় জাতীয় পতাকা।
এর আগে শুক্রবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, "একটি বিশেষ সিন্ডিকেট বৈঠকে, ওসমান হাদির পরিবারের ইচ্ছায় এবং সরকারের চাহিদার প্রেক্ষিতে" জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশেই তাকে দাফন করা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গত ১২ই ডিসেম্বর দুর্বৃত্তের গুলিতে গুরুতর আহত হন শরিফ ওসমান হাদি। তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর পাঠানো হলেও ১৮ই ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় তার।

ওসমান হাদির জানাজায় রাজনৈতিক নেতারা
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরিফ ওসমান হাদির জানাজায় অগণিত সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা অংশ নেন।
জানাজার নামাজ শেষে জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, বাংলাদেশের "সব ক্ষেত্রে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বিনির্মাণ করতে চেয়েছিলেন ওসমান হাদি"।
"ওসমান হাদির স্বপ্নের সঙ্গে এদেশের মানুষ একাত্ম হয়েছিল বলেই পরাজিত শক্তি তার ওপর হামলা চালিয়েছে"- বলেও মন্তব্য করেন মি. হোসেন।
ওসমান হাদির মৃত্যুর "আবেগকে শক্তিতে পরিণত করার" কথা বলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ।
"দেশি এবং বিদেশি সকল চক্র যারা গণতন্ত্রের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে চায়, যারা নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করতে চায়, তাদের সমুচিত জবাব দেওয়া হবে"- বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মি. আহমদ বলেন, "জাতির কাছে আমাদের আকাঙ্ক্ষা, শান্তিপূর্ণভাবে সামনের দিকে এগোতে হবে, কোনো রকমের কোনো উসকানিতে যেন আমরা পা না দেই।"
তাাদের বাইরেও ওসমান হাদির জানাজায় অংশ নেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা।
এদিকে, দাফন শেষে সন্ধ্যায় ইনকিলাব মঞ্চের ডাকে রাজধানীর শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হয়। এসময় 'হাদি' 'হাদি' স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে ওই এলাকা।
ওসমান হাদিকে হত্যার প্রতিবাদ ও দায়ীদের গ্রেফতার ও বিচারের দাবিতে শাহবাগে অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেন বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এসময় শাহবাগের সড়ক দিয়ে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
পরে সেখান থেকে আবারও আল্টিমেটামের ঘোষণা দিয়ে কর্মসূচির সমাপ্তি ঘোষণা করেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের।

ছবির উৎস, Chief Adviser GOB FB
জানাজায় নানা মহলের মানুষ
ওসমান হাদির মৃত্যুর খবর আসার পর ঢাকায় প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পত্রিকার অফিস, সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের কার্যালয়, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতে হামলা এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনা ঘটে।
শনিবার অনেকটা সতর্ক অবস্থানে দেখা যায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে।
জানাজা উপলক্ষ্যে সকাল থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয় জাতীয় সংসদ ভবনের সামনের সড়ক। আশপাশের সড়কেও যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
বেলা ১২টা আগেই অসংখ্য মানুষ আসতে থাকেন সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার দিকে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালাতেও দেখা যায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে।
সংসদ ভবনের সামনে মূল মাঠের বাইরে মানিক মিয়া এভিনিউ সড়কে দাঁড়িয়েও জানাজায় অংশ নেন অনেকে।

ছবির উৎস, Drik/Getty Images
জানাজা শেষে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন কেউ কেউ।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, ওসমান হাদিকে টার্গেট করা মানে বাংলাদেশকে টার্গেট করা।
তিনি বলেন, "ওসমান হাদিকে হত্যা করেছে পালিয়ে যাওয়া দোসররা। তারা বাংলাদেশকে দুর্বল করতে চায় বলেই ওসমান হাদিকে টার্গেট করেছে তারা"।
জানাজায় অংশ নিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান। তিনি বলেন, "ইতিহাসের অংশ হয়ে গেলেন ওসমান হাদি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার সন্তানকে বুকে টেনে নিয়েছে।"
"আজকে লক্ষ মানুষের সমাগম তার জানাজায়, এই গভীর ভালোবাসা এবং আবেগ প্রমাণ করে যে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে যে সংগ্রাম, তার প্রতি বাংলাদেশের সবাই একাত্মবোধ করে।"








