কওমি মাদ্রাসায় বারবার ছেলেশিশু যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে কীভাবে?

কওমি মাদ্রাসাগুলোতে যৌন নির্যাতন নিয়ে মুখ খুলছেন ভুক্তভোগীরা
ছবির ক্যাপশান, কওমি মাদ্রাসাগুলোতে যৌন নির্যাতন নিয়ে মুখ খুলছেন ভুক্তভোগীরা
    • Author, তাফসীর বাবু
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৯ মিনিট

(এই প্রতিবেদনের কিছু বর্ণনা আপনার মানসিক চাপের কারণ হতে পারে)

"আমার ছেলে একেবারে নাম ধরে ধরে সব বলেছে। কে তাকে টয়লেটে নিয়েছে, কে তাকে বিছানায় নিয়েছে, কোন হুজুর কী করেছে, সবকিছু সে বলেছে।"

কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিজের সাত বছর বয়সী সন্তানের উপর হওয়া যৌন নির্যাতনের কথাগুলো বলছিলেন বেসরকারি চাকুরিজীবী মি. বাশার। এটি তার ছদ্মনাম।

মি. বাশার তার ছোট্ট সন্তানকে ছয় মাস আগে ভর্তি করেছিলেন স্থানীয় একটি কওমি মাদ্রাসায়। উদ্দেশ্য হাফেজ বানানো।

কিন্তু সেখানেই তার ভাষায় ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের শিকার হয় তার শিশু সন্তান।

"ব্যাপারটা এতো মর্মান্তিক যে, আমার ছেলে অনেক কান্না করেছে। মুমূর্ষু অবস্থায় আমার ছেলেটা বিছানায় শুয়ে ছিলো। এমন অবস্থাতেও আধাঘণ্টা পর এসে আবার নির্যাতন করেছে। আমার ছেলে ব্যাথায় ফজরের নামাজের জন্য পরে আর উঠতে পারে নাই" বলছিলেন মি. বাশার।

পরিবারের অভিযোগ, তাদের শিশু সন্তানের উপর যৌন নির্যাতনের শুরুটা হয়েছিলো মাদ্রাসার বেশি বয়সী কয়েকজন শিক্ষার্থীর মাধ্যমে। পরে বলাৎকারে অংশ নেন মাদ্রাসার একজন শিক্ষকও।

শিশুটি যৌন নির্যাতন থেকে বাঁচতে এসব কথা জানিয়েছিলো মাদ্রাসার একজন 'বড় হুজুরকে'। কিন্তু প্রতিকার মেলেনি।

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

শেষপর্যন্ত যখন পরিবার এটা জানতে পারে ততদিনে পার হয়ে গেছে ছয় মাস।

খায়রুল বাশার বিবিসি বাংলাকে বলেন, "হুজুরকে আমার ছেলে গিয়ে বলে যে, আমার কাপড় খুলে খারাপ কাজ করেছে। তখন হুজুর উল্টা ছেলেটাকে বেশ কয়েকটি মার মেরেছে। বলেছে এই কথা যেন চার দেয়ালের বাইরে না যায়। মাথায় কোরআন শরীফ দিয়ে শপথ করিয়েছে যেন বাবা-মা'কেও না জানায়।"

এরপর ভয়ে তার ছেলে বিষয়গুলো আর পরিবারকে জানায়নি। কিন্তু এর ফলে তার পরবর্তী দিনগুলো কেটেছে আরো ভয়াবহ।

"ওরা তো ছাত্র-শিক্ষক সবাই হরিলুট করছে আমার ছেলেকে। ওকে ধ্বংস করে দিয়েছে। ...আমার ছেলে বলেছে যে, ভর্তির পর প্রথম বিশ দিন সে ভালো ছিলো। এরপর কোন রাতেই সে আসলে ভয়ে ঘুমাতে পারেনি। ওই হুজুরকে রাতে উঠতে দেখলেই আমার ছেলে তার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বড় হুজুরের বেডের নিচে গিয়ে ঢুকে থাকতো। যখন ভোর তিনটার দিকে সবাইকে ঘুম থেকে ওঠানো হতো, তখন সে তার বিছানায় ফেরত আসতো," বলেন মি. বাশার।

এই ঘটনায় ২৬শে অগাস্ট মামলা দায়ের করেন মি. বাশার। মামলায় ১০ জনকে আসামি করা হয় এবং এর মধ্যে দুই জন মাদ্রাসা শিক্ষকসহ পাঁচ জন কারাগারে আছেন। বাকি দুই আসামি জামিনে ও তিন জন পলাতক রয়েছে বলেও তিনি জানান।

এই ঘটনায় মি. বাশারের স্ত্রীও ভেঙে পড়েছেন। মি. বাশার জানান, ছেলেকে মাদ্রাসায় ভর্তির সিদ্ধান্ত নিয়ে এখন তাদের আফসোসের শেষ নেই।

"আমার ছেলে প্রতিটা রাত যে কষ্টটা করেছে, ছয় মাস তো দূরের কথা সারা দুনিয়া আমার হাতে এনে দিলেও আমি একটা রাতকেও মানতে পারবো না। আমি এর বিচার করবোই," ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন মি. বাশার।

বাংলাদেশে মি. বাশারের ছেলের সঙ্গে যে অপরাধের অভিযোগ এসেছে, এমন ঘটনা নতুন নয়। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে কওমি মাদ্রাসায় ছেলেশিশুর উপর এরকম যৌন নির্যাতনের বিভিন্ন ঘটনা গণমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে।

প্রশ্ন উঠেছে, এমন নির্যাতন কওমি মাদ্রাসাগুলোতে কতটা বিস্তৃত এবং এগুলো সেভাবে প্রকাশ্যে আসে না কেন?

এক্ষেত্রে মাদ্রাসায় শিশুদের সুরক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মীয় এসব প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব উদ্যোগ না থাকায় সেটা নিয়ে সমালোচনা আছে দীর্ঘদিন ধরে।

তবে এর মধ্যেই সপ্তাহ তিনেক আগে অবশ্য কওমি মাদ্রাসাগুলোর সর্বোচ্চ বোর্ড নতুন একটি নির্দেশনা জারি করেছে। যেখানে শিক্ষার্থীদের মারধর করে শাস্তি দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে দেশটির ছয়টি মাদ্রাসা বোর্ডের নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি'আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ।

একই সাথে শিক্ষার্থীদের প্রতি যথাযথ আচরণ নিশ্চিত করতে প্রতিটি মাদ্রাসায় একটি ছাত্র সুরক্ষা কমিটি গঠন বা পুনর্গঠন করে সেটিকে সক্রিয় রাখার পরামর্শ দিয়েছে তারা।

এর মাধ্যমে মাদ্রাসাগুলোতে ছেলে শিশুদের উপর যৌন নির্যাতন, হয়রানি, মারধরসহ যেকোনাে অনৈতিক পরিস্থিতির মোকাবিলা করা যাবে বলে মনে করেন মাদ্রাসা সংশ্লিষষ্টরা।

যৌন নির্যাতনের শিকার হলেও অনেকসময় ভূক্তভোগীরা এসব বিষয় প্রকাশ্যে আনতে চান না
ছবির ক্যাপশান, যৌন নির্যাতনের শিকার হলেও অনেকসময় ভূক্তভোগীরা এসব বিষয় প্রকাশ্যে আনতে চান না

'আমরা সবাই জানতাম যে, মাদ্রাসায় এগুলো হয়'

ফিরোজ করিমকে (ছদ্মনাম) ২০০৩ সালে একটি কওমি মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়েছিলো তার পরিবার। ফিরোজ করিমের বয়স তখন ছিলো মাত্র সাত বছর।

"আম্মার একটা মানত ছিলো যে আমাকে হিফজ করাবে, হাফেজ বানাবে। সেকারণেই মাদ্রাসায় ভর্তি করে।" বলেন ফিরোজ করিম।

ভর্তির কিছুদিন পরই যৌন নির্যাতনের শিকার হন তিনি। তাকে কৌশলে ছাদে ডেকে নিয়ে নির্যাতন করা হয়।

"ছাদে একটা রুম ছিলো খাদেমদের। সেখানে খাট ছিলো। তিনজন ছাত্র আমার দুই হাত দু'দিকে বেঁধে ফেলে। ওরা তিনজনই আমাকে বেঁধে রেখে তাদের মনোবাসনা পূরণ করে।"

ফিরোজ করিম আরো যোগ করেন, "আমার বিশেষ স্থানে বেশ জখম হয়েছিলো। আমি অনেক ছোট ছিলাম। আমাকে এমনসব ভয় দেখানো হয়েছিলো যে আমি আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। ভয়ে কাউকে কিছু বলিনি।"

ওই ঘটনার কিছুদিন পর পড়াশোনায় উন্নতি না হওয়ায় ফিরোজ করিমকে অন্য একটি কওমি মাদ্রাসায় ভর্তি করে তার পরিবার। এই মাদ্রাসাতেও তার উপর নেমে আসে যৌন নির্যাতন। এবার নির্যাতন করেন মাদ্রাসার শিক্ষক।

ফিরোজ করিম বলেন, "উনি (শিক্ষক) আমাকে সেভেনআপের সঙ্গে কিছু একটা মিশিয়ে খাইয়েছিলেন। হুজুরের রুমে এটা খাওয়ার পর আমার আর কিছু মনে নেই। পরবর্তীতে আমি আমি যখন জেগে উঠি তখন নিজেকে আবিস্কার করি আমার বিছানায়। এবং আমার পেছনে বেশ আঘাতপ্রাপ্ত। সঙ্গে রক্তও পড়ছিলো একটু।"

এই ব্যক্তি পরপর দুটি মাদ্রাসায় এমন দু:সহ নির্যাতনের ট্রমা এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন। এমনকি তার পরিবারকেও কখনো বলতে পারেননি এসব কথা।

"আমরা মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার পর থেকেই জানি যে, স্টুডেন্টদের মধ্যে এগুলো হয়। বড় ছাত্ররা ছোটদের এসব করে এবং শিক্ষকরাও করে। কিন্তু লজ্জা, ভয়, চাপ ইত্য়াদির কারণে এগুলো আর বাইরে প্রকাশ করা হয়ে ওঠে না।" বলেন ফিরোজ করিম।

'আবাসিক মডেলেই' সমস্যা?

সম্প্রতি একের পর এক কওমি মাদ্রাসায় ছেলেশিশু যৌন নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পর এর তথ্য সংগ্রহে একটি ওয়েবসাইট খোলেন কওমি মাদ্রাসারই সাবেক দুই শিক্ষার্থী।

তাদেরই একজন সালাউদ্দীন জাহাঙ্গীরের সঙ্গে কথা হয় বিবিসি বাংলার।

তার মতে, মাদ্রাসাগুলোর যে আবাসিক মডেল বা আবাসিক রাখার প্রবণতা সেখানেই সমস্যাটা হয়।

তিনি বলেন, "আমি যতদূর জানি বা আমার বন্ধু-বান্ধব যারা আছে বা যারা ভূক্তভোগী তাদের কথায় স্পষ্ট যে, এগুলো (যৌন নির্যাতন) প্রায় প্রতিটি কওমি মাদ্রাসারই সমস্যা। কারণ এগুলোর স্ট্রাকচারাল ডিজাইন তো একই। যেখানেই এই স্ট্রাকচারে এই ধরনের আবাসন ব্যবস্থা থাকবে, এই ধরনের পরিবেশ থাকবে, সেখানে এই প্রবলেম তৈরি হবেই।"

"শিশুদের নিপীড়নের বিষয়টা আসলে নিচের ক্লাসগুলোতে বেশি হয়। যেমন ধরেন হেফজখানা। এবং এরফলে যেটা হয়, একসময় যারা নিপীড়িত হয়েছে, পরবর্তীকালে তারাই আবার নিপীড়ক হয়ে যায়। এবং এসব নির্যাতন এখন কিছুটা সামনে আসলেও এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো বহু আগে থেকেই ঘটছে। হয়তো সামনে সেভাবে আসে নাই" বলেন সালাউদ্দীন জাহাঙ্গীর।

মি. জাহাঙ্গীর তার এক বন্ধুসহ যে ওয়েবসাইট খুলেছেন তার নাম আওয়াজডটবিডি। যার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, বিশেষত মাদ্রাসায় যৌন নির্যাতনে ভূক্তভোগীদের বক্তব্য তুলে ধরা। ওয়েবসাইটে সেটা নাম-পরিচয় প্রকাশ না করেই লিপিবদ্ধ করা যায়।

দশ দিনে ওয়েবসাইটটিতে ১৭০টি ঘটনা তুলে ধরেছেন ভুক্তভোগীরা। যার ৩০টি ঘটনা মাদ্রাসাকেন্দ্রিক।

ঢাকার একটি আবাসিক মাদ্রাসা
ছবির ক্যাপশান, ঢাকার একটি আবাসিক মাদ্রাসা

যৌন নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ্য়ে আসে না কেন, সমস্যা কোথায়?

দেখা যায় অনেক মাদ্রাসায় যৌন নির্যাতনের বিষয়টি ভেতরে অনেকেই জানেন। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই সেগুলো অস্বীকার করা হয়, নয়তো বাইরে আসতে দেয়া হয় না। কিন্তু এমন প্রবণতার কারণ কী? কেন এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি থামানো যাচ্ছে না?

কওমি মাদ্রাসার সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক কিংবা ভূক্তভোগীসহ বিভিন্নজনের সঙ্গে কথা বলে এর কয়েকটি কারণ স্পষ্ট হয়েছে। যৌন নির্যাতনের ঘটনা বাইরে প্রকাশ হলে 'ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বদনাম হবে এবং মাদ্রাসার দুর্নাম হলে অনুদান বন্ধ হয়ে যেতে পারে বা ছাত্র ভর্তিতেও এর প্রভাব পড়বে বলে মাদ্রাসা সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

ফলে ঘটনা ঘটলে সেটা অনেকক্ষেত্রেই এড়িয়ে যাবার চেষ্টা হয় বলে জানাচ্ছেন ইসলাম বিষয়ক লেখক ও অ্য়াকটিভিস্ট সালাউদ্দিন জাহাঙ্গীর। বিশেষ করে আইনের আশ্রয় নেওয়া বা পুলিশে দেয়া -এধরনের পদক্ষেপ খুব একটা নেওয়া হয় না।

"হয় ধামাচাপা দেওয়া হয়, নয়তো নামমাত্র শাস্তি দিয়ে ঐ শিক্ষক বা ছাত্রকে বের করে দেওয়া হয়। এটা তো বড় শাস্তি হলো না। যদি পুলিশে দেওয়ার প্রচলন থাকতো, তাহলে হয়তো এটা কমে আসতো। কারণ শাস্তি না থাকলে অপরাধ হবেই।"

তিনি যোগ করেন, "ইসলামের ক্ষতি হবে এই চিন্তা করে তারা যেটা নিয়ে কথা বলছে না, সেটা না বলার কারণে যে আরো হাজার হাজার ছেলের জীবন নষ্ট হচ্ছে- এটা তারা কখনো চিন্তা করে না।"

দেখার কেউ নেই

তবে সমস্যা আরো আছে। সেটা হচ্ছে, কওমি মাদ্রাসাগুলোতে এসব দেখভালের নির্দিষ্ট কােনাে কর্তৃপক্ষ নেই।

প্রথমত: মাদ্রাসাগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই। তারা স্বাধীনভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করে।

দ্বিতীয়ত: কওমি মাদ্রাসাগুলোর নিজস্ব যে বোর্ড, সেখানেও কারো একক কর্তৃত্ব নেই। মাদ্রাসাগুলো অন্তত ৬টি বোর্ডের অধীনে পরিচালিত হয়।

তৃতীয়ত: বোর্ডগুলো মূলত শিক্ষা কার্যক্রম, সিলেবাস, পরীক্ষা দেখভাল করে। এর বাইরে অনিয়ম বা যৌন নির্যাতনের বিষয়গুলো সেভাবে মনিটরিং হয় না। বোর্ডগুলোর সেরকম লোকবলও নেই।

জানতে চাইলে কওমি মাদ্রাসার সবেচেয়ে বড় বোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের সহসভাপতি মুসলেহ উদ্দীন রাজু অবশ্য বিবিসি বাংলাকে বলেন, এমন ঘটনা ঘটলে তারা ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন।

"দুয়েকটা জায়গায় এরকম যেসব দুর্ঘটনা ঘটে, আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। কেউ কেউ হয়তো মামলাও করে। অনেকসময় দেখা যায় ঘটনা বোর্ডের কাছে আসার আগেই মাদ্রাসার কমিটি, স্থানীয় জনতা বা এলাকাবাসী ব্য়বস্থা নিয়ে নেয়।"

স্থানীয়ভাবে যেসব ব্য়বস্থা নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, সেটা মূলত: মারধর বা ছাত্র হলে বহিস্কার আর অপরাধী যদি শিক্ষক হয় তাহলে তাকে চাকুরিচ্য়ুত করা হয়।

কিন্তু দেখা যায়, অভিযুক্তরা খুব সহজেই অন্য় কোন মাদ্রাসায় ঢুকে যেতে পারে।

তবে বেফাকের সহসভাপতি মুসলেহ উদ্দীন রাজু জানাচ্ছেন, যৌন নির্যাতনের ঘটনা যেন না ঘটে, সেজন্য় তারা কিছু পরিবর্তনেরও চেষ্টা করছেন।

এরমধ্যে সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ হচ্ছে, মাদ্রাসাগুলোতে ছাত্র সুরক্ষা কমিটি গঠনের উদ্যোগ। এ বিষয়ে বোর্ড একটি নির্দেশনাও জারি করেছে।

ঢাকার একটি কওমি মাদ্রাসা
ছবির ক্যাপশান, ঢাকার একটি কওমি মাদ্রাসা

আল-হাইআতুল উলয়া জানিয়েছে, গত ১২ই সেপ্টেম্বর তাদের স্থায়ী কমিটির সভায় নির্দেশনাটি চূড়ান্ত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোনও ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে অপরাধ বা অনৈতিক কাজে জড়িত থাকলে তার সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনানুগ বিচার নিশ্চিত করা এবং অপরাধীকে কোনোরূপ প্রশ্রয় না দেওয়াই আল-হাইআতুল উলয়ার অবস্থান।

এ নির্দেশনা মূলত চারটি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। এগুলো হলো 'শাসনের সীমা নির্ধারণ, ইসলাহি কার্যক্রম জোরদারকরণ, ছাত্র/ছাত্রী-সুরক্ষা কমিটি অনতিবিলম্বে কার্যকরকরণ ও মাদ্রাসাবিরোধী অপপ্রচার রোধে করণীয়'।

নির্দেশনায় শাসনের শরয়ী সীমা নির্ধারণ অংশে বলা হয়েছে, শাসনের একমাত্র উদ্দেশ্য হবে শিক্ষার্থীর সংশোধন ও কল্যাণ, প্রতিশোধ নয়।

"রাগের অবস্থায় কাউকে শাস্তি দেওয়া যাবে না। শাসনের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে অগ্রসর হতে হবে— প্রথমে নম্র সতর্কতা, প্রয়োজনে মৃদু ভর্ৎসনা, এরপর রাগ-ধমক; একান্ত অপরিহার্য হলে সর্বশেষ ধাপ হিসেবে অভিভাবককে ডেকে লিখিতভাবে অবহিত করে অভিভাবকসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে— কোনও অবস্থাতেই ছাত্র/ছাত্রীকে শাস্তিস্বরূপ প্রহার করা যাবে না, যা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ"।

এতে আরও বলা হয়, "লাঠি, বেত বা কোনও যন্ত্র দিয়ে আঘাত করা, মুখমণ্ডল-মাথা বা স্পর্শকাতর অঙ্গে আঘাত করা এবং হাড় ভাঙা, রক্তপাত বা দাগ সৃষ্টিকারী যেকোনো শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রকাশ্যে অপমান, গালমন্দ, তিরস্কার, কটু ভাষা বা ঘৃণাসূচক সম্বোধন এবং অন্য যেকোনো মানসিক নির্যাতনমূলক আচরণও পরিহারযোগ্য"।

নির্দেশনায় জানানো হয় যে, এ সীমা লঙ্ঘনকারী শিক্ষক/শিক্ষিকা শরীয়ত ও বিধি উভয় দৃষ্টিতে জবাবদিহিতার আওতাভুক্ত থাকবেন।

ইসলাহি কার্যক্রম জোরদারকরণ অংশে বলা হয়েছে, "প্রতিটি মাদ্রাসায় শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত ইসলাহি মজলিস, নবনিযুক্ত শিক্ষকদের জন্য বাধ্যতামূলক তারবিয়াতি মজলিস এবং অভিভাবক-সমাবেশ আয়োজনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে সমস্যা দ্রুত মাদরাসা কর্তৃপক্ষের গোচরে আসে"।

প্রসঙ্গত, মাদ্রাসার ইসলাহি কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদেরকে আত্মশুদ্ধির পথ ও আধ্যাত্মিক উন্নতির শিক্ষা প্রদান করা হয়। এতে বিভিন্ন কর্মশালা, তালিমি মজলিস, ইসলামী সাহিত্য পাঠ এবং বিশেষ বয়ান বা বক্তৃতার আয়োজন করা হয়।

মাদ্রাসায় সুরক্ষা কমিটি বিষয়ে ওই নির্দেশনায় বলা হয়েছে, "প্রতিটি মাদরাসায় সুরক্ষা কমিটি গঠন বা পুনর্গঠন করে তা সক্রিয় রাখতে হবে। যে কোনও অভিযোগ অবশ্যই কমিটির নিকট পেশ করার সুযোগ থাকতে হবে এবং ৭ দিনের মধ্যে তদন্ত করে প্রতিবেদন পেশ করতে হবে। কমিটি না থাকা বা নিষ্ক্রিয় থাকা প্রমাণিত হলে তা ইলহাক স্থগিত বা বাতিলের কারণ হতে পারে"।

নির্দেশনায় প্রতিটি বোর্ডে পৃথক 'মাদরাসা মনিটরিং সেল' গঠন ও বোর্ডভিত্তিক পৃথক হটলাইন চালু করতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

"শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে সতর্কতা, অভিযোগ পাওয়ামাত্র তাৎক্ষণিক নিরপেক্ষ তদন্ত এবং মিথ্যা অপবাদ ও মিডিয়া ট্রায়ালের শিকার নিরপরাধ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে আইনগত প্রতিকারের ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে"।

কওমি মাদ্রাসাগুলোর বোর্ডের এমন সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এসেছে যখন দেশটিতে একের পর এক মাদাসায় যৌন নির্যাতন কিংবা শিক্ষার্থীদের শারিরীক নির্যাতনের বিষয়গুলো সামনে এসেছে।

বোর্ড মনে করছে ছাত্র সুরক্ষা কমিটি গঠন এবং নীতিমালাগুলো বাস্তাবায়িত হলে শিক্ষার্থীদের যেকোনাে বিষয়ে অভিযোগ জানানো এবং সেটার প্রতিকারে একটি পদ্ধতিগত কাঠামো তৈরি হবে।

আল-হাইআতুল উলয়ার পরিচালনা কমিটির সদস্য মুসলেহ উদ্দিন রাজু বিবিসি বাংলাকে বলেন, বোর্ডের নির্দেশনায় প্রতিটি বোর্ডে পৃথক 'মাদরাসা মনিটরিং সেল' গঠন ও বোর্ডভিত্তিক পৃথক হটলাইন চালু করতেও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

"শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে সতর্কতা, অভিযোগ পাওয়ামাত্র তাৎক্ষণিক নিরপেক্ষ তদন্ত এবং মিথ্যা অপবাদ ও মিডিয়া ট্রায়ালের শিকার নিরপরাধ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে আইনগত প্রতিকারের ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে নীতিমালায়"।

সরকার কী বলছে?

বাংলাদেশের আইনে ছেলেশিশুদের যৌন নির্যাতন বা নিপীড়ন দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও সুনির্দিষ্টভাবে ছেলে শিশুর বলাৎকারের বিষয়টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয় ২০২৫ সালে।

কিন্তু আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও বিশেষত মাদ্রাসাগুলোতে এসব ঘটনা গোপন করা বা নামমাত্র শাস্তি দিয়ে ধামাচাপা দেয়ার প্রবণতা প্রবল বলে অভিযােগ রয়েছে।

এছাড়া দেখা যায়, দুর্বল সামাজিক অবস্থান কিংবা ধর্মীয় চাপের কারণে ভূক্তভোগি পরিবারগুলোও খুব একটা আইনের আশ্রয় নেয় না, এমনকি ঘটনাগুলোও প্রকাশ্যে আনতে চায় না।

কিন্তু এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছেলেশিশু যৌন নির্যাতন নিয়ে সরকার কী করছে- এ বিষয়ে চেষ্টা করেও শিক্ষামন্ত্রী কিংবা শিক্ষা উপদেষ্টার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বিবিসিকে জানিয়েছেন, মাদ্রাসাগুলো সরাসরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে না থাকলেও মনিটরিং এর ব্য়াপারে সরকারের উদ্যোগ নিচ্ছে।

"সরকারের এখানে যে দায়িত্ব, সরকার সেটা একদম সঠিকভাবে পালন করবে। সুতরাং সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারের মনিটরিংয়ের অধীনে আসবে।"

কিন্তু সেটা কবে- এমন প্রশ্নে প্রতিমন্ত্রী জানান, সময় লাগবে।

"এই মনিটরিং ক্যাপাসিটিটা বিল্ড করতে আমার সময় লাগবে। আমরা ২০২৮ সাল থেকে সরকারি এবং বেসরকারি -এদুটোতে যাচ্ছি। এরপরে আমাদের প্ল্যান বা যেটাই বলেন, সেটা হচ্ছে, মাদ্রাসা লেভেলগুলোতে যাওয়া। কিন্তু সংখ্যায় যেহেতু এগুলো অনেক বড় এবং ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিকূলতাও ভিন্ন। সেটার জন্য আবার মনিটরিং যারা করবেন, তাদের প্রশিক্ষণ দরকার আছে। এই জায়গাগুলো ঠিক করার জন্যই আমরা সময় নিচ্ছি।"