এবার কলকাতায় বাংলাদেশ উপদূতাবাসের সামনে সাধু সন্ন্যাসী নিয়ে বিজেপি নেতার বিক্ষোভ

বাংলাদেশের হিন্দু যুবক দীপু চন্দ্র দাসের হত্যার বিরুদ্ধে ভারতের নানা রাজ্যে বিক্ষোভ শুক্রবারও অব্যাহত থেকেছে। এই ইস্যুতে বিক্ষোভগুলি প্রথমে দিল্লিতে বাংলাদেশের দূতাবাসের সামনে শুরু হলেও গত কয়েকদিন ধরে সেগুলি মূলত কলকাতায় সংগঠিত হচ্ছে।
শুক্রবার কলকাতায় বাংলাদেশ উপদূতাবাসের সামনে কয়েকশো হিন্দু সাধু সন্ন্যাসীকে নিয়ে বিক্ষোভ দেখাতে হাজির হন বিজেপি নেতা ও পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী।
দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা সেরে বেরিয়ে সংবাদমাধ্যমকে মি. অধিকারী বলেন, "আমরা একশ কোটি হিন্দু, বাংলাদেশের দেড়-দু কোটি হিন্দুর জন্য লড়ব।"
এর আগে শুক্রবার দুপুরে ওই উপদূতাবাসের সামনে হিন্দু সংহতি নামের একটি সংগঠনের সদস্যরাও বিক্ষোভ দেখিয়ে আসেন।
এদিন উপদূতাবাসের সামনে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল নজিরবিহীন। উপদূতাবাস থেকে প্রায় দুশো মিটার দূরে পুলিশ এক দুর্ভেদ্য লোহার ব্যারিকেড গড়ে তুলেছিল।
অন্যদিকে, শুক্রবার সকালে আসামের গুয়াহাটিতে বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনারের দফতরের সামনে জড়ো হয়ে একটি বাঙালি সংগঠনের কিছু সদস্য স্লোগান দেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের চার-পাঁচ মাস আগে নানা হিন্দুত্ববাদী সংগঠন যেভাবে দীপু চন্দ্র দাসের হত্যার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখাচ্ছে, তা থেকে বিজেপি নির্বাচনী ফায়দা তোলার একটা কৌশল নিয়েছে।

সাধু- সন্ন্যাসীদের নিয়ে বিক্ষোভ
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
বিজেপির নেতা ও পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এসপ্তাহের গোড়ায় কলকাতায় বাংলাদেশ উপদূতাবাসের সামনে একটি বিক্ষোভে অংশ নিয়ে বলেছিলেন যে তিনি ২৬ তারিখ আবারও দীপু চন্দ্র দাসের হত্যার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখাতে আসবেন।
সেই ঘোষণা মোতাবেক কয়েকশো সাধু সন্ন্যাসীকে নিয়ে শুক্রবার বিকেলে মি. অধিকারী হাজির হন উপদূতাবাসের সামনে। ওই সাধুসন্তদের মধ্যে ছিলেন কয়েকজন নাগা সন্ন্যাসীও।
সাধুদের কেউ এসেছিলেন আসামের কামাক্ষ্যা থেকে, কেউ বা পশ্চিমবঙ্গেরই নানা জেলা থেকে। তাদের গলায় ঝোলানো ছিল দীপু চন্দ্র দাসের হত্যার বিরুদ্ধে লেখা নানা স্লোগান সহ পোস্টার।
উপদূতাবাসের তরফে পাঁচজনকে ভেতরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। ওই বৈঠকে কী কথা হলো, সেই বিষয়ে সংবাদমাধ্যমকে জানাতে গিয়ে মি. অধিকারী বলেন, "আমি ভেতরে বলে এসেছি রোহিঙ্গা মুসলমানদের কক্সবাজারে রেখেছেন কেন – মুসলমান বলে তো? গাজার ইহুদীদের জন্য ইসরায়েল লড়েছে। আমরাও একশ কোটি হিন্দু বাংলাদেশের দেড়-দু কোটি হিন্দুর জন্য লড়ব।
"আমাদের কাছে (উপদূতাবাসের তরফে) বলেছে, দশজনকে গ্রেফতার করেছি, বলেছে বিচার হবে, জামিন হবে না। বলেছে বাংলাদেশ সরকার দায়িত্ব নিয়েছে দীপু চন্দ্র দাসের পরিবারের। কিন্তু ননস্টপ চলছে। আমি আবার বলব একশ কোটি হিন্দু আমরা চুপ থাকতে পারি না," বলছিলেন শুভেন্দু অধিকারী।
ওই বিক্ষোভে শামিল হয়েছিলেন যোগী প্রতীকানন্দ। তিনি বলছিলেন, "বাংলাদেশে প্রতিদিন সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপরে অত্যাচার চলছে। দীপু দাসকে যেভাবে জীবন্তু পুড়িয়ে মারা হল, আমরা সনাতনী হিন্দুরা এর ধিক্কার জানাই। আমরা ভারত সরকারের কাছেও এই দাবি রাখি যে তারা বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ওপরে চাপ সৃষ্টি করে যাতে বাংলাদেশি হিন্দুদের জীবন জীবিকা রক্ষা হয়।"

দুর্ভেদ্য নিরাপত্তা
শুক্রবার বাংলাদেশের উপদূতাবাস থেকে প্রায় দুশো মিটার দূরে দুর্ভেদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা করেছিল কলকাতা পুলিশ।
এর আগে বিক্ষোভ দেখাতে আসা হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর কর্মীরা উপদূতাবাস থেকে প্রায় দুশো মিটার দূরে পুলিশের গড়ে তোলা একটি ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে গিয়েছিলেন। তাদের দ্বিতীয় ব্যারিকেডে আটকিয়ে দিয়ে লাঠি চার্জ করেছিল পুলিশ।
শুক্রবার সেই সুযোগ আর বিক্ষোভকারীদের দেয়নি কলকাতা পুলিশ।
যদিও শুক্রবারের বিক্ষোভকারী সাধুসন্তদের মধ্যে 'ব্যারিকেড ভেঙে ফেলার মতো' কোনও আগ্রাসী মনোভাব লক্ষ্য করা যায়নি। বরং এর আগের দিনগুলিতে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা অনেক বেশি আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে গিয়েছিলেন।
শুক্রবার সাধুসন্তরা বাজনা বাজিয়ে নাচগান করতে করতেই উপদূতাবাস থেকে অনেকটা দূরে গড়ে তোলা ব্যারিকেডের সামনে বসে থাকেন।
পুলিশ যে ব্যারিকেড গড়েছিল, তা ছিল প্রায় নয় ফুট উঁচু দুই স্তরের লোহার জাল। এগুলি মাটিতে গর্ত করে বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আবার পূর্ব এবং পশ্চিম উভয় দিকই পুরোটা এই ব্যারিকেড লাগিয়ে সেগুলি আবার ঝালাই করে দেওয়া হয়েছিল। রাস্তার পাশ দিয়ে কেউ যাতে গলে চলে যেতে না পারেন, তাই ফুটপাথও ছিল জালে ঘেরা।
এলাকার অন্যান্য রাস্তা দিয়ে যাতে কেউ উপদূতাবাসের কাছেও না যেতে পারে, সেজন্য সেগুলিতেও ছিল ছোট ব্যারিকেড এবং পুলিশ প্রহরা।
সাধারণত রাজ্য সরকারের সচিবালয় নবান্নতে কোনও বিক্ষোভ থাকলে এভাবে ব্যারিকেড গড়া হয় – যা ভেদ করা একরকম অসাধ্য।

কেন লাগাতার বিক্ষোভ
বিক্ষোভকারীরা বলছেন, দীপু চন্দ্র দাসের হত্যার যেসব ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, সেসব দেখে যে কোনও মানুষেরই শিউরে ওঠার কথা। কলকাতার মানুষজনও শিউরে উঠছেন সেসব দেখে।
শুক্রবার বাংলাদেশ উপদূতাবাসের কাছে অপেক্ষা করার সময়ে একজন সাধারণ মানুষ এক পুলিশ কর্মীর কাছে জানতে চাইছিলেন যে এত নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা কীসের জন্য।
যখন তিনি জানলেন যে বাংলাদেশ নিয়ে বিক্ষোভ আছে, সেই বাসিন্দা শুনেই বললেন, "একদম সঠিক। যেভাবে জ্বালিয়ে দিয়েছে ছেলেটাকে!"
পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষের মধ্যে যে একটা প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, সেটাকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগাতে চাইছে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো, এমনটাই মত বিশ্লেষকদের।
হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির বিশ্লেষক স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য বলছিলেন যে নিশ্চিতভাবেই সাধারণ মানুষের একটা অংশের এই প্রতিক্রিয়া থেকে লাভ তুলতে চাইবে বিজেপি, এবং সময়টা যখন পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের মাত্র চার-পাঁচ মাস আগে।
তার কথায়, "বাংলাদেশ প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির কোনো নির্বাচনী প্রচার হয় না কখনই। তাদের তো অন্যতম মূল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিই থাকে পশ্চিমবঙ্গ যাতে 'পশ্চিম বাংলাদেশ' না হয়ে যায়। এরকম একটা সময়ে দীপু চন্দ্র দাসের ঘটনা থেকে তারা নির্বাচনী লাভ ঘরে তোলার চেষ্টা তো করবেই।
"এছাড়াও আরএসএসের থিয়োরি হচ্ছে মুসলমানরা যেখানে সংখ্যাগুরু, হিন্দুদের সেখানে থাকা কঠিন। সেই নীতি অনুসরণ করেই দীপু চন্দ্র দাসের ঘটনাকে তারা দেখছে," বলছিলেন মি. ভট্টাচার্য।
এরই মধ্যে সামনে এসেছে কেরালা আর ওড়িশা রাজ্যের দুটি ঘটনা – যেখানে একজন হিন্দু ও একজন মুসলমান গণপিটুনিতে মারা গেছেন, দুটি ক্ষেত্রেই তাদের বাংলাদেশি সন্দেহে মারা হয়েছে বলে অভিযোগ।
তাই সামাজিক মাধ্যমে কেউ কেউ লিখছেন যে দীপু চন্দ্র দাসের হত্যার বিরুদ্ধে যেমন বিক্ষোভ হচ্ছে, তেমনই কেরালা আর ওড়িশার ঘটনা নিয়েও বিক্ষোভ হওয়া উচিত।








