আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
হামাসের অর্থের উৎস কী? পাঠকের প্রশ্ন, বিবিসির উত্তর
বিগত তিন সপ্তাহ ধরে চলতে থাকা ইসরায়েল ও হামাসের যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ পুরো বিশ্বকে স্তম্ভিত করেছে। যুদ্ধবিদ্ধস্ত অঞ্চলের পরিস্থিতি সম্পর্কে পাঠকদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দিলেন বিবিসি-র সংবাদদাতারা।
ইসরায়েলের ওপরে হামাসের আক্রমণের তিন সপ্তাহ হতে চলল। ওই হামলায় মারা গেছেন ১৪শো মানুষ। ইসরায়েল পাল্টা বোমার আঘাত হেনেছে গাজা ভূখণ্ডের উপর। হামাস পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইসরায়েলের বোমার আঘাতে নিহত হয়েছেন পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষ।
ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ইতিমধ্যে পশ্চিমা দেশের নেতারা ইসরায়েল সফরে এসেছেন। এর পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক আইন মেনে, গাজাতে বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষিত রাখার বিষয়টি নিয়েও তারা ইসরায়েলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলছেন।
ইতিমধ্যে গাজার উপর স্থল অভিযানের আশঙ্কা করা হচ্ছে, যদিও সেটা ঠিক কবে হতে চলেছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে, এবং তা ক্রমশ বেশ জটিলও হয়ে উঠছে।
ইসরায়েল-গাজার রণাঙ্গনের চিত্র আরও স্পষ্ট করে তুলতে ওই যুদ্ধবিদ্ধস্ত অঞ্চলে কর্মরত বিবিসি-র সাংবাদিকরা পাঠকদের বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন
হামাস এই বিপুল অর্থ কোথা থেকে পাচ্ছে?
রোজমেরি মালটাস-স্মিথ জানতে চেয়েছেন : হামাসকে কারা গোড়া থেকে অর্থের যোগান দিয়ে এসেছে? এখন কারা হামাসকে আর্থিক ভাবে কারা সাহায্য করে? কীভাবে তারা হামাসকে অর্থ দেন?
জেরুজালেম থেকে আমাদের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সংবাদদাতা ইয়োলান্দ নেল এর উত্তরে বলেছেন:
শুরুর দিকে, প্রবাসী ফিলিস্তিনি এবং ব্যক্তিগত দাতা, যারা মূলত আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের বাসিন্দা, তারাই হামাসকে অর্থ সাহায্য করতেন। কিছু ইসলামিক দাতব্য গোষ্ঠীও আর্থিক সাহায্য করত।
তবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্যরা তাদের (হামাসকে) জঙ্গি গোষ্ঠী ঘোষণা করার পরে, এইভাবে আর্থিক সাহায্য করা কিছুটা কঠিন হয়ে পড়ে।
এখন, ইরানের কাছ থেকে হামাস অর্থ সাহায্য ও অন্যান্য সামগ্রী পেয়ে থাকে।
গাজায় সাম্প্রতিক চূড়ান্ত আর্থিক সঙ্কটের সময়ে কাতার ফিলিস্তিনকে সাহায্য করেছে। তারা আগেও ফিলিস্তিনকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছিল। ওই অর্থ মূলত খরচ করা হয়েছিল ফিলিস্তিনের কয়েক হাজার সরকারি কর্মচারীর বেতন দিতে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রক বা ইউএস ট্রেজারি এও জানিয়েছে, যে হামাসের একটি গোপন আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যবস্থা আছে, যা থেকে কয়েকশো মিলিয়ন ডলার মূল্যের সম্পদ তৈরি করে।
সুদান, আলজেরিয়া, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং অন্যান্য দেশ থেকে পরিচালিত সংস্থাগুলি ওই সম্পদ ব্যবহার করে হামাসকে অর্থ জুগিয়ে থাকে।
গাজায় খাদ্য ও জ্বালানি পৌঁছচ্ছে?
ক্যারোলাইন কেলি জানতে চেয়েছেন : গত দুই সপ্তাহ ধরে ইসরায়েল গাজা অবরোধ করে রেখেছে, এর মানে কি, গাজার মানুষরা কোনও জল, জ্বালানি ও বিদ্যুত পরিষেবা পাচ্ছেন না?
মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিবিসি-র সংবাদদাতা টম বেটমেন এর উত্তরে বলেছেন:
গাজার উপর ‘সম্পূর্ণ অবরোধ’ জারি করছে বলে জানিয়েছিল ইসরায়েল।
জ্বালানি মন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ হামাসের হামলার পরে বলেছিলেন যতক্ষণ না জিম্মিদের মুক্তি দেওয়া হবে, ততক্ষণ জল বা বিদ্যুৎ দেওয়া হবে না। তিনি এটাকে ‘মানবিকতার জন্য মানবিকতা’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।
হামাস গাজা ভূখণ্ডের ওপরে ক্ষমতা বিস্তারের পরে ২০০৬ সাল থেকে মিশরের মদতে ওই অঞ্চলের ওপরে কড়া অবরোধ জারি করে ইসরায়েল।
ইসরায়েল বলেছিল অস্ত্র তৈরির উপকরণ যাতে গাজায় না ঢুকতে পারে, সেজন্যই এই পদক্ষেপ।
এর ফলে সাধারণ জীবনযাপন ভীষণ কঠিন হয়ে পড়ে, কারণ গাজায় কী প্রবেশ করবে আর কী করবে না, তার পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে ইসরায়েল ও মিশর। তবে মিশর থেকে সুড়ঙ্গ দিয়ে চোরাগোপ্তা পথে যা প্রবেশ করত, তার ওপরে কারও নিয়ন্ত্রণ ছিল না।
কয়েকটি ত্রাণ সামগ্রী বহনকারী ট্রাক ছাড়া শনিবার থেকে আর কিছুই প্রবেশ করে নি মিশরের সীমান্ত দিয়ে। খান ইউনুস শহরের পূর্ব দিকের অংশে কয়েক ঘন্টার জন্য জল সরবরাহ করছে ইসরায়েল।
অর্থাৎ, যুদ্ধের আগে থেকে গাজায় যে পরিমান জল আর জ্বালানী মজুত করা ছিল, তা দিয়েই এখন কাজ চলছে।
এর মধ্যে জেনারেটর আর জলের ফিল্টার চালানোর জন্য ব্যক্তিগতভাবে মজুত ডিজেল বা বোতলজাত জল আর কুয়োর জলও রয়েছে। অনেক সময়েই কুয়োর জল অপরিশুদ্ধ হয়, ফিল্টার করা ছাড়া তা ব্যবহার করা যায় না।
ইসরায়েল কি জিম্মিদের উদ্ধার করতে পারবে?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পাঠক ই-মেল মারফত জানতে চেয়েছেন: ইজরায়েলের তরফে হামাসের কব্জায় থাকা জিম্মিদের উদ্ধারের সম্ভাবনা কতটা?
বিবিসি-র নিরাপত্তা বিষয়ক সংবাদদাতা ফ্রাঙ্ক গার্ডনার বলেছেন:
গাজায় জিম্মিদের সংখ্যা প্রায় দুশো। জিম্মিদের সংখ্যা এত বেশি হওয়ার ফলে তাদের সবাইকে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে উদ্ধার করা ইসরায়েলের পক্ষে কঠিন।
আমরা জানি, কাতারের মধ্যস্থতায় শুক্রবার দুজন জিম্মিকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে, এবং আরও দুজনকে সোমবার মুক্ত করা গিয়েছে। কাতার মনে করে এইভাবে আরও কিছু সংখ্যক জিম্মিকে ছাড়িয়ে আনা সম্ভব।
কেউ কেউ আবার এও মনে করেন যে ইসরায়েলি বাহিনীর গাজা আক্রমণ যাতে প্রতিহত করা যায়, সেজন্যই হামাস সময় কাটানোর কৌশল নিয়েছে।
জিম্মি উদ্ধার করতে ইসরায়েল পারদর্শী। তাদের স্পেশাল ফোর্স ‘সায়রেত মতকল’ এই ধরনের উদ্ধারকার্যের জন্যই নিবিড়ভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত।
কিন্তু এক্ষেত্রে বেশ কিছু সমস্যাও আছে।
জিম্মিদের একটা অংশ অথবা সবাইকেই মাটির নীচে টানেল বা বাঙ্কারে রাখা হয়েছে।
কিছু ক্ষেত্রে, জিম্মিদের অন্য গোপন আস্তানাতেও সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
যদি হামাস জানতে পারে যে জিম্মিদের উদ্ধার করার চেষ্টা হচ্ছে, সেক্ষেত্রে, তারা হয়ত জিম্মিদের প্রথমেই হত্যা করার চেষ্টা করবে।
তাই যে কোনও রকমের উদ্ধার তৎপরতাই ঝুঁকিপূর্ণ।
End of বিবিসি বাংলায় দেখতে পারেন
ফাতাহ কি আবার গাজা শাসন করবে?
সাইপ্রাস থেকে অ্যালেক্স জানতে চেয়েছেন, হামাসের কাছে হেরে যাওয়ার পর, ফাতাহ পুনরায় গাজা অধিগ্রহণ করবে কিনা এর কোনও ইঙ্গিত মিলেছে?
মধ্যপ্রাচ্য সংবাদদাতা ইয়োলান্দ নেল বলেছেন:
হামাসের প্রধান প্রতিপক্ষ ফাতাহ একটি ধর্ম নিরপেক্ষ রাজনৈতিক দল।
ফাতাহ নেতা প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ বা প্যালেস্তিনিয়ান অথরিটির (পি এ) প্রধান, যারা অধিকৃত পশ্চিম তীরের বেশকিছুটা অঞ্চল শাসন করে।
একই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফিলিস্তিনের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন প্যালেস্তাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন বা পিএলও-র শীর্ষ নেতা।
কয়েক দফায় ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি শান্তি আলোচনায় অংশ নিয়েছিল যে পিএলও, হামাস বা ইসলামিক জিহাদ তাদের অংশ নয়।
পিএলও একসময় গাজা শাসন করলেও হামাস ২০০৭ সালে সেখানে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর পিএ নিরাপত্তা বাহিনীদের উৎখাত করে।
পার্লামেন্ট নির্বাচনে হামাস জয়ী হওয়ার এক বছর পর এই ঘটনা ঘটে।
End of বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর
ইসরায়েলের জন্য সীমারেখা আছে কি?
স্যাম প্রশ্ন করেছেন, পশ্চিমা সরকারগুলি কি এই সংঘাতে ইসরায়েলের জন্য এমন কোনও সীমারেখা টেনে দিয়েছে, যেটা পেরনো যাবে না?
ফ্রাঙ্ক গার্ডনার উত্তরে বলেছেন:
যদি তা থেকেও থাকে, তাহলে আমরা এটি সম্পর্কে খুব কমই শুনেছি। যেভাবে গত বছর ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন নিয়ে ন্যাটোতে আলোচনা হয়েছিল, সেরকম কোনও ঐক্যবদ্ধ 'পশ্চিমা অবস্থান' এই সংঘাতের ক্ষেত্রে নেই ।
গত সাতই অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামাসের হামলার বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতার কারণে অনেক পশ্চিমা নেতা ইসরায়েলকে তাদের পূর্ণ সমর্থন দিতে ছুটে আসেন।
যদিও ইসরায়েলের প্রতিশোধমূলক বিমান হামলায় গাজায় বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার পর ইসরায়েলের মিত্র গোষ্ঠীর মধ্যে এই ধারণা বাড়ছে যে নেতানিয়াহু সরকার বাড়াবাড়ি করে ফেলছে।
"যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১-এর পর আমরা রাগে অন্ধ ছিলাম, তেমনটা হবেন না", গত সপ্তাহে ইসরায়েলের সংক্ষিপ্ত সফরে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এই বার্তা দিয়েছিলেন।
সমস্ত পশ্চিমা নেতারা ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘন না করার আহ্বান জানিয়েছেন, তবুও জাতিসংঘের সংস্থাগুলি এখন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছে যে তারা জনবহুল এলাকায় বোমা বর্ষণ করছে এবং ১০ লাখেরও বেশি মানুষকে ঘর ছাড়া করেছে।