আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
ঢাকার সামরিক হাসপাতাল থেকে হেলিকপ্টারে সরাসরি মাগুরায় নেয়া হয় শিশুটির মরদেহ, সেখানেই হলো জানাজা
প্রায় আট দিন হাসপাতালে শারীরিক পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করে শেষপর্যন্ত মৃত্যুর কাছে হেরে যায় মাগুরার আট বছর বয়সী শিশুটি। আজই সন্ধ্যায় তার মরদেহ দাফনের জন্য সামরিক হেলিকপ্টারে করেঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল থেকে সরাসরিমাগুরায় নেওয়া হয় বলে তার পরিবার জানিয়েছে।
বোনের শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে গিয়ে গত পাঁচই মার্চ সে যৌন নিপীড়নের শিকার হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
আজ বৃহস্পতিবার আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতরের (আইএসপিআর) এক বিজ্ঞপ্তিতে শিশুটির মৃত্যুর খবর জানানো হয়। এতে বলা হয়, দুপুর একটার দিকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।
উল্লেখ্য, গত আট মার্চ শিশুটিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে সিএমএইচ-এ নেওয়া হয়। গতকাল বুধবার চার বার এবং আজ সকাল থেকে আরও তিন বার তার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছে বলেও জানানো হয়।
এই শিশুটির যৌন নিপীড়নসহ সাম্প্রতিক বেশি কয়েকটি নারী নিপীড়ন ও হেনস্তার ঘটনায় সম্প্রতি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ হয়। এসব বিক্ষোভ থেকে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের দ্রুত বিচার এবং স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি করা হচ্ছে।
এদিকে, শিশুটির মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। আসামিদের দ্রুত বিচারের আওতায় নিয়ে আসার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও শোক প্রকাশ করে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
মাগুরার এই ঘটনায় সাত দিনের মধ্যে বিচারকাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল।
হেলিকপ্টারে করে নেওয়া হয় মরদেহ
শিশুটির মামার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিবিসি বাংলাকে জানান, সেনাবাহিনীর উদ্যোগে মরদেহ মাগুরায় নেওয়া হয়। সেখানে সন্ধ্যায় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
মাগুরায় শিশুটি চাচার কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, ধর্ষণের মামলার তদন্তে আজও পুলিশ শিশুটির বাড়িতে এসেছিল।
মাগুরা সদর থানার ইন্সপেক্টর ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন বিবিসি বাংলাকে বলেন, কেউ যদি ধর্ষণের পর হত্যার চেষ্টা করে বা এখন যেহেতু মারা গেছে, তাই নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে হত্যা সংক্রান্ত যে বিধান আছে, সে অনুযায়ী বিচার চলবে। সেভাবেই চার্জশিট দেওয়া হবে। যত দ্রুত সম্ভব প্রতিবেদন দেওয়া হবে।
এই মামলায় এখন চার জন আটক আছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ধর্ষণের অভিযোগ বিষয়ে গ্রেফতার ব্যক্তিদের কেউ স্বীকারোক্তি বা অন্য কোনো তথ্য দিয়েছে কিনা জানতে চাইলে মো. আলাউদ্দিন বলেন, ডিএনএ রিপোর্ট, ডাক্তারের প্রতিবেদন এসবের ভিত্তিতে প্রমাণিত হবে এটা ধর্ষণ নাকি অন্য কিছু। এর আগে আমাদের বলার কোনো এখতিয়ার বা সুযোগ নেই।
কী ঘটেছিল শিশুটির সঙ্গে
পুলিশ ও পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, কয়েকদিন আগে শিশুটি মাগুরা শহরে তার বোনের শ্বশুর বাড়িতে বোনের কাছে বেড়াতে যায়।
গত ছয়ই মার্চ বেলা ১১টার কিছুক্ষণ পর শিশুটিকে অচেতন অবস্থায় মাগুরা আড়াইশ শয্যা হাসপাতালে নিয়ে আসেন এক নারী। পরে জানা যায় ওই নারী তার বোনের শাশুড়ি। এরপর খবর পেয়ে শিশুটির মা হাসপাতালে আসেন।
হাসপাতালে চিকিৎসকেরা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে শিশুটির গলায় দাগ ও শরীরে বেশ কিছু জায়গায় আঁচড় দেখতে পান। চিকিৎসকদের উদ্ধৃত করে পুলিশ জানায়, শিশুটির যৌনাঙ্গে রক্তক্ষরণ হচ্ছিলো।
অবস্থা ভালো নয় দেখে তখনি মাগুরা হাসপাতালের চিকিৎসকদের পরামর্শে শিশুটিকে নেয়া হয় ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে থেকে সেদিনই সন্ধ্যায় তাকে আনা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
শিশুটিকে ঢাকায় আনার পরপরই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছিলেন, তার শারীরিক অবস্থা 'ক্রিটিক্যাল'।
সাতই মার্চ রাত থেকে শিশুটিকে লাইফ সাপোর্টে দেওয়া হয়। শিশুটির চিকিৎসায় একটি মেডিক্যাল বোর্ডও কাজ শুরু করে।
পরে আট মার্চ তাকে সিএমএইচে স্থানান্তর করা হয়।
গত ৮ মার্চ মাগুরা সদর থানায় চার জনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার মামলা করেন শিশুটির মা।
এরপর পুলিশ শিশুটির বোনের স্বামী, বোনের শ্বশুর, শাশুড়ি ও ভাশুরকে গ্রেপ্তার করে। আদালতে তোলার পর তাদের ভিন্ন ভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।
মাগুরার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মিরাজুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, শিশুটিকে নিপীড়নের ঘটনার সাথে যারা জড়িত বলে পরিবার থেকে অভিযোগ করা হয়েছে , তাদের চারজনকেই পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
'এ ইস্যুকে কেন্দ্র করে কোনো নৈরাজ্য বরদাশত করা হবে না'
শিশুটিকে নিপীড়নের প্রতিবাদে ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে গত সাতই মার্চ শুক্রবার সড়ক অবরোধ ও থানার সামনে বিক্ষোভ করেন স্থানীয়রা।
পরে আটই মার্চ রাতে ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ শুরু হয়। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, রাজনীতিবিদসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ ধর্ষণ ও নারী নিপীড়নের বিচার ও কঠোর শাস্তি দাবি করেন।
ঢাকায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে গত বুধ ও বৃহস্পতিবার পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।
বৃহস্পতিবার (১৩ মার্চ) আইন মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেছেন, মাগুরার এই ঘটনায় সাত দিনের মধ্যে বিচারকাজ শুরু হবে।
"বিশেষ ব্যবস্থায় আমরা আজই পোস্টমর্টেম প্রতিবেদন নেওয়ার ব্যবস্থা করেছি। ডিএনএ স্যাম্পল কালেকশন করা হয়ে গেছে। আশা করি আগামী পাঁচ দিনের মধ্যে রিপোর্ট পেয়ে যাব। এরই মধ্যে ১২-১৩ জনের ১৬১ ধারায় (দণ্ডবিধি) স্টেটমেন্ট নেওয়া হয়েছে। আশা করছি আগামী সাত দিনের মধ্যে বিচার কাজ শুরু হবে।"
তিনি জানান, শিশুটির মরদেহ হেলিকপ্টারে করে মাগুরা নেওয়ার সময় সরকারের পক্ষ থেকে উপদেষ্টা ফরিদা আখতার সঙ্গে যাবেন।
"এ ইস্যুকে কেন্দ্র করে কোনো নৈরাজ্য আমরা বরদাস্ত করব না" বলেও উল্লেখ করেন আসিফ নজরুল।
"ধর্ষণ ও বলাৎকারের মামলাগুলোর দ্রুত বিচার শেষ করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হবে। আগামী রবিবারের মধ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশোধনীর অধ্যাদেশ জারির চেষ্টা করা হবে। এ সময় কেউ দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করলে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে," যুক্ত করেন তিনি।