আফগান হাসপাতালে শিশুদের মৃত্যু 'চেয়ে দেখা ছাড়া কিছু করার নেই’

- Author, ইওগিতা লিমাই
- Role, আফগানিস্তান সংবাদদাতা
তিন মাসের শিশু তৈয়বুল্লাহ নিশ্চুপ ও স্থবির। তার মা নিগার সন্তানের নাক থেকে অক্সিজেনের পাইপ সরিয়ে সেখানে আঙ্গুল দিয়ে দেখছেন তার ছেলে এখনও নিশ্বাস নিচ্ছে কি না।
যখন বুঝতে পারলেন তৈয়বুল্লাহ ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে, তখন তিনি কাঁদতে শুরু করলেন।
আফগানিস্তানের এই হাসপাতালটিতে একটি ভেন্টিলেটরও পর্যন্ত নেই।
ছোট ছোট শিশুদের মুখে বসানো যায় এই মাপের মাস্কও নেই হাসপাতালে, যার ফলে মায়েরা তাদের শিশুদের নাকের কাছে অক্সিজেন টিউব হাত দিয়ে ধরে রাখেন।
হাসপাতালের নার্স ও যন্ত্রপাতির যেসব কাজ করার কথা, এই নারীরা সেই কাজগুলোই করার চেষ্টা করছেন।
জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের হিসেব অনুসারে নিরাময়যোগ্য অসুখে প্রতিদিন আফগানিস্তানে ১৬৭টি শিশুর মৃত্যু হয়।
প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা ও সঠিক ওষুধ দেওয়া দেওয়া গেলে এই শিশুদের বাঁচানো সম্ভব হতো।
এই সংখ্যাটা ভয়াবহ। কিন্তু এটা একটা অনুমান।
কিন্তু দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় ঘর প্রদেশের প্রধান হাসপাতালে শিশুদের ওয়ার্ডে গেলে মনে হবে এই অনুমান খুবই কম।
সবগুলো ঘর অসুস্থ শিশুতে ভর্তি। একটি বেডে কমপক্ষে দুটি শিশু। নিউমোনিয়া আক্রান্ত হয়ে তাদের ছোট ছোট শরীর প্রায় শেষ হয়ে গেছে।
এখানে মাত্র দুজন নার্স ৬০টি অসুস্থ শিশুর দেখাশোনা করে।
একটা কক্ষে আমরা অন্তত দুই ডজন শিশুকে দেখেছি যাদের অবস্থা গুরুতর বলে মনে হয়েছে।
এই শিশুদের সার্বক্ষণিক নিবিড় পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন, কিন্তু এই হাসপাতালে তা পাওয়া একেবারেই অসম্ভব।
তার পরেও ঘর প্রদেশে যে দশ লাখ মানুষ বাস করেন এটাই তাদের কাছে সবচেয়ে ভাল সরকারি হাসপাতাল যেখানে মৌলিক সুযোগ-সুবিধা ও সবচেয়ে ভালো যন্ত্রপাতি রয়েছে।

সরকারি স্বাস্থ্য সেবা আফগানিস্তানে কখনোই পর্যাপ্ত ছিল না। এসব পরিচালনার জন্য যে বিদেশি অর্থ সাহায্য দেওয়া হয় সেটাও ২০২১ সালের অগাস্ট মাসে যখন তালেবান ক্ষমতা দখল করে তখন থেকে বন্ধ রয়েছে।
গত ২০ মাসে আমরা সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিক ঘুরে ঘুরে দেখেছি যেগুলোতে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সেবা পুরোপুরি ভেঙে পড়ছে।
তালেবান সম্প্রতি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এনজিওতে নারীদের কাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যার ফলে মানবিক সাহায্য সংস্থাগুলোর পক্ষে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এর জের ধরে আরো অনেক শিশু ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
ঘর হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ ও চিকিৎসকের অভাব সত্ত্বেও সামান্য যা কিছু আছে তা দিয়েই তৈয়বুল্লাহকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
শিশুটির অবস্থা দেখতে ছুটে এলেন ড. আহমাদ সামাদি। তার চোখে মুখে ক্লান্তি, চাপ ও হতাশা।
তৈয়বুল্লাহর বুকের ওপর তিনি তার স্টেথোস্কোপ ধরে দেখলেন- এখনও মৃদু হার্ট-বিট শোনা যাচ্ছে।
নার্স এদিমা সুলতানি অক্সিজেনের পাম্প নিয়ে ছুটে এলেন। লাগিয়ে দিলেন তৈয়বুল্লাহর মুখে। এর পর ড. সামাদি তার বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে ছোট্ট শিশুটির বুকের ওপর চাপ দিতে লাগলেন।
সেখানে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখছিলেন তৈয়বুল্লাহর নানা ঘওসাদ্দিন। তিনি জানালেন যে তার নাতি নিউমোনিয়া এবং অপুষ্টিতে ভুগছে।
“আমাদের চারসাদ্দা জেলা থেকে পাথরের রাস্তা ধরে তাকে এখানে নিয়ে আসতে আট ঘণ্টা সময় লেগেছে,” বলেন ঘওসাদ্দিন।
এই পরিবারটি যারা তাদের খাবার হিসেবে শুধু শুকনো রুটি কিনে খেতে পারে, এইটুকু পথ আসার খরচ জোগানোর অর্থও তাদের কাছে ছিল না।
তার নাতিকে বাঁচানোর জন্য আধ ঘণ্টা ধরে চেষ্টা চলল।
এর পর নার্স সুলতানি মা নিগারের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বললেন - তৈয়বুল্লাহ মারা গেছে।
এতক্ষণ এই ঘরে যে নিস্তব্ধতা জমা হয়েছিল, মা নিগারের কান্নায় সেটা খান খান হয়ে ভেঙে পড়ল।
তার ছেলেকে একটি কম্বলে মুড়িয়ে নানা ঘওসাদ্দিনের হাতে তুলে দেওয়া হলো।
এর পর পরিবারটি মৃত শিশুটিকে নিয়ে ফিরে গেল বাড়িতে।
তৈয়বুল্লাহর বেঁচে থাকার কথা ছিল- যেসব অসুখে সে ভুগছিল সেগুলো সবই নিরাময় করা যেত।
“আমিও একজন না এবং যখন আমি একটি শিশুকে মারা যেতে দেখি, আমার মনে হয় আমি যেন আমার নিজের সন্তানকে হারিয়েছি। আমি যখন তার মাকে কাঁদতে দেখলাম আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। এটা আমার বিবেককে আহত করে,” বললেন নার্স সুলতানি, যিনি ঘন ঘন ২৪ ঘণ্টার শিফটে কাজ করেন।
“আমাদের যন্ত্রপাতি নেই এবং প্রশিক্ষিত স্টাফও নেই, বিশেষ করে নারী কর্মী। আমরা যখন গুরুতর অসুস্থ এতোগুলো শিশুকে দেখছি তখন আমরা কাকে আগে দেখব? শিশুদের মৃত্যু দেখা ছাড়া আমাদের তো আর কিছুই করার নেই,” বলেন তিনি।

এর কয়েক মিনিট পর, পাশের ঘরে আরেকটা শিশু, যার মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো, সে শ্বাস নেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে।
এই শিশুটির নাম গুলবদন। দুই বছর বয়সী এই শিশুটি ত্রুটিপূর্ণ হৃদপিণ্ড নিয়ে জন্ম নিয়েছিল। এই অবস্থাকে বলা হয় প্যাটেন্ট ডাক্টাস আর্টেরিওসিস।
এই হাসপাতালেই ছয় মাস আগে তার এই সমস্যা প্রথম শনাক্ত হয়।
ডাক্তাররা আমাদের বলেছেন এই অসুখ বিরল কোনো রোগ নয় এবং এর চিকিৎসাও খুব কঠিন কিছু নয়। তবে এই সমস্যার সমাধানের জন্য যে অপারেশন করা প্রয়োজন তা করার যন্ত্রপাতি ঘর প্রদেশের প্রধান এই হাসপাতালে নেই।
এজন্য তার যেসব ওষুধের প্রয়োজন - তাও নেই।
গুলবদনের দাদি আফওয়া গুল তার নাতনির ছোট দুটো হাত ধরে রেখেছে যাতে সে তার মাস্ক টেনে খুলে ফেলতে না পারে।
“তাকে কাবুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমরা কিছু অর্থ ধার করেছি। কিন্তু অপারেশন করানোর মতো প্রয়োজনীয় অর্থ আমাদের নেই। একারণে আমরা তাকে এখানে নিয়ে এসেছি,” বলেন তিনি।
আর্থিক কিছু সাহায্যের জন্য তারা একটি এনজিওর কাছে গিয়েছিলেন। তাদের ব্যাপারে সব তথ্য লিখে রাখা হয়েছে ,কিন্তু এখনও পর্যন্ত তারা কিছু জানতে পারেন নি।
গুলবদনের পিতা নওরোজ তার মেয়ের কপালে হাত বুলিয়ে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন। প্রত্যেকবার শ্বাস নেওয়ার সাথে সাথে সে যন্ত্রণায় কুঁচকে উঠছিল।
তার মুখে উদ্বেগের ছাপ। ঠোঁট কুঞ্চিত করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি। আমাদের বললেন গুলবদন খুব সম্প্রতি কথা বলতে শুরু করেছে। শব্দ করে তাকে এবং তার পরিবারের সদস্যদের ডাকতে পারছে।

“আমি একজন শ্রমিক। আমার নিয়মিত কোনো রোজগার নেই। আমার যদি অর্থ থাকতো, তাকে এভাবে ভুগতে হতো না। এই মুহূর্তে এক কাপ চা কিনে খাওয়ার সামর্থ্যও আমার নেই,” বলেন তিনি।
আমি ড. সামাদির কাছে জানতে চাইলাম গুলবদনের কতোটুকু অক্সিজেন প্রয়োজন।
“প্রতি মিনিটে দুই লিটার,” বললেন তিনি। “এই সিলিন্ডার যখন খালি হয়ে যাবে, আমরা যদি আরেকটা সংগ্রহ করতে না পারি, তাহলে সে মারা যাবে।”
এর কতক্ষণ পরে আমরা যখন গুলবদনকে আবার দেখতে গেলাম, জানতে পারলাম আগে আমাদের যা বলা হয়েছিল, ঠিক তাই হয়েছে।
সিলিন্ডারের অক্সিজেন ফুরিয়ে গেছে, এবং সে-ও মারা গেছে।
হাসপাতালের যে ইউনিটে অক্সিজেন উৎপাদন করা হয় তারা পর্যাপ্ত পরিমাণে অক্সিজেন তৈরি করতে পারে না, কারণ এখানে শুধুমাত্র রাতের বেলায় বিদ্যুৎ থাকে।
এছাড়া অক্সিজেন তৈরির জন্য যেসব উপাদান প্রয়োজন - সেগুলোর সরবরাহও নিয়মিত নয়।

মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এই হাসপাতালে দুটো শিশুর মৃত্যু হলো যা ঠেকানো যেতো। ড. সামাদি বলছেন, এসব মৃত্যু তাদের জন্য খুব দুঃখজনক।
“আমি চরম পরিশ্রান্ত এবং তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করি। প্রতিদিন আমরা ঘরের একটি অথবা দুটো শিশুকে হারাই। এর সাথে আমরা ইতোমধ্যে অভ্যস্ত হয়ে গেছি,” বলেন তিনি।
হাসপাতালের কক্ষগুলোতে ঘোরাঘুরি করার সময় আমরা দেখলাম উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে।
এক বছর বয়সী সাজাদ জোরে জোরে কষ্ট করে নিশ্বাস নিচ্ছিল। সে নিউমোনিয়া ও মেনিনজাইটিসে ভুগছে।
ইরফান নামের একটি শিশুর নিশ্বাস নেওয়া যখন আরো বেশি কষ্টকর হয়ে উঠল তখন তার মা জিয়ারাহকে আরো একটি অক্সিজেন পাইপ দেওয়া হলো তার ছেলের নাকের কাছে ধরে রাখার জন্য।
তিনি কাঁদছিলেন। তার অশ্রু গাল বেয়ে পড়ছিল। এক হাত দিয়ে তিনি তার চোখের পানি মুছলেন এবং আরেকটা হাত দিয়ে যতোটা শান্তভাবে সম্ভব অক্সিজেনের পাইপটা ধরে রাখলেন।
তিনি আমাদের জানালেন বরফ জমে রাস্তা বন্ধ না থাকলে তিনি ইরফানকে কমপক্ষে চার/পাঁচদিন আগে হাসপাতালে নিয়ে আসতে পারতেন।
এরকম পরিস্থিতির কারণেই অনেকে হাসপাতালে পৌঁছাতে পারে না। আর যারা এসে পৌঁছাতে পারে তাদেরকেও খুব বেশি সময় থাকতে হয় না।
“দশদিন আগে একটি শিশুকে খুবই গুরুতর অবস্থায় এখানে নিয়ে আসা হয়েছিল,” বললেন নার্স সুলতানি। “আমরা তাকে একটা ইনজেকশন দিলাম, তবে তাকে সুস্থ করে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ আমাদের কাছে ছিল না।”
“ফলে তার পিতা তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে গেল। তিনি আমাকে বলেছিলেন - যদি তাকে মরতেই হয়, সে বাড়িতেই মরুক।”

ঘর প্রদেশের হাসপাতালে আমরা যা দেখলাম - তার পর একটা বড় প্রশ্ন উঠতে পারে যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ২০২১ সাল পর্যন্ত ২০ বছর ধরে শত শত কোটি ডলার অর্থ সাহায্য দিয়ে যাওয়ার পরেও আফগানিস্তানের স্বাস্থ্যসেবা এতো দ্রুত ভেঙে পড়ছে কেন?
প্রাদেশিক একটি হাসপাতালে রোগীদের জন্য একটি ভেন্টিলেটরও যদি না থাকে, এসব অর্থ তাহলে কোথায় খরচ করা হয়েছে?
বর্তমানে ঠেকা দেওয়ার মতো কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না থাকার কারণে তালেবান সরকারের কাছে সরাসরি অর্থ দেওয়া যায় না। একারণে মানবিক সাহায্য সংস্থাগুলো হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্টাফদের বেতন এবং খাদ্য ও ওষুধের খরচ জোগানোর জন্য এগিয়ে এসেছে।
এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে যাতে ঘর প্রদেশের হাসপাতালের মতো দেশের অন্যান্য হাসপাতালগুলোও চালু থাকতে পারে।
কিন্তু এই অর্থ সাহায্য দিয়ে কাজ তো হচ্ছেই না, বরং এর ফলে ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
সাহায্য সংস্থাগুলো সতর্ক করে দিয়েছে যে তাদের দাতারা অর্থ দেওয়া বন্ধ করে দিতে পারে কারণ তালেবান নারীদের ওপর, বিশেষ করে আফগান নারীদের জাতিসংঘ ও এনজিওতে কাজ করার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।
আফগানিস্তানের জন্য জাতিসংঘ যে সাহায্যের যে আবেদন জানিয়েছে তার মাত্র পাঁচ শতাংশ সাড়া পাওয়া গেছে।

আমরা গাড়ি দিয়ে ঘর হাসপাতালের কাছে একটি পাহাড়ের ওপর অবস্থিত কবরস্থানে যাই। এখানে কাকে কোথায় কখন কবর দেওয়া হচ্ছে তার কোনো রেকর্ড নেই। এমনকি দেখাশোনা করার জন্য কোনো তত্ত্বাবধায়কও নেই।
ফলে এখানে কার কার কবর সেটা জানা সম্ভব নয়। তবে বড় কবর থেকে ছোট কবরগুলোকে আলাদা করা যায়।
আমরা দেখলাম নতুন কবরের অন্তত অর্ধেকই হবে শিশুদের।
এই কবরস্থানের পাশেই একটি বাড়িতে থাকেন এমন একজন আমাদের বললেন এখন যাদেরকে তারা কবর দিচ্ছেন তাদের বেশিরভাগই শিশু।
কতো শিশু মারা যাচ্ছে সেটা গণনা করার হয়তো কোনো উপায় নেই, তবে এই সঙ্কট যে অনেক তীব্র তার সাক্ষ্য সবখানেই পাওয়া যায়।
এই প্রতিবেদনটি তৈরিতে সাহায্য করেছেন ইমোজেন এন্ডারসন এবং সঞ্জয় গাঙ্গুলি।








