আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর হত্যায় জড়িত সব আসামীকে মুক্তি দিলো আদালত
ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী হত্যা মামলার ছয় আসামীকে শুক্রবার মুক্তি দিয়েছে সেদেশের সর্বোচ্চ আদালত। ১৯৯১ সালের ২১ মে তামিলনাডুর শ্রীপেরুমবুদুরে এল টি টিই-র সদস্য এক নারী আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত হন মি. গান্ধী।
একটি নির্বাচনী জনসভায় রাজীব গান্ধীকে মালা দিয়ে সম্বর্ধনার ছলে নিজের গায়ে আঁটা বোমার ট্রিগার টেনেছিলেন এলটিটিই সদস্য সেই নারী হামলাকারী মিজ ধানু।
মি. গান্ধী ও মিজ ধানু সহ ১৬ জন ঘটনাস্থলেই মারা গিয়েছিলেন। আহত হয়েছিলেন ৪৫ জন।
End of আরও পড়তে পারেন:
মুক্ত আত্মঘাতী দলের একমাত্র জীবিত সদস্যও
শুক্রবার আদালতের নির্দেশে যারা মুক্তি পেলেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন নলিনী শ্রীহরণও, যিনি রাজীব গান্ধীকে হত্যার জন্য গঠিত এলটিটিই-র পাঁচ সদস্যের আত্মঘাতী বোমারু দলটির একমাত্র জীবিত সদস্য।
মুক্তি পেয়েছেন তার স্বামী মি. মুরুগানও।
মি. মুরুগান এবং মুক্তি পাওয়া আরেক আসামী মি. সান্থান শ্রীলঙ্কার নাগরিক। আরও দুজন ১৯৯০ সালে উদ্বাস্তু হিসাবে শ্রীলঙ্কা থেকে তামিলনাডুতে এসেছিলেন।
এবছর মে মাসে সংবিধানের বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে আরেক যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামী মি. পেরারিভালানকে মুক্তি দিয়েছিল শীর্ষ আদালত।
আগে ফাঁসির আদেশ, এখন মুক্তি
এলটিটিই সদস্য নলিনী শ্রীহরণ সহ বাকি আসামীদের শুক্রবার মুক্তির নির্দেশ দিলেও এদের মধ্যে চারজনকে আগে ফাঁসির আদেশ দিয়েছিল এই সুপ্রিম কোর্টই।
তিনজনকে দেওয়া হয়েছিল যাবজ্জীবন মৃত্যুদণ্ড।
নিম্ন আদালত অবশ্য ধৃত ২৬ জনেরই ফাঁসির আদেশ দিয়েছিল।
তবে রাজীব গান্ধীর স্ত্রী সনিয়া গান্ধী ২০০০ সালে নলিনী শ্রীহরণকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন।
২০১৪ সালে বাকি ফাঁসির আসামীদের মৃত্যুদণ্ডও সুপ্রিম কোর্ট রদ করে দিয়েছিল।
সেই সময়ে আদালত এই যুক্তি দেখিয়েছিল যে আসামীদের ক্ষমাভিক্ষার আর্জি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে রয়েছে।
মুক্তির জন্য দীর্ঘ আইনি লড়াই
যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত এই আসামীরা দীর্ঘদিন ধরেই মুক্তি পাওয়ার জন্য আইনি লড়াই চালাচ্ছিলেন।
এরা সবাই প্রায় তিন দশক ধরে জেলে রয়েছেন, এই যুক্তি দেখিয়ে ২০১৮ সালেই তামিলনাডুর মন্ত্রীসভা আসামীদের মুক্তি দেওয়ার জন্য রাজ্যপালের কাছে সুপারিশ করেছিল।
সুপ্রিম কোর্টের দুই সদস্যের বেঞ্চ শুক্রবারের রায়ে উল্লেখ করেছেন যে দোষীরা জেলে থাকার সময়টায় পড়াশোনা করেছেন, ডিগ্রি অর্জন করেছেন, তাদের ব্যবহারও ভাল ছিল।
মুক্তির নির্দেশে কংগ্রেস অসন্তুষ্ট সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে কংগ্রেস দল।
এই প্রসঙ্গে দলের মুখপাত্র জয়রাম রমেশ এক বিবৃতিতে বলেছেন যে রাজীব গান্ধীর খুনিদের ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত পুরোপুরি ভুল। সুপ্রিম কোর্ট এ বিষয়ে ভারতের ভাবাবেগের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয় নি।
তবে তামিলনাডুর রাজনীতিতে রাজীব গান্ধীর হত্যাকারীদের নিয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত ভাবাবেগ কাজ করে।
ডিএমকে অথবা এই আই এ ডি এম কে, যে দলই সেই রাজ্যে সরকারে থেকেছে, তারাই এই আসামীদের মুক্তি জন্য সরব হয়েছে, কারণ সেখানকার মানুষদের একাংশ মনে করেন এই দোষীরা আসলে দাবার বোড়ে ছিলেন।
রাজীব গান্ধী হত্যার মূল চক্রান্তের সম্বন্ধে এরা বিশেষ কিছুই জানতেন না।
রাজীব গান্ধীকে যেভাবে হত্যা করা হয়
১৯৯১ সালের ২১ মে রাতে তামিলনাডুর শ্রীপেরুমবুদুরে এক নির্বাচনী জনসভায় ভাষণ দিতে যান রাজীব গান্ধী।
বহু মানুষ সেখানে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নিচ্ছিলেন মি. গান্ধীকে।
তাদেরই মধ্যে ছিলেন এলটিটিই-র আত্মঘাতী বোমারু ধানু।
মি. গান্ধীকে মালা দেওয়ার পরে নিচু হয়ে পা ছুঁয়েছিলেন তিনি আর তখনই নিজের কোমরে বাঁধা বোমাটি ফাটিয়ে দেন তিনি।
ঘটনার সময়ে সামান্য দূরেই ছিলেন গাল্ফ নিউজের সংবাদদাতা নীনা গোপাল। তিনি সেই সময়ে ডেকান ক্রনিকল কাগজের স্থানীয় সম্পাদক ছিলেন।
রাজীব গান্ধীর সহযোগী সুমন দুবের সঙ্গে মিজ গোপাল কথা বলছিলেন একটু দূরে দাঁড়িয়ে।
"আমি সুমনের সঙ্গে কথা বলার পরে মিনিট দুয়েকও হয় নি, হঠাৎই বিস্ফোরণ," বলছিলেন মিজ গোপাল।
শাড়িতে মাংসের টুকরো, রক্তের ছিটে
মিজ গোপাল বলছিলেন, "আমি সাধারণত সাদা শাড়ি পরি না। কিন্তু সেদিন তাড়াহুড়োতে একটা সাদা শাড়ি পরেই চলে গিয়েছিলাম।
বোমা ফাটার পরে যখন নিজের শাড়িটার দিকে তাকালাম, দেখি সেটা পুরোপুরি কালো হয়ে গেছে, আর তাতে কিছু মাংসের টুকরো লেগে আছে। কোথাও কোথাও রক্তের ছিটেও লেগেছিল।"
"আমি অদ্ভুতভাবে বেঁচে গিয়েছিলাম, অথচ আমার সামনে দাঁড়ানো প্রত্যেকে বিস্ফোরণে মারা গিয়েছিলেন," বলছিলেন নীনা গোপাল।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছিলেন, চারদিকে তখন দৌড়োদৌড়ি চলছে। কারও গায়ে আগুন লেগে গেছে, কেউ চিৎকার করে সাহায্য চাইছে।
প্রথমে কিছুক্ষণ তো বোঝাই যায় নি যে রাজীব গান্ধী বেঁচে আছেন কী না।
চারদিক ধোঁয়ায় ভরে গিয়েছিল।
ধোঁয়া কিছুটা কমলে সবাই খোঁজ শুরু করে রাজীব গান্ধীর।
নিরাপত্তা কর্মকর্তা পি কে গুপ্তার পায়ের কাছে পরে ছিল রাজীব গান্ধীর মাথার একটা অংশ।
কপাল ফেটে গিয়ে ঘিলু বেরিয়ে এসেছিল তার।
মি. গুপ্তাও তখন জীবনের শেষ লগ্নে।
রাজীব হত্যার তদন্ত, এলটিটিই যোগ
হত্যার তদন্তের জন্য কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সের আই জি, ডি আর কার্তিকেয়নের নেতৃত্বে একটা বিশেষ তদন্ত দল গঠিত হয়েছিল।
কয়েকমাসের মধ্যেই সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মূল অভিযুক্ত শিভারাসন আর তার কয়েকজন সঙ্গী ধরা পড়ার আগেই সায়ানাইড বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করে।
তদন্ত চলাকালীনই সামনে আসে রাজীব হত্যায় এলটিটিই যোগ।
শ্রীলঙ্কার এলটিটিইকে কাবু করার জন্য রাজীব গান্ধী ভারতীয় সেনাবাহিনী পাঠিয়েছিলেন।
শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠানোর কারণে শ্রীলঙ্কার তামিল বিদ্রোহীরা ক্ষুব্ধ ছিল।
এই ক্ষোভের কারণেই দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা করে এলটিটিই রাজীব গান্ধীকে হত্যা করেছিল।