বাখমুটে রুশ পতাকা উত্তোলন, তবে যুদ্ধ চলছে

রুশ ভাড়াটে বাহিনী ওয়াগনারের প্রধান দাবি করেছেন তিনি ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় বাখমুট শহরের নগর ভবনে রুশ পতাকা উড়িয়ে দিয়েছেন।

রাতের বেলা তোলা এক ভিডিওতে ওয়াগনার বাহিনীর প্রধান ইয়েভগেনি প্রিগোশিন বলেছেন “আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে” বাখমুট এখন রাশিয়ার অংশ।

তবে তিনি স্বীকার করেছেন শহরের পশ্চিমাঞ্চলীয় মহল্লাগুলোতে ইউক্রেনের সৈন্যরা এখনও ঘাঁটি গেড়ে রয়েছে।

ইউক্রেনের সরকারও জোর দিয়ে বলছে বাখমুট এখনও তাদের সৈন্যদের নিয়ন্ত্রণে।

ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় এই শহরটির নিয়ন্ত্রণ নিতে রাশিয়া গত সাত মাসেরও বেশি সময় ধরে মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

তবে ইউক্রেন জোরালো ভাষায় দাবি করেছে বাখমুট দখলের যে দাবি ওয়াগনার করেছে তা একেবারেই ভুয়া।

ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর স্টাফ প্রধান রোববার সন্ধ্যায় বলেছেন যদিও রাশিয়া বাখমুটের ওপর তাদের হামলা অব্যাহত রেখেছে, “ইউক্রেনের সৈন্যরা সাহসের সাথে শত্রুর হামলা প্রতিহত করছে এবং শহরটি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে।"

প্রেসিডেন্টে জেলেনস্কির স্টাফ প্রধান অন্দ্রি ইয়ারস্‌মাক “সাজানো কাল্পনিক বিজয়ের” দাবি নিয়ে উদ্বিগ্ন না হতে ইউক্রেনের জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

ইউক্রেনের উপ প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হানা মালিয়ার বলেছেন বাখমুটের দখল নেওয়ার যে “ভুয়া” দাবি ওয়াগনার প্রধান করেছেন তা “হাস্যকর"।

তার প্রচারিত ভিডিওতে ওয়াগনারের প্রধান মি. প্রিগোশিন বলেন বাখমুটের নগরভবনে তোলা পতাকার ওপর লেখায় রোববার সেন্ট পিটার্সবার্গ শহরে বিস্ফোরণে নিহত রুশ সামরিক ব্লগার ভ্লাদলেন তাতারস্কির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে।

তবে বিবিসি নিরপেক্ষ সূত্র থেকে এই ফুটেজের সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।

গবেষণা সংস্থা ইন্সটিটিউট অব ওয়ার (আইএ ডব্লিউ) রোববার তাদের এক এক বিশ্লেষণে বলেছে ইউক্রেনীয় সৈন্যরা এখনও বাখমুটের সিংহভাগ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে – যদিও রুশ সৈন্যরা দক্ষিণ এবং পূর্ব দিকে থেকে শহরটি ঘিরে ফেলার চেষ্টা করছে।

ওয়াগনার, যারা নিজেদেরকে বেসরকারি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে পরিচয় দেয়, বাখমুট যুদ্ধে বড় ধরনের ভূমিকা রাখছে এবং এই যুদ্ধে তাদের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি হয়েছে।

রাশিয়ার বিভিন্ন কারাগার থেকে হাজার হাজার দণ্ডিত অপরাধীদের বের করে এনে ওয়াগনার বাহিনীতে ঢুকিয়ে অল্প প্রশিক্ষণ দিয়ে বাখমুটের রণাঙ্গনে পাঠানো হয়।

তবে, পাশাপাশি রুশ সৈন্যরাও বাখমুটে লড়াই করছে।

গত কয়েকমাস ধরে বাখমুটের দখল নিয়ে চলা রক্তক্ষয়ী লড়াইতে দুই পক্ষের হাজার হাজার যোদ্ধা মারা গেছে।

ধারণা করা হয়, ইউক্রেনের চেয়ে রুশ পক্ষের প্রাণহানি হয়েছে অনেক বেশি। পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষ থেকে দেওয়া গোয়েন্দা বিভিন্ন রিপোর্টে বলা হয়েছে বাখমুট দখলের যুদ্ধে ২০ থেকে ৩০ হাজার রুশ সৈন্য মারা গেছে।

বাখমুট ১২০০ মাইল রণাঙ্গনের একটি ক্ষুদ্র অংশ হলেও কেন মাসের পর মাস ধরে দুই পক্ষই শহরটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এমন মরিয়া হয়ে লড়ছে?

রুশ কম্যান্ডাররা মনে করছেন বাখমুটের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে এই শহরটিকে ভিত্তি করে ইউক্রেনের আরও এলাকা দখলের চেষ্টা সহজ হবে।

ব্রিটেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ডিসেম্বরে এক বিশ্লেষণে বলেছিল বাখমুটের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে রাশিয়া কাছের ক্রমাটরস্ক এবং স্লোভিয়ানস্কের মত বড় বড় শহরগুলোর ওপর হুমকি তৈরি করতে সক্ষম হবে।

তাছাড়া, রুশ ভাড়াটে বাহিনী ওয়াগানারের জন্য এই যুদ্ধে জেতা এখন মর্যাদার লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাহিনীর প্রধান ইয়েভগেনি প্রিগোশিন মনে করছেন বাখমুটের যুদ্ধে সাফল্য না দেখাতে পারলে ক্রেমলিনে তার প্রভাব এবং সুনাম ক্ষুণ্ণ হবে।

বাখমুটের সামরিক কৌশলগত গুরুত্ব আসলে কতটা তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তবে ইউক্রেন এই যুদ্ধকে রাশিয়ার সামরিক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি বাড়ানোর একটি সুযোগ হিসাবে বিবেচনা করছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন।

গত সাত মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা লড়াইতে পূর্ব ইউক্রেনের শিল্পসমৃদ্ধ শহরটিতে ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে এবং তা অব্যাহত রয়েছে।

শহরের ডেপুটি মেয়র সম্প্রতি বিবিসিকে বলেন, শহরে এখন মাত্র কয়েক হাজার মানুষ রয়ে গেছেন যারা আন্ডারগ্রাউন্ড শেল্টারে গ্যাস, বিদ্যুৎ বা পানি সরবরাহ ছাড়া আশ্রয় নিয়ে রয়েছেন।

“শহরটি প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। এমন একটি ভবনও নেই যেখানে যুদ্ধের নিশানা নেই,” বলেন বাখমুটের ডেপুটি মেয়র ওলেকসান্দার মার্চেঙ্কো।

ইউক্রেনের সেনাবাহিনী আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে রাশিয়ার দখল থেকে বেশ কিছু এলাকা পুনর্দখলের অভিযান শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

জার্মানির তৈরি অত্যাধুনিক লেপার্ড ট্যাংক সহ আধুনিক পশ্চিমা ভারী অস্ত্র আসতে শুরু করলেই ইউক্রেন পাল্টা অভিযান শুরু করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।