যশোরের হিন্দু ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যা, পুলিশ ও স্থানীয়রা যা বলছেন

ছবির উৎস, COLLECTED
- Author, জান্নাতুল তানভী
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
যশোরের মনিরামপুরে রানা প্রতাপ বৈরাগী নামের একজন বরফ কল ব্যবসায়ীকে ডেকে নিয়ে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। ব্যবসার পাশাপাশি তিনি স্থানীয় একটি পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন বলে জানা গেছে। তবে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় হত্যা, ধর্ষণ ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের তিনটি মামলা রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
সোমবার সন্ধ্যায় মনিরামপুর উপজেলার মনোহরপুর ইউনিয়নের কপালিয়া বাজারে এ ঘটনা ঘটে।
মি. বৈরাগীর হত্যার এই ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ আলোচনা চলছে।
কিন্তু ঠিক কী কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে সে বিষয়টি নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা কাজ করছে।
ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে পুলিশ জানিয়েছে, হত্যার ঘটনা এখনো তদন্তাধীন রয়েছে।
মনিরামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রজিউল্লাহ খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, " মামলা প্রক্রিয়াধীন, মামলা নিয়ে নিচ্ছি আমরা, ওই ছেলের বাবা মামলা করছে।"
তবে, নিহত ব্যক্তির বিরুদ্ধে যশোর জেলার অন্য দুইটি থানায় হত্যা, ধর্ষণ ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের তিনটি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এক সময় তিনি চরমপন্থি কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিলেন বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন।
নিহত এই ব্যক্তি নড়াইল থেকে প্রকাশিত ' দৈনিক বিডি খবর ' নামে একটি পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন বলে জানা গেছে।

ছবির উৎস, Sazed Rahman
ঘটনার দিন ঠিক কি ঘটেছিলো?
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
সোমবার সন্ধ্যায় মি. বৈরাগীকে হত্যার সময় সেদিন ঠিক কি ঘটেছিল জানতে চাইলে স্থানীয়রা জানান, রানা প্রতাপ বৈরাগীর বরফকলের পাশে এই খুনের ঘটনাটি ঘটেছিল।
পুলিশ, পরিবারের সদস্য এবং স্থানীয়রা জানান, ঘটনার দিন সন্ধ্যায় ছয়টায় কয়েকজন ব্যক্তি তাকে বরফ কল থেকে ডেকে নিয়ে পার্শ্ববর্তী কপালিয়া ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সামনে নিয়ে যান।
ওই গলিতেই মি. বৈরাগীর সাথে বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে তার মাথায় গুলি করা হয়। পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।
গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মি. বৈরাগী মারা যান।
নিহত ব্যক্তির বাবা তুষার কান্তি বৈরাগী দাবি করেন তার ছেলের সাথে কারো ব্যবসায়িক কোনো বিরোধ ছিলো না।
কী কারণে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বুঝতে বা অনুমান করতে পারছেন না তিনি।
তিনি বলেন, " ব্যবসায়িক কোনো বিরোধ তার সাথে তো দেখি না। এটা ঘটনাটা কী ঘটেছে এটাও বুঝতে পারছি না। হঠাৎ করে এটা হবে, এটা করবে কিছুই আমরা বুঝতে পারিনি।"
বিবিসি বাংলাকে তিনি জানান, ঘটনার দিন বেলা তিনটায় তার ছেলে কপালিয়া বাজারের ওই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যান।
তিনি বলেন, " বরফ কলের কারখানার পাশে ঘটনাটা ঘটেছে। তাকে ফোন করে ডেকে নিয়ে গেছে।"
কে নিহত মি. বৈরাগীকে ডেকে নিয়ে গেছে, তারা কারা বা খুনের সাথে তারা জড়িত সন্দেহ করছেন কি না এমন প্রশ্নে সাবেক এই স্কুল শিক্ষক বলেন, " মনে হয়তো তাই। এখন....তারা তো চিনতে পারিনিতো তাদের। মানে স্পটেতো আমরা ছিলাম না, পরে সংবাদ পেয়ে আমি এখানে আসি।"
এদিকে, কারা এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত বা কী কারণ জানতে চাইলে মনিরামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মি. খান বলেন, ঘটনাটি তদন্তের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
ঘটনাটি নিয়ে 'হুট করে আগাম কথা' বলতে চাননি এই পুলিশ কর্মকর্তা।
তবে, মি. বৈরাগীর মাথায় তিনটি গুলি করে এবং গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে বলে জানান মনিরামপুর থানার ওসি মি. খান।
পোস্টমর্টেম বা ময়না তদন্তের জন্য নিহত ব্যক্তির মরদেহ এখনো যশোরের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে রয়েছে বলে জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।

ছবির উৎস, COLLECTED
কে এই রানা প্রতাপ বৈরাগী?
যশোরের কেশবপুর উপজেলার আরুয়া গ্রামের স্কুল শিক্ষক তুষার কান্তি বৈরাগীর ছেলে নিহত রানা প্রতাপ বৈরাগী।
এক ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে নিহত রানা বড় সন্তান ছিলেন।
মি. বৈরাগী পেশায় একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। মনিরামপুর উপজেলার কপালিয়া বাজারে তার একটি বরফ তৈরির কারখানা রয়েছে।
এই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি তার আড়ুয়া গ্রাম থেকে পাঁচ থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
নিহত ব্যক্তির বাবা তুষার কান্তি বৈরাগী বিবিসি বাংলাকে তার পেশার বিষয়ে বলেন, " ব্যবসা করেতো অনেক দিন থেকে। কপালিয়া বাজারের বরফ কল আর কাঁটাখালি বাজারে একটা মাছের আড়ত আছে একটা।"
কোনো ধরনের রাজনীতির সাথে তিনি জড়িত ছিলেন না বলেও দাবি করেন তার বাবা তুষার কান্তি বৈরাগী।
এদিকে, স্থানীয়রা জানান, নিহত মি. বৈরাগী একসময় চরমপন্থী দলের সাথে যুক্ত ছিলেন। পুরনো পত্রপত্রিকায় রানা প্রতাপের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নানা খবর প্রকাশিত হয়েছে।
পরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়ের পাশাপাশি নিহত ব্যক্তি মি. বৈরাগী লিটন দত্ত নামে আরেকজনের সাথে মিলে একটি দৈনিক পত্রিকা বের করেছিলেন বলেও দাবি তাদের।
নিহত ব্যক্তির পরিচয় সম্পর্কে মনোহরপুরের ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আক্তার ফারুক মিন্টুও জানান, কপালিয়া বাজারের বরফ কলটি ও কাঁটাখালি বাজারে একটি মৎস্য আড়তের মালিক তিনি।
বিবিসি বাংলাকে বলেন, " পাঁচ-ছয় বছর ধরে সে কপালিয়া বাজারের একটা বরফ কলের মালিক। আরেকটা মৎস্য আড়তের মালিক।"
তিনি বলেন, "জনশ্রুতিতে শুনি, জানি যে, একসময় আন্ডার ওয়ার্ল্ডের সাথে জড়িত ছিল নাকি''।
এলাকার স্থানীয় ব্যক্তিরাও এই বিষয়টি জানে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
রানা প্রতাপ বৈরাগী নড়াইল থেকে প্রকাশিত ' দৈনিক বিডি খবর ' নামে একটি পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন বলে জানা গেছে।
গুগলে দৈনিক বিডি খবর সার্চ দেওয়ার পর কোনো ওয়েবসাইট পাওয়া যায়নি, তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের একটি পাতা পাওয়া যায়। এতে ওই পত্রিকার যে ছবি রয়েছে তাতে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের সাথে রানা প্রতাপ বৈরাগীর নাম রয়েছে। সম্পাদকের স্থানে লিটন দত্ত নামে একজনের নাম রয়েছে।
এছাড়া বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়নের ওয়েবসাইটে নড়াইল জেলার দৈনিক বিডি খবর নামে পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে লিটন দত্তের নাম পাওয়া গেছে।
স্থানীয় সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, কয়েক বছর আগে নড়াইল থেকে রানা প্রতাপ বৈরাগী ও লিটন দত্ত মিলে পত্রিকাটি প্রকাশ করেছিলেন। শুরুতে নিয়মিত হলেও পরে মাঝে মাঝে পত্রিকাটি প্রকাশ করা হতো। তবে গত কিছুদিন ধরে পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ রয়েছে।
এদিকে, নিহত ব্যক্তি একটি পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক কি না এই পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পুলিশের কাছে জানতে চাইলে মনিরামপুর থানার ওসি জানান, এই পরিচয়ের বিষয়ে কিছু জানেন না।

ছবির উৎস, Getty Images
নিহত ব্যক্তির বিরুদ্ধে তিনটি মামলা ছিল
মনিরামপুর থানার ওসি মো. রজিউল্লাহ খান জানান, মনিরামপুর থানায় আগে কোনো মামলা না থাকলেও তার বিরুদ্ধে কেশবপুর ও অভয়নগর থানায় মামলা রয়েছে।
যশোরের কেশবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুখদেব রায় জানান, তার বিরুদ্ধে ওই থানায় একটি মামলা রয়েছে।
"আমার থানায় (কেশবপুর) তার বিরুদ্ধে শুধুমাত্র একটা মামলা আছে। এটা বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলা ছিল, ২০১৬ সালের সম্ভবত, এখন স্পেসিফিক বলতে পারবো না " বলেন মি. রায়।
" এটা তখনকার ঘটনাতো এখন আর এটা বলার স্কোপ নাই। এখনকার এই তথ্য পাইতে হলে কোর্টের থেকে পাওয়া যাবে। পুরো ডিটেইলস কোর্টে আছে " বলেন মি. রায়।
এদিকে, অভয়নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এস এম নুরুজ্জামানের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, তার থানায় হত্যা ও ধর্ষণের দুইটি মামলা রয়েছে।
২০১৪ সালে অভয়নগর থানায় নিহত রানা প্রতাপ বৈরাগীর বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছিল।
পরে ২০২০ সালে এই একই থানায় মি. বৈরাগীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগে আরেকটি মামলা করা হয়েছিলো বলে জানিয়েছেন অভয়নগর থানার ওসি।
মামলা দুইটির অভিযোগ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বলতে পারেননি মি. নুরুজ্জামান।
এই পুলিশ কর্মকর্তা জানান, তিনি সেসময় এই থানায় ছিলেন না।
বিবিসি বাংলাকে মি. নুরুজ্জামান বলেন, "এগুলার তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশীট অনেক আগেই পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আদালতে বিচারাধীন তবে কি অবস্থায় আছে বলতে পারছি না''।








