আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
গালি দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আইনে কী ধরনের বাধা আছে?
- Author, মরিয়ম সুলতানা
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
বাংলাদেশের একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের লাইভ অনুষ্ঠানে যখন একটি প্রতিবেদন প্রচার হচ্ছিল, তখন চলে আসে অনুষ্ঠানটির উপস্থাপিকার সঙ্গে আরেকজনের কথোপকথন। অনুষ্ঠানে হঠাৎ চলে আসা কথোপকথনে গালি দিতে শোনা যায় নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির দুই মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ ও সারজিস আলমের উদ্দেশে।
এই ঘটনায় উপস্থাপিকাসহ তিনজনকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে ওই চ্যানেল কর্তৃপক্ষ।
ঘটনাটির পক্ষে-বিপক্ষে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন চলছে নানা আলোচনা।
হাসনাত আব্দুল্লাহ নিজেও ফেসবুক একটি পোস্ট দিয়েছেন। তিনি গতকাল বৃহস্পতিবার দিবাগত মধ্যরাতে নিজের ভেরিফায়েড আইডি থেকে স্ট্যাটাস দিয়ে ওই টিভির সাংবাদিকদের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি লিখেছেন, "আমরা এই দ্বিমত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্যই আন্দোলন করেছিলাম। আপনার এই গালির স্বাধীনতার জন্যই আন্দোলন করেছিলাম।"
"শুধু মত প্রকাশ নয়, দ্বিমত প্রকাশও অব্যাহত থাকুক," যোগ করেন তিনি।
তবে গালি দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বিধি-বিধান আছে কি না, আইনে কোনো বাধা আছে কি না, এসব নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে চলছে নানা আলোচনা।
আইনে গালি দেওয়ার অধিকার কতটুকু
কাউকে 'গালি' দেওয়া যাবে কি যাবে না, বাংলাদেশের আইনে এ বিষয়ে আইনে সরাসরি কিছু বলা নেই। তবে "কেউ মানহানিকর শব্দ ব্যবহার করলে তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করা যায়" বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ।
কিন্তু কোন ধরনের বক্তব্য মানহানিকর, আইনে তা খুব সীমিতভাবে বলা আছে। এক্ষেত্রে "কোন শব্দটা মানহানির, তা সমাজের প্রথা হিসাবে ধরে নিতে হবে" বলে জানান তিনি।
"মানহানিকর বলতে এর আওতায় গালি দেওয়ার বিষয়কেও আনা যায়। আইনে গালি শব্দটা বলা নেই" বলেও উল্লেখ করেন ওই আইনজীবী।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসানও বিবিসি বাংলাকে বলেন, আইনে গালি দেওয়ার অধিকার নেই। বরং, কাউকে গালি দিয়ে অপমান করা আইনের চোখে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
মানহানির মামলাগুলো ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৪৯৯ ও ৫০০ ধারা অনুযায়ী পরিচালিত হয়।
দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারামতে, কোনও ব্যক্তি যদি অন্য কোনও ব্যক্তির খ্যাতি বা সুনাম নষ্ট করার জন্য উদ্দেশ্যমূলক শব্দাবলি বা চিহ্নাদি বা দৃশ্যমান প্রতীকের সাহায্যে নিন্দা প্রণয়ন বা প্রকাশ করে, তাহলে তাতে ওই ব্যক্তির মানহানি হয়েছে মর্মে গণ্য হবে। মৃত ব্যক্তিরও খ্যাতি বা সুনাম নষ্ট হয়, এমন কোনও বক্তব্য দিলেও এই ধারায় মানহানির মামলা হতে পারে।
দণ্ডবিধির ৫০০ ধারায় মানহানির ক্ষেত্রে দুই বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদে বিনা শ্রম কারাদণ্ড অথবা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার কথাও বলা আছে।
এছাড়া, অনলাইনে যদি মানহানিকর বক্তব্য দেয়, তার জন্যও আইনি বিধান আছে।
চলতি বছর পাস হওয়া 'সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৩'-এর ২৯ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনও ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনও ইলেকট্রনিক বিন্যাসে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারায় বর্ণিত মানহানিকর তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করেন, তাহলে তা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হিসাবে ধরা হবে এবং এ জন্য তিনি অনধিক ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
এ আইনে মানহানির মামলায় কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়নি।
গালি দেওয়া কি মত প্রকাশের স্বাধীনতা?
গালি দেওয়া মত প্রকাশের স্বাধীনতার আওতায় পড়ে কিনা – জানতে চাইলে একাধিক আইনজীবী বিবিসি বাংলাকে বলেন, গালি দেওয়াকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বলা যায় না। কারণ গালি কোন স্বাভাবিক কথোপকথন না। মতপ্রকাশ মানে কোনও বিষয়ের ওপর মতামত প্রকাশ করা।
"গালি সাধারণত একজনকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়। গালি কোনও মত নয়। গালি হলো এমন শব্দ, যা দিয়ে আরেকজনকে আহত করা হয়," বলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসানও বলেন, "কাউকে অপমান করা, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা বা মানহানিকর বক্তব্য দেওয়া কখনোই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মাঝে পড়ে না।"
তবে রাজনীতিবিদেরকে গালি দেওয়ার হিসাবটা আলাদা, বলেন আইনজীবী মনজিল মোরসেদ।
তার মতে, বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীতে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে গালিকে কখনও কখনও মত প্রকাশের স্বাধীনতা হিসাবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্বব্যাপী এটি প্রথা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
অর্থাৎ, রাজনীতি ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে গালিকে মত প্রকাশ হিসাবে বিবেচনা করা হবে না।
"বিশ্বব্যাপী রাজনীতিতে এটা চলছে। এগুলোকে যদি বলা হয় যে মানহানির মাঝে পড়বে, তাহলে তো রাজনীতি নিয়ে কথাই বলা যাবে না। রাজনীতির সব কথা মানহানি হিসাবে নিলে সবাই-ই তো আসামী হয়ে যাবে, তখন মত প্রকাশ আর থাকে না।" বলেন মি. মোরসেদ।
তবে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় কাউকে রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে যদি বলা হয় যে তিনি ডাকাত কিংবা চোর, এবং সে যদি মনে করে যে মানহানি হয়েছে, তাহলে তিনি মামলা করতে পারেন।
"কেউ বললো, ছাগল। এটা মানহানিকর হবে, আইনে কোথাও ব্যাখ্যা নাই। কিন্ত আপনি ফিল করতে পারবেন যে মানহানি হয়েছে," ব্যাখ্যা করেন মি. মোরসেদ।
এছাড়া, কেউ যদি আড়ালে থেকে কাউকে গালি দেয়, তখন কী হবে?
"তখন মামলা হবে না। মামলা হতে হলে প্রমাণ লাগবে। আর যদি মানহানিকর মন্তব্যের প্রমাণ থাকে, তাহলে তিনি মামলা করতে পারেন" বলে জানান আইনজীবী মনজিল মরসেদ।
এক্ষেত্রে আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, কেউ কোনো অপরাধ করলে তাহলে তার বিরুদ্ধে সত্য প্রকাশ করা যাবে। কিন্তু কাউকে অপমান করা বা গালি দেওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
"রাজনীতিবিদদের সমালোচনা হতে পারে। তাদের অপরাধের বিষয়ে বলাটা আর তাদের বাবা-মা তুলে গালি দেওয়াটা কোনোভাবেই শোভনীয় না। এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ," বলেন মিজ হাসান।
তার মতে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কখনোই কাউকে আঘাত করে হতে পারে না। জনগণের সমালোচনা করার অধিকার আছে। কিন্তু কোনোকিছুই একটি "বর্ডারকে ক্রস করে নয়।"
এক্ষেত্রে হাসনাত আব্দুল্লাহ নিজেও তার পোস্টের মন্তব্যে সমালোচনার কথাই লেখেন।
তিনি লিখেছেন, "রাজনীতিবিদদের যাতে স্বাধীনভাবে সমালোচনা করা যায়, সেই অধিকারের জন্যই আমরা আন্দোলন করেছি। আমাদের এই লড়াই একটা স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার লড়াই, যেখানে যে কোনো মানুষ রাজনীতিবিদদের উচিত বা অনুচিত সমালোচনা করতে পারবে।"
"তবে প্রত্যাশা থাকবে সেটি হবে গঠনমূলক উপায়ে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় আমরা বদ্ধপরিকর, সেই মত আমার বিরুদ্ধে হলেও," যোগ করেন হাসনাত আব্দুল্লাহ।
উল্লেখ্য, আইনে কোনগুলো মানহানি বলে গণ্য হবে না, দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারায় তা বলা আছে।
জনগণের কল্যাণে কারও প্রতি সত্য দোষারোপ করলে, সরকারি কর্মচারীর সরকারি আচরণ সম্পর্কে সৎ বিশ্বাসে অভিমত প্রকাশ করলে, সরকারি বিষয়-সংশ্লিষ্ট প্রশ্নে কোনও ব্যক্তির আচরণ নিয়ে মতপ্রকাশ করলে, যেকোনও জনসমস্যা সম্পর্কে ও কোনো ব্যক্তির আচরণ সম্পর্কে সৎ বিশ্বাসে অভিমত প্রকাশ করলে, জনকল্যাণের স্বার্থে সতর্ক করার উদ্দেশ্যে কারও সম্পর্কে কিছু বললে কিংবা সৎ বিশ্বাসে কর্তৃত্বসম্পন্ন ব্যক্তির কাছে কারও সম্পর্কে অভিযোগ করার মতো বিষয় হলে তা আইনের চোখে মানহানিকর বলে গণ্য হবে না।
আইনজীবীরা বলছেন, আইনে বারবার ভালো উদ্দেশ্যে অভিমত প্রকাশের কথা বলা হচ্ছে।