রাজশাহীতে গভীর গর্ত থেকে উদ্ধারের পর দুই বছরের শিশুটিকে মৃত ঘোষণা

শিশুটিকে উদ্ধারের জন্য গর্তের চারপাশ থেকে এক্সকাভেটর দিয়ে মাটি খনন করা হচ্ছে। সেখানে উৎসুক জনতার ভিড়।

ছবির উৎস, Sayeed Sazu

ছবির ক্যাপশান, শিশুটিকে উদ্ধারের জন্য গর্তের চারপাশ থেকে এক্সকাভেটর দিয়ে মাটি খনন করা হচ্ছে

রাজশাহীর তানোরে গভীর নলকূপের জন্য খনন করা গর্তে পড়ে যাওয়া দুই বছর বয়সী শিশুটিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানোর পর তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছে। তানোর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. বার্নাবাস হাসদাক বিবিসি বাংলাকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

এর আগে তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাঈমা খান শিশুটিকে উদ্ধার করার খবর বিবিসি বাংলাকে নিশ্চিত করেন। শিশুটিকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয় বলে তখন জানান তিনি।

প্রায় ৩২ ঘণ্টা পর অচেতন অবস্থায় শিশুটিকে উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস এবং তার অবস্থা জানতে তাৎক্ষণিকভাবে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর মৃত ঘোষণা করে।

বৃহস্পতিবার রাত ৯টা ৭ মিনিটের দিকে শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারের বিষয়টি সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেন ফায়ার সার্ভিসের অপারেশন ডিরেক্টর লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি জানান, শিশুটিকে ৬০ ফুট নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

এদিকে তানোর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. বার্নাবাস হাসদাক মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, শিশু সাজিদকে হাসপাতালে ৯টা ২০ মিনিটের দিকে নিয়ে আসা হয়, রাত ৯টা ৪০ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছে।

এর আগে, শিশুটির স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসের (ভেন্টিলেশন) জন্য যে পাইপটি গর্তের ভেতরে ঢুকানো হয়েছিল সেটি সরিয়ে ফেলার তথ্য বিবিসি বাংলাকে জানান তানোর ফায়ার সার্ভিসের কর্মী মেহেদী হাসান।

আজ বিকেল পৌনে চারটার দিকে তিনি জানিয়েছিলেন, গতকাল বুধবার বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত শিশুটির আওয়াজ পেয়েছিল ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। বিকেলের পরে সারারাত তার আর কোনো আওয়াজ পাওয়া যায়নি।

তবে গতকাল সারারাত এবং সকালেও ভেন্টিলেশন পাইপ চালু ছিল এবং বৃহস্পতিবার সকালের পর সেটি বন্ধ করা হয় বলে জানান মি. হাসান।

গর্তের ভেতরে যাতে মাটি ঝরে না পড়ে সে কারণে মাটি খোঁড়া কিছু সময় বন্ধ ছিল বলেও জানান তিনি।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, "৩৫ ফিটের মতো খুঁড়ে নিচে কাজ করা যাচ্ছিলো না, মাটি ভেঙে ভেঙে পড়ছিলো। যার কারণে উপরে যে জায়গাটা ভেঙে পড়ার মতো আশঙ্কা করা হচ্ছে, ওই অংশটা ১০ ফিটের মতো। এটা ছেড়ে ওপরে বাম সাইডের দিকে খুঁড়ছে।"

গতকাল শিশুটি গর্তে পড়ার পর তিনিসহ ফায়ার সার্ভিসের একটি টিম ঘটনাস্থলে যান। সেখানে যাওয়ার পর যখন গর্তের গভীরতা মাপেন, তখন তা ৩৩ ফিট পেয়েছিলেন বলে জানান মি. হাসান।

এদিকে সকালে পুলিশ এবং স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস জানায়, গতকাল বুধবার দুপুর একটার দিকে তানোর উপজেলার কোয়েল হাট পূর্বপাড়া গ্রামে আগেই খনন করা একটি গর্তে পড়ে যায় শিশু সাজিদ।

তানোর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শাহীনুজ্জামান বিবিসি বাংলাকে বলেন, ফায়ার সার্ভিসের আটটি ইউনিট কাজ শুরু করে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ৫০ জন পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

ঘটনাস্থলে মূল গর্তের পাশ থেকে মাটি কেটে পথ তৈরি করে শিশুটিকে উদ্ধারের চেষ্টা চালান ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য সংবাদ
যে গর্তে শিশু পড়েছে বলে জানা যাচ্ছে সেখানকার ছবি। পাশে মাটি খনন করা হচ্ছে।

ছবির উৎস, Sayeed Sazu

ছবির ক্যাপশান, যে গর্তে শিশু পড়েছে বলে জানা যাচ্ছে সেখানকার ছবি

'যে গর্তে পড়েছে সেটি অনেক সরু'

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

বুধবার দুপুরে কোয়েল হাট পূর্বপাড়া গ্রামের মো. রাকিবের ছেলে শিশু সাজিদ, মায়ের সাথে হেঁটে ওই স্থান দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ গর্তে পড়ে যায় বলে জানা যায়।

শিশুটির মা রুনা খাতুন ঘটনা সম্পর্কে সাংবাদিকদের বলেছেন, দুই ছেলেকে কোলে নিয়ে তিনি সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন,এক পর্যায়ে একজনকে কোল থেকে নামিয়ে দিয়েছিলেন।

যে শিশুটিকে মা কোল থেকে নামিয়ে দিয়েছিলেন সেই শিশুটিই গর্তে পড়ে গিয়েছে।

"দুই ছাওয়াল দুই গালেত (কোলে) নিছি, পরে একটা নামায়া দিছি.. ওকেই নামায়া দিছি। দিয়া আমি সামনে গেছি আমার পোলাডা পিছে পিছে যাচ্ছিলো, যাতে লাইগা পিছলায়া পইড়া গেছে। আমি পিছে ঘুরে তাকায় দেখি ছাওয়াল আমার মা মা কইরা ডাকছে, পিছে ঘুইরা তাকায়া দেখি ছাওয়াল নাই। গর্তের থিকা মা মা কৈরা ডাকছে" বলছিলেন রুনা খাতুন।

গতকালই উদ্ধার কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথমে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট কাজ শুরু করলেও পরে সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শাহীনুজ্জামান বিবিসিকে বলেছেন, শিশুটি যে গর্তে পড়েছে সেটি অনেক সরু।

"গতর্টা অনেক সরু। ছয় থেকে আট ইঞ্চি ব্যাসার্ধের গর্ত। (শিশুটি) ৩০ থেকে ৩৫ ফুট নিচে পড়েছে ধারণা করা হচ্ছে। ফায়ার সার্ভিসের ক্যামেরা ওইটুক পর্যন্ত গিয়েছে" বলেন তিনি।

তবে, ক্যামেরায় শিশুটিকে দেখা যায়নি বলে জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।

শিশুটি যে গর্তে পড়েছে তার চারদিকে তিনটি এক্সকাভেটর (মাটি খননকারী যন্ত্র) দিয়ে মাটি খনন করে উদ্ধার কার্যক্রম চালাচ্ছিলেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।

"সময় লাগবে আরো, মাটি নিচে নরম। ঝুরঝুর করে পড়ে যাওয়ার শঙ্কা, তাই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে কাজ করছে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা" বলেন মি. শাহীজ্জামান।

এদিকে, বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে আটটা পর্যন্ত মূল গর্তের পাশে ৩৫ ফিট গভীরে গিয়ে মাটি কেটেও শিশুটিকে না পাওয়ায় আরো অতিরিক্ত পাঁচ ফিট পর্যন্ত মাটি খনন করার সিদ্ধান্ত নেয় ফায়ার সার্ভিস।

স্থানীয় সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, এখন ৪০ ফুটের বেশি গভীর পর্যন্ত মাটি খনন করার কাজ করছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।

বুধবার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে ফায়ার সার্ভিস ছোট এক্সকাভেটর দিয়ে খনন কাজ শুরু করে। পরে রাতে ১০টার দিকে রাজশাহী সিটি করপোরেশন থেকে পাঠানো বড় এক্সকাভেটর দিয়ে খনন শুরু হয়।

রাতভর মাটি খনন কাজ চলে।

এক্সকাভেটোর দিয়ে মূল গর্তের চারপাশ থেকে মাটি খনন কাজ হচ্ছে। উৎসুক মানুষ তা দেখছে।

ছবির উৎস, Sayeed Sazu

ছবির ক্যাপশান, শিশুটিকে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়াসে অক্সিজেন সরবরাহ করা হচ্ছে বলে জানান মি. হোসেন।

অক্সিজেন সরবরাহ করা হয় গর্তে

স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গতকাল দুপুরে ঘটনার খবর পান তারা।

সেখানে পৌঁছানোর আগে স্থানীয় মানুষ প্রাথমিকভাবে চেষ্টা করায় বেশ কিছু মাটি গর্তের ভেতরে পড়ে গিয়েছিলো।

তানোর ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মী বেলাল হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলেন, "৩৫ ফিট পর্যন্ত তারের মাধ্যমে সার্ভেইলেন্স ক্যামেরা নিয়ে গেছে, সেখানে শিশুটিকে পাওয়া যায় নাই। পরে আরো অতিরিক্ত পাঁচ ফিট খনন করা হয়েছে। ৪০ ফিট পর্যন্ত যাওয়ার পরও বাচ্চার কোনো হদিস পাওয়া যায় নাই।"

তবে, শিশুটিকে বাঁচিয়ে রাখতে অক্সিজেন সরবরাহ করা হচ্ছিলো বলেও জানান মি. হোসেন।

নলকূপের গর্ত খোঁড়ার নিষেধাজ্ঞা

স্থানীয় সাংবাদিকরা জানান, তানোরের পাঁচন্দর ইউনিয়ন উচ্চ খরাপ্রবণ এলাকা। সেখানে মাটির ১২০ থেকে ১৩০ ফুট গভীরেও ভূ-গর্ভস্থ পানির সন্ধান মেলে না।

তবে, এই এলাকায় গভীর নলকূপ বসানো যাবে না বলে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

যেখানে শিশুটি পড়ে গিয়েছিলো সেই জমির মালিক একটি গভীর নলকূপ বসানাের জন্য বছর খানেক আগে আট ফুট ব্যাসার্ধের একটি কূপ খনন করিয়েছিলেন।

কিন্তু পানি না পেয়ে গভীর নলকূপ বসানোর কাজটি আর এগোয়নি, অর্থাৎ খনন কাজে ফল মেলেনি, কিন্তু গর্তটি পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিলো।

এবার বর্ষায় মাটি দেবে গিয়ে সেখানে নতুন করে গর্ত সৃষ্টি হয়।

আর সে গর্তেই শিশুটি পড়ে যায় বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন।