ক্যালিফোর্নিয়ায় বর্ণবৈষম্য-বিরোধী খসড়া আইন নিয়ে বিভক্ত হিন্দু সমাজ

ছবির উৎস, RENU SINGH
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে বর্ণবৈষম্যকে বেআইনি ঘোষণা করার লক্ষ্যে একটি খসড়া আইন এ সপ্তাহে ঐ রাজ্যের স্টেট অ্যাসেম্বলি বা রাজ্য বিধানসভায় তোলা হচ্ছে।
সুখজিন্দর কৌর (পরিচয় গোপন রাখার স্বার্থে নামটি বদলে দেয়া হয়েছে) ক্যালিফোর্নিয়ার একটি হাসপাতালে নার্স হিসেবে কাজ করছেন। রোগীদের সেবায় তাকে দীর্ঘ এবং ক্লান্তিকর শিফটে কাজ করতে হয়। কিন্তু যখনই কাজে বিরতি হয় সেই সময়টা তার জন্য খুবই দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
তিনি একজন দলিত। ভারতের গভীর বৈষম্যমূলক বর্ণ-ভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসের একেবারে নিচের দিকে যেসব সম্প্রদায় রয়েছে তিনি তাদের একজন। তিনি জানাচ্ছেন, নিম্ন বর্ণের জন্য তাকে প্রায়ই তার উচ্চ বর্ণের সহকর্মীদের কাছ থেকে নানা ধরনের অবমাননার মুখোমুখি হতে হয়।
"উচ্চ বর্ণের নার্সরা চামারদের নোংরা বলে গালি দেয় এবং তারা বলে তার সংস্পর্শে এলে তারা দূষিত হবে," বলছিলেন মিসেস কৌর।
এই ঘটনা শুধু ক্যালিফোর্নিয়াতেই ঘটছে না, অন্যান্য জায়গাতেও যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী এবং নিম্ন বর্ণের হিন্দুরা নানা রকম নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন।

ছবির উৎস, PREM PARIYAR
প্রেম পারিয়ার একজন শিক্ষক। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন নেপাল থেকে।
তিনি জানালেন, নেপালে উচ্চ বর্ণের মানুষের নৃশংসতার প্রতিবাদ জানানোর পরিণামে তার পরিবার নির্মম আক্রমণের শিকার হয়। পরে ২০১৫ সালে তারা নেপাল থেকে পালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যায়।
কিন্তু জাতপাতের বৈষম্য যুক্তরাষ্ট্রেও তার পিছু ছাড়েনি। তিনি বললেন, একবার ক্যালিফোর্নিয়ার সান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়াতে এক বন্ধুর বাড়িতে তাকে দুপুরের খাবারের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
"সেখানে যাবো কি না তা নিয়ে আমি দ্বিধায় ছিলাম। কারণ আমাকে কোথায় বসতে দেয়া হবে, কোথায় খাওয়া দেয়া হবে সেটি নির্ধারিত হবে আমার বর্ণের ভিত্তিতে। কিন্তু আমি ভেবেছিলাম, এখানকার মানুষ শিক্ষিত, এটি এমন এক দেশ যেখানে মানবাধিকারকে মূল্য দেয়া হয়। এখানে পরিস্থিতি নিশ্চয়ই ভিন্ন হবে," বলছিলেন মি. পারিয়ার।
কিন্তু তিনি যখন নিজের জন্য খাবার নিতে গেলেন, তখন তাকে বলা হয়েছিল কোন কিছু স্পর্শ না করতে। এর বদলে অন্য একজন তার প্লেটে খাবার তুলে দিয়েছিল।

ছবির উৎস, PREM PARIYAR
End of বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর:
মি. পারিয়ার বলছেন, তার বন্ধুর বাড়ির ঐ ঘটনা নেপালে তার শৈশবকালের আরেকটি ঘটনার কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল: তিনি ছোট জাতের মানুষ জেনে তার একজন শিক্ষক তারই দেয়া জল মুখ থেকে থু থু করে ফেলে দিয়েছিল।
দলিত অধিকার কর্মীরা বলছেন, বর্ণভেদে নিপীড়িত অভিবাসীরা ক্যালিফোর্নিয়ায় আবাসন, শিক্ষাগত, পেশাগত এবং সামাজিক বৈষম্যের সম্মুখীন হচ্ছেন।
আন্দোলনের সূচনা যেভাবে
গত মার্চ মাসে ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট অ্যাসেম্বলিতে ডেমোক্রেটিক পার্টির একজন সেনেটর আয়েশা ওয়াহাব ‘এসবি-৪০৩’ শিরোনামে একটি খসড়া আইনের প্রস্তাব দিয়েছেন। এই আইনে লিঙ্গ, জাতি, ধর্ম এবং প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি ঐ রাজ্যের বৈষম্য-বিরোধী আইনে বর্ণভিত্তিক বৈষম্য থেকে সুরক্ষা দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিলটি গত মে মাসে রাজ্যের সেনেটে ৩৪-১ ভোটে পাস হয়। যদি এটি রাজ্য বিধানসভার ভোটেও পাস হয়, তাহলে ক্যালিফোর্নিয়াই হবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কোন অঙ্গরাজ্য যেটি বর্ণভিত্তিক বৈষম্য নিষিদ্ধ করবে।
তবে সিয়াটল হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম শহর যেটি গত ফেব্রুয়ারি মাসেই বর্ণভিত্তিক বৈষম্যকে নিষিদ্ধ করে আইন তৈরি করেছে।
একই রকম আইন তৈরির দাবিতে ক্যালিফোর্নিয়াতেও এখন আন্দোলন দানা বাঁধছে।

ছবির উৎস, Getty Images
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছে ইকুয়ালিটি ল্যাব নামে একটি প্রতিষ্ঠান। ৪০টিরও বেশি আমেরিকান এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কর্মী ও সংগঠনের একটি জোট যারা বহুমত, আন্ত:বর্ণ সম্পর্ক এবং বহু-জাতিসত্তায় বিশ্বাস করে।
ক্যালিফোর্নিয়ায় বড়ো মাপের দক্ষিণ এশীয় অভিবাসী রয়েছেন এবং রাজ্যটি বিশ্বের বড় বড় কয়েকটি প্রযুক্তি কোম্পানির প্রধান কেন্দ্র।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় পাঁচ লক্ষ শিখ অভিবাসীর অর্ধেকেরও বেশি বাস করেন এই রাজ্যে এবং ক্যালিফোর্নিয়ার গুরুদুয়ারা বা শিখ মন্দিরগুলিও বর্ণভিত্তিক বৈষম্যকে বেআইনি ঘোষণার পক্ষে আন্দোলনে সামিল হয়েছে।
এই সম্প্রদায়ের দুটি বৃহত্তম অ্যাডভোকেসি গ্রুপ - শিখ কোয়ালিশন এবং শিখ আমেরিকান লিগ্যাল ডিফেন্স অ্যান্ড এডুকেশন ফান্ড - সেনেটর আয়েশা ওয়াহাবের আনা ‘এসবি-৪০৩’ খসড়া আইনটিকে সমর্থন করছে।
শিখরা জানাচ্ছেন রবিদাস, প্রায় ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার সদস্য নিয়ে যেটি রাজ্যের বৃহত্তম দলিত সম্প্রদায়, তারাই ক্যালিফোর্নিয়ার তৃণমূল পর্যায়ে ঐ বিলের পক্ষে জনমত গড়ে তুলছে।
রেনু সিং নিজে একজন রবিদাস এবং একজন নারী অধিকার কর্মী। বর্ণপ্রথার কারণে ক্যালিফোর্নিয়ার নিম্নবর্ণের নারীরা যেসব বৈষম্যের শিকার হয়েছেন সেই অভিজ্ঞতা তিনি সবাইকে জানাতে বলছেন। তাদের চারপাশে তারা যা দেখছেন সে সম্পর্কে কথা বলার জন্যও তিনি অনুরোধ করছেন, যাতে রাজ্যের আইন প্রণেতারা বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে পারেন।

ছবির উৎস, PREM PARIYAR
আমেরিকায় নিম্ন বর্ণের হিন্দুদের কী হাল
ইকুয়ালিটি ল্যাবের এক সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, আমেরিকায় প্রবাসী নিম্ন বর্ণের হিন্দুদের প্রতি চার জনের মধ্যে একজন শারীরিক এবং মৌখিক বর্ণ সহিংসতার শিকার হয়েছেন; প্রতি তিনজনের মধ্যে একজন শিক্ষায় বৈষম্যের সম্মুখীন হয়েছেন এবং প্রতি তিনজনের মধ্যে দু’জনের কাজের ক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিজ্ঞতা হয়েছে।
এই সমীক্ষাটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রে হিন্দুদের নানা বর্ণের সদস্যদের বিস্তার আর এর প্রভাব সম্পর্কে প্রথম গভীর অনুসন্ধান, এবং এতে উত্তরদাতার সংখ্যা ছিল ১,৫০০ জন।
দু’হাজার আঠারো সালে প্রকাশিত ঐ সমীক্ষার ফলাফল থেকে জানা যায় যে ‘নিম্ন বর্ণের’ লোকেরা প্রতিশোধকে ভয় পান এবং ‘সমাজচ্যুত’ হওয়ার বিষয়ে উদ্বিগ্ন এবং তাই তারা "তাদের জাতের তথ্য লুকিয়ে রাখেন।”
তবে, ভারতীয় প্রবাসীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বর্ণ বৈষম্যের এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করছেন।

ছবির উৎস, Getty Images
কেন এই বিরোধিতা
সান ফ্রান্সিসকো-ভিত্তিক দলিত অধিকার কর্মী দীপক অলড্রিন এই বিলের পক্ষে নন। "আমি এখানে ৩৫ বছর ধরে বসবাস করছি। কোন হিন্দু আমাকে কখনো জিজ্ঞেস করেনি আমি কোন জাতের," বলছিলেন তিনি।
অনেক ভারতীয়-আমেরিকান ব্যক্তি এবং ধর্মীয় ও পেশাদার গোষ্ঠীও এই আইনের তীব্র বিরোধিতা করছেন। তারা যুক্তি দিচ্ছেন যে এই খসড়া আইনে যদিও কোন বিশেষ ধর্মের নাম উল্লেখ করা হয়নি, তবুও এটি "হিন্দুদের প্রতি এবং তাদের উপাসনালয়ের প্রতি বৈষম্য সৃষ্টি করবে। এমনকি চাকরিবাকরির ক্ষেত্রেও তাদের যোগ্যতা কমে যাবে।“
তারা বলছেন, ক্যালিফোর্নিয়ায় এখন যেসব আইন রয়েছে তা যে কোনও রকম বৈষম্য মোকাবেলার জন্য যথেষ্ট। আইনটি যাতে দিনের আলো না দেখে সেজন্য তারা এখন তাদের সম্প্রদায়কে সংগঠিত করছে।
হিন্দুপ্যাক্ট হচ্ছে আমেরিকান হিন্দুদের একটি তৃণমূল সংগঠন। এর অধীনে রয়েছে অনেক ধরনের ব্যবসা এবং অনেকগুলো হিন্দু মন্দির। তারা বিলটি প্রত্যাখ্যান করার জন্য ক্যালিফোর্নিয়ার স্টেট সেনেটরদের কাছে আবেদন করেছে।
এই সংস্থার আহ্বায়ক অজয় শাহ বলছেন, আইনটি "গভীরভাবে ত্রুটিপূর্ণ, অসৎ উদ্দেশ্যপূর্ণ এবং ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে আসা শিশু ও যুবকদের, এবং যারা হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী তাদের টার্গেট করে আইনটি তৈরি করা হয়েছে।"
হিন্দু আমেরিকান ফাউন্ডেশনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং নির্বাহী পরিচালক সুহাগ শুক্লা বলছেন, এই বিলটির কারণে ইতোমধ্যেই হিন্দুদের জাতপাত সম্পর্কে একটি ‘অবাঞ্ছিত সচেতনতা’ তৈরি হয়েছে৷
তিনি বলেছেন যে তিনি "কর্মীদের অনুপযুক্ত প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার কথা শুনেছেন। বিশেষ করে প্রযুক্তি খাতে দক্ষিণ এশীয় নয় এমন কর্মদাতারা তাদের জাতপাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।"
যদি এটি একটি প্যাটার্নে পরিণত হয় তাহলে তা শেষ পর্যন্ত একটি জাতি-ভিত্তিক হয়রানির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা করেন।
"জাতপাতের অসাংবিধানিক সংজ্ঞা" দেয়ার জন্য হিন্দু আমেরিকান ফাউন্ডেশন মার্কিন ফেডারেল আদালতে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে।

ছবির উৎস, RENU SINGH
মার্কিন বৈষম্যবিরোধী নীতিমালায় বর্ণ সংযোজনকে তারা চ্যালেঞ্জ করেছে এই বলে যে, এর ফলে "জাতিগত প্রোফাইলিং এবং অধিকতর পুলিশি নজরদারির জন্য একটি বিশেষ সম্প্রদায়কে এককভাবে চিহ্নিত করা হবে।“
যারা এই বিলের বিরোধিতা করছেন তারা বলছেন, রাষ্ট্র কীভাবে কোন নাগরিকের জাতপাত চিহ্নিত করার পরিকল্পনা করছে তা নিয়ে তারাও বিভ্রান্ত, কারণ এটি একটি অত্যন্ত জটিল বিষয়।
তবে সেনেটর ওয়াহাব ব্যাখ্যা করেছেন, অন্যান্য সংরক্ষিত বিষয়ের মতো এই আইনে বর্ণ সনাক্তকরণের বিবরণ অন্তর্ভুক্ত নেই।
"বর্ণ কীভাবে নির্ধারণ করা হবে তার কোন বিষয় এতে নেই। এটি কেবল একটি বৈষম্য-বিরোধী আইন। যখন কেউ আদালতে বিষয়টি নিয়ে যাবে তখন এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের ডেকে আনার প্রয়োজন হবে। তারাই তদন্ত করে ঠিক করবেন বৈষম্যের ধরনটি কেমন ছিল।"
মিসেস ওয়াহাব জানান, বিলটি প্রস্তাব করার পর থেকে তিনি "হত্যার হুমকি" পেয়েছেন।
তাকে সেনেটরের পদ থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্য এখন প্রচারণা চালানো হচ্ছে এবং তিনি সম্ভাব্য পুনঃনির্বাচনের মুখোমুখি হচ্ছেন।
তিনি বলছেন, এই খসড়া আইনের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াটি ‘তীব্র’ ও ‘নৈরাশ্যকর’ এবং বিলটি পড়ে দেখার জন্য তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
"আপনি উচ্চ বর্ণের কিংবা নিম্ন বর্ণের হোন না কেন, তাতে কিছু যায় আসে না। আইনটি আপনাকেও রক্ষা করবে," বলছেন তিনি।








