বাজেটে মূল্যস্ফীতির চ্যালেঞ্জ, মোকাবেলায় ‘পানিতে আগুনের ছিটা’ তত্ত্ব

- Author, তাফসীর বাবু
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
ঢাকার মালিবাগে একটি কাঁচাবাজার। সেখানেই মাছের দোকানির সঙ্গে বেশ চড়া গলায় দরদাম করছেন মালিবাগের বাসিন্দা রাবেয়া জামিল।
বাজেটের মধ্যেই রাখতে হবে খরচ, কেনাকাটায় তাই এই বাড়তি দরকষাকষি। দরদামের এক পর্যায়ে দাম নিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতা একমত হলেন, কেনা হল মাছ।
রাবেয়া জামিলের কাছে প্রশ্ন ছিল সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাজারে দ্রব্যমূল্য কেমন দেখছেন?
তার ছোট্ট উত্তর, “সবকিছুর দাম বাড়ছে। কোন কিছুর দাম একবার বাড়লে আর কমছে না।”
তিনি জানাচ্ছেন, এখন আয়ের সঙ্গে ব্যয় মেলানো যাচ্ছে না।
“আগে এক হাজার টাকা বাজারে আনলে ব্যাগভর্তি বাজার করা যেতো। এখন সেটা সম্ভব না। একই বাজারের জন্য অনেক টাকা লাগছে। কিন্তু টাকায় আয় বাড়েনি।”
বাংলাদেশে যখন আরেকটি বাজেটের সময় ঘনিয়ে এসেছে, তখন আয়-ব্যয়ের সমীকরণ মেলাতে এমন হিমশিম অবস্থাই দেখা যাচ্ছে সাধারণ মানুষের।
তারা জীবন-ধারণে স্বস্তি ফেরানোর উপায় খুঁজছেন।
কিন্তু এই যখন অবস্থা তখন সরকার তার বাজেটে কোন বিষয়ে গুরুত্ব দিতে যাচ্ছে?
আর তাদের সামনে অর্থনীতির চ্যালেঞ্জগুলোই বা কী?
দ্রব্যমূল্যে স্বস্তি চায় মানুষ
মালিবাগ বাজারেই আরও কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়। তাদের সকলেই বলছেন, জীবন চালাতে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে দ্রব্যমূল্য নিয়ে।
বাজারের একজন সবজি বিক্রেতা বললেন, দাম বৃদ্ধির কারণে বেচা-বিক্রি কম হচ্ছে। ফলে লাভও কম।
“আমাদের অবস্থা আরও খারাপ। কারণ ব্যবসার অবস্থা খারাপ। আয় কমে গেছে। ঋণ করে দোকানে মাল ওঠাতে হয়। কিন্তু সেই টাকা শোধ করতে পারি না।”
সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে দেখলে অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি আর আয় না বাড়ার কথাই সমস্যা হিসেবে উঠে আসছে।
কিন্তু সরকারের কাছে আসলে এখন অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ কোনগুলো?

মূল্যস্ফীতি, রিজার্ভ আর রাজস্ব খাতে নজর সরকারের
সম্প্রতি বাজেট নিয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন। সেখানেই অর্থমন্ত্রীর বরাতে গণমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে সরকার এখন অর্থনীতিতে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ নিরসন করতে চায়।
এর প্রথমেই আছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ রাখা। কারণ এটা সরাসরি জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না থাকলে জনজীবনে প্রভাব পড়ে।
দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নয়ন।
আর তৃতীয় চ্যালেঞ্জ হিসেবে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, রাজস্ব আয় বাড়ানোর কথা।
তবে মন্ত্রী মোটা দাগে এটাই বলেছেন যে, বাজেটের মূল উদ্দেশ্য থাকবে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেয়া।
মূল্যস্ফীতি কমানো সম্ভব?
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
মূল্যস্ফীতি কমানো এখনই সরকারের পক্ষে সম্ভব নয় বলেই মনে করেন অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।
তার মতে, সরকার এখন ব্যয় কমানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু বাজেটের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতিকে কমিয়ে আনবে এটা খুব কমই হয়।
“মূল্যস্ফীতিকে হঠাৎ বেশি নামিয়ে আনতে গেলে অন্যান্য সূচকে এর প্রভাব পড়বে। সূতরাং এটা সম্ভব হবে না। সুতরাং এখানে যেটা করা জরুরি যে নিত্য প্রয়োজনীয় কিছু পণ্য যেমন চাল, ডাল, তেল এসব ক্ষেত্রে যদি আমরা সমর্থন বা সহায়তা দিতে পারি। ওএমএস বা এরকম কোন মাধ্যমে দরিদ্র মানুষ যেন এসব কিনতে পারে। সামজিক সুরক্ষার আওতা বাড়ানো। সেগুলো হয়তো মূল্যস্ফীতির সময়টায় মানুষকে সাহায্য করবে টিকে থাকতে।”
তার মতে, আপাতত: গুরুত্ব দেয়া উচিত দরিদ্র মানুষকে স্বস্তি দেয়ার উপর।
বাংলাদেশে একইসঙ্গে রিজার্ভ কমে যাওয়া এবং সরকারের রাজস্ব আয় কাঙ্খিত মাত্রায় না থাকাও একটা বড় সমস্যা। কারণ উন্নয়ন, ভর্তুকিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বরাদ্দ দেয়ার জন্য নির্ভর করতে হচ্ছে মূলত: ঋণের উপর। বাংলাদেশের বিদেশি ঋণ এখন ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
সরকারের যে আয় হয়, তার বড় অংশটাই ঋণ এবং ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়ে যাচ্ছে।
ফলে বাংলাদেশে বাজেটে রাজস্ব আয় বাড়ানোর একটা চাপ আছে। কিন্তু আয় কোথা থেকে আসবে?

অনেকেই মনে করছেন, সরকার হয়তো ভ্যাট-ট্যাক্সের আওতা বাড়িয়ে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করবে।
কিন্তু বাংলাদেশে রাজস্ব বিভাগের রাজস্ব সংগ্রহে দুর্বলতা বহু পুরনো।
দেশটিতে কর-জিডিপি’র অনুপাত ১০ শতাংশের নিচে।
ফলে সাধারণ নাগরিকদের উপর করের বোঝা চাপবে কি-না সেটা একটা বড় প্রশ্ন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলছেন, করের চাপ যেন সাধারণ মানুষের উপর না পরে সেটায় গুরুত্ব দিতে হবে।
“বাংলাদেশে সবাইকেই ট্যাক্স দিতে হয়। যে শাহবাগে বসে ভিক্ষে করছে, সেও যখন একটা পণ্য কেনে, তখন তাকে একটা পরোক্ষ ট্যাক্স দিতে হয়। বাংলাদেশে ট্যাক্সের তিন ভাগের দুই ভাগ হচ্ছে এই ধরনের ট্যাক্স। যেটা গরীবকে বেশি প্রভাবিত করে।”
“বাংলাদেশে যারা আয়ের দিক দিয়ে শীর্ষ দশ শতাংশে আছে, জিডিপি’র শতাংশে চার শতাংশ পরিমাণ ট্যাক্স তাদের কাছ থেকে কালেকশন করার কথা। কিন্তু আমরা পাচ্ছি দেড় থেকে দুই শতাংশ। তাহলে আমরা তো প্রত্যক্ষ কর সংগ্রহ করতে পারছি না। আমাদেরকে পরোক্ষ করের চাপ কমিয়ে প্রত্যক্ষ কর আহরণ বাড়াতে হবে,” বলছেন মি. হেলাল উদ্দিন।
মূল্যস্ফীতি মোকাবেলায় 'আগুনে পানির ছিটা'
এবারের বাজেটে কর পরিকল্পনা কী হবে সেটা অবশ্য বাজেটের আগে খোলাসা করেনি সরকার। মূল্যস্ফীতি কতটা কমবে সেটাও প্রশ্ন সাপেক্ষ।
যদিও সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে ইতোমধ্যেই বলা হচ্ছে, সাধারণ মানুষের উপর যেন চাপ না পড়ে সেটা মাথায় রেখেই তৈরি হচ্ছে বাজেট। এর জন্য সামাজিক সুরক্ষা খাতে বাড়বে বরাদ্দ।

জানতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি’র সভাপতি এম এ মান্নান বলেন, বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি ৯ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যেই আছে। এটা আরও কম ছিলো। সেখান থেকে বেড়েছে। কিন্তু এক লাফে বাড়েনি। বৃদ্ধিটা সহনীয়ভাবে হয়েছে।
“তবে আমাদের নিজেদের স্বার্থেই ইনফ্লেশন কমানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে এর সঙ্গে যারা নিম্ন আয়ের মানুষ, মূল্যস্ফীতি যাদেরকে বেশি আঘাত করে, তাদের জন্যও কিছু সুরক্ষা নিতে হবে। বাজেটে এবার এই সুরক্ষা আরও বাড়বে। যাতে গরীবের পকেটে আরও কিছু টাকা ঢোকে। এগুলো হলো পানিতে আগুণের ছিটা দেয়া, পরিস্থিতিকে সহনীয় রাখা,” বলেন এম এ মান্নান।
সরকারের সাবেক এই পরিকল্পনা মন্ত্রী অবশ্য বলছেন, বাজেট বাস্তবায়নে করের বোঝা নয় বরং ঋণের প্রবাহ ঠিক রাখাই হবে কৌশল।
তিনি বলেন, “আমাদের তো উন্নয়ন ঠিক রাখতে হলে আয় বাড়াতে হবে। হঠাৎ করে কর দিয়ে সেটা সম্ভব নয়।''
''আমরা এখানে ঋণ নেবো। আমাদের আরও ঋণ নেয়ার সক্ষমতা আছে। তবে এখানে শর্ত একটাই দেশে যেন ধারাবাহিকতা থাকে, স্থিতিশীলতা থাকে। কৃষিতে, খামারে, কারখানায় মানুষ যেন উৎপাদনে থাকতে পারে। তাহলে ঋণ নিয়ে ভয় নেই। এখানে দুর্নীতি রোধ এবং অর্থের ব্যবহার যেন ঠিকমতো হয়, সেটাও দেখতে হবে।”
বাজেটে অর্থসংস্থান কিংবা এর ব্যবহার নিয়ে সংকট নেই বলেই মনে করছে সরকার।
যদিও মূল্যস্ফীতি কমিয়ে জনজীবনে স্বস্তি আনা খুব একটা সহজ হবে না বলেই মত অর্থনীতি বিশ্লেষকের।
এখন সরকার সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি, দুর্নীতি কমানো, রাজস্ব আয়ে উন্নতি এবং আমদানি-রপ্তানি পরিস্থিতি কতটা অনুকূলে রাখতে পারে তার উপরই নির্ভর করছে অনেক কিছু।











