বিএনপির বয়কটে কেমন হতে যাচ্ছে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ?

- Author, আবুল কালাম আজাদ
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি সিটি করপোরেশনে এমন একটি সময়ে নির্বাচন হতে যাচ্ছে যখন দেশটি সংসদ নির্বাচনকালীন সরকার পদ্ধতি নিয়ে পাল্টাপাল্টি কঠোর অবস্থানে আছে বিরোধী দল বিএনপি এবং ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ।
আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে দেশের ৫টি সিটি করপোরেশনের নির্বাচন রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে বলেই মনে করেন অনেকে। যদিও বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল সিটি নির্বাচনও বয়কটের ঘোষণা দিয়েছে।
তফসিল অনুযায়ী দেশের ৫টি সিটি কর্পোরেশনের মধ্যে ২৫শে মে ভোট হবে গাজীপুরে। এরপর ১২ই জুন খুলনা ও বরিশাল এবং ২১ শে জুন সিলেট ও রাজশাহী সিটিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
গাজীপুরে অনুষ্ঠিতব্য সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে কোনো প্রার্থীও দেয়নি বিএনপি। তবে বিএনপির বেশ কয়েকজন স্থানীয় নেতা কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সিটি নির্বাচনে প্রতীক বরাদ্দ ও প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ার পর সেখানে এখন নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়েছে।
এ অবস্থায় বিএনপি আসন্ন সিটি নির্বাচনগুলিকেও একতরফা নির্বাচন হিসেবে দেখছে। তবে যেহেতু বিএনপির স্থানীয় নেতারা কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করছেন, তাই আওয়ামী লীগ মনে করছে নির্বাচন 'অংশগ্রহণমূলক' হচ্ছে ।

ভোটারদের ভাবনা
নির্বাচনকালীন সরকার পদ্ধতি নিয়ে পাল্টাপাল্টি অবস্থানে সিটি নির্বাচনকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে।
গাজীপুরে ষাটোর্ধ্ব একজন ভোটার বলেন, “সরকার যা চায় তাই হইছে বিগত দিনে। এখন আমরা আশা করতেছি যে ফেয়ার (সুষ্ঠু) নির্বাচন হবে।”
মেয়েকে স্কুলে নিয়ে আসা একজন অভিভাবকের মন্তব্য হলো, “যেটা আমরা ভাবি যে সুষ্ঠু নির্বাচন হোক এবং দু’দলই অংশগ্রহণ করুক। এটাই চাই, আর কিছু না।”
সাধারণ মানুষ নির্বাচনটি কেমন দেখতে চায়? এ প্রশ্নে একজন গৃহিনীর মন্তব্য হলো, "আমার ভোট আমি দিতে চাই। আমার ভোটটা যেন অন্য কেউ না দিতে পারে”।
ভোটারদের এমন মন্তব্যের পেছনে রয়েছে ২০১৮ সালের গাজীপুর সিটি এবং সবশেষ জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতা।
আলোচনায় সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর

সবশেষ গাজীপুর সিটি নির্বাচনে একটি ভোট কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর পক্ষে অবাধে সিল মারার চিত্র ধরা পড়েছিল বিবিসির ক্যামেরায়। বিরোধী দল ওই নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ করেছিলেন। সে নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী মো: জাহাঙ্গীর আলম।
মি. আলম পরবর্তীকালে মেয়র পদ হারিয়েছেন। আর এবার নির্বাচনে তিনি প্রার্থীও হতে পারেননি। এবার নিজের মাকে মেয়র প্রার্থী করে নির্বাচনী মাঠে আছেন জাহাঙ্গীর আলম। তিনিও দাবি করছেন প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের।
জাহাঙ্গীর আলম বলছেন, নির্বাচনে যাতে কোন অন্যায় কিংবা পেশিশক্তির ব্যবহার না হয়।
নির্বাচনে বিএনপির তৃণমূল
২০১৩ এবং ২০১৮ সালে গাজীপুরসহ অন্য সিটিগুলোতে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল বিএনপি। এরপর জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বিএনপি অংশ নেয়। দলটি বলছে, ২০১৮ সালের অভিজ্ঞতা থেকে তারা এ সরকারের অধীনে সব ধরনের নির্বাচন বয়কটের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ বলেন, দলীয় সিদ্ধান্ত হচ্ছে এ সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে না।
“নির্বাচন নিয়ে যে সমস্যা বাংলাদেশে, এটা তো লোকাল নির্বাচনে যে অবস্থা, জাতীয় নির্বাচনেও একই অবস্থা। সমস্যা তো ভিন্ন নয়। সুতরাং বিএনপির অবস্থান খুবই পরিস্কার, আমরা কোনো নির্বাচনেই এ সরকারের অধীনে যাবো না।”
সরেজমিনে গিয়ে গাজীপুর নির্বাচনের প্রার্থী বিশ্লেষণ করে দেখা যায় বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দিলেও সেখানে বিএনপি ঘরানার একজন প্রার্থী মেয়র পদে লড়ছেন। এছাড়া কাউন্সিলর পদে ২৪ জন বিএনপির স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা প্রার্থী হয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে।

বিএনপির তৃণমূলের অনেকে মনে করেন, স্থানীয় নির্বাচনে অংশ না নিলে মাঠ পর্যায়ে দলের সাংগঠনিক শক্তি হৃাস পায়। গাজীপুর সিটি নির্বাচনে বিএনপির মেয়র পদে কেউ দলীয় প্রতীকে অংশ নেয়নি। যেহেতু কাউন্সিলর পদে দলীয় প্রতিক নেই, তাই দলের পক্ষ থেকে থেকেও এ ব্যাপারে খুব একটা কঠোরতা দেখা যায় না।
গাজীপুর মহানগর বিএনপির মহিলা দলের সহসভাপতি খন্দকার নুরুন্নাহার সংরক্ষিত আসনে কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
তিনি বলেন, “মেয়র পদ নিয়েই দ্বন্দ্ব। কাউন্সিলরদের ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা দেয় নাই যে আপনারা দলের থেকে দাড়াতে পারবেন বা করতে পারবেন না।”
আরেকজন কাউন্সিলর প্রার্থী মাহাবুবুর রশীদ খান বলেন, “বিএনপি মূলত মেয়র নির্বাচন করতেছে না। আর আমরা যারা কাউন্সিলররা আছি বিএনপিপন্থী তারা আসলে জনগণের কাছে দায়বদ্ধতার কারণে নির্বাচনটা করছি।”

আওয়ামী লীগের দৃষ্টিভঙ্গি
গাজীপুরে মেয়র পদে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে কোনো প্রার্থী না থাকলেও বিএনপি পুরোপুরি নির্বাচন বয়কট করেছে সেটি মানতে চায় না আওয়ামী লীগ।
আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আজমত উল্লাহ খান বিবিসিকে বলেন, মহানগর এবং থানা পর্যায়ে বিএনপি এবং তাদের সহযোগী সংগঠনের অনেক দায়িত্বশীল নেতারা এখানে কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করছেন।
"সবমিলিয়ে এটাকে বলা যাবে না যে তারা নির্বাচন বয়কট করেছে। এটা তাদের কৌশল হতে পারে, কৌশলের কারণে শুধু মেয়র পদে তারা প্রতীকটা দেন নাই,” মি. খান।
সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্তে অনেকটা একতরফা নির্বাচনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। একইভাবে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিরোধী দল বিএনপি শেষ পর্যন্ত অংশ না নিলে সেক্ষেত্রেও সংবিধান মেনেই অধীনে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ক্ষমতাসীন দল।

দেশের ৫টি সিটি নির্বাচনকেও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া বলছেন, বিএনপি দলীয়ভাবে গাজীপুরে নির্বাচন করছে না এটা তাদের বিষয়।
"আমরা দেখেছি সেখানে তৃণমূলে, বিশেষ করে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে স্থানীয় বিএনপি নেতারা অংশগ্রহণ করেছেন। আশাকরি অন্যান্য সিটি নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিএনপি তাদের সিদ্ধান্ত বদল করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে,” বলেন মি. বড়ুয়া।








