ভারতীয়দের ভিসা দেওয়া 'সীমিত' করল বাংলাদেশ, কী বলছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা?

    • Author, তারেকুজ্জামান শিমুল
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা

দিল্লি দূতাবাস ও আগরতলা সহকারী হাই কমিশনার কার্যালয়ে ভিসা কার্যক্রম বন্ধের পর এবার কলকাতা, মুম্বাই এবং চেন্নাইয়ে অবস্থিত বাংলাদেশের উপ-দূতাবাসগুলো থেকেও ভারতীয় নাগরিকদেরকে পর্যটক ভিসা দেওয়া 'সীমিত' করা হয়েছে।

এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিজ্ঞপ্তি জারি করা না হলেও বুধবার থেকে যে ওই তিন উপ-দূতাবাস থেকে পর্যটক ভিসা দেওয়া 'সীমিত' করা হয়েছে, বিবিসি বাংলাকে সেটি নিশ্চিত করেছেন কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশ উপ-দূতাবাসের একাধিক কর্মকর্তা।

এমন একটি সময় এই খবর প্রকাশ্যে আসলো যখন বিভিন্ন ইস্যুতে ভারতের মোদি সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সম্পর্কের টানাপোড়েন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

এর মধ্যে সম্প্রতি ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) থেকে বাংলাদেশি ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়াকে কেন্দ্র করে দু'দেশের মধ্যকার সম্পর্কের এই টানাপোড়েন নতুন মাত্রা পেয়েছে।

ইতোমধ্যেই আইপিএলের সকল খেলা ও অনুষ্ঠান সম্প্রচার বন্ধ রাখার নির্দেশ জারি করেছে বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়।

সেইসঙ্গে, আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলতে বাংলাদেশের ক্রিকেট দলকে ভারতে পাঠানো হবে না বলেও জানিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ।

সেই ধারাবাহিকতাতেই কলকাতা, মুম্বাই এবং চেন্নাইয়ে অবস্থিত বাংলাদেশের উপ-দূতাবাস থেকে ভারতের নাগরিকদের পর্যটক ভিসা দেওয়া 'সীমিত' করা হলো কি-না, সেই প্রশ্ন উঠতে দেখা যাচ্ছে।

আবার বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখেও ভারতীয়দের জন্য ভ্রমণ ভিসা স্থগিত বা সীমিত করা হচ্ছে কি-না, সেটি নিয়েও আলোচনা হতে দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন মহলে।

যদিও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন জানিয়েছেন, ভারতীয়দের জন্য ভ্রমণ ভিসা স্থগিত বা সীমিত করার বিষয়ে সরাসরি কোনো সিদ্ধান্ত দেননি তিনি।

তবে ভারতের যেসব মিশনগুলোতে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, সেগুলোতে আপাতত ভিসা প্রদান বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

আরও পড়তে পারেন:

কেবল একটি কেন্দ্রে পর্যটন ভিসা চালু

দিল্লি ও আগরতলার পর কলকাতা, মুম্বাই এবং চেন্নাইয়েও বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে ভারতীয় নাগরিকদেরকে পর্যটক ভিসা প্রদান 'সীমিত' করা হয়েছে।

এর ফলে এখন শুধুমাত্র গুয়াহাটির অ্যাসিস্ট্যান্ড হাই কমিশনারের দফতর থেকে ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশে ভ্রমণ ভিসা দেওয়ার ব্যবস্থা চালু থাকল।

তবে পর্যটক ভিসা দেওয়া 'সীমিত' করা হলেও বাণিজ্যিক ভিসা সহ অন্যান্য ভিসা দেওয়া চালু থাকছে বলে জানিয়েছেন কলকাতার বাংলাদেশ উপ-দূতাবাসের কর্মকর্তারা।

২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্টের গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস ঘেরাও এবং ভিসা কেন্দ্রের সামনে বিভিন্ন ব্যানারে একাধিকবার বিক্ষোভ করতে দেখা গেছে।

এরপর কয়েকদিন ভারত সব ধরনের ভিসা কার্যক্রম বন্ধ রাখে।

পরে ভিসা সেন্টারগুলো চালু হলেও মূলত ওই সময় থেকেই ভারত জানিয়ে দেয় যে মেডিকেল ভিসা এবং কিছু জরুরি প্রয়োজন ছাড়া অন্যান্য ভিসা তারা আপাতত ইস্যু করবে না।

বর্তমানে বাংলাদেশিদের জন্য ভারতীয় পর্যটক ভিসা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা যা বলছেন

কলকাতা, মুম্বাই এবং চেন্নাইয়ে অবস্থিত বাংলাদেশের উপ-দূতাবাসে ভারতীয়দের জন্য বাংলাদেশের ভ্রমণ ভিসা দেওয়া বন্ধ, স্থগিত বা সীমিত করার বিষয়ে তার কাছে সরাসরি কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন।

বৃহস্পতিবার বিকেলে ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

"আমার কাছে এই ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নেই," বলেন মি. হোসেন।

তবে নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকলে আপাতত ভিসা প্রদান বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

"আমি যেটা করেছি সেটা হলো যে, আমাদের যে মিশনগুলোতে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে আমরা আপাতত ভিসা সেকশন বন্ধ রাখতে বলেছি। কারণ এটা নিরাপত্তার প্রশ্ন," সাংবাদিকদের বলেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা।

উল্লেখ্য যে, সম্প্রতি দিল্লির কূটনৈতিক এলাকায় নিরাপত্তা বেস্টনি ভেদ করে বাংলাদেশ দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ করে ভারতের 'হিন্দু চরমপন্থীরা'।

ওই ঘটনার পর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন অভিযোগ করেছিলেন যে, ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ হাইকমিশনের জন্য যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়নি।

কাছাকাছি সময়ে ত্রিপুরার আগরতলায়ও বাংলাদেশের অ্যাসিস্ট্যান্ট হাইকমিশনারের কার্যালয়ের সামনে হিন্দুত্ববাদী কিছু সংগঠনের নেতাকর্মী বিক্ষোভ করেন।

অতীতে সেখানে হামলা ও ভাঙচুরের নজিরও আছে।

ফলে বিক্ষোভের এসব ঘটনার পর নিরাপত্তার শঙ্কা থেকে দিল্লিতে বাংলাদেশের দূতাবাস ও আগরতলায়ও অ্যাসিস্ট্যান্ট হাইকমিশনারের কার্যালয় থেকে ভিসা দেওয়া বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

'আমরা খেলব কিন্তু ভারতের বাইরে'

আইপিএল থেকে ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে ভারতে না পাঠানোর বিষয়ে ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ও বিসিবি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটিকে সমর্থন করেন বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন।

"আমি এটাকে এভাবে দেখি যে, একজন ক্রিকেটার, সেতো একটা সীমিত সময় ওখানে যাবে, খেলবে, তারপরে হোটেলে চলে যাবে। তার নিরাপত্তা যদি দেওয়ার সম্ভব না হয়, সে কারণেই তো তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, আপাতদৃষ্টিতে," বলেন মি. হোসেন।

"তাহলে আমার এই যে টিম যাবে, শুধু টিম যাবে না, টিমের সমর্থকরাওতো যাবে, খেলা দেখতে যাবে লোক। তাদের নিরাপত্তা প্রশ্ন আছে। আমরা কী করে বিশ্বাস করব যে, তারা নিরাপদ থাকবে?," বলেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা।

মি. হোসেন মনে করেন, ভারতের হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো যেভাবে 'বাংলাদেশবিরোধী কার্যকলাপ এবং কথাবার্তা' বলছে, সেটার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের খেলোয়াড় ও দর্শকদের নিরাপত্তা দেওয়া 'সত্যিকার অর্থেই' ভারতীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর পক্ষে কঠিন হবে।

"সেই হিসাবে যে, আমরা আসলে খেলব কিন্তু ভারতের বাইরে খেলব, যেখানে সমস্যা হবে না,"বলেন উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন।

ভারতে খেলতে না যাওয়ার এই সময়ে বাণিজ্য চালু রাখার বিষয়ে এক প্রশ্নে উপদেষ্টা বলেন, "এখানে আমাদের স্বার্থ আছে না যাওয়াতে। কারণ আমাদের এখানে আমাদের লোকদের নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত…কাজেই আমরা আমাদের লোকদেরকে পাঠাব না।"

"কিন্তু চাল কেনাতে যদি স্বার্থ থাকে আমাদের, যদি আমরা কম দামে পাই এবং আমাদের কিনতেই হয়, তাহলে ভারত যদি আমাদের চাল রপ্তানি করে আমরা যদি কিনি, ব্যবসায়ীরা করতেছেন, আমি কোনো সমস্যা দেখি না," সাংবাদিকদের বলেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মি. হোসেন।