তল্লাশির সময় ফাইল সরিয়ে 'কোনো অন্যায় করিনি', বললেন মমতা

কয়লা পাচারের একটি মামলায় তৃণমূল কংগ্রেসের পরামর্শদাতা সংস্থায় তল্লাশি চালানোর সময়ে বৃহস্পতিবার যেভাবে মমতা ব্যানার্জী গিয়ে সেখান থেকে বেশ কিছু ফাইল নিয়ে বেরিয়ে আসেন, তাতে তিনি কোনো অন্যায় করেননি বলে জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী।

তৃণমূল কংগ্রেসের পরামর্শদাতা সংস্থা 'আই-প্যাক'-এর দফতর আর সংস্থাটির মালিক প্রতীক জৈনের বাড়িতে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে কেন্দ্রীয় এজেন্সি এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি ওই তল্লাশি চালাচ্ছিল।

সেই তল্লাশির মধ্যেই মমতা ব্যানার্জী দুটি ভবনেই যান এবং বেশ কিছু ফাইল ও হার্ড ডিস্ক নিয়ে বেরিয়ে আসেন প্রকাশ্যেই।

গতকালের মমতা ব্যানার্জীর ওই ফাইল এবং কম্পিউটার হার্ড ডিস্ক সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার নাটকীয় ঘটনার পর তা নিয়ে শুক্রবারও কলকাতা আর দিল্লি ছিল ঘটনাবহুল।

শুক্রবার ইডি-র তল্লাশি অভিযানের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিলেন মমতা ব্যানার্জী নিজেই। দীর্ঘ এক মিছিলের শেষে এসে মমতা ব্যানার্জী বক্তৃতায় বলেন, তিনি গতকাল যা করেছেন, সেটা সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের চেয়ারপার্সন হিসাবে করেছেন, কোনো অন্যায় তিনি করেননি।

অন্যদিকে, মমতা ব্যানার্জী যেভাবে, তাদের ভাষায় 'গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্যপ্রমাণ' সরিয়ে নিয়ে গেছেন, তা নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা করেছে ইডি।

শুক্রবার মামলাটির শুনানি হওয়ার কথা থাকলেও এজলাসে ভিড় বেশি থাকায় বিচারপতি মামলা না শুনেই উঠে যান। ওই মামলায় মমতা ব্যানার্জীকেও যুক্ত করেছে ইডি। আবার তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী ও তাদের দলের পরামর্শদাতা সংস্থা পাল্টা একটি মামলা করেছে ইডির বিরুদ্ধে।

দিল্লিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর দফতরের সামনে তৃণমূল কংগ্রেসের আটজন সংসদ সদস্য বিক্ষোভ দেখানোর সময়ে পুলিশ তাদের টেনে হিঁচড়ে সরিয়ে নিয়ে যায়।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন

'কোনো অন্যায় করিনি'

দক্ষিণ কলকাতার যাদবপুর থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের কয়েক হাজার নেতা কর্মীকে নিয়ে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের তল্লাশি অভিযানের প্রতিবাদে মিছিল করেন মমতা ব্যানার্জী।

সকাল থেকেই পুরো মিছিলের পথে বড়ো বড়ো ব্যানার লাগানো হয়েছিল – যেগুলির মূল বক্তব্য ছিল যে, কেন্দ্রীয় এজেন্সিকে নির্বাচনের আগে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে বিজেপির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার।

ওই মিছিলের শেষে এক বড়ো জনসভায় বক্তৃতা দেন মিজ. ব্যানার্জী। তিনি বলেন, "কাল যা করেছি, অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের চেয়ারম্যান হিসেবে করেছি। কোনো অন্যায় করিনি। তুমি খুন করতে এসেছিলে। চোরের মতো আমার সমস্ত ডেটা চুরি করতে এসেছিলে। জোড়াফুলটা যদি রক্ষা না হয়, মানুষের হয়ে লড়াই করব কী করে?"

তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে না পেরে বিজেপি ইডিকে ব্যবহার করে তৃণমূলের 'ইলেকশন স্ট্র্যাটেজি' হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

সেই কারণেই আইপ্যাকের কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়ি ও অফিসে তল্লাশি চালানো হয়েছে বলে তাঁর দাবি।

ভাষণের শেষ দিকে তিনি বলেন, "তুমি আমাকে এক দিন আটকাবে, আমি ১০০ দিনের ফসল তুলে নেব। আমাকে জেলে ভরলে তোমাকে সারা পৃথিবীতে ভরে দেব। মনে রাখবে, সুস্থ বাঘের চেয়ে আহত বাঘ আরও ভয়ংকর।"

তৃণমূল কংগ্রেসের ওই মিছিলের পরে কলকাতার এসপ্ল্যানেড অঞ্চলে বিক্ষোভ মিছিল করে বিজেপি। মমতা ব্যানার্জী যেভাবে কেন্দ্রীয় এজেন্সির তল্লাশি চলাকালীন সেখানে প্রবেশ করে নথিপত্র বের করে এনেছেন, তা নজিরবিহীন বলে মন্তব্য করেছেন দলটির নেতারা।

বিষয়টি নিয়ে রাজ্যপালের কাছেও গিয়েছিলেন বিজেপি নেতরা।

দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেছেন, "গতকাল মুখ্যমন্ত্রী সমস্ত সাংবিধানিক রীতিনীতিকে অস্বীকার করে, একজন প্রশাসনিক প্রধান হিসাবে সরকারি অফিসারদের ওপর আক্রমণ করলেন, তাদের থেকে ফাইল ছিনিয়ে নিলেন, কারণ তার দলের যারা এই কয়লা কেলেঙ্কারির সঙ্গে যুক্ত তাদের তিনি বাঁচাতে চান।"

আদালতে যা হলো

আই-প্যাকের সল্টলেক দফতর ও সংস্থার মালিক প্রতীক জৈনের বাড়িতে ইডির তল্লাশি শুধু আর রাজনৈতিক বিবৃতি-পাল্টা বিবৃতিতে থেমে নেই। ওই ঘটনা পৌঁছেছে কলকাতা হাইকোর্টেও।

তাদের তদন্তে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট হাইকোর্টে মামলা করেছে। ওই মামলায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীকেও যুক্ত করা হয়েছে। এর পাল্টা কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। শুক্রবার বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের বেঞ্চে এই দুই মামলার শুনানি হওয়ার কথা ছিল।

দুপুর আড়াইটা নাগাদ শুনানির কথা ছিল। তবে এই গুরুত্বপূর্ণ মামলাটি শুনতে বহু উকিল এবং অন্যান্য মানুষও জড়ো হয়েছিলেন এজলাসে। আদালতে হাজির সাংবাদিকরা বলছেন, বিচারপতি বারবার ঘর ফাঁকা করতে এবং ওই মামলার সঙ্গে যাদের সম্পৃক্ততা নেই, তাদের এজলাস ছেড়ে চলে যেতে বলেন। তবুও হট্টগোল বন্ধ হয়নি, কেউ বাইরে যাননি।

এরপরেই বিচারপতি এজলাস ছেড়ে উঠে যান। পরে তিনি লিখিত নির্দেশে জানিয়ে দেন, এদিনের মতো মামলার শুনানি স্থগিত রাখা হচ্ছে এবং ১৪ই জানুয়ারি মামলাটির পরবর্তী শুনানি হবে।

এরপরে শুক্রবারই শুনানি এবং যদি অন্য কোনো বিচরকের এজলাসে মামলাটি পাঠানো যায়, সেই আবেদন জানিয়ে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট ই-মেইল করেছিল হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে। কিন্তু সেই আবেদন মানেনি হাইকোর্ট।

আবার এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট এবং কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে দুটি আলাদা অভিযোগ জমা পড়েছে কলকাতা পুলিশের কাছে। একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী নিজেই আর অন্যটি পুলিশের তরফে করা হয়েছে।

দিল্লিতে বিক্ষোভ

বৃহস্পতিবারের ঘটনার প্রতিবাদে এদিন দিল্লিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের দফতরের বাইরে বিক্ষোভ দেখান তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্যরা।

তৃণমূল কংগ্রেস জানিয়েছে, ডেরেক ও' ব্রায়েন, মহুয়া মিত্র, কীর্তি আজাদ, শতাব্দী রায় সহ আট জন সংসদ সদস্য ওই বিক্ষোভে সামিল হয়েছিলেন।

দিল্লি পুলিশ সেখান থেকে তাদের টেনে হিঁচড়ে সরিয়ে দেয় বলে অভিযোগ করেছে দলটি। তাদের বাসে তুলে পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।

যদিও দিল্লি পুলিশ জানায়, প্রথমে তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্যদের সরে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করা হলেও তাঁরা তাতে রাজি হননি। তারপরই বিক্ষোভ সরাতে হস্তক্ষেপ করে পুলিশ।