সিএএ কার্যকর করে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে বিজেপির লাভ হবে না ক্ষতি?

    • Author, প্রভাকর মণি তিওয়ারি এবং দিলীপ শর্মা
    • Role, বিবিসি হিন্দি, কলকাতা ও গৌহাটি

ভারতে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট (সিএএ) কার্যকর করার কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশ জুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গিয়েছে। তবে সবচেয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া মিলেছে পশ্চিমবঙ্গ এবং আসাম থেকে।

২০১৯ সালে যখন এই আইন পার্লামেন্টে পাস হয়, তখন এই দুই রাজ্যেই এর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছিল।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর তীব্র বিরোধিতা করে বলেছেন, "সিএএ হচ্ছে বাংলাকে আবার ভাগ করার এবং দেশ থেকে বাঙালিদের বিতাড়িত করার খেলা।"

তৃণমূল কংগ্রেসের পাশাপাশি বামপন্থীরাও এর বিরুদ্ধে সরব হয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বরাবরই ভারতে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের তীব্র বিরোধিতা করে এসেছেন।

সোমবার এই আইন দেশ জুড়ে কার্যকর হওয়ার পর তীব্র ভাষায় কেন্দ্রকে আক্রমণ করেছেন তিনি।

সোমবার সন্ধ্যায় সিএএ আইন সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর তড়িঘড়ি সাংবাদিক বৈঠক ডেকে তিনি বলেন, "এটা ছেলেখেলা নয়।”

নির্বাচনের আগে এটাকে ‘লোক দেখানো’ পদক্ষেপ এবং ‘ললিপপ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন তিনি।

“ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণার দু-তিনদিন বাকি, তখনই এটা করার দরকার পড়ল? এটা রাজনৈতিক পরিকল্পনা”, মন্তব্য করেন মমতা ব্যানার্জি।

তার প্রশ্ন ছিল, ২০২০ সালে এই আইন পাস হয়েছে। তাহলে চার বছর পরে, লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগে কেন এটা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিল সরকার?

তিনি বলেন, “এখানে যদি সিএএ এবং জাতীয় নাগরিক পঞ্জীর (এনআরসি) মাধ্যমে কারও নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়, তাহলে আমরা চুপ করে বসে থাকব না। এই আইনটা আসলে একটি প্রতারণা।”

মঙ্গলবারও একই সুর শোনা গিয়েছে তার গলায়।

পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগণার একটি সভা থেকে এই আইনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “সিএএ হল এনআরসির সঙ্গে যুক্ত। বিজেপি এখানে ডিটেনশন ক্যাম্প করতে চাইছে। তাই আবেদন করার আগে একবার নয়, হাজারবার ভাবুন। একটা মানুষেরও অধিকার কেড়ে নিতে দেব না।”

দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পাল্টা দাবি জানিয়ে বলেছে, এই আইন নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার নয়, বরং নাগরিকত্ব দেওয়ার পক্ষে।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

পশ্চিমবঙ্গে যেখানে খুশির পরিবেশ

একই সঙ্গে কিন্তু উত্তর ২৪ পরগণা-সহ পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য জেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মতুয়া সম্প্রদায় এই খবরে আনন্দ প্রকাশ করে উৎসব করেছে। মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই এই আইন কার্যকরের দাবি জানিয়ে আসছিলেন।

২০১৯ সালের নির্বাচনেও তা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বিজেপির নেতারা। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে না পারায় তাদের মধ্যে ছিল চরম অসন্তোষ।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই রাজ্যে সিএএ ও ন্যাশানাল রেজিস্টার অফ সিটিজেনস (এনআরসি) চালু করার ঘোর বিরোধী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এর প্রতিবাদে রাস্তায়ও নেমেছেন তিনি।

মুখ্যমন্ত্রীর যুক্তি, মতুয়া সম্প্রদায়ের সদস্যরা ইতিমধ্যেই ভারতীয় নাগরিক।

"যদি তারা নাগরিক না হন তাহলে এতদিন নির্বাচনে কীভাবে তারা বিজেপিকে ভোট দিয়ে এসেছে? এই অবস্থায় তাদের আবার নাগরিকত্ব কী ভাবে দেওয়া হবে?", প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

হরিচাঁদ ঠাকুর ১৮১২ সালে ওড়াকান্দিতে (বর্তমানে বাংলাদেশে) মতুয়া নামে এই ধর্মীয় সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা করেন।

বনগাঁর বিজেপি সাংসদ তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মতুয়া মহাসঙ্ঘের নেতা শান্তনু ঠাকুর বলেন, “সিএএ শুধু মতুয়াদের জন্যই নয়, রাজ্যে বসবাসকারী সমস্ত শরণার্থীদেরও নাগরিকত্বের পথ প্রশস্ত করবে।”

তিনি আরও বলেছেন যে এটি বৈধ নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার জন্য নয়, নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে।

‘টাইমিং’ নিয়ে প্রশ্ন

পশ্চিমবঙ্গের প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরীও এই আইন কার্যকর করার সময় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার প্রশ্ন কেন ঠিক নির্বাচনের আগেই এই আইন কার্যকর করা হচ্ছে?

এর উদ্দেশ্য 'নির্বাচনী সুবিধা আদায় করা' - এমনটাই মনে করেন তিনি।

অন্য দিকে রাজ্য সিপিএম সম্পাদক মহম্মদ সেলিম একে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আঁতাতের ফল' বলে বর্ণনা করেছেন।

দিল্লিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি দাবি করেন, মমতা ব্যানার্জি স্রেফ লোক দেখানোর জন্য এই আইনের বিরোধিতা করছেন।

মহম্মদ সেলিম বলেন, “ধর্মের ভিত্তিতে মানুষকে মেরুকরণ করতে কেন্দ্র নির্বাচনের আগে আইন কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।”

তার দাবি, পশ্চিমবঙ্গে বামেদের 'ক্রমবর্ধমান শক্তি'র কথা মাথায় রেখে শুধুমাত্র ধর্মীয় মেরুকরণের মাধ্যমে বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যে ভোট ভাগাভাগি করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

অন্য দিকে, মঙ্গলবার উত্তর ২৪ পরগণার মতুয়া অধ্যুষিত অঞ্চলে সভা থেকে মতুয়া সম্প্রদায়কে সতর্ক করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

"এখানে আবেদন করলে আপনারা নাগরিক থাকা সত্ত্বেও বে-নাগরিক হয়ে যাবেন। অনুপ্রবেশকারী হয়ে যাবেন,” বলেছেন তিনি।

বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার এই মন্তব্যের বিরোধিতা করেছেন।

তার কথায়, “কেন্দ্রীয় সরকার বরাবরই তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছে। লোকসভা ভোটের আগে সিএএ কার্যকর করার আশ্বাস দিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। এখন সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়েছে। এই আইন নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।”

একই সঙ্গে তার দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সিএএ সম্পর্কে যা বলছেন তা ঠিক নয়।

“নির্বাচনের আগে মুখ্যমন্ত্রী কিছু মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন। যদি প্রমাণ দিতে পারেন এই আইনের কারণে কারও নাগরিকত্ব গিয়েছে তা হলে ওর সামনে কান ধরে উঠবোস করব”, বলেছেন মি মজুমদার।

এদিকে এই আইনের বিজ্ঞপ্তির খবর প্রকাশ্যে আসার পর উত্তর ২৪ পরগণা ও নদীয়া জেলার মতুয়া অধ্যুষিত এলাকায় ঢাক-ঢোল পিটিয়ে ও মিষ্টি বিতরণ করে এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানানো হয়।

বনগাঁর বিজেপি সাংসদ শান্তনু ঠাকুর বলেন, “মতুয়াদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই এই সম্প্রদায়ের জন্য এটা আনন্দের বার্তা বয়ে এনেছে।”

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি কী সুবিধা পেতে পারে?

উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগণার পাশাপাশি নদীয়া জেলাতেও বহু সংখ্যক মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষ বাস করেন। প্রায় ৩ কোটি জনসংখ্যার এই সম্প্রদায় রাজ্য বিধানসভার অন্তত ৫০টি আসনে নির্ণায়কের ভূমিকায় রয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সিএএ কার্যকর হলে নাগরিকত্ব ও অন্যান্য মৌলিক অধিকার নিয়ে এই সম্প্রদায়ের মধ্যে যে আশঙ্কা ছড়ানো হয়েছে, তার অবসান হবে।

সেই সঙ্গে আগামী নির্বাচনে এর ফলে রাজনৈতিক দৃশ্যপটও পাল্টে যেতে পারে। মতুয়া সম্প্রদায়কে বিজেপির সমর্থক বলে মনে করা হয়। দীর্ঘদিন ধরেই নাগরিকত্ব আইনের দাবি জানিয়ে আসছিল এই সম্প্রদায়।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে ২০২১ সালের ১৭ মার্চ বাংলাদেশের ওড়াকান্দির মতুয়া ঠাকুরবাড়ি পরিদর্শনে গিয়েছিলেন।

সে সময় ভাবা হয়েছিল শুধুমাত্র মতুয়াদের ভোট টানতেই সেই সফর।

ভারত স্বাধীন হওয়ার পর এই সম্প্রদায়ের মানুষ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে বসতি স্থাপন করেন।

মতুয়া সম্প্রদায়ের আর এক নেতা বলেন, "এই আইনের মাধ্যমে মতুয়া সম্প্রদায় প্রকৃত স্বাধীনতা পেয়েছে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক খেলার শিকার। এখন অন্তত আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এখানে নিশ্চিন্তে বসবাস করতে পারবে।”

কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সদস্য তথা মতুয়া সম্প্রদায়ের নেতা মমতাবালা ঠাকুর অন্য মত পোষণ করেন।

তিনি বলছেন, "আমরা ইতিমধ্যেই এই দেশের নাগরিক। সিএএ-র ফর্ম ভর্তি করলেই বর্তমান অবস্থার ইতি ঘটবে। খুব ভেবেচিন্তে কাজ করতে হবে।”

আসামে প্রতিক্রিয়া

সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন কার্যকর হওয়ার পর আসাম তথা উত্তর-পূর্ব ভারতের একাধিক অংশে আদিবাসী সংগঠনগুলো আন্দোলনে নেমেছে।

আসামের সবচেয়ে প্রভাবশালী ছাত্র সংগঠন অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন সোমবার সন্ধ্যায় সিএএ বিধির প্রতিলিপি পুড়িয়ে প্রতিবাদ জানায়।

সিএএ-র বিরুদ্ধে তাদের এই প্রতিবাদে ৩০টি আদিবাসী সংগঠনও সামিল হয়েছে।

আসামে কংগ্রেসের নেতৃত্বে ১৬টি রাজনৈতিক দলের যৌথ বিরোধী ফোরামও রাজ্য জুড়ে সিএএ-র বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে।

বস্তুত, চলতি মাসেই ভারতে লোকসভা নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা হতে চলেছে। আর তার মাত্র কয়েকদিন আগে সিএএ কার্যকর করায় রাজনৈতিক পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

আসামের রাজনীতি কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন এমন বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন সিএএ বিরোধী আন্দোলন যদি ২০১৯ সালের মতো বড় আকারে হয়, তাহলে কিন্তু বিজেপির ক্ষতি হতে পারে।

আসামের ১৪টি লোকসভা আসনের মধ্যে বিজেপি এবার ১১টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। গত নির্বাচনে ৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল তারা।

সিএএ এখন কার্যকর করার কারণ কী?

এসবের মাঝে প্রশ্ন উঠছে, ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে সিএএ আইন তৈরি হলেও বিজেপি কেন সেটা কার্যকর করতে চার বছরেরও বেশি সময় নিল?

একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে লোকসভা ভোট ঘোষণার ঠিক আগে কেন এই আইন সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি জারি করা হল।

সাংবাদিক বৈকুণ্ঠনাথ গোস্বামী মনে করেন, বিজেপির নির্বাচনী পাটিগণিতে সিএএ বাস্তবায়নের এটাই সঠিক সময়। কয়েক দশক ধরে অসমের রাজনীতিকে কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন এই প্রবীণ সাংবাদিক।

নির্বাচনী পাটিগণিত ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, "৪০০ আসনের সীমা অতিক্রম করবে বলে দাবি জানানো বিজেপি কিন্তু দক্ষিণ ভারত থেকে ওড়িশার বিজু জনতা দল পর্যন্ত সব দলকে নিজেদের জোটে একত্রিত করার চেষ্টা করছিল। এ থেকেই এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে বিজেপি একটি আসনও হারাতে চায় না।”

“তাই সিএএ-র মাধ্যমে বাংলার মতুয়া সম্প্রদায় এবং আসামের হিন্দু বাঙালি ভোটকে নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। মনে রাখতে হবে এনআরসি-তে লক্ষ লক্ষ হিন্দু বাঙালির নাম বাদ পড়েছে।”

“ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের মুখোমুখি হওয়া এই মানুষগুলো বিজেপির ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। এখন নির্বাচনে সিএএ-র মাধ্যমে এই মানুষদের নাগরিকত্ব দেওয়া নিয়ে ভাষণ দেওয়া হবে”, বলছিলেন মি গোস্বামী।

২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, আসামের ৩ কোটি ১২ লক্ষ জনসংখ্যার মধ্যে ৭০ লক্ষরও বেশি হিন্দু বাঙালি। বাঙালি হিন্দুরা অসমিয়া হিন্দুদের পরে রাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম সম্প্রদায়।

আসাম বিধানসভার বিরোধী দলনেতা দেবব্রত শইকিয়া বলেছেন, বিজেপি শুধুমাত্র নিজেদের রাজনৈতিক লাভের জন্য আসামের মানুষের উপর সিএএ চাপিয়ে দিয়েছে।

কংগ্রেস নেতাদের বক্তব্য সিএএ এইন কার্যকর করে অসমের মানুষের জমি, ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে বিজেপি।

"কয়েকটা ভোটের জন্য বিজেপি ২০১৪ সাল পর্যন্ত এখানে আসা বিদেশিদের আসামে থাকার এবং এখানে জমির অধিকার পাওয়ার অনুমতি দিয়েছে", বলছেন তারা।

অন্য দিকে, বিজেপির দাবি সাধারণ মানুষের কথা মেনেই সমস্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।

আসামের প্রবীণ বিজেপি নেতা বিজয় কুমার গুপ্তা বলেছেন, "এক-দু’টো সংগঠন সিএএ-র বিরোধিতা করছে। তবে আসামের মানুষ কিন্তু বিজেপিকে সমর্থন করছে।"

"২০১৯ সালে আন্দোলন হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে আসামের মানুষ বিজেপিকে ক্ষমতায় এনেছিল", বলছিলেন তিনি।

আশির দশকে প্রায় ৬ বছর ধরে চলা আসাম আন্দোলনের পর ১৯৮৫ সালে ভারত সরকারের সাথে একটি চুক্তির জেরেই এনআরসি শুরু করা হয়েছিল।

ওই চুক্তির ভিত্তিতে ১৯৭১ সালের ২৪ শে মার্চের পরে যারা আসামে এসেছিলেন তাদের বিদেশি হিসাবে বিবেচনা করা হত।

কিন্তু সিএএ কার্যকর হলে ২০১৪ সালের মধ্যে সে রাজ্যে আসা বিদেশি নাগরিকরা ভারতের নাগরিকত্ব পাবেন।

সিএএ অনুসারে, হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি এবং খ্রিস্টান যারা পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং আফগানিস্তান থেকে ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৪ এর আগে ভারতে এসেছেন তাদের অবৈধ অভিবাসী হিসাবে গণ্য করা হবে না। ভারতীয় নাগরিকত্ব দেওয়া হবে তাদের।

আসামে বিজেপি কীভাবে লাভবান হবে?

অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক শঙ্করজ্যোতি বড়ুয়া বিবিসিকে বলেন, "কেন্দ্রীয় সরকার সিএএ বিধির বিজ্ঞপ্তি জারি করে অসমিয়া জাতিকে সংকটে ফেলেছে। সিএএ আসামের সাংস্কৃতিক ও জনতাত্ত্বিক কাঠামোর জন্য হুমকির সমান।”

“আসামের মানুষ কখনই সিএএ মেনে নেবে না, আমরা গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে এর বিরুদ্ধে ক্রমাগত প্রতিবাদ করব এবং সুপ্রিম কোর্টে এই আইনের বিরুদ্ধে আর্জি জানাব।”

এদিকে লোকসভা নির্বাচনের আগে রাজ্যে আন্দোলনকারীদের প্রতিহত করতে বিভিন্ন জেলায় তৎপর পুলিশ প্রশাসন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আসাম পুলিশের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সিএএ-র বিরুদ্ধে রাজ্যের কয়েকটি সংগঠনের আন্দোলনের ঘোষণার পর স্থানীয় থানাগুলোর ফাঁকা জায়গায় অস্থায়ী জেল তৈরি করা হয়েছে।

২০১৯ সালের আন্দোলনের সঙ্গে তুলনা করে এবার আসামের আদিবাসীদের একত্রিত করার প্রশ্নে আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক বলেন, "সিএএ নিয়ে আসামের আদিবাসীরা বেশ ক্ষুব্ধ। গত বারের আন্দোলনে মানুষ নিজেরাই রাস্তায় নেমে এসেছিল। এবারেও মানুষ চুপ করে বসে থাকবে না।”

“সিএএ-র বিরোধিতায় রাস্তায় নামবে ৩০টি আদিবাসী সংগঠন। আমরা আশা করছি মানুষ বাঁচার জন্য আওয়াজ তুলবেন”, বলছিলেন মি বড়ুয়া।

প্রবীণ সাংবাদিক সমীর কর পুরকায়স্থ গত দুই দশক ধরে আসাম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর রাজনীতি কভার করছেন।

তিনি মনে করেন, "বিজেপি যদি এখন সিএএ বাস্তবায়ন না করত, তাহলে বিশেষ করে হিন্দু বাঙালি ভোটারদের নিরিখে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে দলটির ক্ষতি হত।”

তবে তিনি এও বলেছেন যে সিএএ আসামের মানুষের কাছে অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়।

তার কথায়, "আসামে এখনও পর্যন্ত এনআরসি স্বীকৃত হয়নি, কারণ তাহলে হিন্দু বাঙালিদের নাগরিকত্ব ঝুঁকির মুখে পড়ত। বিজেপি যদি এবার সিএএ কার্যকর না করত, তাহলে হিন্দু বাঙালি ভোটাররা তাদের বিরুদ্ধে চলে যেত।”

প্রবীণ সাংবাদিক বৈকুণ্ঠ নাথ গোস্বামী বলছেন, অসমে সিএএ কার্যকর হলে সে রাজ্যের ভোটে বিজেপির খুব একটা ক্ষতি হবে না।

তিনি বলছেন, "সিএএ নিয়ে আপার ও মধ্য আসামের প্রায় ৮টি আসনে অসমিয়া ভাবাবেগের প্রভাব রয়েছে। কিন্তু ২০১৯ সালে যে মাত্রায় আন্দোলন হয়েছিল, যাতে রেল স্টেশন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল, মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন, এবার সেই মাত্রায় আন্দোলন হওয়াটা কঠিন।”

“সিএএ-র বিরুদ্ধে জনজাগরণ না হলে সংগঠনগুলোর আন্দোলনে সেই প্রতিবাদের সেই পরিবেশ তৈরি হবে না। আর এই ক্ষতি এড়াতে বিজেপি সাম্প্রতিককালে একাধিক প্রকল্প এনেছে বিশেষত মহিলা ভোটারদের কথা মাথায় রেখে। এটা নির্বাচনে দলের পক্ষে যাবে”, মন্তব্য করছেন মি গোস্বামী।