ভারতে নাগরিকত্ব আইন: আসামে জেগে উঠছে 'অসমীয়া আবেগ'

    • Author, অমিতাভ ভট্টশালী
    • Role, বিবিসি বাংলা, গুয়াহাটি থেকে

ভারতে নাগরিকত্ব আইন সংশোধনের বিরুদ্ধে আসামে প্রথম প্রতিবাদের যে ছবিটা ছড়িয়ে পড়েছিল সামাজিক মাধ্যমে - সেটি ছিল গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর কয়েক কিলোমিটার লম্বা এক মশাল মিছিল।

তার পরে প্রতিদিনই আসামের গ্রামে-গঞ্জে ও শহরে প্রতিবাদ, অবস্থান কর্মসূচি, মিছিল হচ্ছে।

কিন্তু যেভাবে আশির দশকের আসাম আন্দোলনের কেন্দ্রস্থলে ছিল ছাত্র সমাজ - এবারেও দেখা যাচ্ছে একইভাবে ছাত্রছাত্রীরাই প্রায় সব প্রতিবাদে রয়েছে সামনের সারিতে।

১৯৭৯ থেকে ১৯৮৫ সালের ওই আসাম আন্দোলন ছিল ওই রাজ্যে অনুপ্রবেশকারী বিদেশিদের তাড়ানোর দাবিতে এবং সেসময় সহিংসতায় বহু মানুষ নিহত হয়েছিল।

গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের এরকমই একটা প্রতিবাদ সভা হয়েছে বুধবার। বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসেছিলেন ছাত্রছাত্রীরা।

তাদের সঙ্গে কথা হচ্ছিল যে এই আইন সংশোধন অসমীয়া জাতিসত্তার আবেগকে নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে কী না, তা নিয়ে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এম ফিলের ছাত্রী প্রতিষ্ঠা পরাশর বলেছেন, "এই নতুন আইন আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপরে একটা বড় আঘাত। এত মানুষ নতুন করে বাইরে থেকে এলে তাদের সঙ্গে সহযোগিতা করার পরিস্থিতি নেই আসামের মানুষদের। সেই জন্যই আমাদের এই বিরোধিতা।"

তার পাশেই বসেছিলেন সহপাঠী মিতালী কুমার। তিনি বলছেন, ভারতের অন্যান্য প্রান্তে নতুন আইনের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন হচ্ছে - সেটা ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে। সেই বিষয়ে আসামের মানুষও একমত।

কিন্তু আসামের প্রতিবাদের একটা বাড়তি দিকও রয়েছে আর সেটা হলো তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির লড়াই।

"ভারতের অন্য রাজ্যে যে প্রতিবাদ হচ্ছে - সেটা ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে। কারণ ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব দেওয়াটা সংবিধানের পরিপন্থী। কিন্তু আসামের বিষয়টা একটু ভিন্ন - এটা আমাদের, অসমীয়াদের জাতিসত্তার সঙ্কট," বলেন তিনি।

কীভাবে একটা আইন অসমীয়া ভাষা-সংস্কৃতিকে সঙ্কটে ফেলে দিয়েছে, তা ব্যাখ্যা করছিলেন আরেক ছাত্র সুদীপ্ত সুতিয়া।

"ভাষা সংস্কৃতির ব্যাপারে আমাদের আবেগকে নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে এই আইনটা। কারণ আসামে অসমীয়া ভাষায় কথা বলার মানুষের সংখ্যা ১৯৭১ সালের পর থেকে কমতে কমতে এখন এসে দাঁড়িয়েছে ৪৮ শতাংশতে। ইতিমধ্যেই আমার ভাষা আমার রাজ্যেই সংখ্যালঘু হয়ে পড়েছে। এর পরে যদি নতুন করে বিদেশ থেকে আসা আরও মানুষকে নাগরিকত্ব দেওয়া হয়, তাহলে আমার ভাষাটাই হারিয়ে যাবে!" বলেন মি. সুতিয়া।

ওই সভার মাঠেই হাজির ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক ছাত্র পলাশজ্যোতি শইকিয়া। তিনি বলেছেন, তিনি ভারতীয় তো বটেই, তবে তার আগে তিনি অসমীয়া।

আরো পড়তে পারেন:

"ভারতীয় হওয়ারও আগে আমি প্রথমে, অসমীয়া -কারণ আমার জন্ম আসামে। সেজন্যই যখন আসামের জাতিসত্তা, ভাষা আর সংস্কৃতিকে কেউ এইভাবে অপমান করে, তার বিরুদ্ধে পথে তো আমি নামবই। আবার ভারতীয় হিসাবেও আমার প্রতিবাদ আছে। কারণ এই আইনের মাধ্যমে ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলে ভারতের সংবিধানটাকেও অপমান করা হয়েছে," বলছিলেন পলাশজ্যোতি শইকিয়া।

আরেক ছাত্রী বন্দিতা দাশ বলছেন, তার অসমীয়া সত্তা এবং ভারতীয় সত্তার মধ্যে কোনও বিরোধ নেই - অসমীয়া এবং ভারতীয় - দুই হিসাবেই তিনি এই প্রতিবাদে সামিল হয়েছেন।

বন্দিতা দাশের কথায়, "এরা তো ভারতের সংবিধানটাই বদলে ফেলতে চাইছে - এটা তো হতে পারে না! এখানে সবাই অসমীয়া, সবাই ভারতীয়.. তাই এটা একদিকে যেমন ভারতীয় হিসাবে সংবিধান রক্ষা করার লড়াই, তেমনই আবার অসমীয়া হিসাবে নিজের ভাষা সংস্কৃতি রক্ষা করারও আন্দোলন, যেটা ছিল আসাম আন্দোলনেরও মূল লক্ষ্য।"

নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মূল সুর যে অসমীয়া ভাষা-সংস্কৃতি রক্ষার লড়াই, সেটা যেমন এই ছাত্রছাত্রীরা বলছিলেন, তেমনই আরও স্পষ্ট হল যখন সভার শেষে কয়েকশো ছাত্রছাত্রী উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান জানাচ্ছিলেন ১১০ বছর আগে রচিত একটি গানকে, যা ১৯২৭ সালের আসাম ছাত্র সম্মেলনে গৃহীত হয় আসামের রাজ্য গীতি হিসাবে - যা ছিল, 'অ মুর আপোনার দেশ'.....

আরো পড়তে পারেন: