ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের মেয়েদের ফুটবল ম্যাচটি প্রায় পাঁচ ঘণ্টায় ঠেকলো কীভাবে?

ছবির উৎস, SPORTZWORKZ YOUTUBE
- Author, ফয়সাল তিতুমীর
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
আরেকটি বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচ, আবারও সেই ম্যাচ ঘিরে উত্তেজনা, বিতর্ক, আলোচনা। বৃহস্পতিবার ঢাকার কমলাপুর স্টেডিয়ামে সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ নারী চ্যাম্পিয়নশিপ ফুটবলের ফাইনালে মুখোমুখি হয় দুই দল।
সন্ধ্যা ৬টায় শুরু হওয়া ম্যাচের ফলাফল আসতে আসতে বাজে রাত প্রায় ১১টা। শেষ পর্যন্ত যৌথ চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হয় দুই দলকে। কিন্তু সেটার প্রক্রিয়া নিয়ে দেখা দেয় প্রশ্ন, যা নিয়ে মাঠেই ছড়ায় উত্তেজনা।
ম্যাচটির নির্ধারিত ৯০ মিনিট ১-১ গোলে শেষ হবার পর খেলা গড়ায় সরাসরি টাইব্রেকারে। সেখানেও থাকে ১১-১১ সমতা।
এরপরই হয় মহানাটকীয়তার শুরু। রেফারিরা কয়েন টসের মাধ্যমে চ্যাম্পিয়ন হিসেবে বেছে নেয় ভারতকে। মাঠেই যার প্রতিবাদ জানায় বাংলাদেশ দল। পরে দেখা যায় টুর্নামেন্টের বাইলজে কয়েন টসের কথা বলা নেই বরং পেনাল্টি চালিয়ে যাওয়ার কথা বলা আছে। এরপর ম্যাচ কমিশনার ভুল শুধরে খেলা চালাতে চাইলে বেঁকে বসে ভারতীয় দল।
শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ অপেক্ষা, আলোচনা আর সমঝোতার পর দুই দলের অধিনায়কের হাতে তুলে দেয়া হয় ট্রফি।

ছবির উৎস, BFF
কী ঘটেছিল খেলায়?
বাংলাদেশ-ভারত ফাইনাল ঘিরে আগে থেকেই আগ্রহ ছিল ফুটবল অঙ্গনে। যদিও পঞ্চম বারের মতো হতে যাওয়া সাফ অনূর্ধ্ব– ১৯ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে আগের চারবারই ফাইনাল খেলে তিনবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ, একবার তারা শিরোপা হারায় ভারতের কাছে।
এবারের আসরেও গ্রুপপর্বের খেলায় ভারতকে ১-০ গোলে হারায় বাংলাদেশ। আসরের বাকি দুটি দল ছিল নেপাল আর ভুটান।
ফাইনাল ম্যাচের শুরুতেই অবশ্য এগিয়ে গিয়েছিল ভারত। ৮ মিনিটেই গোলের দেখা পাবার পর বাকি সময়েও বল দখল ও আক্রমণে এগিয়ে ছিল তারা। কিন্তু ম্যাচের একেবারে অন্তিম মুহূর্তে যোগ করা অতিরিক্ত সময় খেলায় সমতা আনে বাংলাদেশ।
নির্ধারিত সময় ১-১ গোলে শেষ হবার পর নিয়ম অনুযায়ী খেলা গড়ায় পেনাল্টি শ্যুটআউটে। সেখানে প্রথমে পাঁচটি করে শট নেয় দু’দল এবং স্কোরলাইনেও থাকে ৫-৫ এর সমতা।
এরপর ‘সাডেন ডেথ’ নিয়মে একে একে শট নিতে থাকেন দুই দলের বাকি ফুটবলাররা। শেষ পর্যন্ত দুই গোলরক্ষক শট নেবার পরও বিজয়ী নির্ধারণ করা যায়নি কাউকেই, টাইব্রেকার শেষেও থাকে ১১-১১ সমতা।
‘ম্যাচ কমিশনারের ভুল’
বিপত্তির শুরু এরপরই।
রোমাঞ্চকর এই ম্যাচটি প্রেসবক্স থেকে কাভার করেছেন ডেইলি স্টারের সিনিয়র রিপোর্টার আনিসুর রহমান। বিবিসির কাছে সেই পরিস্থিতির বর্ণনা দেন তিনি, “রেফারি ১২ নম্বর শট নেয়ার জন্য বাংলাদেশের একজনকে ডাক দেন, সেই ফুটবলার যখন এগিয়ে যাচ্ছিলেন পেনাল্টি শট নিতে তখন ম্যাচের ৪র্থ রেফারি সংকেত দেন থামার জন্য। এরপর রেফারিরা একপাশে এসে আলোচনা করতে থাকেন, সেই আলোচনায় যোগ দেন ম্যাচ কমিশনার।”

ছবির উৎস, BFF
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
এরপর ম্যাচ অফিসিয়ালদের দুই দলের অধিনায়ককে ডেকে নিতে দেখা যায়। তাদের নিয়ে কয়েন টস করেন রেফারি। টসে ভারত জিতলে উদযাপনে মাতে ভারতীয় শিবির। সে সময় বিস্ময় প্রকাশ করতে দেখা যায় বাংলাদেশের অধিনায়ককে, কিছু একটা নিয়ে অভিযোগও জানাতে থাকেন তিনি।
"বাংলাদেশের অধিনায়ক আফিদা ম্যাচ শেষে বলেন যে তিনি আসলে জানতেন না কিসের জন্য এই টস। তিনি ভেবেছিলেন যেহেতু ১১টা করে শট নিয়েছে দুই দল, তাই বোধ হয় পরের শটটি কে নেবে সেজন্য টস করছেন রেফারিরা”, বলেন আনিসুর রহমান।
কিন্তু যখন বাংলাদেশ বুঝতে পারে টসের মাধ্যমে চ্যাম্পিয়ন নির্ধারণ করা হয়েছে তখন দলটির ম্যানেজার আমিরুল ইসলাম বাবুর নেতৃত্বে পুরো দল প্রতিবাদ জানাতে থাকে রেফারিদের কাছে।
এ সময় মাঠে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। বিক্ষুব্ধ বাংলাদেশ দলের বিপরীতে একপাশে যখন ভারতের ফুটবলার শিরোপা উদযাপন করছে, তখন তাদের দিকে দর্শকদের দুয়োধ্বনি দিতে দেখা যায়।
তখন দর্শকদের দিকে ফিরে পাল্টা উদযাপন করে ভারতের মেয়েরা। এসময় গ্যালারি থেকে বোতল ছোড়া হয়। চ্যাম্পিয়ন ফটোশ্যুটের পর এক পর্যায়ে রেফারিদের সঙ্গে হাত মেলাতে যান ভারতীয় দলের অধিনায়ক। কিন্তু সেসময় রেফারি হাত না মিলিয়ে তাদের শান্ত থাকার ইঙ্গিত করেন।
এই ম্যাচের ধারাভাষ্য দিচ্ছিলেন শাহ্নূর রাব্বানী, “আমাদের কাছেও তখন কোন তথ্য আসছিল না। বুঝতে পারছিলাম না কি ঘটছে। তবে মাঠে তখন বেশ উত্তেজনা। একদিকে গ্যালারিতে দর্শকদের চিৎকার, অন্যদিকে মাঠে ভারতীয় ফুটবলারদের উল্লাস। এক পর্যায়ে নিরাপত্তার জন্য বাড়তি পুলিশও আনা হয়,” বলেন তিনি।
ম্যাচ অফিসিয়ালদের সাথে তখনো আলোচনা চলমান বাংলাদেশ দলের। সেখানে ছিলেন সাফের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল হক হেলাল। “আমাদের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে অতীতে এটা কখনোই হয়নি, এটা ম্যাচ কমিশনারের একটা ভুল হয়ে গিয়েছে, সে বাইলজ না দেখে হয়তো একটা ডিসিশন দিয়ে দিয়েছে। এই ভুল করাতে এমন পরিস্থিতি। আমরা এএফসির সাথে কথা বলেছি, তারাও জানিয়েছে না, পেনাল্টি শ্যুটআউট চলতে থাকবে”, বলেন মি. হেলাল।
বাইলজে কী আছে?

ছবির উৎস, SAFF
সাউথ এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশন – সাফের অনূর্ধ্ব ১৯ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের বাইলজে ৪ নম্বর সেকশনটি টেকনিক্যাল নিয়ম কানুন নিয়ে। সেখানে ৭ এর ৩ ধারায় বলা আছে, “সেমিফাইনাল ও ফাইনালে যদি নির্ধারিত সময়ে বিজয়ী নির্ধারণ করা না যায় তাহলে খেলার নিয়ম অনুযায়ী পেনাল্টিতে যেতে হবে। কোনো অতিরিক্ত সময় যোগ হবে না।”
একাধিক রেফারি বিবিসিকে জানিয়েছেন, ফুটবলে নিয়ম হলো কোনো একজন বিজয়ী নির্ধারিত না হওয়া পর্যন্ত পেনাল্টি শ্যুটআউট চলতে থাকবে।
ফুটবলে কয়েন টস একেবারে সর্বশেষ কোন অপশন হিসেবে কখনো ব্যবহৃত হতে পারে, যখন আবহাওয়া বা মাঠ একেবারে খেলা চালানোর উপযুক্ত থাকে না তখন, কিন্তু সেটাও বাইলজে থাকতে হবে।
তবে এই ম্যাচে বাইলজের আরও কিছু দিক খণ্ডন হয়েছে। যেমন ৮ এর ১ ধারায় বলা আছে কোনো কারণে খেলায় দেরি হলে রেফারিরা প্রথমে আধাঘণ্টা অপেক্ষা করবেন, সিদ্ধান্ত নেয়ার চেষ্টা করবেন যে ম্যাচটি কখন শুরু করা যেতে পারে।
এরপর আরও সর্বোচ্চ আধাঘণ্টা তারা দেরি করতে পারবেন। এরপর ম্যাচ শুরু না হলে সেটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করতে হবে।
আবার যৌথ চ্যাম্পিয়ন ঘোষণার কথাও বাইলজে উল্লেখ ছিল না।
ভারতের সামনে দেয়া হয় ‘তিনটি অপশন’

ছবির উৎস, BFF
প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে মাঠে বসে থাকেন বাংলাদেশের ফুটবলাররা। এই সময়টা নিজেদের ড্রেসিংরুমে আবদ্ধ রাখে ভারতীয় দল।
রেফারি ও ম্যাচ অফিসিয়ালদের সাথে তখন আলোচনায় যোগ দেয় সাফের কর্মকর্তারাও। এ সময় তিনটি সমাধান বের হয়ে আসে বলে জানান সাফের সেক্রেটারি।
“এক, এই ম্যাচ বাতিল করে প্রথম থেকে আবার শুরু করা; দুই, পেনাল্টি চলতে থাকা, অথবা তিন, যৌথ চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা। ভারতকে এই প্রস্তাব দেয়া হয়, কিন্তু তারা কোনটাই মানেনি,” বলেন আনোয়ারুল হক হেলাল।
টুর্নামেন্টে অংশ নিতে আসা ভারতীয় দলের ফুটবলার ও কর্মকর্তারা যখন কিছুতেই কিছু মানছেন না, তখন আয়োজকরা যোগাযোগ করে অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশনের (এআইএফএফ) সাথে। এআইএফএফের সভাপতি ও সেক্রেটারির মধ্যস্থতায় শেষ পর্যন্ত যৌথ চ্যাম্পিয়নের প্রস্তাব মেনে নেয় ভারতীয় দল।
মঞ্চে একসাথে ট্রফি হাতে নিলেও শেষ পর্যন্ত সেই ট্রফি ও চ্যাম্পিয়নশিপের মেডেল দেশে নিয়ে যায় ভারতীয় দল। বাংলাদেশের জন্য নতুন করে ট্রফি তৈরি করে দেয়া হবে বলে জানান সাফের সাধারণ সম্পাদক।
“আসলে সাফের স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত। এটা তো যুবদের ডেভলপমেন্টের জন্য, এখানে জয়-হার মুখ্য নয়। সবাই চ্যাম্পিয়ন-চ্যাম্পিয়ন করে এটা ঠিক না। এই টুর্নামেন্ট করছি যাতে তরুণরা প্রস্তুত হতে পারে ভবিষ্যতের জন্য”, বলেন মি. হেলাল।
তবে এতে ভারতের সাথে সম্পর্কে কোনো প্রভাব পড়বে কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, সেটা তারাই ভালো বলতে পারবে, তবে সব সিদ্ধান্ত ভারতের সাথে আলোচনা করেই নেয়া হয়েছে।








