অবৈধ বিয়ের মামলায় খালাস ইমরান খান, তবে কারামুক্তি নিয়ে ধোঁয়াশা

ইদ্দত চলাকালীন বিয়ে করে ইসলামি আইন ভাঙ্গার অভিযোগে পাকিস্তানের কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ও তার স্ত্রী বুশরা বিবিকে বেকসুর খালাস করার নির্দেশ দিয়েছে। এই রায়ের পরে বুশরা বিবি জেল থেকে ছাড়া পাবেন, তবে ইমরান খানকে এখনই ছাড়া হবে কী না, তা নিয়ে কিছুটা ধোঁয়াশা আছে বলেই জানিয়েছে বিবিসি উর্দু।

ইদ্দত চলাকালীন বুশরা বিবি আর ইমরান খানের বিয়ে হয়েছিল, যা ইসলামি আইনের পরিপন্থী, এই অভিযোগে মামলা করেছিলেন বুশরা বিবির প্রাক্তন স্বামী খাওয়ার মানিকা। সেই মামলায় এ বছর ফেব্রুয়ারি মাসে ইসলামাবাদের একটি সিভিল আদালত ইমরান খান ও তার স্ত্রীকে অবৈধ বিয়ের অভিযোগে সাত বছর করে কারাদণ্ড এবং পাঁচ লক্ষ টাকা করে জরিমানা দিয়েছিল।

ইসলামাবাদ থেকে বিবিসির সংবাদদাতারা জানাচ্ছেন, অতিরিক্ত সেশনস জজ মুহম্মদ আফজল মাজুকা শনিবার তার আদেশে জানান যে, অন্য কোনও মামলায় যদি অভিযুক্ত না হয়ে থাকেন এই দম্পতি, তাহলে তাদের মুক্তি দিতে কোনও বাধা নেই। আদালতের নির্দেশ আদিয়ালা জেল কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।

ওই জেলেই আগে থেকে বন্দী আছেন ইমরান খান।

আদৌ কী জেল থেকে ছাড়া পাবেন ইমরান?

বুশরা বিবির জেল থেকে ছাড়া পাওয়া নিশ্চিত হলেও ইমরান খান এখনই মুক্তি পাবেন কী না, তা নিয়ে দ্বিমত রয়েছে তার দল পাকিস্তান তেহরিক-এ-ইনসাফ ও মি. খানের আইনজীবীদের মধ্যে।

মনে করা হচ্ছে নয়ই মে-র সহিংসতা সংক্রান্ত কিছু মামলায় তাকে অভিযুক্ত হিসাবে দেখানোর কারণে সম্ভবত ইমরান খান এখনই জেল থেকে ছাড়া পাবেন না।

সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ইমরান খানের আইনজীবী ও তার দলেরই নেতা ব্যারিস্টার গোহর আলি বলেন, “ইমরান খানকে শনিবারই ছেড়ে দেওয়া উচিত কারণ তার বিরুদ্ধে এটাই শেষ মামলা ছিল। এই মামলার কোনও ভিত্তিই ছিল না। সব মামলাগুলিই রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জন্য করা হয়েছিল।“

তবে ইমরান খানের দলের অন্যতম মুখপাত্র আহমেদ জানুজা বিবিসিকে জানিয়েছেন যে নয়ই মে-র সহিংসতা সংক্রান্ত তিনটি মামলায় ইমরান খানকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। তার কথায়, লাহোরের একটি সন্ত্রাস দমন আদালত ওই মামলাগুলিতে ইমরান খানকে গ্রেফতার করার অনুমতি দিয়েছে। ওই আদালত মি. খানকে জামিনও দেয় নি।

আদালত যে নির্দেশ দিল

বিচারক তার রায়ে লিখেছেন, ইমরান খান ও বুশরা বিবির বিয়ে কোনও ধরনের প্রতারণা করে হয় নি। দম্পতি এই দাবিও করেন নি যে তাদের দুজনের আগে বিয়ে হয় নি।

আবার বুশরা বিবির প্রাক্তন স্বামী খাওয়ার মানিকা ছয় বছর কেন চুপ করে ছিলেন, সেই প্রশ্নও তুলেছে আদালত।

বিচারক মনে করেছেন যে, এতদিন পরে মি. মানিকার বিচার চাওয়ার সময়সীমা পেরিয়ে গেছে এবং ইমরান খান ও বুশরা বিবির বিরুদ্ধে মামলায় উপযুক্ত প্রমাণ দিতেও তিনি ব্যর্থ হয়েছেন।

ইমরান খান ও বুশরা বিবির বিয়ে হয়েছিল ২০১৮ সালে।

বিবাহ বিচ্ছেদের পরে ইসলামি আইন অনুযায়ী যতদিন পুনরায় বিয়ে করা থেকে বিরত থাকতে হয় অর্থাৎ ইদ্দত চলে, তারই মধ্যে বুশরা বিবি ইমরান খানকে বিয়ে করেন, এমনটাই অভিযোগ ছিল তার সাবেক স্বামী খাওয়ার মানিকার। আইন ও সংবিধান ভঙ্গ করার জন্য ইমরান খান ও বুশরা বিবির কঠোর শাস্তি চেয়েছিলেন খাওয়ার মানিকা।

ওই মামলার বিচার চলেছিল রাওয়ালপিণ্ডির আদিয়ালা জেলে কারণ সেখানেই অন্যান্য মামলায় বন্দী ছিলেন ইমরান খান।

প্রায় আড়াই মাস ধরে শুনানি চলাকালীন খাওয়ার মানিকা ও ইমরান খানের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডাও হয়েছিল।

কে বুশরা খান?

আপাদমস্তক বোরখায় ঢাকা, কালো নেকাবের বাইরে কেবল একজোড়া চোখই দেখা যায় বুশরা বিবির। রীতিমত পর্দানশিন বুশরা বরাবরই ছিলেন কোনরকম আলোচনার বাইরে।

বুশরা বিবিকে কোন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে দেখা যায়নি কখনো, এমনকি স্বামীর নির্বাচনি প্রচারণাতেও তার উল্লেখ করার মত উপস্থিতি দেখা যায়নি কখনো।

ফলে ইমরান খানের তৃতীয় স্ত্রীকে নিয়ে গুজব ছড়াতে খুব বেশি সময় লাগেনি।

প্রথমত, বিয়ের আগে বুশরা মানিকা নামে পরিচিত এ নারী পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেট অধিনায়ক ও রাজনীতিবিদ ইমরান খানের প্রাক্তন দুই স্ত্রীর থেকে একেবারেই আলাদা।

যেখানে কেতাদুরস্ত ব্রিটিশ পত্নী জেমিমা গোল্ডস্মিথ এবং সাংবাদিক রেহাম খানের ম্যাগাজিন এবং টেলিভিশনের পর্দায় ছিল সরব উপস্থিতি, সেখানে বুশরা মানেকা বরাবরই ছিলেন পর্দার আড়ালে।

এমনকি ২০১৮ সালে ব্রিটিশ ডেইলি মেইলকে দেয়া সাক্ষাৎকারে মি. খান গর্বের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘বিয়ের আগে তিনি তার স্ত্রীর চেহারাও দেখেননি’ - যা ছিল আশির দশকে তুমুল সফল ও জনপ্রিয় ক্রিকেটার ইমরান খানের পরিচিত ব্যক্তিত্বের বিচারে একেবারেই ‘অচিন্তনীয়’ একটি ব্যাপার।

ইমরান খান বলেছিলেন, বুশরার বুদ্ধিমত্তা এবং চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যই তাকে তার প্রতি আকৃষ্ট করেছে।

কিন্তু সেসব নিয়ে লোকের অত আগ্রহ ছিল না, বরং বুশরার রহস্যময়তাই যেন তাকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।

বুশরা বিবি নামে সবার কাছে পরিচিত এ নারীকে আসলে 'আধ্যাত্মিক ক্ষমতার অধিকারী' বলে মনে করেন অনেকে। আধ্যাত্মিক বিষয়ে পরামর্শদাতা হিসেবে তার কিছু অনুসারীও আছে, যারা তাকে আলাদা সম্মান দেন।

পাকিস্তানে কেউ কেউ বলেন বুশরা বিবি সুফি ভাবধারার সঙ্গে যুক্ত। যদিও অনেকেই আবার সে বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন।

ইসলামিক রহস্যে ঘেরা সুফিবাদ স্রষ্টার অনুসন্ধান এবং পার্থিব বিষয় ত্যাগের উপর জোর দেয়। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইমরান খান এই ধারার প্রতি আগ্রহী।

বুশরার স্বপ্ন ও ইমরান খানের প্রধানমন্ত্রীত্ব

বলা হয়ে থাকে, একবার ইমরান খান ১৩ শতকে নির্মিত এক দরগায় পরামর্শের জন্য গিয়েছিলেন পাঁচ সন্তানের মা বুশরা বিবির কাছে। তখনও বুশরা বিবি তার প্রথম স্বামীর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কে ছিলেন।

কথিত আছে, এসময় একদিন বুশরা বিবি স্বপ্নে দেখেন যে কেবল তাদের বিয়ে হলেই ইমরান খান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন।

এরপর তারা বিয়ে করেন এবং ছয় মাস পর মি. খান দেশটির প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন।

তবে, বর্তমানে ৪০ বছর বয়সী বুশরা বিবি ২০১৮ সালের অক্টোবরে তার দেয়া একমাত্র টিভি সাক্ষাৎকারে এ বিষয়টির সত্যতা নাকচ করে দেন।

তবে ইমরান খানের অধীনে দ্রুতই পাকিস্তান উন্নতি করবে বলে উপস্থাপককে আশ্বস্ত করেন তিনি। যদিও তেমনটা ঘটেনি।

ইমরানের আগের দুই স্ত্রী

একদা প্লেবয় হিসেবে পরিচিত ইমরান খানের ক্রিকেট খেলাকালীন সময় কিংবা পরে বিয়ে করে সামাজিকভাবে স্থিত হবার সময়েও তিনি লাইমলাইটে ছিলেন - যা কিনা সুফিবাদের ধারণার চেয়ে অনেকটাই আলাদা।

প্রায় দুই দশক আগে ১৯৯৫ সালে ব্রিটিশ নাগরিক জেমিমা গোল্ডস্মিথকে বিয়ে করেন ইমরান খান। তখন তার বয়স ৪৩ বছর আর জেমিমার বয়স ছিল ২১ বছর। মিজ গোল্ডস্মিথের বাবা সেসময় বিশ্বের সবচেয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের একজন ছিলেন।

নয় বছর স্থায়ী সে সংসারে তাদের দুটি পুত্র সন্তান আছে।

এরপর ২০১৫ সালে সাংবাদিক এবং বিবিসির সাবেক আবহাওয়া উপস্থাপক রেহাম খানের সঙ্গে মি. খানের দ্বিতীয় বিয়ে টিকেছিল এক বছরেরও কম সময়।

রেহাম খানের দাবি, ইমরান খানের সমর্থকরা তাকে হেনস্তা করেছিল এবং এ নিয়ে পরে একটি বইও লেখেন তিনি।

এর বিপরীতে, ইমরান খানের ২০১৮ সালের বিয়ে ছিল খুবই সাদামাটা।

পর্যবেক্ষকদের মতে, তাদের বিয়ে ইসলামের প্রতি ইমরান খানের আনুগত্যকে জনগণের সামনে বেশ ভালোভাবে উপস্থাপন করেছিল।