বেনজীর আহমেদ কি সত্যিই বড় ধরনের চাপে পড়তে যাচ্ছেন?

বেনজীর আহমেদ

ছবির উৎস, Benazir Ahmed/facebook

ছবির ক্যাপশান, বেনজীর আহমেদ

সম্পদ ক্রোক, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ, শেয়ার ব্যবসার জন্য করা বিও অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ হওয়ার পর বিদেশে কোনও সম্পদ আছে কি না ,তাও খুঁজে দেখার সিদ্ধান্তের পর অনেকেই মনে করছেন পুলিশের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে ঘিরে তৈরি হওয়া আইনি বেড়াজাল ক্রমেই তাকে আরও আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলছে।

বিশেষ করে মি. আহমেদের সম্পদের তদন্তের বিষয়ে ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে যে বক্তব্য এসেছে তাকেও অনেকে ইঙ্গিতপূর্ণ মনে করছেন।

যদিও আবার অনেকের মধ্যে এই সংশয়ও আছে যে শেষ পর্যন্ত এই তদন্ত চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করবে কি-না।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী খুরশিদ আলম খান অবশ্য বলেছেন মি.আহমেদ ও তার পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকেছে দুদক। একই সাথে তাদের আরও কোথাও কোনও সম্পদ আছে কি না বা তারা কোনও টাকাপয়সা সরিয়েছেন কি না, সেটিও গুরুত্ব সহকারে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।

আইনি প্রক্রিয়া আর ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষস্তর থেকে আসা বক্তব্য পর্যালোচনা করে দুর্নীতি বিরোধী সংস্থা টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ডঃ ইফতেখারুজ্জামান মনে করছেন দুদকের আইনজীবীরা যা বলেছেন তাতে এটি নিশ্চিত যে এসব সম্পদ 'বৈধ আয়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়'।

“প্রক্রিয়াটি সঠিকভাবে চললে তার (বেনজীর আহমেদ) স্পেস ছোট হয়ে আসছে। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় পুরো আইনি প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে আদৌ জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে কি না, সেটি নিশ্চিত হওয়া কঠিন। কারণ হতে পারে এটিও কোন বোঝাপড়ার অংশ”, বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

সিনিয়র আইনজীবী শাহদীন মালিক আবার বলছেন জমির মালিকানা ও ব্যাংক লেনদেনের তথ্য থেকেই বৈধ আয় বহির্ভূত সম্পদের অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায় এবং সে কারণে তিনি মনে করেন দুদকের উচিত হবে সুনির্দিষ্ট এমন দু'একটি মামলা করে আদালতে প্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে দ্রুত মি. আহমেদের শাস্তি নিশ্চিত করা।

দুদকের পিপি (পাবলিক প্রসিকিউটর) মীর আহমেদ আলী সালাম বিবিসি বাংলাকে বলছেন যে, “ওনাকে প্রমাণ করতে হবে তার আয় বৈধ। অনুসন্ধানের পর রিপোর্ট আসবে। তার ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশন মামলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবে। মামলা হলে প্রমাণগুলো আদালতে আসবে। তখন তুলনা হবে যে তার বেতন-সহ বৈধ আয় কতো ছিল।”

এপ্রিল মাসে ফেসবুকে একটি ভিডিও বার্তায় বেনজীর আহমেদ দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ মিথ্যা। অবসরের পরে তাকে দুর্নীতিবাজ প্রমাণের চেষ্টা হতাশাজনক ও দুঃখজনক বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

সেই ভিডিও বার্তায় তার বিরুদ্ধে আনা নানা অভিযোগের ব্যাখ্যা ও সম্পদ কীভাবে অর্জন করেছেন, তার পক্ষে বক্তব্য তুলে ধরেছিলেন।

প্রসঙ্গত, বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের ১৫ই এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইজিপি ছিলেন। এর আগে তিনি র‍্যাবের মহাপরিচালকও ছিলেন।

কর্মজীবনে পাঁচবার পুলিশের সর্বোচ্চ পদক ছাড়াও নীতি নৈতিকতার জন্য শুদ্ধাচার পুরস্কারেও তাকে ভূষিত করেছিল সরকার।

সম্প্রতি মি. আহমেদ ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জন বিষয়ক কিছু খবর আসে সংবাদমাধ্যমে। এরপর তার সম্পদ অনুসন্ধানে তিন সদস্যের টিম গঠন করে দুর্নীতি দমন কমিশন।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:
র‍্যাবের ডিজি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন বেনজীর আহমেদ।

ছবির উৎস, Benazir Ahmed/facebook

ছবির ক্যাপশান, র‍্যাবের ডিজি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন বেনজীর আহমেদ।

আইনি প্রক্রিয়া আর রাজনৈতিক বক্তব্য

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের সম্পদ নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে নানা খবর আসলেও দৃশ্যত প্রভাবশালী মি. আহমেদের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রক্রিয়া কতটা অগ্রসর হবে তা নিয়ে অনেকের মধ্যেই সংশয় ছিলো মূলত রাজনৈতিক কারণে।

সে কারণেই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গত ২৪শে মে যখন মি. আহমেদের বিষয়ে মন্তব্য করেন, তখন তা মুহুর্তের মধ্যেই সারা দেশে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

ওবায়দুল কাদের সে দিন বলেন, "সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের ব্যাপারে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত করে বের করছে। দুদক স্বাধীন। এই স্বাধীনতা শেখ হাসিনা দুদককে দিয়েছেন। দুদক জানিয়েছে, বেনজীর আহমেদের অবৈধ সম্পদের বিষয়ে এখনো তদন্ত হচ্ছে এবং আরও তদন্ত হবে।"

“তদন্ত হচ্ছে মানে, মামলা হলে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। কোনও অপরাধী শাস্তি ছাড়া পার পাবেন না শেখ হাসিনার আমলে”, বলেছিলেন তিনি।

ডঃ ইফতেখারুজ্জামানের মতে আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে তার (মি. আহমেদ) জায়গা) ছোট হয়ে আসছে, কিন্তু বিষয়টি এখনও 'কেবল অনুসন্ধান পর্যায়ে'।

ডঃ শাহদীন মালিক অবশ্য বলছেন যে শুধু জমির মালিকানা দলিল এবং ব্যাংকের রেকর্ড, এ দুটো থেকেই পরিষ্কার যে এগুলো তার বৈধ আয়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

“এর ভিত্তিতেই মামলা করে তার শাস্তি দিয়ে এরপর অন্যগুলো নিয়ে অগ্রসর হওয়া উচিত। দুদকের উচিত হবে সুনির্দিষ্ট কয়েকটা মামলা করে আদালতে প্রমাণের মাধ্যমে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে জেলে পোরা এবং অবৈধ সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে জব্দ করা। এরপর বাকিগুলো নিয়ে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ থাকবে। না হলে পুরো বিষয়টিই ঝুলে যেতে পারে”, বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন ড: মালিক।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ

ছবির উৎস, BANGLADESH POLICE

ছবির ক্যাপশান, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ

‘তদন্ত থেকে শুরু হবে অ্যাকশন’

দুদকের পিপি মীর আহমেদ আলী সালাম বিবিসি বাংলাকে বলেছেন এখনও পর্যন্ত যা হচ্ছে সেটি হল তার সম্পদ ক্রোক ও অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ।

“মনে রাখতে হবে যে এখনও অনুসন্ধান চলছে। এরপর মামলা হলে যখন তদন্ত হবে তখন জমির দলিল ও অ্যাকাউন্ট জব্দ করে ডকুমেন্টস হিসেবে আদালতে উপস্থাপন করা হবে। তখন তাকে প্রমাণ করতে হবে যে তার সম্পদ বৈধ আয় দিয়ে হয়েছে। এরপর আদালত সিদ্ধান্ত দিবেন”, বিবিসি বাংলাকে জানান তিনি।

মূলত তদন্ত পর্যায়েই আদালত তার সম্পদ সরকারকে জব্দ করার নির্দেশ দিতে পারেন। তবে এখনও পর্যন্ত যে নির্দেশ এসেছে তাতে প্লট বা ফ্ল্যাট-সহ সম্পদ যে অবস্থায় আছে সে অবস্থাতেই থাকবে।

“হয়তো এখনও অনেক তথ্য আছে যেগুলো জানা যায়নি। অনুসন্ধানকারী দল তাদের অনুসন্ধান শেষে রিপোর্ট দিলে সে সম্পর্কে জানা যাবে”, বলছিলেন মি. সালাম।

ওদিকে দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান জানিয়েছেন বেনজীর আহমেদের আরও কোনও সম্পদ আছে কি না, বা অন্য কোথায় টাকা সরানো হয়েছে কি না তাও গুরুত্ব সহকারে পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হচ্ছে।

“ওনাদের দুদক ডেকেছে। জিজ্ঞাসাবাদ করবে। কমিশন নাও ডাকতে পারত। তবু ন্যায় বিচারের স্বার্থে এবং কেউ যাতে সুষ্ঠু বিচার থেকে বঞ্চিত না হয়, পাশাপাশি সুষ্ঠু অনুসন্ধানে যেন ব্যাঘাত না ঘটে সেজন্যই তাদের ডাকা হয়েছে”, বলছিলেন তিনি।

প্রসঙ্গত, দুদক আগামী ৬ই জুন বেনজীর আহমেদকে এবং ৯ই জুন তার স্ত্রী ও সন্তানদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকে পাঠিয়েছে।

মি. আহমেদের সম্পদ অনুসন্ধানে গত মাসে কাজ শুরু করে দুদকের তিন সদস্যের একটি কমিটি
ছবির ক্যাপশান, মি. আহমেদের সম্পদ অনুসন্ধানে গত মাসে কাজ শুরু করে দুদকের তিন সদস্যের একটি কমিটি

এদিকে গত মঙ্গলবারই বেনজীর আহমেদ, তার স্ত্রী জীশান মির্জা ও ছোট মেয়ে তাহসিন রাইসা বিনতে বেনজীরের নামে থাকা শেয়ার বাজারের সব বেনিফিশিয়ারি ওনার্স অ্যাকাউন্ট (বিও হিসাব) ফ্রিজ করে রাখার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

সিনিয়র আইনজীবী শাহ্দীন মালিক বলছেন কতটা অবৈধ কাজ মি আহমেদ করেছেন তার সব কিছুর হদিস বের করার কঠিন হবে।

“তবে আপাতত তদন্ত কর্মকর্তারা যা পেয়েছেন সেখানে জমির মালিকানা কিংবা ব্যাংক লেনদেনের রেকর্ড থেকেই পরিষ্কার যে এগুলো তার বৈধ আয়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এর ভিত্তিতেই আদালতের মাধ্যমে তার শাস্তি নিশ্চিত হওয়া দরকার। বাকিগুলো নিয়ে দুদক পরেও অগ্রসর হতে পারবে”, বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন শাহদীন মালিক।

আইনজীবীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী এখনও পর্যন্ত আদালত বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের যে সব সম্পদ জব্দ বা ফ্রিজ করার নির্দেশ দিয়েছেন তার মধ্যে আছে ঢাকার গুলশানে চারটি ফ্ল্যাট, ৩৩টি ব্যাংক হিসেব, তিনটি শেয়ার ব্যবসার বিও অ্যাকাউন্ট, প্রায় ৬২১ বিঘা জমি, উনিশটি কোম্পানির শেয়ার এবং ত্রিশ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র।

এ পর্যন্ত তদন্তকারীরা ঢাকা, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও কক্সবাজারে বেনজীর আহমেদ এবং তার স্ত্রী ও তিন মেয়ের মালিকানাধীন জমির সন্ধান পেয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ১১২ একর জমি তার নিজ জেলা গোপালগঞ্জে।

পাশাপাশি মি. আহমেদ বা তার পরিবারের সদস্যদের বিদেশে সম্পদ আছে কি না, তা জানতে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে (বিএফআইইউ) চিঠি দিয়েছে দুদক।