'টাকা দিয়েও গ্যাস পাচ্ছি না'- সিলিন্ডার গ্যাস সংকটে দিনভর ভোগান্তি

- Author, সজল দাস
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
দেশজুড়ে গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি সিলিন্ডার নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই বাড়তি ভোগান্তির কারণ হয়- বিক্রির ক্ষেত্রে কমিশন বৃদ্ধি, বিইআরসির একতরফা দাম ঘোষণা বন্ধ করাসহ ছয় দফা দাবিতে এলপিজি ব্যবসায়ীদের ডাকা ধর্মঘট।
এমন প্রেক্ষাপটে জ্বালানী খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বা বিইআরসি'র সঙ্গে বৈঠকের পর ধর্মঘট প্রত্যাহার করেছেন এলপিজি ব্যবসায়ীরা।
তবে, এলপিজি সংকটে সপ্তাহজুড়ে চলা গ্রাহক ভোগান্তি বৃহস্পতিবার ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটের কারণে চরমে পৌঁছায়। আগে থেকে প্রস্তুতি না থাকায় রান্না বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক বাসায়।
সিলিন্ডার গ্যাস না পেয়ে বৈদ্যুতিক চুলা অথবা কাঠের চুলায় রান্নার কাজ সারতে দেখা গেছে অনেক পরিবারকে।
সরেজমিন রাজধানীর উলন এলাকায় খালি সিলিন্ডার নিয়ে দোকানে দোকানে ঘুরতে দেখা যায় ব্যবসায়ী মাসুদুল হাসানকে।
বাসার গলিতে কিংবা আশপাশের এলাকায় অন্তত পাঁচজন খুচরা ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগাযোগ করেও এলপিজি সিলিন্ডারের ব্যবস্থা করতে পারেননি তিনি।
মি. হাসান বিবিসি বাংলাকে বলেন, "গত সপ্তাহে গ্যাস কিনেছি আড়াই হাজার টাকায়, এখন তো টাকা দিয়েও গ্যাস পাচ্ছি না। এদিকে কোথাও সিলিন্ডার নাই।"
একই অবস্থা ওই এলাকার আরেক বাসিন্দা রিয়া আক্তারের। আট জনের পরিবারে রান্নার জন্য এলপিজি সিলিন্ডারই বড় ভরসা তার। সরেজমিন মিজ আক্তারের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, গ্যাসের সংকট থাকায় বাচ্চাদের খাবার আগে তৈরি করছেন তিনি।
রিয়া আক্তার জানান, গেল সপ্তাহজুড়েই গ্যাসের তীব্র সংকট থাকায় ভোগান্তিতে দিন কাটছে। "ফ্লাট বাসায় লাইন গ্যাস নাই, সিলিন্ডার গ্যাসই ভরসা। সিলিন্ডারে গ্যাস প্রায় শেষ তাই বাচ্চাদের খাবার আগে তৈরি করছি, কখন শেষ হয়ে যায়," বলেন তিনি।
সিলিন্ডার গ্যাসের সংকট প্রভাব ফেলেছে অলিগলির রেস্তোরা কিংবা চায়ের দোকানেও। গ্যাস না থাকায় বৃহস্পতিবার সকাল থেকে রেস্তোরা বন্ধ রেখেছেন রামপুরা ডিআইটি রোডের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ হাবিব।
তিনি বলছেন, এক সপ্তাহ জুড়েই গ্যাস নিয়ে সংকটে আছেন তিনি। সিলিন্ডারের আকার ভেদে দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকার পর্যন্ত সিলিন্ডার কিনেছন তিনি।
"চার দিন আগে ছোট সিলিন্ডার কিনছি দুই হাজার টাকায় বড়টা কিনছি সাড়ে তিন হাজারে, গতকাল গ্যাসের দোকানে খোঁজ নিছি বড়টার দাম কয় পাঁচ হাজার টাকা। আজকে আর ফোনই রিসিভ করে না," বলেন মি. হাবিব।

ব্যবসায়ীদের আন্দোলন কেন?
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
রাজধানীর রামপুরা, মগবাজার, কুড়িলসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় সরেজমিন দেখা গেছে, সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বেশিরভাগ দোকানই বন্ধ রয়েছে।
বেশ কয়েকজন ডিলারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা এ নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
রামপুরা এলাকায় মেসার্স রোজি এন্টার প্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার বিবিসি বাংলাকে জানান, "কোম্পানি থেকে সাপ্লাই নাই তাই আমরা গ্যাস দিতে পারছি না, এর বাইরে আমার কিছু জানা নাই।"
গ্যাস সিলিন্ডার সংকটের কারণে দোকান বন্ধ রেখেছেন খুচরা ব্যবসায়ীরাও। তারা বলছেন, ধর্মঘটের কারণে বড় ব্যবসায়ী কিংবা ডিলারদের কাছ থেকে কোনো সরবরাহ পাচ্ছেন না তারা।
মগবাজার এলাকার ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শওকত বিবিসি বাংলাকে বলেন, "গত কয়দিন চাহিদা কুড়িটা থাকলে সিলিন্ডার দেয় দুইটা, পাঁচটা। আজকে তো পুরাই বন্ধ করে দিছে ডিলাররা। অনেকেই ফোন দিচ্ছেন কিন্তু দিতে পারছি না, তাই দোকান বন্ধ করে রাখছি।"
এলপিজি সিলিন্ডার নিয়ে সাধারণ মানুষের তীব্র ভোগান্তীর মধ্যেই বৃহস্পতিবার ২৪ ঘণ্টার ধর্মঘটের ডাক দেয় এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি।
গত বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত কর্মসূচি থেকে ধর্মঘটের ঘোষণা দেন এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি।
কমিশন বৃদ্ধি, বিইআরসির একতরফা দাম ঘোষণা বন্ধ করাসহ ছয় দফা দাবিতে এই ধর্মঘটের ঘোষণা দেয় তারা।
বৃহস্পতিবার দিনভর ভোগান্তির পর ব্যবসায়ী, রিটেইলারসহ সব পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করে দেশের জ্বালানী খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসি। বৈঠকের পর ধর্মঘট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেন ব্যবসায়ীরা।
এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি সেলিম খান বিবিসি বাংলাকে জানান, "বিইআরসি আমাদের যৌক্তিক দাবি মেনে নেওয়ায় ধর্মঘট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা।"
তবে এলপি গ্যাসের সংকটের মধ্যেই পরিবেশকদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করে বিইআরসি গ্যাসের যে নতুন দাম নির্ধারণ করেছে, সেটি ঠিক হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মি. খান বলেন, "বিইআরসি মাসে একবার মূল্য ঘোষণা করলেও কোম্পানিগুলো একাধিকবার মূল্য সমন্বয় করে, যার পুরো দায় পরিবেশকদের বহন করতে হয়। এসব সমস্যা সমাধানে আশ্বাস পেয়েই আমরা ধর্মঘট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।"
এদিকে, এলপি গ্যাস নিয়ে চলমান সংকট নিরসনে সরকার, আমদানিকারক এবং ব্যবসায়ীসহ সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানান বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ।
বৃহস্পতিবার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি জানান, "সরকারের কাছে আমদানির উর্ধ্বসীমা শিথিল করার জন্যও বলা হয়েছে। বিকল্প উৎস থেকে দ্রুত যেন আমদানি করা যায় সে বিষয়ে মালিকপক্ষের কাছে আহ্বান জানানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।"

ছবির উৎস, Screen Grab
ঘাটতি নেই, কারসাজি হয়েছে
সিলিন্ডার গ্যাসের সরবরাহ এবং এই খাতের সংকট নিরসনে এলপিজি ব্যবসায় জড়িতদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছে সরকার।
গ্যাস ব্যবসায়ীদের চলমান ধর্মঘট এবং ভবিষ্যত আন্দোলনের যে ঘোষণা তারা দিয়েছে, এমন প্রেক্ষাপটে বৃহস্পতিবার বিকেলে আবারও এই খাতের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন।
এর আগে মঙ্গলবার সকালে সচিবালয়ে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকের পর, গ্যাসের দাম নিয়ে জ্বালানি সচিব এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বা বিইআরসি এর চেয়ারম্যানের সঙ্গেও বৈঠক করেছিলেন জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান।
সেদিন গণমাধ্যমকে তিনি জানিয়েছিলেন, ব্যক্তি খাতের কারসাজির কারণেই বাসাবাড়িতে রান্নার কাজে ব্যবহৃত সিলিন্ডার গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।
জানান, "এলপিজি যারা আমদানি করে তারা আশা করছিল যে এলপিজির দাম বাড়বে, বিইআরসি ৫৩ টাকা না কত টাকা বাড়িয়েছে। তো এইটার অনেকে সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছে"।
তিনি বলেন, আমদানি গত মাসের তুলনায় এ মাসে বেশি, সুতরাং এ ধরনের ঘাটতি হওয়ার কথা না।
কারসাজির মাধ্যমেই অস্বাভাবিকভাবে দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, জেলা প্রশাসন এবং পুলিশের মাধ্যমে সরকার ব্যবস্থা নিচ্ছে বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।
উপদেষ্টার এই ঘোষণার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে বাড়তি দাম নেওয়ায় বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ীকে জরিমানাও করে প্রশাসন। এ নিয়েও ক্ষোভ জানিয়েছিলেন ব্যবসায়ীরা।
গত চৌঠা জানুয়ারি ভোক্তাপর্যায়ে বেসরকারি খাতের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের কেজিতে চার টাকা ৪২ পয়সা বাড়িয়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম এক হাজার ৩০৬ টাকা নির্ধারণ করে বিইআরসি।
যদিও এর আগে থেকেই খুচরা বাজারে সরকার নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ জানিয়ে আসছিলেন সাধারণ ভোক্তারা।








