আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
গোপালগঞ্জে পরিস্থিতি 'স্বাভাবিক' দাবি প্রশাসনের, 'গ্রেফতার-আতঙ্কে' রাস্তায় মানুষ কম
বাংলাদেশের গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির কর্মসূচিকে ঘিরে সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। তবে ঘটনার তিন দিন পর এখন পরিবেশ স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
কারফিউ শিথিল থাকায় আজ লোকজন ও যানবাহন কিছুটা চোখে পড়েছে, যদিও গ্রেফতার আতঙ্কের কারণে পুরুষদের বাইরে কমই দেখা গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সাংবাদিকরা।
জেলা প্রশাসন শুক্রবার রাতেই ঘোষণা করেছিলো, কারফিউ শনিবার সকাল ছয়টা থেকে রাত এগারটা পর্যন্ত শিথিল থাকবে।
"পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। তবে দুষ্কৃতকারীদের খোঁজে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রুহুল আমিন সরকার।
প্রসঙ্গত, বুধবার দুপুর দেড়টার দিকে গোপালগঞ্জের পৌরপার্ক এলাকায় আয়োজিত এনসিপি'র সমাবেশস্থলে হামলার ঘটনা ঘটেছিলো।
এ ঘটনার জের ধরে প্রথমে ১৪৪ ধারা ও পরে কারফিউ জারি করেছিলো প্রশাসন। মাঝে শুক্রবার কয়েক ঘণ্টার বিরতি দিয়ে আজ সকাল পর্যন্ত কারফিউ বহাল ছিল।
এদিকে গোপালগঞ্জে একটি রাজনৈতিক সমাবেশকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও প্রকাশ্যে গুলি চালনার ঘটনায় পাঁচ জন নিহত এবং অনেকে আহত হওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ (এইচআরএফবি)।
আজকের পরিস্থিতি কেমন
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রুহুল আমিন সরকার জানিয়েছেন, জনজীবন এখন অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছে বলেই তারা দেখতে পাচ্ছেন।
সাংবাদিকসহ স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে যে, কারফিউ শিথিল থাকায় আজ সকাল থেকেই লোকজনকে বাইরে আসতে দেখা গেছে। জেলা সদর ছাড়াও উপজেলাগুলোতেও গত কয়েকদিন যে থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছিলো তা এখন আর অনেকটাই নেই বলে জানিয়েছেন তারা।
মূলত সংঘর্ষের পর কারফিউ জারি করা হলে অচল হয়ে পড়েছিলো সেখানকার জনজীবন। এর মধ্যেই পুলিশি অভিযানের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিলো জেলাজুড়ে।
সেই অবস্থা কাটিয়ে আজ কারফিউ শিথিল হওয়ার পর সকাল থেকেই কাঁচামালের দোকানসহ ছোটো ছোটো দোকানপাট আজ খুলতে দেখা গেছে।
তবে শনিবার শহরের কিছু মার্কেটের সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় সেগুলো বন্ধ ছিল। এর বাইরে অন্য মার্কেট ও দোকানপাটগুলো খুলেছে।
শহরের বিসিক এলাকা, কাঁচাবাজার, লঞ্চঘাট এলাকাসহ যেসব এলাকা জনসমাগম বেশি দেখা যায় সেগুলো কয়েকদিনের বিরতির পর পুরনো চেহারা ফিরে পেতে শুরু করেছে।
শহর ও উপজেলাগুলোয় রিকশা-অটো রিকশা চলাচল গতকাল পর্যন্ত ছিল খুব কম। আজ সকাল থেকে সেই চিত্রও পাল্টেছে।
"তবে গ্রেফতার-আতঙ্ক পুরোপুরি না কাটায় অনেকে ঘরবাড়ি থেকে বের হননি। বিশেষ করে পুরুষরা," বলছিলেন স্থানীয় একজন সাংবাদিক।
তিনি জানান, মূলত শ্রমজীবী বা অল্প আয়ের মানুষজন কাজের জন্যই ঘর থেকে বেরিয়েছে বেশি।
কিন্তু এ সত্ত্বেও তিনদিনের কারফিউয়ের পর অনেকটা স্বস্তি নিয়ে ঘরের বাইরে এসেছেন সেখানকার মানুষ। চায়ের দোকানগুলোতেও লোকজনের ভিড় দেখা গেছে।
তবে কোথাও কোথাও বাজার করতে আসা নারীরা সংবাদকর্মীদের বলেছেন, গ্রেফতার আতঙ্ক-থাকায় তারা তাদের বাড়ির পুরুষ সদস্যদের বাজারে আসতে দেননি।
যদিও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রুহুল আমিন সরকার বলেছেন, সাধারণ কোনো মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হয় সে বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই তারা কাজ করছেন।
ওদিকে জনসমাগম বাড়ার পাশাপাশি যানবাহন চলাচলও স্বাভাবিক হয়ে আসায় এলাকায় ধীরে ধীরে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসতে শুরু করেছে।
এর আগে গতকাল পর্যন্ত গোপালগঞ্জ থেকে দূরপাল্লার বাস চলাচল ছিল খুবই কম। অল্প কিছু বাস চলাচল করায় লোকজনকে অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে ঢাকা বা অন্য গন্তব্যে যেতে হয়েছে। স্থানীয় সাংবাদিকরা বলছেন, শহরের ভেতরেও যান চলাচল যেমন বেড়েছে তেমনি দূরপাল্লার বাস চলাচলও অনেক স্বাভাবিক হয়ে এসেছে।
এদিকে জেলার তিনটি থানায় পুলিশের করা তিন মামলায় আড়াই হাজারের বেশি ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের গোপালগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ৩০৪ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
সহিংসতার ঘটনায় দায়ের করা এসব মামলায় এ পর্যন্ত ১৬৪ জনকে আটক করা হয়েছে বলেও পুলিশ জানিয়েছে।
সেদিন কী ঘটেছিল
পহেলা জুলাই থেকে দেশব্যাপী শুরু হওয়া 'দেশ গড়তে জুলাই পদযাত্রা' কর্মসূচির অংশ হিসেবে মঙ্গলবার 'মার্চ টু গোপালগঞ্জ' কর্মসূচি ঘোষণা করে এনসিপি।
তাদের এই কর্মসূচিকে ঘিরে ওইদিন রাত থেকেই জেলাটিতে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। এরপরও বুধবার সমাবেশের আয়োজন করা হয় গোপালগঞ্জ শহরের পৌর পার্ক এলাকায়।
কিন্তু এনসিপি'র কেন্দ্রীয় নেতারা সেখানে পৌঁছানোর আগেই সমাবেশস্থলে হামলার ঘটনা ঘটে। সমাবেশ শেষে ফেরার পথে গোপালগঞ্জ সরকারি কলেজের সামনে আবারো হামলার মুখে পড়ে এনসিপি'র কেন্দ্রীয় নেতাদের গাড়িবহর। যা পরবর্তীতে রূপ নেয় সহিংস সংঘাতে।
কয়েক ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর পুলিশ ও সেনাবাহিনীর কড়া নিরাপত্তায় গোপালগঞ্জ ছেড়ে খুলনার দিকে রওয়ানা দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতারা।
এদিন দুপুর থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে হামলাকারীদের দফায় দফায় সংঘর্ষে ঘটে হতাহতের ঘটনা। যে পরিস্থিতি মোকাবিলায় ওই দিন সন্ধ্যা থেকেই গোপালগঞ্জে ঘোষণা করা হয় কারফিউ।
পুলিশ দাবি করে, তারা গোপালগঞ্জে প্রাণঘাতী কোনো অস্ত্র ব্যবহার করেনি। আর আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের এক বিবৃতিতে বলা হয়, আত্মরক্ষার্থে বাধ্য হয়ে বলপ্রয়োগ করেছে সেনাবাহিনী।
বুধবার দিন রাতে গোপালগঞ্জের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. জীবিতেশ বিশ্বাস জানিয়েছিলেন, সংঘর্ষের ঘটনা চারটি মৃতদেহ হাসপাতালে এসেছে।
পরে শুক্রবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরেকজন মারা গেছেন।
গোপালগঞ্জে নিহত চারজনের ময়নাতদন্ত না হওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসে। এ নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য দিয়েছে নিহতদের স্বজনরা এবং পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
পুলিশের দেওয়া প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, উচ্ছৃঙ্খল জনতার কারণেই মৃতদেহগুলোর ময়নাতদন্ত করা সম্ভব হয়নি। তারা আগেই মৃতদেহ নিয়ে গেছে।
তবে নিহতদের স্বজনরা বলছেন, ঘটনার দিন হাসপাতাল কিংবা প্রশাসন থেকে কোনো সহায়তা পাননি তারা। বাধ্য হয়েই ময়নাতদন্ত ছাড়া মরদেহের শেষকৃত্য করা হয়েছে বলেও দাবি তাদের।
ওদিকে গোপালগঞ্জে সহিংসতায় নিহতদের প্রয়োজন হলে ময়নাতদন্ত করা হবে বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।
"ঢাকার যেটা আছে সেটার ময়নাতদন্ত হচ্ছে। আর কয়েকটা ডেডবডি তারা নিজেরা নিয়ে চলে গেছে, ময়নাতদন্ত কীভাবে হবে? ওইগুলোর যদি দরকার হয়, ময়নাতদন্ত হবে। প্রয়োজনে উত্তোলন করেও ময়নাতদন্ত করা যায়," ঢাকায় সাংবাদিকদের বলেছেন তিনি।