আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
গোপালগঞ্জে সংঘর্ষের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
জাতীয় নাগরিক পার্টি- এনসিপির মার্চ টু গোপালগঞ্জ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বুধবার দিনভর সংঘর্ষ ও নিহতের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষ করে, সহিংসতায় চারজন নিহত এবং বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানোর বিষয়টি নিয়ে যেমন আলোচনা চলছে, আবার এনসিপির নেতাকর্মীদের যথাযথ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়নি বলেও অভিযোগ তুলেছে দলটি।
যদিও পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়িতে করেই গোপালগঞ্জ ছাড়েন এনসিপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা।
হামলাকারীদের থামাতে তাদের দেশীয় অস্ত্রের বিপরীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট ব্যবহার করেছে বলে জানিয়েছেন ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিকরা।
পুলিশ বলছে, তারা আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য "নিয়মমতো যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে"।
তবে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনায় 'পুলিশের তৎপরতা দেখা যায়নি' উল্লেখ করে এক বিবৃতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী।
যা দেখেছেন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তিরা
'দেশ গড়তে জুলাই পদযাত্রা'র অংশ হিসেবে ১৬ই জুলাই গোপালগঞ্জ যাওয়ার ঘোষণা দেয় এনসিপি। তবে অন্য জায়গায় হওয়া পদযাত্রা কর্মসূচির নাম জেলাটির ক্ষেত্রে বদলে রাখা হয় 'মার্চ টু গোপালগঞ্জ'।
তবে এনসিপির নেতাকর্মীদের গাড়িবহর জেলাটিতে প্রবেশের আগেই সকাল বেলা পুলিশের গাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে। এতে চার পুলিশ সদস্য আহত হন।
এদিকে নিজেদের সিদ্ধান্তে অনড় থেকে কর্মসূচি চালিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এনসিপি। তবে শীর্ষ নেতারা আসার আগেই গোপালগঞ্জ শহরের পৌর পার্ক এলাকায় সমাবেশস্থলে হামলার ঘটনা ঘটে। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীবেষ্টিত হয়েই মঞ্চে যান এনসিপি নেতারা।
এসময় সেখানে উপস্থিত সাংবাদিক সরদার রনি বিবিসি বাংলাকে জানান, নাহিদের বক্তব্য দেওয়ার এক পর্যায়ে ককটেল বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পান তারা।
এসময় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম প্রোগ্রাম দ্রুত শেষ করতে সদস্য সচিব আখতার হোসেনকে ইশারা করেন।
এরমধ্যেই চারিদিক থেকে ইট-পাটকেল ছোঁড়া শুরু হয়। এসময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্য দিয়ে এনসিপি-নেতাদের পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
পরে পুলিশ ও হামলাকারীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। হামলাকারীদের হটাতে সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল ছোঁড়ে পুলিশ।
এক পর্যায়ে সেনাবাহিনীর সদস্যরাও সংঘর্ষে জড়ায়। এসময় তাদের ওপরের দিকে ফাঁকা গুলি ছুঁড়তে দেখা গেছে বলে জানান মি. রনি। তবে 'কাউকে টার্গেট করে' কিংবা 'পুলিশ সদস্যদের' কোনো গুলি ছুঁড়তে দেখেননি তিনি।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক স্থানীয় সাংবাদিক জানিয়েছেন, পুলিশ সদস্যদেরও তারা গুলি ছুঁড়তে দেখেছেন।
'পুলিশ খুব ভীত ছিল'
উত্তেজনার মধ্যেই বিকেল পাঁচটার দিকে পুলিশ সেনাবাহিনীর এপিসিতে (আর্মার্ড পার্সোনেল ক্যারিয়ার) করে গোপালগঞ্জ ছাড়েন সুপারের কার্যালয়ে অবস্থান নেওয়া এনসিপি নেতারা।
তারা গোপালগঞ্জ থেকে বেরিয়ে রাত ৯টার দিকে খুলনা থেকে সংবাদ সম্মেলন করেন। এসময় হামলার জন্য আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগকে দায়ী করেন তারা।
এছাড়াও পুলিশ ক্লিয়ারেন্স নিয়ে যাওয়ার পরও হামলার ঘটনায় "প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ" প্রকাশ করেন দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
অনেকটা একই কথা বলেন দলটির আরেক নেতা সারজিস আলম। বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করেনি।
সহিংসতার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যে কঠোর ভূমিকায় দেখা গেছে, তা আগেই কেন নেওয়া হলো না, এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি।
"হাইয়ার অথরিটি (ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষ) থেকে যখন এটা পর্যবেক্ষণ করা শুরু হলো, আশেপাশের জেলা থেকে ফোর্স এখানে মুভ করা শুরু হলো - তারপর তারা অ্যাক্টিভ রোল প্লে (সক্রিয় ভূমিকা পালন) করা শুরু করলো," বলেন তিনি।
ঘটনা ঘটার পরে সেনাবাহিনীকে সক্রিয় ভূমিকায় দেখা গেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে তার আগে "পুলিশ বা স্থানীয় গোয়েন্দা সংস্থার যে অ্যাক্টিভ রোল প্লে করার কথা ছিল, সেটা তারা করে নাই" বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
সারজিস আলমের দাবি, সমাবেশস্থলে হামলা করার পর তাদের প্রতিহত করার পরিবর্তে পুলিশ নিজেই সেখান থেকে সরে গেছে।
হামলার প্রাথমিক পর্যায়ে পুলিশের ভূমিকা দুর্বল ছিল বলে জানিয়েছেন একজন স্থানীয় সাংবাদিকও। তিনি বলছেন, আচমকা হামলার জন্য পুলিশ সদস্যদের প্রস্তুত দেখা যায়নি।
একইসাথে হামলাকারীদের তুলনায় পুলিশ সদস্যদের সংখ্যা কম থাকায় প্রথমে তারা পিছু হটে যান। পরে বাইপাস সড়কের কাছে টহলে থাকা সেনাবাহিনীর সদস্যদের কাছে বার্তা গেলে, তারাও ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন বলে জানান ওই সাংবাদিক।
এসময় সেনাবাহিনী ও পুলিশ যৌথভাবে হামলাকারীদের প্রতিহত করার চেষ্টা করে।
এনসিপি নেতারা চলে যাওয়ার পরে লঞ্চঘাট থেকে পুলিশ লাইনে যাওয়ার পথে ত্রিমুখী হামলার মুখে পড়েছিলেন মি. রনিসহ আরও চারজন সাংবাদিক।
তার মতে, এসময় "পুলিশ রীতিমতো হতভম্ব এবং খুবই ভীত ছিল"।
অপর পক্ষ থেকে ইট পাটকেল ছোঁড়া হচ্ছিল এবং পুলিশ ভয়ে পালাচ্ছিল, এমনটা প্রত্যক্ষ করেছেন বলেও জানান তিনি।
মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন ও পুলিশের বক্তব্য
গোপালগঞ্জে সংঘর্ষের ঘটনায় চারজন নিহত হওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে বিবিসি বাংলা।
এছাড়া এনসিপির তিনজন আহত ও বহরের ছয়টি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানান নাহিদ ইসলাম।
তবে সহিংসতায় নিহত ও আহতদের অনেকে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলে খবর এসেছে গণমাধ্যমে। ফলে সংঘর্ষের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো 'গোপালগঞ্জ জেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে পুলিশের প্রতিবেদন' শীর্ষক এক বিবৃতিতে বলা হয়, সেনাবাহিনী ও পুলিশ উচ্ছৃঙ্খল জনতাকে বোঝানোর চেষ্টা করে। কিন্তু তারা কোনো কথা না শুনে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে এবং দেশীয় অস্ত্র নিয়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনীসহ এনসিপির নেতা কর্মীদের ওপর আক্রমণ করে। এছাড়া নাশকতাকারীরা গোপালগঞ্জ জেলা কারাগার সহ অন্যান্য সরকারি স্থাপনায় হামলা করে।
এসময় সংঘর্ষে চারজন নিহত হন, প্রায় ৪৫ জন পুলিশ সদস্য ও সাংবাদিকসহ প্রায় অর্ধশতাধিক লোকজন আহত হন বলেও জানানো হয়েছে এতে।
এ নিয়ে জানতে চাইলে ঢাকা রেঞ্জের ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল - ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমি এখানে (গোপালগঞ্জে) আসার পরে পুলিশ সুপারের সাথে কথা বলেছি এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যারা রয়েছেন, বিশেষ করে পুলিশ, তারা সবাই তাদের নিয়মমতো এবং যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য তারা শান্তিপূর্ণভাবে কাজ করেছে"।
একইসাথে সহিংসতার আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি, এমন অভিযোগের সত্যতা তদন্ত করা হবে বলেও জানান তিনি।
সেনাবাহিনী আত্মরক্ষার্থে বল প্রয়োগে বাধ্য হয়- আইএসপিআর
গোপালগঞ্জে সেনাবাহিনী আত্মরক্ষার্থে বলপ্রয়োগে বাধ্য হয় বলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)।
বুধবার গোপালগঞ্জের ঘটনা প্রসঙ্গে বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সেনাবাহিনী হামলাকারীদের মাইকে বারংবার ঘোষণা দিয়ে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করলে তারা সেনাবাহিনীর ওপর বিপুল সংখ্যক ককটেল ও ইট পাটকেল ছুড়ে হামলা করে এবং এক পর্যায়ে সেনাবাহিনী আত্মরক্ষার্থে বলপ্রয়োগে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে, সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশ যৌথভাবে বিশৃঙ্খলাকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
এতে বলা হয়, "গোপালগঞ্জ জেলায় একটি রাজনৈতিক দলের জুলাই পদযাত্রার অংশ হিসেবে আহ্বানকৃত জনসমাবেশকে কেন্দ্র করে এলাকার একদল উচ্ছৃঙ্খল জনতা গত ১৬ জুলাই সংঘবদ্ধভাবে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। এ ঘটনায় প্রাথমিকভাবে কয়েকজন পুলিশ সদস্য ও সাংবাদিক আহত হন।"
"এছাড়া শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও সরকারি যানবাহনে ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হওয়ায় সেনাবাহিনী ও স্থানীয় পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে হস্তক্ষেপ করে এবং প্রাথমিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়।"
"উক্ত রাজনৈতিক সংগঠনের সমাবেশ চলাকালীন মঞ্চে পুনরায় হামলা চালানো হয় এবং একই সঙ্গে জেলা কারাগারে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়। সেনাবাহিনীর সার্বিক তত্ত্বাবধানে গোপালগঞ্জ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আশ্রয় গ্রহণকারী ব্যক্তিবর্গকে খুলনায় স্থানান্তর করা হয়। সর্বোপরি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পেশাদারিত্ব ও ধৈর্যের সাথে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়"- বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইএসপিআর জানিয়েছে, বর্তমানে গোপালগঞ্জ জেলায় সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক এবং প্রশাসনের জারি করা কারফিউ চলমান রয়েছে। সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, র্যাব এবং প্রশাসনের অন্যান্য সংস্থাগুলো ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় রেখে কাজ করে যাচ্ছে।
গতকাল বুধবার সকাল থেকে চলমান এই রাজনৈতিক সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলায়, গোপালগঞ্জ জেলার জনসাধারণও অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে নিজেদের নিবৃত্ত রেখে সেনাবাহিনীকে সহায়তা করেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে বিজ্ঞপ্তিতে।