শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যে মামলায় রায় আজ

ছবির উৎস, Getty Images
গত বছরের জুলাই-অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় সংগঠিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে করা মামলার রায় ঘোষণা হবে আজ।
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই রায় ঘোষণা করবেন।
এর আগে গত ১৩ই নভেম্বর রায় ঘোষণার তারিখ জানিয়েছে আদালত।
এই মামলায় শেখ হাসিনা ছাড়া বাকি দুই আসামি হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এবং পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন।
আসামিদের মধ্যে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান পলাতক।
সাবেক আইজিপি মি. মামুন এই মামলার একমাত্র গ্রেফতারকৃত আসামি। তিনি এই মামলায় অ্যাপ্রুভার বা রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ইতিহাসে কোনো আসামির এ ধরনের "অ্যাপ্রুভার" বা রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদনের ঘটনা এটাই প্রথম বলে সেসময় জানিয়েছিলেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।
একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এই ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর এই ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়।
পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালেই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় প্রথম মামলা (মিসকেস বা বিবিধ মামলা) হয়।
গত বছরের ১৭ই অক্টোবর পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালের প্রথম বিচার কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। ওইদিনই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এ মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে ট্রাইব্যুনাল।
ওইসময় শেখ হাসিনাই মামলাটির একমাত্র আসামি ছিলেন।
পরে এ বছরের মার্চে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সাবেক আইজিপিকে এ মামলায় আসামি করতে প্রসিকিউশনের করা আবেদন মঞ্জুর করে ট্রাইব্যুনাল।

ছবির উৎস, BBC/TANVEE
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
এ বছরের ১২ই মে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।
এই মামলায় শেখ হাসিনাসহ আসামিদের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ এনে প্রতিবেদন জমা দেয় তদন্ত সংস্থা।
শেখ হাসিনা 'মাস্টারমাইন্ড, হুকুমদাতা ও সুপিরিয়র কমান্ডার' হিসেবে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংগঠিত করেছেন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরে গত পহেলা জুন শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন।
ওইদিন অভিযোগ আমলে নিয়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
তাদের গ্রেফতার করা সম্ভব না হলে হাজির হতে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিতে ১৬ জুন নির্দেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল।
বিজ্ঞপ্তি জারির পরও হাজির না হলে ২৪শে জুন তাদের দুই জনের জন্য ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৮-এর সাবেক বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর আমির হোসেনকে তাদের পক্ষে মামলা লড়তে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ দেয় ট্রাইব্যুনাল।
এ বছরের পহেলা জুলাই তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি শুরু হয়।
ওইদিন শুনানির শুরুতে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম ট্রাইব্যুনালকে জানান, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের সময় ২০০৯ সালের ছয়ই জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্ট পর্যন্ত।
মি. ইসলাম তার বক্তব্য উপস্থাপনের সময় একটা বড় অংশ জুড়ে শেখ হাসিনার বাবা বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের প্রসঙ্গে কথা বলেন।
শেখ হাসিনার 'কৃত অপরাধের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য' বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, " বাংলাদেশে আজীবন ক্ষমতা ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষা ছিল শেখ হাসিনার। তার পিতাও চেয়েছিল এমনটা।"
পরে ১০ই জুলাই তিন আসামির বিরুদ্ধে পাঁচ অভিযোগে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার শুরুর নির্দেশ দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
তিন আসামির বিরুদ্ধে ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়, ষড়যন্ত্র, উস্কানি, হত্যা, পরিকল্পনাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের পাঁচটি অভিযোগ গঠন করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে পাঁচটি মামলার বিচার চলছে। তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের কোনো মামলায় বিচার শুরুর প্রথম ঘটনা এটি।
ওইদিনই ( ১০ই জুলাই) সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে মামলাটিতে 'অ্যাপ্রুভার' হওয়ার আবেদন করেন।
সেদিন কাঠগড়ায় থাকা এ মামলার একমাত্র গ্রেফতারকৃত আসামি পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের কাছে অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে চায় ট্রাইব্যুনাল।
কাঠগড়ায় থাকা সাদা-কালো চেকশার্ট পরিহিত মি. মামুন তার বক্তব্য জানান।

ছবির উৎস, Getty Images
চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে মাইক্রোফোনে কথা বলেন মি. মামুন। ইংরেজিতে তিনি দায় স্বীকার করার কথা জানান।
আদেশের পরে এক সংবাদ সম্মেলনে ওইদিন চিফ প্রসিকিউটর মি. ইসলাম বলেন, "তিনি তার দোষ স্বীকার করেছেন। তিনি অ্যাপ্রুভার (রাজসাক্ষী) হতে চেয়েছেন।"
মি. ইসলাম জানান 'অ্যাপ্রুভার' হওয়ার মাধ্যমে জুলাই-অগাস্টের সব অপরাধ উদঘাটনে সহায়তা করবেন পুলিশের সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
তাদের বিরুদ্ধে গঠন করা প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৪ই জুলাই আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা উস্কানিমূলক বক্তব্য দেন।
ওই বক্তব্যে তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে ন্যায্য দাবিতে আন্দোলনকারীদের রাজাকারের বাচ্চা, রাজাকারের নাতি-পুতি বলে উল্লেখ করেন।
এর পরিপ্রেক্ষিতে আসাদুজ্জামান খান কামাল ও চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনসহ তৎকালীন সরকারের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের 'প্ররোচনা, সহায়তা ও সম্পৃক্ততায়' আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও সশস্ত্র 'আওয়ামী সন্ত্রাসী' ব্যাপক মাত্রায় ও পদ্ধতিগতভাবে নিরীহ নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার উপর আক্রমণ করে।
প্ররোচনা, উস্কানি, অপরাধ সংঘটন প্রতিরোধে ব্যর্থতা, ষড়যন্ত্রের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে এতে।
দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের 'হত্যা করে নির্মূলের নির্দেশ' দিয়েছেন।
যেটি বাস্তবায়ন করেছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন।
অপরাধ সংঘটনের নির্দেশ, সহায়তা, সম্পৃক্ততা এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আসামিরা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছেন বলে এই অভিযোগে বলা হয়েছে।

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাইদ হত্যার ঘটনায় তৃতীয় অভিযোগটি আনা হয়েছে।
শেখ হাসিনাসহ তিন জনের বিরুদ্ধে প্ররোচনা, উস্কানি, ষড়যন্ত্র, সহায়তা, সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়েছে এই অভিযোগে।
চার নম্বর অভিযোগে, গত বছরের পাঁচই অগাস্ট রাজধানীর চাঁনখারপুল এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্বারা ছয় জনকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
আশুলিয়াতে জীবিত একজনকেসহ মোট ছয়জনকে পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগে পাঁচ নম্বর অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।
এই মামলায় আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী, আহত ব্যক্তি ও প্রতক্ষ্যদর্শী, আহতদের চিকিৎসা দানকারী চিকিৎসকসহ মোট ৫৪ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন।
এছাড়া শেখ হাসিনার কথোপকথনের অডিও, ভিডিও, গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন, জব্দ করা গুলি ট্রাইব্যুনালে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে গত ১২ই অক্টোবর এ মামলার যুক্তি-তর্ক শুরু হয়। শেষ হয় ২৩শে অক্টোবর।
ওইদিন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার দাবি জানান চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম এবং অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান।
আর শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের পক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন দুইজনকে খালাস করে দেওয়ার আবেদন করেন।
এছাড়া গ্রেফতারকৃত একমাত্র আসামি ও অ্যাপ্রুভার বা রাজসাক্ষী সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনকে খালাস করে দেওয়ার আবেদন জানান তার আইনজীবী যায়েদ বিন আমজাদ।
এদিকে, আজ সোমবার রায়ের দিনে কার্যক্রম নিষিদ্ধে আওয়ামী লীগের 'কমপ্লিট শাটডাউন' কর্মসূচি রয়েছে।
মামলার রায় ঘিরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। সেনা, বিজিবি, র্যাব ও পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
হাইকোর্ট, মৎসভবন, সচিবালয় এলাকার প্রত্যেকটি মোড়ে মোড়ে বসানো হয়েছে চেকপোস্ট এবং নিরাপত্তা তল্লাশি চলছে।
হাইকোর্টের কর্মী, আইনজীবী, গণমাধ্যমকর্মী ছাড়া সাধারণ কাউকে এই এলাকায় প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না।
উল্লেখ্য, ঢাকাসহ বেশ কয়েকটি জেলার বিচারিক আদালতে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলাও করা হয়েছে। এসব মামলার সংখ্যা পাঁচশোর বেশি।
এরই মধ্যে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে দুদকের করা প্লট দুর্নীতির মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে।








