ভারতে কুস্তিগিরদের যৌন হেনস্থা মামলা বন্ধের নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের

কুস্তি ফেডারেশনের প্রধানের বিরুদ্ধে ধর্নায় ভারতের শীর্ষ কুস্তিগিররা। ডানদিক থেকে সাক্ষী মালিক, ভিনেশ ফোগট, বজরং পুনিয়া

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, কুস্তি ফেডারেশনের প্রধানের বিরুদ্ধে ধর্নায় ভারতের শীর্ষ কুস্তিগিররা। ডানদিক থেকে সাক্ষী মালিক, ভিনেশ ফোগট, বজরং পুনিয়া

ভারতের কুস্তি ফেডারেশনের প্রধানের বিরুদ্ধে ওঠা যৌন হেনস্থার অভিযোগ সংক্রান্ত একটি মামলা বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে দেশের সুপ্রিম কোর্ট। বৃহস্পতিবার তারা বলেছে এ নিয়ে আগে যে নির্দেশ দিয়েছিল মামলা রুজু করার, তারপরে নতুন করে আর কোনও নির্দেশ তারা দেবে না।

প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ বলেছে সাত কুস্তিগিরকে যৌন হেনস্থার অভিযোগ নিয়ে পুলিশকে এফআইআর করার এবং ওই কুস্তিগিরদের নিরাপত্তার নির্দেশ আগেই দিয়েছিল।

সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, এফআইআর দায়ের হয়েছে কুস্তি ফেডারেশনের প্রধানের বিরুদ্ধে।

ওই তদন্তের ওপরে সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিরও দরকার নেই বলেই মনে করেছে শীর্ষ আদালত।

তাই কোর্ট এই মামলাটি এখন বন্ধ করে দিচ্ছে।

এদিকে রাজধানী দিল্লিতে অলিম্পিকস, এশিয়ান গেমসে মেডেল জয়ী কুস্তিগিররা গত ১১ দিন ধরে যে ধর্না চালাচ্ছেন, তার ওপরে বুধবার গভীর রাতে লাঠি চালিয়েছে পুলিশ, এমনটাই অভিযোগ ওই কুস্তিগিরদের।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে এবং দেখতে পারেন
বুধবার রাতে পুলিশ তাদের ওপরে লাঠি চার্জ করেছে বলে অভিযোগ করছেন কুস্তিগিররা
ছবির ক্যাপশান, বুধবার রাতে পুলিশ তাদের ওপরে লাঠি চার্জ করেছে বলে অভিযোগ করছেন কুস্তিগিররা

কুস্তিগিরদের ওপরে লাঠি চালানোর অভিযোগ

সাক্ষী মালিক, বজরং পুনিয়া বা ভিনেশ ফোগতের মতো মেডেল জয়ী কুস্তিগিররা ভারতীয় কুস্তি ফেডারেশনের প্রধান ব্রিজভূষণ শরণ সিংয়ের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগে এই ধর্না চালাচ্ছেন।

মি. সিং কুস্তি ফেডারেশনের প্রধান ছাড়াও বিজেপির একজন সংসদ সদস্য।

কয়েক মাস আগেও কুস্তিগিররা মি. সিংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে ধর্নায় বসেছিলেন। সরকার সেই সময়ে তাদের আশ্বস্ত করেছিল যে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কিন্তু কুস্তিগিররা বলছেন, কোনও শাস্তি না হওয়ায় তারা ফেডারেশন প্রধানের পদত্যাগ এবং গ্রেপ্তারির দাবিতে আবার ধর্নায় বসেছেন।

বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরে কুস্তিগিররা সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন, এটা তাদের পরাজয় নয়। তবে তারা ধর্না চালিয়েই যাবেন।

ফেডারেশন প্রধান যে নারী কুস্তিগিরদের যৌন হেনস্থা করেছিলেন বলে অভিযোগ, তাদের সবার বয়ান এখনও পুলিশ রেকর্ড করে নি বলেও জানান ধর্নায় বসা কুস্তিগিররা।

সংবাদ সম্মেলনে কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন ভিনেশ ফোগত, পরে হাত দিয়ে চোখ ঢাকছেন
ছবির ক্যাপশান, সংবাদ সম্মেলনে কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন ভিনেশ ফোগত, পরে হাত দিয়ে চোখ ঢাকছেন
‘এজন্যই দেশের হয়ে পদক এনেছিলাম?’
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

বুধবার রাতে পুলিশের কথিত লাঠি চালনার পরে কুস্তিগিররা সেখানে এক ঝটিতি সংবাদ সম্মেলন করেন।

কুস্তিগির ভিনেশ ফোগত কাঁদতে কাঁদতেই বলেন, “এই ব্যবহার পাওয়ার জন্যই কি দেশের জন্য পদক নিয়ে এসেছিলাম?“

তারা বলেন, দিল্লিতে বুধবার সারাদিন বৃষ্টি হয়েছে, তাদের ধর্নার জায়গাটা পুরো জলে ভর্তি হয়ে গিয়েছিল। তাই তারা কাঠের ফোল্ডিং খাট আনার ব্যবস্থা করছিলেন। পুলিশ তখনই বাধা দেয়।

ভিনেশ ফোগত প্রশ্ন তোলেন, “ব্রিজভূষণ মজাসে বিছানায় ঘুমোচ্ছে, আর আমরা একটু শোওয়ার জন্য খাট আনতে গিয়েছিলাম। তার জন্য এই ব্যবহার?”

“আমরা তো নিজেদের মান সম্মানের জন্য লড়াই করছি, আর পুলিশ মেয়েদের বুকে পর্যন্ত ধাক্কা দিচ্ছে,” বলেন মিজ. ফোগট।

তিনি তার জেতা সব পদক ফিরিয়ে দেওয়ারও প্রস্তাব দিয়েছেন। এর আগেই পুলিশ ধর্নার এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দিয়েছে।

বুধবারের ঘটনা নিয়ে পুলিশ বলছে যে ধর্নার জায়গায় ফোল্ডিং খাট নিয়ে আসার অনুমতি ছিল না। তাই তারা বাধা দিয়েছে।

দিল্লি পুলিশের উপ কমিশনার প্রণব তায়েল বলছেন, “অনুমতি ছাড়া ফোল্ডিং খাট আনা হচ্ছিল বলে আমরা বাধা দিই। সেই সময়ে কুস্তিগির আর তাদের কিছু সমর্থক ব্যারিকেডের সামনে চলে আসেন আর খাটগুলো ভেতরে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তখনই কিছুটা ধাক্কাধাক্কি হয়েছে।“

কুস্তিগিরদের তরফে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

দিল্লি মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সন স্বাতী মালিওয়াল ওই ধর্না মঞ্চে রাতে যাওয়ার চেষ্টা করলে তাকেও গ্রেপ্তার করা হয়।

ধর্নামঞ্চে ফোল্ডিং খাট আনা হচ্ছিল বিনা অনুমতিতে, বলছে পুলিশ

ছবির উৎস, ANI

ছবির ক্যাপশান, ধর্নামঞ্চে ফোল্ডিং খাট আনা হচ্ছিল বিনা অনুমতিতে, বলছে পুলিশ

নজিরবিহীন ধর্না

ভারতের খেলোয়াড়দের সঙ্গে কর্মকর্তাদের মতভেদ হয়েই থাকে, কিন্তু তিন অলিম্পিকস পদক জয়ী, দুই বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন সহ এতজন কুস্তিগির ফেডারেশন প্রধানের শাস্তির দাবীতে দীর্ঘদিন ধরে ধর্না দিচ্ছেন রাস্তায় বসে, এরকম ঘটনা আগে হয় নি।

তবে এই কুস্তিগিররাই এবছর জানুয়ারি মাসে ধর্নায় বসেছিলেন একই অভিযোগ তুলে।

সেসময়ে সরকারের তরফে তাদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল যে সব অভিযোগের তদন্ত করা হবে।

অলিম্পিকস পদক জয়ী বক্সার মেরি কমের নেতৃত্বে একটি তদন্তকারী কমিটি তাদের রিপোর্ট জমা দিয়েছে গতমাসে, কিন্তু তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয় নি। ওই তদন্ত নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কুস্তিগিররা।

তারা যে ফেডারেশন প্রধানের বিরুদ্ধে শুধু একনায়কতন্ত্র চালানোর অভিযোগ করছেন, তা নয়। তারা নারী কুস্তিগিরদের যৌন হেনস্থা করেছেন ব্রিজভূষণ শরণ সিং, এটাই তাদের মূল অভিযোগ।

২০০৮ সালে বেইজিং অলিম্পিক্সে সুশীল কুমার তাম্র পদক জেতার পর থেকেই ভারতে কুস্তিগিররা সম্মান পেতে শুরু করেন। ২০১২ লন্ডন অলিম্পিকস, এশিয়াড, কমনওয়েলথ গেমস, বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ, প্রতিটা প্রতিযোগিতাতেই ভারতের কুস্তিগিররা যথেষ্ট ভাল পারফর্ম করতে থাকেন, পদকও আসতে থাকে।

একই সঙ্গে ফেডারেশন প্রধান মি. সিংয়ের কাজকর্মের ধরন নিয়েও সরব হতে থাকেন কুস্তিগিররা।

যৌন হেনস্থার অভিযোগ যার দিকে, সেই কুস্তি ফেডারেশন প্রধান ও বিজেপি এমপি বৃজভূষণ শরণ সিং

ছবির উৎস, ANI

ছবির ক্যাপশান, যৌন হেনস্থার অভিযোগ যার দিকে, সেই কুস্তি ফেডারেশন প্রধান ও বিজেপি এমপি বৃজভূষণ শরণ সিং
বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর

যৌন হেনস্থার শিকার এক কিশোরী কুস্তিগিরও, অভিযোগ

পদকজয়ী কুস্তিগির ভিনেশ ফোগত প্রথম যৌন হেনস্থার অভিযোগটা তোলেন।

তিনি নিজে ফেডারেশন প্রধানের দ্বার হেনস্থার শিকার না হলেও অন্তত সাত জন নারী কুস্তিগির তার কাছে যৌন হেনস্থার কথা জানিয়েছে বলে সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছিলেন মিজ. ফোগত।

ওই সব হেনস্থা যেমন বিদেশে টুর্নামেন্ট চলাকালীন হয়েছে, তেমনই ভারতীয় কুস্তি ফেডারেশনের প্রধান দপ্তর, যেটা আবার ব্রিজভূষণ শরণ সিংয়ের আবাসও, সেখানও হেনস্থা হয়েছে বলে অভিযোগ।

হেনস্থার শিকার হওয়া কুস্তিগিরদের মধ্যে একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক নারী কুস্তিগিরও আছেন।

সাতজন নারী কুস্তিগির পুলিশের কাছে পৃথক এফআইআর দায়ের করেছেন।

এর আগে অভিযোগ জানানোর পরেও দিল্লি পুলিশ এফআইআর দায়ের করছে না বলে অভিযোগ করে সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছিলেন কুস্তিগিররা।

শীর্ষ আদালতের নির্দেশে পরে এফআইআর দায়ের করেছে পুলিশ।

তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অবশ্য বারেবারেই অস্বীকার করেছেন মি. সিং।

তিনি বলেছেন যে কোনও ধরনের তদন্তের মুখোমুখি হতে তিনি রাজী। কিন্তু যেভাবে ধর্না দেওয়া হচ্ছে, তা তার বিরুদ্ধে একটা ষড়যন্ত্র বলে মন্তব্য করেন মি. সিং।