কেজরিওয়ালের গ্রেফতার নিয়ে আবারও মুখ খুলল আমেরিকা

ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মন্তব্য করার জন্য দিল্লিতে নিযুক্ত শীর্ষ মার্কিন কূটনীতিককে ডেকে পাঠিয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া দেওয়ার একদিন পরে আবারও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের দুটি সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে মন্তব্য করেছে।

প্রথমে জার্মানি এবং তারপরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের গ্রেফতারি নিয়ে মন্তব্য করেছিল।

দুটি ক্ষেত্রেই অত্যন্ত কড়া প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল ভারতের বিদেশ মন্ত্রক।

তাৎপর্যপূর্ণভাবে তারপরে দ্বিতীয় দিনও মার্কিন বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র ম্যাথু মিলার বলেছেন যে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের গ্রেফতারি এবং সংশ্লিষ্ট আইনি পদক্ষেপের ওপরে নজর রাখছে যুক্তরাষ্ট্র।

এছাড়া, ভারতের আয়কর বিভাগ তাদের কিছু ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ‘ফ্রিজ’ করে দিয়েছে বলে ভারতের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় কংগ্রেস যে অভিযোগ তুলেছে, তা নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র মন্তব্য করেছেন।

এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই সব মন্তব্য করেছেন।

মি. মিলারের কথায়, “কংগ্রেস দল যে অভিযোগ তুলেছে যে আয়কর বিভাগ তাদের কয়েকটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দিয়েছে, যে কারণে আসন্ন নির্বাচনে প্রচার চালানো তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে উঠেছে, সে ব্যাপারটিও আমাদের নজরে আছে। এই সব বিষয়গুলির ক্ষেত্রেই নিরপেক্ষ, ন্যায্য এবং সময়ের মধ্যে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে, এটাই আমরা আশা করি।“

তবে দিল্লিতে নিযুক্ত দূতাবাসের ভারপ্রাপ্ত প্রধানকে ডেকে পাঠিয়ে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক যে বৈঠক করেছে, সে ব্যাপারে কোনও প্রতিক্রিয়া দিতে চাননি মি. মিলার।

এ ব্যাপারে তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “কূটনৈতিক স্তরে কী আলোচনা হয়েছে, তা নিয়ে আমি কিছু বলব না। কিন্তু নিশ্চিতভাবে সর্বসমক্ষে আমরা যা বলেছি আগে, এখনও সেই কথাই বলছি। নিরপেক্ষ, ন্যায্য এবং সময়ের মধ্যে আইনি প্রক্রিয়া চলবে, এটাই আমাদের আশা।

“আমাদের মনে হয় না এতে কারও আপত্তি থাকতে পারে। ব্যক্তিগত স্তরেও আমরা স্পষ্ট করে এটাই বলতে চাই”, জানিয়েছেন ম্যাথু মিলার।

অরবিন্দ কেজরিওয়ালের গ্রেফতারি নিয়ে সর্বপ্রথম মুখ খুলেছিল জার্মানি।

তার পরে মঙ্গলবার প্রতিক্রিয়া দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ভারত দুই দেশের শীর্ষ কূটনীতিকদের ডেকে কড়া প্রতিক্রিয়া জানানোর পরে দ্বিতীয়বার যুক্তরাষ্ট্র একই বিষয়ে মন্তব্য করলেও জার্মান বিদেশ মন্ত্রক নতুন করে এ বিষয়ে নতুন করে কিছু বলতে চায়নি।

ভারতের কী প্রতিক্রিয়া ছিল?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মন্তব্যের প্রেক্ষিতে দিল্লিতে বিদেশ মন্ত্রকের দপ্তরে বুধবার ডেকে পাঠানো হয় আমেরিকার দূতাবাসের অন্তর্বর্তীকালীন উপ প্রধান গ্লোরিয়া বারবেনাকে। প্রায় ৪০ মিনিট পরে তিনি বেরিয়ে আসেন।

তার পরেই ভারতের বিদেশ মন্ত্রক এক কড়া বিবৃতি দিয়ে জানায় যে, মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র যেভাবে ভারতের একটি আইনি পদক্ষেপ নিয়ে মন্তব্য করেছেন, তার তীব্র প্রতিবাদ জানানো হচ্ছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, “রাষ্ট্রগুলি একে অন্যের সার্বভৌমত্ব এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলির প্রতি সম্মান দেখাবে, এটাই কূটনীতিতে আশা করা হয়। বন্ধুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এই দায়িত্বটা আরও বেশি। এর অন্যথা হলে অস্বাস্থ্যকর উদাহরণ তৈরি হয়ে যেতে পারে।''

“ভারতের আইনি ব্যবস্থাকে অপবাদ দেওয়া সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত'' বলেও ওই বিবৃতিতে জানিয়েছে ভারত।

কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?

ভারতের অনেক বিশেষজ্ঞ অরবিন্দ কেজরিওয়ালের গ্রেফতারি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে 'অবাঞ্ছিত' বলে মনে করছেন।

ভারতের প্রাক্তন বিদেশ সচিব এবং তুরস্ক, ফ্রান্স, রাশিয়াসহ বহু দেশে ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসাবে কাজ করা কানওয়াল সিব্বল বলছেন, জার্মানির মন্তব্য নিয়ে ভারতের বিরোধিতার পরেও যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে মন্তব্য করেছে।

তিনি সামাজিক মাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে লিখেছেন, “কেজরিওয়ালের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মন্তব্য অনুচিত হয়েছে। জার্মানির উস্কানিমূলক মন্তব্যে ভারত কড়া প্রতিক্রিয়ার দেওয়ার পরেও যুক্তরাষ্ট্র একটা বিবৃতি দিয়েছে।"

"ভারতকে প্রতিক্রিয়া জানাতে হয়েছিল কারণ এটি যদি না করা হত, তাহলে অর্থটা দাঁড়াত যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং জার্মানির সঙ্গে পৃথক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলে ভারত। বিদেশ মন্ত্রক অত্যন্ত সতর্ক ভাবেই একটি বিবৃতি দিয়েছে।“

অন্যদিকে সামরিক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ব্রহ্ম চেলানি মনে করেন যে ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর প্রতি আক্রমণাত্মক হওয়া এবং তাদের ছোট করে দেখানোর প্রচেষ্টা কী করে না করা যায়, সেটা এখনও মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ‘টিম’ শিখে উঠতে পারেনি।

এক্স হ্যান্ডেলে তিনি লিখেছেন, “বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের সঙ্গে সর্বশেষ বিতর্ক তো একটি উদাহরণ মাত্র। আমেরিকা ২০২২ সালে ভারতকে হুমকি দিয়েছিল যে তারা যদি ইউক্রেন যুদ্ধে কোনও পক্ষের দিকে না আসে তবে তাদের ‘মূল্য’ চোকাতে হতে পারে।“

ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্রের মন্তব্য বেশ অবাক করেছে বিশ্লেষকদের।

এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রথমবারের মন্তব্যে ভারত কড়া প্রতিক্রিয়া দেওয়ার পরে দ্বিতীয়বারও সেই একই বিষয় নিয়ে এবং তার সঙ্গে ভারতের বিরোধী দলের তোলা একটি অভিযোগ নিয়ে মন্তব্য করা তো আরও আশ্চর্যজনক।

কেন গ্রেফতার কেজরিওয়াল?

দিল্লিতে মদের দোকানের লাইসেন্স দেওয়ার নীতি বদল করে মি. কেজরিওয়াল এবং কয়েকজন মন্ত্রী ও নেতা মদ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঘুষ নিয়েছেন, এই অভিযোগেরই তদন্ত করছে কেন্দ্রীয় এজেন্সি।

এই মামলাতেই মি. কেজরিওয়ালের দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা ও দিল্লির প্রাক্তন উপমুখ্যমন্ত্রী মণীষ শিশোদিয়া এক বছরের বেশি সময় ধরে জেলে আছেন।

দলের সংসদ সদস্য সঞ্জয় সিং ওই একই মামলায় গত বছর অক্টোবর মাসে গ্রেফতার হয়েছেন।

অতি সম্প্রতি তেলেঙ্গানার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী কে চন্দ্রশেখর রাওয়ের মেয়ে কে কভিতাকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। বেশ কয়েকজন মদ ব্যবসায়ী, নেতা, মন্ত্রী ও তাদের কয়েকজন সহায়কও জেলে রয়েছেন।

দিল্লির আবগারি নীতি সংক্রান্ত ওই মামলায় মি. কেজরিওয়ালকে জেরা করার জন্য নয়বার সমন পাঠিয়েছিল কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রকের তদন্ত এজেন্সি এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি।

দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী কোনও বারই জেরার মুখোমুখি হতে যাননি। তবে আরেক কেন্দ্রীয় এজেন্সি সিবিআই তাকে একবার জেরা করেছিল।

ইডি একটি প্রেস রিলিজ দিয়ে জানিয়েছে যে অরবিন্দ কেজরিওয়ালই এই মামলায় 'মূল ষড়যন্ত্রকারী'।

দক্ষিণ ভারতীয় রাজ্য তেলেঙ্গানার সাবেক ক্ষমতাসীন দল ভারত রাষ্ট্র সমিতির নেত্রী ও রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী কে চন্দ্রশেখর রাওয়ের মেয়ে কে কভিতা মি. কেজরিওয়াল এবং আপ নেতা মণীষ শিশোদিয়া ও সঞ্জয় সিংয়ের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করেছিলেন বলে ইডি জানিয়েছে।

কথিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে এমন একটি নীতি তৈরি করা হয়েছিল যা দক্ষিণ ভারতের একটি মদ লবিকে উপকৃত করেছিল, যাকে ইডি 'সাউথ লবি’ বলে অভিহিত করেছে।

তবে এসব অভিযোগ ‘বানোয়াট’ আখ্যা দিয়ে বরাবরই নাকচ করে দিয়েছে আম আদমি পার্টি।

দলটি বলেছে, আদালতে এর বিরুদ্ধে তাদের লড়াইয়ের পাশাপাশি অরবিন্দ কেজরিওয়াল দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী হিসাবেই থাকবেন।

বৃহস্পতিবার দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে আদালতে হাজির করেছিল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট।

তাকে পয়লা এপ্রিল পর্যন্ত হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।