কোটা নিয়ে আপিল বিভাগের শুনানিতে রোববার যা হয়েছে

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, জান্নাতুল তানভী
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
বাংলাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে সংঘাত ও সহিংস পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে রোববার সকাল থেকেই দেশের সর্বোচ্চ আদালতের দিকে নজর ছিল সবার। কারণ এ দিন কোটা পুনর্বহাল করে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা লিভ টু আপিলের শুনানির দিন নির্ধারিত ছিল।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম কারফিউর মধ্যেও সর্বোচ্চ আদালতের কার্যক্রম বসেছে।
কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে গত কয়েকদিনে নিহত হয়েছে শতাধিক মানুষ। আহত হয়েছে এর কয়েকগুণ বেশি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার কারফিউ ঘোষণা করেছে এবং সেনা মোতায়েন করেছে। সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে রোববার ও সোমবার।
রোববার সকালে শুনানির পর সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহাল করে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছিল তা বাতিল করেছে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত। চাকরিতে কোটার ক্ষেত্রে বেশ কিছু সংস্কারের নির্দেশনাও দিয়েছে আপিল বিভাগ।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন

ছবির উৎস, Getty Images
আপিল বিভাগের শুনানিতে যা হলো
রোববার সকাল নয়টার পর থেকেই আপিল বিভাগের কক্ষে ভিড় বাড়তে থাকে আইনজীবীদের। কানায় কানায় পরিপূর্ণ এজলাসে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
আদালত কক্ষে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাও উপস্থিত ছিলেন। তারা আপিল বিভাগে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মামলার শুনানি দেখতে উপস্থিত হয়েছেন বলে জানান।
বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীও এ সময় আদালতে আসেন।
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
সকাল ১০টা ১৭ মিনিটে আপিল বিভাগের সাতজন বিচারপতি এজলাসে আসেন। শুরু হয় বিচার কার্যক্রম। এ সময় সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, তিনি কিছু শিক্ষার্থীর পক্ষে কোটা নিয়ে ‘সাবজেক্ট ম্যাটারে’ শুনানি করতে চান।
এ সময় ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর আদালতে বলেন, শুনানির জন্য আবেদন এফিডেভিড করতে পারেননি, কিন্তু বুয়েটের কিছু শিক্ষার্থীর পক্ষে কোটা নিয়ে শুনানি করতে চান।
এরপর তানজিব উল আলমসহ আরও কয়েকজন আদালতে শুনানি করতে চান বলে জানান।
এরপর প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান আবেদন এফিডেভিড করতে না পারলেও সমস্যা নেই জানিয়ে মোট পাঁচজন আইনজীবীকে শুনানির অনুমতি দেন।
আদালত আইনজীবী আহসানুল করিম, তানিয়া আমীর, তানজিব উল আলম, সারা হোসেন, জেড আই খান পান্নাকে পাঁচ মিনিট করে শুনানির অনুমতি দেন।
চলতি বছরের ৫ই জুন কোটা পুনর্বহাল করে রায় দেয় হাইকোর্ট। এ মাসে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হলে গত ১৬ই জুলাই হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। এর দুইদিন পর কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত দুই শিক্ষার্থী এ মামলায় পক্ষভুক্ত হয়ে আবেদন করে।
সকাল দশটা ২৫ মিনিটে সেই আবেদনের শুনানি শুরু করেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা।
এই নিবন্ধে Google YouTubeএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত Google YouTube কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।
End of YouTube post, 1
শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন বাংলাদেশের সরকারি চাকরিতে কখন কিভাবে কোটা ব্যবস্থা চালু হয় সে ইতিহাস তুলে ধরেন। হাইকোর্টের রায় বাতিলের পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরেন তিনি।
তিনি শুনানিতে বলেন, ১৯৭২ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম সরকারি চাকরিতে ৩০ শতাংশ কোটা ব্যবস্থা চালু করেন।
এরপর কবে, কখন কিভাবে বিভিন্ন সময়ে সরকারি সিদ্ধান্ত বা আদালতের মাধ্যমে কোটা ব্যবস্থার বিবর্তন হয় সে ইতিহাস বিস্তারিতভাবে আপিল বিভাগকে জানান মি. উদ্দিন।
কোটা বাতিল করে ২০১৮ সালে সরকারি প্রজ্ঞাপনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে করা রিটে হাইকোর্ট ওই প্রজ্ঞাপন অবৈধ ঘোষণা করে যে রায় দেয় সেটিকে স্ববিরোধী বলে শুনানিতে উল্লেখ করেন মি. উদ্দিন।
তিনি বলেন, “ এই জাজমেন্ট ইটসেলফ কন্ট্রাডিকটরি। নিজেরাই জাজমেন্ট সেট এ সাইড (বাতিল) করে দিয়েছেন। এটার কোন যৌক্তিকতা নাই। উনারা নিজেরাই ভায়োলেট করে ফেললেন”।
“রায়ে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য কোটা রাখতে বলেছেন উনারা। কিন্তু এটা সরকারের পলিসির বিষয়। তারা সিদ্ধান্ত নেবে কত শতাংশ কোটা থাকবে,” বলেন মি. উদ্দিন।
তিনি দুইটি যুক্তিতে হাইকোর্টের রায় বাতিলের আবেদন করেন আপিল বিভাগে। এর একটি যুক্তি- এ বিষয়টি সরকারের পলিসি ম্যাটার এবং আরেকটি হাইকোর্টের রায় স্ববিরোধী।
সরকারকে বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ ও দেয়া হয়েছে ওই রায়ে- এ বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, “হাইকোর্ট সরকারকে এ ধরনের পরামর্শ দিতে পারে না। তাই জাজমেন্ট বাতিল করার আবেদন করি।”

ছবির উৎস, Getty Images
শিক্ষার্থীদের আইনজীবী যা বলেন
এরপর কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত দুই শিক্ষার্থীর পক্ষে শুনানি শুরু করেন তাদের আইনজীবী শাহ মঞ্জুরুল হক।
আদালতকে তিনি জানান, খাদ্য অধিদপ্তরের চাকরি না পেয়ে সাতজন আদালতের শরণাপন্ন হন। তখন ২০১০ সালে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় কাউকে না পেলে খালি রাখতে বলা হয়। তবে পরবর্তীতে হাইকোর্টের একাধিক রায়ে এবং সরকারের সিদ্ধান্তেরও বিভিন্ন সময় তা পরিবর্তন ও সংস্কার হয়েছে।
এরপর ২০১৮ সালে সরকার উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি কমিটি করে কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। পরে মুক্তিযোদ্ধার কয়েকজন সন্তান হাইকোর্টে রিট করলে সরকারের ওই প্রজ্ঞাপন অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয়া হয়।
এ সময় প্রধান বিচারপতি বলেন, যেহেতু ৩০ শতাংশ কোটা সরকারের পলিসি ডিসিশন ছিল, তাই এটা জাজমেন্টে সংরক্ষণ করা হয়। সরকারের পলিসি ডিসিশনকে হাইকোর্ট, আপিল বিভাগ প্রটেক্ট করেছে।
আপিল বিভাগের আরেক বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম এ সময় প্রশ্ন করেন, তারা কোটা বাতিল নাকি সংস্কার চান?
শিক্ষার্থীদের আইনজীবী মি. হক বলেন, “কোটা সংস্কার চাই, বাতিল নয়।”

ছবির উৎস, Getty Images
মুক্তিযোদ্ধাদের আইনজীবী যা বলেন
কোটা বাতিল করে সরকার ২০১৮ সালে পরিপত্র জারি করেছিল, তার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে ২০২১ সালে রিট করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েকজন সন্তান।
তাদের আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী শুনানিতে বলেন, “২১ বছর কোটা বাস্তবায়ন হয়নি। মুক্তিযোদ্ধারা কোন কিছুর আশায় যুদ্ধ করেনি। ফলে কোটা বাস্তবায়ন না হওয়ায় তারা অনগ্রসর রয়ে গেছে।”
এ সময় প্রধান বিচারপতি তাকে জিজ্ঞেস করেন, “কখনও আইনিভাবে আবেদন করেছেন কি না? ২০১৮ সালে কোটা বাতিল হয়। আপনারা আসলেন ২০২১ সালে। কি করলেন তিন বছর?”
তখন যৌক্তিক হারে মুক্তিযোদ্ধা কোটা রেখে সংস্কারের কথা বলেন মি. হক।
এ দিন আরও সিনিয়র আইনজীবীরাসহ মোট নয়জন আদালতে বক্তব্য রাখেন। আদালতে সিনিয়র আইনজীবী এ এফ হাসান আরিফ, জয়নুল আবেদীনসহ অন্যান্যরা অভিমত দেন।
তাদের প্রত্যেকেই সরকারি চাকরিতে কত শতাংশ কোটা রাখা হবে সেটি সরকারের পলিসিগত সিদ্ধান্ত বলে মন্তব্য করেন। একইসাথে মুক্তিযোদ্ধারা অনগ্রসর নয়, বরং তারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান, তারপরও আর কতদিন তাদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম এই কোটার সুবিধা পাবেন- এমন প্রশ্নও তোলেন আইনজীবীরা।
এই নিবন্ধে Google YouTubeএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত Google YouTube কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।
End of YouTube post, 2

বিশেষ পরিস্থিতিতে আদালতের কার্যক্রম
শুনানিতে আইনজীবী সারা হোসেন আদালতকে বলেন, একটা বিশেষ প্রেক্ষাপটে এ ধরনের শুনানি এলাউ করা হচ্ছে, যা আমি গত ৩০ বছর দেখিনি। কেন কারফিউর মধ্যে এসেছি, সুপ্রিমকোর্ট বসেছে, সেটার কারণ আছে। আমরা ক্রিটিক্যাল পরিস্থিতিতে বসেছি।
আদালত এ সময় বলেন একটা বিশেষ পরিস্থিতিতে আদালত বসেছে আজ। তিনি এর কারণ ব্যাখ্যা করেন। কেন সাধারণ ছুটি এবং কারফিউতে আদালত বসেছে।
তিনি বলেন, “ যখন ছুটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয় তখন সিনিয়র ব্রাদারদের সাথে আলোচনা করেছি। কারণ বিচার বিভাগের ছুটি সিজে ঠিক করেন। নির্বাহী বিভাগের সাথে সামঞ্জস্য রাখা হয়। আমরা জরুরি বিষয়ের জন্য বসবো বলে সিদ্ধান্ত নেই। পরে কারফিউ জারি হয়”।
রায় ঘোষণা
পরে সব পক্ষের শুনানি শেষে আদালত একটা বিশ মিনিটে রায় ঘোষণা করেন।
রায়ে কোটা পুনর্বহাল করে হাইকোর্টের দেয়া রায় বাতিল করা হয়। একইসাথে সরকারের নীতি নির্ধারণী বিষয় হলেও সংবিধান অনুযায়ী সম্পূর্ণ ন্যায় বিচারের স্বার্থে আদালত সরকারি চাকরিতে ৯৩ শতাংশ মেধা-ভিত্তিক নিয়োগ দেয়ার নির্দেশ দেয়।
একইসাথে মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সন্তানগণের জন্য পাঁচ শতাংশ কোটা রাখার নির্দেশ দেয়া হয় রায়ে।
এছাড়া ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য এক শতাংশ এবং প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য এক শতাংশ কোটা সংরক্ষণ করার নির্দেশ দেয়া হয় রায়ে।
তবে, নির্ধারিত কোটায় যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে সংশ্লিষ্ট কোটার শূন্য পদগুলো সাধারণ মেধা তালিকা থেকে পূরণ করার নির্দেশনা দেয়া হয় রায়ে।
আদালত আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান। এজন্য সরকারকে শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে আহ্বান জানান।
অনতিবিলম্বে সরকারকে এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারির নির্দেশ দেয় আপিল বিভাগ। একইসাথে প্রয়োজন এবং সার্বিক বিবেচনায় সরকার আদালতের নির্ধারিত কোটা বাতিল, সংশোধন বা সংস্কার করতে পারবে বলেও রায়ে বলা হয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images
আদালতে প্রবেশে কড়াকড়ি
সুপ্রিমকোর্টে প্রধান প্রবেশ পথটি রোববার বন্ধ ছিল। কারফিউ থাকায় আদালতের নিরাপত্তায় মোতায়েন ছিল ব্যাপক সংখ্যক সেনাবাহিনীর সদস্য। পরে মাজার গেইট নামে পরিচিত আরেকটি ফটক দিয়ে আদালত এলাকায় প্রবেশ করতে হয়।
এ দিন আদালতে প্রবেশের সময় নিরাপত্তার কড়াকড়ি দেখা গেছে। প্রতিটি গাড়ি এমনকি গণমাধ্যমের গাড়িও প্রবেশের সময় তল্লাশি করছিলেন সেনা সদস্য এবং পুলিশ সদস্যরা।








