ইরানে আরো প্রবল হয়েছে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ, ইন্টারনেট বন্ধ

ইরানের রাজধানী তেহরানে রাতের বেলায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীরা রাস্তায়, পাশে কয়েকটি গাড়ি

ছবির উৎস, x

ছবির ক্যাপশান, তেহরানে রাতেও বিক্ষোভ দেখা যায়, ৮ই জানুয়ারির ছবি
    • Author, ডেভিড গ্রিটেন

ইরানের রাজধানী এবং অন্যান্য শহরগুলোতে বিশাল মিছিল করেছেন বিক্ষোভকারীরা। যেটিকে বছরের পর বছর ধরে চলা শাসনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় শক্তি প্রদর্শন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিবিসি পার্সিয়ান একটি ফুটেজ যাচাই করেছে, যেখানে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তেহরান এবং দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মাশহাদে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করতে দেখা গেছে, যাদের বাধা দিতে পারেনি নিরাপত্তা বাহিনী।

পরে অবশ্য দেশব্যাপী ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের খবর দিয়েছে একটি পর্যবেক্ষণ দল।

ফুটেজে বিক্ষোভকারীদের ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে উৎখাত এবং নির্বাসনে থাকা সাবেক শাহ এর সন্তান রেজা পাহলভির প্রত্যাবর্তনের দাবি জানাতে শোনা যাচ্ছে।

মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর তথ্য অনুসারে, ইরানি মুদ্রার দরপতনের প্রতিবাদে টানা ১২ দিন ধরে অস্থিরতা চলছে, যা দেশটির ৩১টি প্রদেশের ১০০টিরও বেশি শহরে ছড়িয়ে পড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক হিউম্যান রাইটস্ অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি বা এইচআরএএনএ জানিয়েছে, কমপক্ষে ৩৪ জন বিক্ষোভকারী - যার মধ্যে পাঁচজন শিশু - এবং আটজন নিরাপত্তা কর্মী নিহত হয়েছেন।

এছাড়া আরও দুই হাজার ২৭০ জন বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

নরওয়ে-ভিত্তিক পর্যবেক্ষক ইরান হিউম্যান রাইটস বা আইএইচআর জানিয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আট শিশুসহ কমপক্ষে ৪৫ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন।

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

২২ জনের মৃত্যু এবং তাদের পরিচয় নিশ্চিত করেছে বিবিসি পার্সিয়ান, আর ছয়জন নিরাপত্তা কর্মীর মৃত্যুর খবর দিয়েছে ইরানি কর্তৃপক্ষ।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায়, বিবিসি পার্সিয়ানের যাচাই করা ভিডিওগুলোতে দেখা গেছে, বিক্ষোভকারীদের একটি বিশাল ভিড় দেশটির উত্তর-পূর্বের শহর মাশহাদের প্রধান সড়ক ধরে এগিয়ে চলেছে।

'শাহ দীর্ঘজীবী হোন' এবং 'এটিই চূড়ান্ত যুদ্ধ! পাহলভি ফিরে আসবে' বিক্ষোভকারীদের এমন স্লোগান দিতে শোনা যায় এবং এক পর্যায়ে, বেশ কয়েকজনকে একটি ওভারপাসে উঠে সেখান থেকে নজরদারী ক্যামেরা সরিয়ে ফেলতে দেখা যায়।

অনলাইনে পোস্ট করা আরেকটি ভিডিওতে পূর্ব তেহরানের একটি প্রধান সড়ক ধরে বিক্ষোভকারীদের একটি বিশাল ভিড় হেঁটে যেতে দেখা গেছে।

তেহরানের উত্তরাঞ্চল থেকে বিবিসি ফার্সিকে পাঠানো ফুটেজে, নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সংঘর্ষের পর বিক্ষোভকারীদের 'অসম্মানজনক' এবং 'ভয় পেও না, আমরা সবাই একসাথে' বলে চিৎকার করতে দেখা গেছে।

দেশটির কেন্দ্রীয় শহর ইসফাহান, উত্তরের শহর বাবোলে এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর তাবরিজেও বিক্ষোভ করেছেন বিপুল সংখ্যক মানুষ। পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর দেজফুলেও বিক্ষোভকারীদের বিশাল ভিড় দেখা গেছে।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:
কেরমানশাহে রাস্তা অবরোধ করে জড়ো হচ্ছেন বিক্ষোভকারীরা

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, কেরমানশাহে রাস্তা অবরোধ করে জড়ো হচ্ছেন বিক্ষোভকারীরা

১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানের ক্ষমতাচ্যুত নেতার ছেলে রেজা পাহলভি, যিনি বর্তমানে ওয়াশিংটন ডিসিতে রয়েছেন, ইরানিদের "দাবি আদায়ের জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে রাস্তায় নামো" এমন আহ্বান জানানোর কিছুক্ষণ পরেই বিক্ষোভ শুরু হয়।

সামাজিক মাধ্যম এক্স এর একটি পোস্টে, পাহলভি বলেছেন, "আজ রাতে লক্ষ লক্ষ ইরানি তাদের স্বাধীনতা দাবি করেছে", বিক্ষোভকারীদের "সাহসী স্বদেশী" হিসেবে বর্ণনা করেছেন তিনি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে "শাসনব্যবস্থাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার" জন্য ধন্যবাদ জানান এবং ইউরোপীয় নেতাদেরও একই কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

বৃহস্পতিবার হওয়া বিক্ষোভের মাত্রাকে ছোট করে দেখিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে খালি রাস্তার ভিডিও পোস্ট করে বিক্ষোভের ঘটনা সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করা হয়েছে।

এদিকে, ইন্টারনেট ওয়াচডগ নেটব্লকস বলেছে তাদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, "দেশব্যাপী ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের মধ্যে" রয়েছে ইরান।

ভিডিওতে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ ইলামের বেশ কয়েকটি কুর্দি অধ্যুষিত শহর ছাড়াও কেরমানশাহ এবং লোরেস্তান প্রদেশে অনেকে দোকান বন্ধ থাকতে দেখা গেছে।

এই অঞ্চলে বিক্ষোভের উপর মারাত্মক দমন-পীড়নের প্রতিক্রিয়ায়, নির্বাসিত কুর্দি বিরোধী দলগুলোর সাধারণ ধর্মঘটের ডাকের পর এমনটি ঘটে।

কুর্দি মানবাধিকার গোষ্ঠী হেঙ্গোর মতে, অস্থিরতার সময় ইলাম, কেরমানশাহ এবং লোরেস্তানে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে কমপক্ষে ১৭ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন এবং তাদের অনেকেই কুর্দি বা লোর জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য।

রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করছেন অনেকে

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ইরানে সরকারের অর্থনৈতিক নীতির বিরুদ্ধে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে

বুধবার, পশ্চিম ইরানের বেশ কয়েকটি অঞ্চলে বিক্ষোভকারী এবং নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে সহিংস সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

দিনটিকে অস্থিরতার সবচেয়ে মারাত্মক সময় হিসেবে উল্লেখ করেছে আইএইচআর। সারা দেশে ১৩ জন বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে সংস্থাটি।

"দমন-পীড়নের পরিধি প্রতিদিন আরও সহিংস এবং আরও বিস্তৃত হচ্ছে বলেই মনে যাচ্ছে," বলছেন আইএইচআর এর পরিচালক মাহমুদ আমিরি-মোঘাদ্দাম।

ইরানের বিপ্লবী গার্ডের ঘনিষ্ঠ, আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্স জানিয়েছে যে, বুধবার তিনজন পুলিশ কর্মকর্তাও নিহত হয়েছেন।

এতে বলা হয়েছে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় লর্ডেগান শহরে 'দাঙ্গাকারী' একটি দলের মধ্যে দুজনকে সশস্ত্র ব্যক্তিরা গুলি করে হত্যা করেছে এবং তেহরানের পশ্চিমে মালার্ডে "অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টার সময়" আরেকজনকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে।

ইরানের মাশহাদে বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় নেমে আসেন

ছবির উৎস, X

ছবির ক্যাপশান, মাশহাদের ভিডিওতে, বিক্ষোভকারীদের 'শাহ দীর্ঘজীবী হোন' স্লোগান দিতে শোনা যায়

এদিকে, ইরানি কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভকারীদের হত্যা করলে আবারও সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

"আমি তাদের জানিয়েছি যে যদি তারা মানুষ হত্যা শুরু করে, যা তারা তাদের দাঙ্গার সময় করে থাকে - তাদের প্রচুর দাঙ্গা আছে - যদি তারা তা করে, তাহলে আমরা তাদের খুব কঠোরভাবে আঘাত করব," এক সাক্ষাৎকারে বলেন তিনি।

অন্যদিকে, মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন যে ইরানের অর্থনীতি "বিপর্যয়ের মুখে"।

বৃহস্পতিবার মিনেসোটার ইকোনমিক ক্লাবে বক্তৃতা দেওয়ার সময় তিনি আরও বলেন, "(প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প) চান না যে তারা বিক্ষোভকারীদের আরও ক্ষতি করুক। এটি একটি উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্ত"।

এর আগে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের সময় 'সর্বোচ্চ সংযম' প্রদর্শনের জন্য নিরাপত্তা বাহিনীকে আহ্বান জানিয়েছিলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, "যেকোনো সহিংস বা জবরদস্তিমূলক আচরণ এড়ানো উচিত," এক বিবৃতিতে বলেন তিনি।

ইরানে সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী খামেনি শনিবার বলেছেন যে কর্তৃপক্ষের "বিক্ষোভকারীদের সাথে কথা বলা উচিত" কিন্তু "দাঙ্গাকারীদের তাদের আসল জায়গা দেখানো উচিত"।

২৮শে ডিসেম্বর, মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের মূল্যে বড় ধরনের পতনের ঘটনায়, ক্ষোভ জানাতে তেহরানের রাস্তায় অনেক মানুষ নেমে আসার পরই, বিক্ষোভ শুরু হয়।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির উপর নিষেধাজ্ঞা এবং সরকারি অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে দুর্বল অর্থনীতির উপর চাপ পড়ার ফলে গত এক বছরে ইরানের মুদ্রার মান সর্বনিম্নে নেমে এসেছে এবং মুদ্রাস্ফীতিও ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে।

এর আগে ২০২২ সালে কুর্দি নারী মাহসা আমিনির হেফাজতে মৃত্যুর পর শুরু হওয়া বিক্ষোভের পর এই আন্দোলন সবচেয়ে ব্যাপক আকার ধারণ করেছে।

মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর তথ্য অনুসারে, দেশটিতে গত কয়েক মাসে ৫৫০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত এবং ২০ হাজারের মতো মানুষকে আটক করেছে নিরাপত্তা বাহিনী।