আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
'৪০টিরও বেশি যুদ্ধ কভার করেছি, কিন্তু ২০২৫ সালের মতো বছর কখনো দেখিনি'
- Author, জন সিম্পসন
- Role, বিবিসি ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্স এডিটর
(সংবেদনশীল কনটেন্ট: এই প্রতিবেদনে মৃত্যুর গ্রাফিক বর্ণনা রয়েছে, যা কিছু পাঠকের জন্য বেদনাদায়ক হতে পারে)
আমার সাংবাদিকতা জীবন শুরু ১৯৬০-এর দশকে। এই দীর্ঘ সময়ে আমি সারা বিশ্বে ৪০টিরও বেশি যুদ্ধ নিয়ে রিপোর্ট করেছি। আমি স্নায়ুযুদ্ধকে চরম পর্যায়ে পৌঁছাতে, এরপর তা প্রশমিত হতে দেখেছি। তবে আমি ২০২৫ সালের মতো উদ্বেগের বছর দেখিনি।
শুধু বড় বড় কয়েকটি যুদ্ধ চলছে এ কারণে নয়, বরং কারণটি হলো সেসব যুদ্ধের মধ্যে একটির রয়েছে ভূরাজনৈতিক প্রভাব—গুরুত্বের দিক থেকে যা অন্য কোনোটির সাথে তুলনা করার মতোই না।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সতর্ক করে বলেছেন, তার দেশে চলা বর্তমান যুদ্ধ রূপ নিতে পার বিশ্বযুদ্ধে। প্রায় ৬০ বছর ধরে যুদ্ধ পর্যবেক্ষণের পর আমার মনের অশুভ আশঙ্কা—তিনি সঠিক বলছেন।
পশ্চিমা সমাজকে সচল রাখা ইলেকট্রনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা বহনকারী সমুদ্রতলের কেব্ল্ রাশিয়া কেটে দিচ্ছে কি না—এই আশঙ্কায় ন্যাটোভুক্ত সরকারগুলো এখন সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে।
ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরীক্ষা করে দেখার অভিযোগ উঠেছে রাশিয়ার ড্রোনগুলোর বিরুদ্ধে। তাদের হ্যাকাররা এমন পন্থা তৈরি করছে, যার মাধ্যমে মন্ত্রণালয়, জরুরি সেবা বিভাগ ও বিশাল করপোরেশনগুলোকে অচল করে দেওয়া সম্ভব।
পশ্চিমা রাষ্ট্রে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেওয়া ভিন্ন মতাবলম্বীদের রাশিয়ার সিক্রেট সার্ভিসের হত্যা ও হত্যাচেষ্টার বিষয়টি নিয়ে নিশ্চিত পশ্চিমা কর্তৃপক্ষ।
২০১৮ সালে সালিসবুরিতে রাশিয়ার সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা সের্গেই স্ক্রিপালকে হত্যাচেষ্টার তদন্তে (এবং একই ঘটনায় ডন স্টারজেস নামে স্থানীয় একজন নারীর বিষক্রিয়ায় মৃত্যুতে) বেরিয়ে আসে যে হামলায় সম্মতি দেশটির সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ছিল।
মানে প্রেসিডেন্ট পুতিনের সম্মতি ছিল এতে।
তিনটি ভিন্ন যুদ্ধের সাক্ষী হয়েছে ২০২৫। ইউক্রনের কথা এখানে অবশ্যই আসবে। এ যুদ্ধে ১৪ হাজার বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি হয়েছে বলে জাতিসংঘ জানিয়েছে।
এরপর আসবে গাজা। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলায় ১,২০০ জন নিহত এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করার জের ধরে গাজায় 'ভয়াবহ প্রতিশোধ' নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
এরপর থেকে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপে ৭০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে ৩০ হাজারের বেশি হলো নারী ও শিশু। এ তথ্য গাজার হামাস পারিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের–প্রাণহানির এ সংখ্যা বিশ্বাসযোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছে জাতিসংঘের কাছে।
এদিকে সুদানে সামরিক ও আধা সামরিক বাহিনীর মধ্যে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ চলছে। গত কয়েক বছরে সেখানে দেড় লাখেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং প্রায় এক কোটি ২০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
সম্ভবত ২০২৫ সালে যদি এটিই একমাত্র যুদ্ধ হতো, তাহলে বাইরের বিশ্ব এটিকে থামাতে আরও বেশি উদ্যোগী হতো।
কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।
গাজায় যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নেওয়ার পর নিজ বিমানে চেপে ইসরায়েলে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, "আমি যুদ্ধ সমাধানে বেশ দক্ষ"।
এটি সত্য যে, এখন গাজায় আগের তুলনায় কম মানুষ নিহত হচ্ছে। তবে যুদ্ধবিরতি সত্বেও গাজা যুদ্ধের সুরাহা হওয়ার নিশ্চয়তা মেলে না।
মধ্যপ্রাচ্যের ভয়াবহ মানবিক দুর্দশার প্রেক্ষাপটে এটি বলাও অস্বস্তিকর ঠেকে যে ইউক্রেনের যুদ্ধ এর থেকে পুরোপুরি ভিন্ন এক মাত্রার।
কিন্তু এটিই বাস্তবতা।
স্নায়ুযুদ্ধ বাদ দিলে বিগত বছরগুলোয় আমি যেসব যুদ্ধ নিয়ে রিপোর্ট করেছি সেগুলো নিশ্চিতভাবে নৃশংস ও বিপজ্জনক হলেও যুদ্ধের মাত্রার বিবেচনায় ছোট ছিল। সেগুলো সারা বিশ্বের শান্তির জন্য হুমকস্বরূপ হওয়ার মতো এতোটা গুরুতর ছিল না।
ভিয়েতনাম যুদ্ধ, প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ এবং কসোভোর যুদ্ধের মতো কিছু সংঘাতে কখনো কখনো মনে হয়েছিল পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ দিকে মোড় নিতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি।
পরাশক্তিগুলো ছোট পরিসরের ও যুগ যুগ ধরে দেখে আসা যুদ্ধের পারমাণবিক যুদ্ধে রূপ নেওয়ার বিপদ নিয়ে শঙ্কিত ছিল।
১৯৯৯ সালে কসোভোর প্রিস্টিনায় রুশ সেনারা আগে পৌঁছে যাওয়ার পর ন্যাটোর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ব্রিটিশ ও ফরাসি বাহিনীকে বিমানঘাঁটি দখলের নির্দেশ দেন। সে সময় ব্রিটিশ জেনারেল স্যার মাইক জ্যাকসন রেডিওতে চিৎকার করে বলেছিলেন, "আপনাদের জন্য আমি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করতে যাচ্ছি না"।
ইউরোপ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রহের ঘাটতি স্পষ্ট হওয়ায়, ২০২৬ সালে সেখানে আরও আধিপত্য বিস্তারে রাশিয়া প্রস্তুত ও আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে।
গত মাসের শুরুতে পুতিন বলেন, ইউরোপের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর কোনো পরিকল্পনা রাশিয়ার নেই। তবে তিনি যোগ করেন, ইউরোপ যদি চায় তাহলে রাশিয়া 'এই মুহূর্তেই' প্রস্তুত।
পরে টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, "আপনারা যদি আমাদের সম্মান করেন, আমাদের স্বার্থকে সম্মান করেন, যেমনটি আমরা সবসময় আপনাদের ক্ষেত্রে করার চেষ্টা করেছি—তাহলে কোনো সামরিক অভিযান হবে না"।
তবে বিশ্বের অন্যতম শক্তিধর রাষ্ট্র রাশিয়া ইতোমধ্যে ইউরোপের একটি স্বাধীন দেশে আগ্রাসন চালিয়েছে, যার ফলে বিপুল সংখ্যক বেসামরিক মানুষ ও সেনাসদস্য প্রাণ হারিয়েছেন।
ইউক্রেনের অভিযোগ, রাশিয়া অন্তত ২০ হাজার শিশুকে অপহরণ করেছে, যা রাশিয়া বরাবরই অস্বীকার করে আসছে। এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে।
রাশিয়ার দাবি, ন্যাটোর সম্প্রসারণের হুমকি থেকে আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যেই তারা এই আগ্রাসন শুরু করেছে। তবে প্রেসিডেন্ট পুতিনের কাছ থেকে মিলেছে ভিন্ন ইঙ্গিত, তাহলো রাশিয়ার আঞ্চলিক প্রভাববলয় পুনঃপ্রতিষ্ঠার ইচ্ছা।
ক্রমেই বদলে যেতে থাকা এক আমেরিকা
তিনি বিস্ময়ের সাথে উপলব্ধি করছেন যে, এই ২০২৫ সালে এমন কিছু ঘটেছে, যা এতদিন পশ্চিমা বিশ্বের কাছে অকল্পনীয় বলে মনে হতো।
তা হলো—মার্কিন এক প্রেসিডেন্ট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে কার্যকর থাকা কৌশলগত ব্যবস্থার প্রতি পিঠ ফিরিয়ে নিতে পারেন, এমন সম্ভাবনা।
ইউরোপকে সুরক্ষা করতে চাওয়ার বিষয়ে ওয়াশিংটন যে অনিশ্চিত- বিষয়টি শুধু তাতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং ইউরোপ যে পথে এগোচ্ছে তা নিয়েও অসন্তুষ্ট তারা।
ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপ এখন 'সভ্যতার বিলুপ্তির স্পষ্ট সম্ভাবনার' মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
ক্রেমলিন এই প্রতিবেদনকে স্বাগত জানিয়েছে এবং বলেছে, এটি রাশিয়ার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আপনি নিশ্চিত থাকেন, নিঃসন্দেহে তাই।
রাশিয়ার মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের স্পেশাল র্যাপোর্টিয়ারের মতে, ভ্লাদিমির পুতিন রাশিয়ার ভেতরে নিজের বিরুদ্ধে এবং ইউক্রেন যুদ্ধের বিরোধিতাকারী প্রায় সব কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দিয়েছেন।
তবে তার নিজের সমস্যাই তো কম না। রাশিয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে মুদ্রাস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা আবার বাড়ার আশঙ্কা আছে, তেলের রাজস্ব কমে যাচ্ছে, আর যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে তার সরকারকে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বাড়াতে হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনীতি রাশিয়ার তুলনায় দশ গুণ বড়। এতে যুক্তরাজ্যকে যুক্ত করলে সেই ব্যবধান আরও বেড়ে যায়। ৪৫ কোটির ইউরোপীয় জনসংখ্যা রাশিয়ার ১৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি।
তবুও পশ্চিম ইউরোপ দীর্ঘদিন ধরে নিজের স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিতে অনিচ্ছুক থেকেছে এবং যতদিন সম্ভব আমেরিকাকে রাজি করিয়ে নিজেদের নিরাপত্তার ভার তার কাঁধেই রেখে দিতে চেয়েছে।
অন্যদিকে আমেরিকাও এখন বদলে গেছে—প্রভাব কমেছে, আত্মমুখী হয়ে উঠেছে এবং আমার পুরো সাংবাদিকতা জীবনে আমি যে আমেরিকাকে চিনেছি, সেটির থেকে অনেকটাই আলাদা। ঠিক যেমনটি ছিল ১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকে, এখনো তারা নিজেদের জাতীয় স্বার্থেই মনোযোগ দিতে চায়।
নতুন বছরে মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি রাজনৈতিকভাবে দুর্বলও হয়ে পড়েন, তবুও তিনি হয়তো এমনভাবে বিচ্ছিন্নতাবাদের পাল্লা ভারী করে ফেলেছেন যে ২০২৮ সালে আরও ন্যাটোপন্থি কোনো প্রেসিডেন্টের পক্ষেও ইউরোপের পাশে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
ভাববেন না যে ভ্লাদিমির পুতিন সে বিষয়টি লক্ষ্য করেননি।
উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা
২০২৬ সাল যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে, তা স্পষ্ট।
ভলোদিমির জেলেনস্কি হয়তো একটি শান্তিচুক্তিতে সম্মত হতে বাধ্য হবেন, যার ফলে ইউক্রেনের বড় একটি অংশ ছেড়ে দিতে হবে।
কয়েক বছরের ব্যবধানে প্রেসিডেন্ট পুতিন পুনরায় আগ্রাসী পথে হাঁটবেন না—এমন নিশ্চয়তা দেওয়ার মতো বাস্তবসম্মত নিরাপত্তা ব্যবস্থা কি আদৌ গড়ে তোলা সম্ভব?
ইউক্রেন এবং তার ইউরোপীয় সমর্থকদের জন্য (যারা ইতোমধ্যেই নিজেদের রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে জড়িত বলে মনে করছে) এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
ইউক্রেনকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব ইউরোপকে অনেক বেশি নিতে হবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই ইউক্রেনের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়—যার ইঙ্গিত তারা মাঝেমধ্যেই দেয়—তাহলে সেই বোঝা হবে বিরাট।
কিন্তু এই যুদ্ধ কি পারমাণবিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে?
আমরা জানি, প্রেসিডেন্ট পুতিন ঝুঁকি নিতে ভালোবাসেন। আরও সচেতন কোনো নেতা হলে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে হামলা চালাতেন না।
পুতিনের অনুচররা রাশিয়ার নতুন অস্ত্রের বড়াই করে যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের দেশগুলোকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার রক্তাক্ত হুমকি দেয়, তবে তিনি নিজে সাধারণত তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি সংযত থাকেন।
আমেরিকানরা এখনো ন্যাটোর সক্রিয় সদস্য হলেও, তাদের পক্ষ থেকে একটি বিধ্বংসী পারমাণবিক হামলার জবাব দেওয়ার ঝুঁকি এখনো অনেক বেশি, অন্তত আপাতত।
চীনের বৈশ্বিক ভূমিকা
চীনের প্রসঙ্গে বলতে গেলে, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সাম্প্রতিক সময়ে স্বশাসিত দ্বীপ তাইওয়ানের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে হুমকি কম দিয়েছেন।
তবে দুই বছর আগে তৎকালীন সিআইএ'র পরিচালক উইলিয়াম বার্নস বলেছিলেন, শি জিনপিং ২০২৭ সালের মধ্যে তাইওয়ান আক্রমণের জন্য পিপলস লিবারেশন আর্মিকে প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন।
চীন যদি তাইওয়ান দখলের বিষয়ে কোনো ধরনের দৃঢ় পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে শি জিনপিংয়ের কাছে বিষয়টি দুর্বলতার প্রকাশ বলে মনে হতে পারে, যা তিনি চাইবেন না।
আপনি ভাবতে পারেন, বর্তমান সময়ে চীন এতটাই শক্তিশালী ও ধনী যে দেশীয় জনমতের তোয়াক্কা করার প্রয়োজন নেই। বাস্তবতা কিন্তু তা নয়।
১৯৮৯ সালে দেঙ শাওপিংয়ের বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থান এবং তার পরিণতিতে তিয়েনআনমেন গণহত্যার পর থেকেই চীনা নেতৃত্ব দেশটির অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত সতর্ক ও গভীর নজরে পর্যবেক্ষণ করে আসছে।
আমি নিজে তিয়েনআনমেন স্কয়ারে সেই ঘটনাগুলো প্রত্যক্ষ করেছি—সেখান থেকে সংবাদ পরিবেশন করেছি এবং কখনো কখনো স্কয়ারেই থেকেছি।
১৯৮৯ সালের ৪ জুনের ঘটনাটি আমরা তখন যেভাবে ভেবেছিলাম, বাস্তবে তা এতটা সরল ছিল না। সশস্ত্র সেনারা নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের গুলি করেছিল। এটি সত্যি ঘটেছিলো।
কিন্তু একই সঙ্গে বেইজিংসহ চীনের আরও বহু শহরে আরেকটি লড়াইও চলছিল।
হাজার হাজার সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিল। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাকে তারা চীনা কমিউনিস্ট পার্টির শাসন পুরোপুরি উৎখাত করার সুযোগ হিসেবে দেখেছিল।
দুদিন পর যখন আমি গাড়ি চালিয়ে শহরের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন অন্তত পাঁচটি পুলিশ স্টেশন ও তিনটি স্থানীয় জননিরাপত্তা পুলিশের সদর দপ্তর পুড়ে যাওয়া অবস্থায় দেখেছিলাম।
একটি উপশহরে উত্তেজিত জনতা এক পুলিশ সদস্যকে আগুনে পুড়িয়ে তার পোড়া দেহ দেয়ালের সঙ্গে ঠেস দিয়ে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল।
তার মাথায় ইউনিফর্মের একটি ক্যাপ বাঁকা করে বসানো ছিল, আর পোড়া ঠোঁটের ফাঁকে গুঁজে দেওয়া হয়েছিল একটি সিগারেট।
তখন বোঝা গেল, সেনাবাহিনী কেবল দীর্ঘদিনের ছাত্র আন্দোলন দমন করছিল না, তারা সাধারণ চীনা জনগণের এক গণ-অভ্যুত্থান নির্মমভাবে দমন করছিল।
৩৬ বছর আগের সেই ঘটনার স্মৃতি এখনো মুছে ফেলতে পারেনি চীনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব। তাই তারা সব সময় বিরোধিতার যেকোনো ইঙ্গিতের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখে—তা হোক ফালুন গংয়ের মতো সংগঠিত গোষ্ঠী, স্বাধীন খ্রিস্টান চার্চ, হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থি আন্দোলন কিংবা স্থানীয় দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ। সব কিছুকেই কঠোরভাবে দমন করা হয়।
১৯৮৯ সালের পর চীন নিয়ে প্রতিবেদন করতে গিয়ে আমি দেশটির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উত্থান খুব কাছ থেকে দেখেছি।
এমনকি আমি এক শীর্ষ রাজনীতিকের সঙ্গেও পরিচিত হয়েছিলাম, যিনি শি জিনপিংয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। তার নাম বো জিলাই। তিনি ছিলেন ইংরেজ অনুরাগী এবং চীনের রাজনীতি নিয়ে বিস্ময়করভাবে খোলামেলা কথা বলতেন।
একবার তিনি আমাকে বলেছিলেন, "সরকার যখন উপলব্ধি করে যে তাকে কেউ নির্বাচিত করেনি, তার ভেতরে কতটা অনিরাপত্তা কাজ করে তা আপনি কখনোই বুঝতে পারবেন না"।
বো জিলাইয়ের প্রসঙ্গে বলতে গেলে বলতে হয়, ঘুষ, আত্মসাৎ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের দায়ে ২০১৩ সালে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে যাচ্ছে।
চীনের শক্তি আরও বাড়বে এবং তাইওয়ান দখলের বিষয়ে তার কৌশল আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে, যা শি জিনপিংয়ের সবচেয়ে বড় উচ্চাকাঙ্ক্ষা।
ইউক্রেন যুদ্ধ হয়তো তখন মীমাংসিত হবে, তবে এমন শর্তে যা প্রেসিডেন্ট পুতিনের পক্ষে যাবে।
তিনি চাইলে পরে আবার ইউক্রেনের আরও ভূখণ্ড দখলের চেষ্টা করতে পারেন।
যদিও নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক ক্ষমতা কিছুটা খর্ব হতে পারে, তবুও তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে ইউরোপ থেকে আরও দূরে সরিয়ে নেবেন।
ইউরোপের দৃষ্টিকোণ থেকে ভবিষ্যৎ চিত্রটি প্রায় হতাশাজনক।
আপনি যদি ভেবে থাকেন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ মানেই পারমাণবিক অস্ত্রের সরাসরি সংঘর্ষ—তাহলে আবার ভাবুন।
সম্ভবত এটি হবে কূটনৈতিক ও সামরিক কৌশলের এক জটিল লড়াই, যার মধ্য দিয়ে স্বৈরতন্ত্র আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
এমনকি পশ্চিমা জোট ভেঙে পড়ার আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে। আর সেই প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।