যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারত যেসব ক্ষেপণাস্ত্র কিনছে সেগুলো কীভাবে কাজ করে?

বাণিজ্য নিয়ে টানাপোড়েন চললেও যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরো অস্ত্র কিনছে ভারত। দেশটিকে প্রায় ৮২৩ কোটি ভারতীয় টাকা (৯২ দশমিক আট মিলিয়ন ডলার) মূল্যের ক্ষেপণাস্ত্র কেনার ছাড়পত্র দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

এর মধ্যে থাকছে ১০০টি ট্যাংক-বিধ্বংসী 'জ্যাভেলিন' মিসাইল, ২৫টি 'লাইটওয়েট কম্যান্ড লঞ্চ ইউনিটি' এবং ২১৬টি 'এক্সক্যালিবার জিপিএস গাইডেড আর্টিলারি রাউন্ড'।

নতুন এই অস্ত্রভাণ্ডারের রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তামূলক পরিদর্শনসহ নানা রকম প্রশিক্ষণও দেবে যুক্তরাষ্ট্র।

আমেরিকার ডিফেন্স সিকিউরিটি কোঅপারেশন এজেন্সি বা ডিএসসিএ দুটি পৃথক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই অস্ত্র বিক্রির ছাড়পত্র দেওয়ার কথা জানিয়েছে। অবশ্য এই অস্ত্র বিক্রির জন্য মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।

ডিএসসিএ আরও বলেছে যে এই অস্ত্রভাণ্ডার ভারতের সাম্প্রতিক ও ভবিষ্যতে আঞ্চলিক হুমকি মোকাবিলা করতে সহায়ক হবে এবং তাদের প্রতিরক্ষা ক্ষমতা বাড়াবে।

অ্যারিজোনা এবং ফ্লোরিডার দুটি বেসরকারি সংস্থার যৌথ উদ্যোগে এই অস্ত্রভাণ্ডার বিক্রি করা হবে ভারতের কাছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ বছর গোড়ার দিকে ঘোষণা করেছিলেন যে দুটি দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা আরও বাড়বে। আবার দুই দেশের মধ্যে ১০ বছরের জন্য প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির চুক্তিও সই হয় গত মাসে।

যদিও রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি কেনা নিয়ে ভারতের ওপর ক্ষিপ্ত যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ওপর উচ্চ শুল্কও আরোপ করে রেখেছেন। যদিও দুই দেশের মধ্যে একটি বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার সম্ভাবনার কথাও জানা গেছে।

মার্কিন সরকার ভারতে আরো অস্ত্র বিক্রি করতে আগ্রহী দীর্ঘদিন ধরেই। যদিও রাশিয়া ভারতের অস্ত্র সরবরাহের শীর্ষ উৎস, তবুও ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এই হার ৬২ শতাংশ থেকে কমে ৩৪ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের প্রতিরক্ষা বাণিজ্য প্রায় শূন্য থেকে বেড়ে ২০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

যেটি কি না রাশিয়া ও ফ্রান্সের পরে যুক্তরাষ্ট্রকে তৃতীয় বৃহত্তম অস্ত্র সরবরাহকারী করে তুলেছে। ট্রাম্প ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি আরো অস্ত্র কেনার আহ্বান জানিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রগুলোর বিশেষত্য কী?

আমেরিকার ডিফেন্স সিকিউরিটি কোঅপারেশন এজেন্সি বা ডিএসসিএ একটি বিবৃতিতে 'জ্যাভেলিন' ক্ষেপণাস্ত্র ও সেগুলোর যন্ত্রাংশ বিক্রির কথা জানিয়েছে।

পৃথক এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে 'এক্সক্যালিবার' বিক্রির সিদ্ধান্ত।

'জ্যাভেলিন' ক্ষেপণাস্ত্র এবং সংশ্লিষ্ট সরঞ্জামের মূল্য হবে প্রায় ৪০০ কোটি ভারতীয় টাকা। এতে একশটি 'এফজিএম-১৪৮ জ্যাভেলিন' ক্ষেপণাস্ত্র ছাড়াও ২৫টি হালকা ওজনের 'কম্যান্ড লঞ্চ ইউনিট' থাকবে। প্রশিক্ষণ, যন্ত্রাংশ এবং কারিগরি সহায়তা দেওয়া হবে এই চুক্তি অনুযায়ী।

পৃথক একটি চুক্তি অনুযায়ী প্রায় ৪১৬ কোটি ভারতীয় টাকা মূল্যের ২১৬টি 'এম৯৮২এ১ এক্সক্যালিবার প্রোজেক্টাইল' ও সেগুলোর যন্ত্রাংশ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়ার কথা।

'জ্যাভেলিন' অত্যন্ত উন্নত মানের ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। ট্যাংক ছাড়াও বাংকার ধ্বংস করার কাজেও ব্যবহৃত হয়। এটা যুদ্ধক্ষেত্রে কাঁধে করেই বহন করে নিয়ে যাওয়া যায়। আবার যে সেনা সদস্য এটি অপারেট করবেন, তিনি ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়ে দিয়ে সেখান থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরে আসারও সময় পাবেন।

ক্ষেপণাস্ত্রটি নিজে থেকেই টার্গেটে পৌঁছিয়ে যাবে।

মার্কিন সেনাবাহিনীর হাতে এই ক্ষেপণাস্ত্র প্রথম আসে ১৯৯৬ সালে। তারপর থেকে মার্কিন বাহিনী এবং তাদের মিত্রদেশগুলোর সেনাবাহিনীর হাতে ৫০ হাজারেরও বেশি 'জ্যাভেলিন' ক্ষেপণাস্ত্র আছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধেও এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে।

ভারত নিজেও এই একই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন করার পরিকল্পনা নিয়েছে, তবে এখনো তা পরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে।

'এক্সক্যালিবার প্রোজেক্টাইল' এক অত্যাধুনিক কামানের গোলা। এটি নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার জন্য পরিচিত। এই গোলাটির লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে ভুলের মাত্রা মাত্র দুমিটার, তাই পারিপার্শ্বিক ক্ষতির শঙ্কাও খুব কম থাকে।

হাউইৎজার কামান থেকে এই গোলা ছোড়া হলে মোটামুটি ৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত যেতে পারে এক্সক্যালিবার।

ভারতের কাছে ইতোমধ্যেই এধরনের হাউইৎজার রয়েছে, তাই নতুন 'লঞ্চ প্ল্যাটফর্ম' না কিনেও ভারতীয় সেনাবাহিনী 'এক্সক্যালিবার' ব্যবহার করতে পারবে। বিশেষত দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে এই গোলা নিখুঁত আঘাত হানতে সহায়ক হবে।

বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম কিনবে ভারত

সর্বশেষ ক্ষেপণাস্ত্র কেনার চুক্তির আগেই গত মাসে ভারত প্রায় ৭৯ হাজার কোটি ভারতীয় টাকা মূল্যের অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম কেনার প্রস্তাব নিয়েছে। সেনা, নৌবাহিনী ও বিমান – তিন বাহিনীর জন্যই কেনা হবে এই সব নতুন অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম।

ভারত সরকারের প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো ২৩শে অক্টোবর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছিল যে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের নেতৃত্বাধীন ডিফেন্স অ্যাকুইজেশন কাউন্সিলের বৈঠকে এই নতুন সরঞ্জাম কেনার প্রস্তাব পাশ হয়।

এর মধ্যে সেনাবাহিনীর জন্য 'নাগ' ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম যেমন কেনা হবে, তেমনই এমকে-টু (নামিস)-ও থাকবে। ওই বিবৃতিতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল যে 'নামিস' দিয়ে শত্রু পক্ষের সাঁজোয়া গাড়ি, বাংকার ও দুর্ভেদ্য অবস্থানগুলো ধ্বংস করা ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য সহজতর হবে।

আবার এমন একটি সরঞ্জামও কেনার কথা আছে, যা দিয়ে ২৪ ঘণ্টাই শত্রুপক্ষের দিক থেকে আসা কোনো তরঙ্গের ওপরে বৈদ্যুতিক নজরদারি চালানো যাবে।

নৌবাহিনীর জন্য যে-সব সরঞ্জাম কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছে, তার মধ্যে আছে ৩০ মিমি 'নেভাল সারফেস গান', উন্নতমানের হালকা ওজনের টর্পেডো এবং ৭৬ মিমি 'সুপার র‍্যাপিড গান মাউন্ট'এ ব্যবহারযোগ্য গোলবারুদ।

এরমধ্যে 'ল্যান্ডিং প্ল্যাটফর্ম ডক' দিয়ে ভারতের নৌবাহিনী জল আর স্থল – দুই ক্ষেত্রেই সেনা ও বিমানবাহিনীর সঙ্গে যৌথ অভিযান চালাতে পারবে।

বিমানবাহিনীর জন্য যে সরঞ্জাম কেনা হবে, তার মধ্যে আছে 'কোলাবরেটিভ লং রেঞ্জ টার্গেট স্যাচুরেশন/ ডেস্ট্রাকশন সিস্টেম)। এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অভিযান চলাকালীন আকাশে উড়তে পারবে, নিজেই পথ চিনে নিয়ে নির্দিষ্ট এলাকায় সরঞ্জাম পৌঁছিয়ে দিতে পারবে।

ভারত দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ অস্ত্র আমদানিকারক দেশ

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট এ বছর মার্চ মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল যে ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ অস্ত্র আমদানিকারক দেশ। ওই তালিকায় ভারতের ওপরে রয়েছে ইউক্রেন।

প্রতিবেদনে লেখা হয়েছিল, "চীন আর পাকিস্তানের দিক থেকে সম্ভাব্য ঝুঁকি ভারতের অস্ত্র আমদানির পরিমাণে প্রতিফলিত হয়। তবে ২০১৫-১৯ এবং ২০২০-২৪ – এই সময়কালের মধ্যে ভারতের অস্ত্র আমদানি ৯.৩ শতাংশ কমেছে। ভারতের অস্ত্র আমদানির বৃহত্তম অংশ বা প্রায় ৩৬ শতাংশ আসে রাশিয়ার কাছ থেকে।"

অন্যদিকে পাকিস্তানের অস্ত্র আমদানি ওই একই সময়কালে বেড়েছে ৬১ শতাংশ। সেখানে অস্ত্রের বড় অংশ, ৮২ শতাংশ জোগান দেয় চীন।

আবার ভারত দাবি করছে যে ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে তারা ২৩ হাজার ৬২২ কোটি ভারতীয় টাকা মূল্যের অস্ত্র বিদেশে রফতানি করেছে। তার আগের অর্থবর্ষে ১ দশমিক ২৭ লাখ কোটি ভারতীয় টাকা মূল্যের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন করেছে ভারত।

মার্চ মাসে দেওয়া এক সংবাদ বিবৃতিতে ভারতের প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো জানিয়েছিল তাদের 'মেক ইন ইন্ডিয়া' উদ্যোগ শুরু হওয়ার পর থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষের এই প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন এক রেকর্ড। প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রফতানির পরিমাণও আরেক রেকর্ড।

ওই বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে যে ২০১৩-১৪ সালে যেখানে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রফতানির পরিমাণ ছিল ৬৮৬ কোটি ভারতীয় টাকা, তা ৩৪ গুণ বেড়ে ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ৬২২ কোটি ভারতীয় টাকায়।

এরমধ্যে ১৫ হাজার ২৩৩ কোটি ভারতীয় টাকা মূ্ল্যের সরঞ্জাম রফতানি করেছে ভারতের বেসরকারি প্রতিরক্ষা উৎপাদন সংস্থাগুলো, আর সরকারি সংস্থাগুলোর রফতানির মূল্য ছিল ৮ হাজার ৩৮৯ কোটি ভারতীয় টাকা।

ভারত থেকে ১০০টিরও বেশি দেশে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রফতানি হয়, যাদের মধ্যে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও আর্মেনিয়া।

গুলি-নিরোধক জ্যাকেট, ডর্নিয়ার বিমান, চেতক হেলিকপ্টার, দ্রুতগতির নৌযান এবং হালকা ওজনের টর্পেডাসহ আরও বহু সরঞ্জাম তারা বিদেশে রফতানি করে থাকে।