বিএনপির অবরোধের দ্বিতীয় দিনে বিভিন্ন স্থানে বাসে আগুন, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া

বাসে আগুন জ্বলছে

ছবির উৎস, Bangladesh Police

ছবির ক্যাপশান, বুধবার সকাল ১১টার দিকে ঢাকার মুগদা এলাকায় এই বাসটিতে আগুন দেওয়া হয়

বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি’র ডাকা টানা তিন দিনের অবরোধ কর্মসূচির দ্বিতীয় দিনে (বুধবার) ঢাকা ও চট্টগ্রামে কয়েকটি বাস ও ট্রাকে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।

ঢাকার মুগদা, সাভার এবং চট্টগ্রামে অন্তত চারটি বাসে আগুন দেবার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া সিলেট এবং বগুড়ায় অবরোধকারীদের সাথে আওয়ামী লীগ ও পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

নেতাকর্মী মারা যাওয়ায় সিলেট বিভাগের চার জেলায় এবং কিশোরগঞ্জে অবরোধের পাশাপাশি হরতাল পালন করেছে বিএনপি।

এদিকে, প্রথম দিনের মতো অবরোধের দ্বিতীয় দিনেও ঢাকার রাস্তায় প্রায় সব ধরনের গাড়ির সংখ্যা কম দেখা করা গেছে। ফলে যানজটও ছিলো না।

তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা কিছুটা বাড়তে দেখা গেছে। এছাড়া গাবতলী ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকেও দূরপাল্লার বাস খুব একটা ছেড়ে যেতে দেখা যায়নি। যদিও ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।

বাসে আগুন
ছবির ক্যাপশান, মুগদা আইডিয়াল স্কুলের সামনে এই বাসটিতে আগুন দেওয়া হয়

গাড়িতে আগুন

রাজধানীর মুগদায় একটি বাসে আগুন দেওয়া হয়। বুধবার সকাল ১১টার দিকে মুগদা আইডিয়াল স্কুলের সামনে এ ঘটনা ঘটে বলে বিবিসি বাংলাকে নিশ্চিত করেন মুগদা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আব্দুল মজিদ।

পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এসে আগুন নিয়ন্ত্রণ করেন। এই ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে একজনকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

বাসটির ভেতরের অবস্থা
ছবির ক্যাপশান, বাসটির ভেতরের অবস্থা

এরআগে, বুধবার ভোরে সাভারের মধুমতী মডেল টাউন এলাকায় একটি বাসে আগুন দেওয়া হয়।

বাসটির সহকারী, যিনি ঘটনার সময় বাসের ভেতরেই ঘুমিয়ে ছিলেন, বলেন ভোর ৬টার দিকে একদল লোক এসে প্রথমে বাসের জানালার কাঁচ ভেঙে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। এরপর তিনি দ্রুত বাস থেকে বের হয়ে যান।

বাস পুড়ে গেছে
ছবির ক্যাপশান, বুধবার ভোরে সাভারের মধুমতী মডেল টাউন এলাকায় এই বাসটিতে আগুন দেওয়া হয়
স্থানীয়দের সহায়তায় বাসের আগুন নেভানো হয়
ছবির ক্যাপশান, স্থানীয়দের সহায়তায় বাসটির আগুন নেভানো হয়

পরে স্থানীয়দের সহায়তায় বাসের আগুন নেভানো হয়। এ ঘটনার পর ওই এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।

সকাল ১০টার দিকে বিজিবিকেও ঘটনাস্থলের আশপাশের এলাকায় টহল দিতে দেখা যায়।

এছাড়া চট্টগ্রামেও বুধবার সকালে দু'টি পরিবহনে আগুন দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।

পাঁচ জেলায় হরতাল

অবরোধের প্রথম দিনে নিহতদেরকে দলীয়কর্মী দাবি করে এর প্রতিবাদে বুধবার কিশোরগঞ্জ এবং সিলেট বিভাগের চার জেলায় হরতাল পালন করে বিএনপি।

এর মধ্যে সিলেট শহরে বিএনপি-জামায়াতের সাথে আওয়ামী লীগের কয়েক দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।

বুধবার সিলেটে বিএনপি-জামায়াত কর্মীদের সাথে আওয়ামী লীগ কর্মীদের সংঘর্ষ

ছবির উৎস, Ahmed Noor

ছবির ক্যাপশান, বুধবার সিলেটে বিএনপি-জামায়াত কর্মীদের সাথে আওয়ামী লীগ কর্মীদের সংঘর্ষ হয়

প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে স্থানীয় প্রতিনিধি জানান, হরতাল-অবরোধের সমর্থনে বুধবার সকালে সিলেট শহরে মিছিল বের করে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা। মিছিলটি বন্দরবাজার এলাকা আসলে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়।

এ ঘটনায় ছয় জন আটক করা হয়েছে বলে স্থানীয় প্রতিনিধিকে জানান সিলেটের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আজবাহার আলী শেখ।

তবে মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জে সকাল-সন্ধ্যা এবং কিশোরগঞ্জে অর্ধবেলা হরতাল পালনকালে কোনো সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি।

এদিকে, বগুড়ায় সড়ক অবরোধ করতে গেলে বিএনপিকর্মীদের সাথে পুলিশের কয়েক দফা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়েছে বলে জানান জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. স্নিগ্ধ আখতার।

ঢাকায় যান চলাচল কম

প্রথম দিনের মতো অবরোধের দ্বিতীয় দিনেও ঢাকায় সীমিত সংখ্যক যান চলাচল করতে দেখা গেছে।

সকাল ১০টা পর্যন্ত ঢাকার ধানমণ্ডি, গ্রিনরোড, কারওরান বাজার, ফার্মগেট, তেজগাঁও, বিজয় সরণী, মহাখালী, বনানী, গুলশান, মিরপুর, আদাবর, শ্যামলী, মোহাম্মদপুর, গাবতলী, গুলিস্তান, যাত্রাবাড়ি সহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে রাস্তায় তুলনামূলক কম সংখ্যক যাত্রীবাহী বাস, মালবাহী ট্রাক, পিকআপ ভ্যান এবং ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল করে।

এছাড়া রিক্সা এবং সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা অন্যান্য দিনের মতোই দেখা গেছে।

তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তায় যানবাহনের সংখ্যা কিছুটা বাড়তে দেখা যায়।

অনেকে রিক্সা-ভ্যানে করে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাচ্ছেন
ছবির ক্যাপশান, বুধবার ঢাকার রাস্তায় বাস কম থাকায় অনেকে রিক্সা-ভ্যানে করে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হন
ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক, সকাল সাড়ে ৯টা
ছবির ক্যাপশান, বুধবার সকাল সাড়ে ৯টায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের চিত্র

ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক

বুধবার সকালে ঢাকার কমলাপুর রেল স্টেশনে স্বাভাবিক দিনের মতোই ট্রেন চলাচল করতে দেখা গেছে। তবে কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেল স্টেশনে যাত্রীদের সংখ্যা কম ছিলো।

ট্রেন চলছে

ছবির উৎস, SHIMUL

ছবির ক্যাপশান, বুধবার সকালে ঢাকায় ট্রেন চলাচল করতে দেখা গেছে

দূরপাল্লার যান বন্ধ

বুধবার সকাল থেকে ঢাকার গাবতলী এবং সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লার কোনো বাস ছাড়তে দেখা যায়নি।

গাবতলী টার্মিনালে বাসের টিকেট কাউন্টারগুলোর অধিকাংশই বন্ধ দেখা গেছে।

যে অল্প সংখ্যক টিকেট বিক্রেতা সকালে কাউন্টার খুলেছেন, যাত্রীর অভাবে গত ২৪ ঘণ্টায় তারা দূরপাল্লার কোনো বাস ছাড়তে পারেননি বলে বিবিসি বাংলার সংবাদদাতাকে জানান।

গাবতলী থেকে উত্তরবঙ্গের ২৬টি জেলা এবং দক্ষিণবঙ্গের ২২টি জেলায় প্রতিদিন অন্তত ১২০০ যাত্রীবাহী বাস চলাচল করে বলে জানিয়েছে টার্মিনাল কর্তৃপক্ষ।

কিন্তু অবরোধ শুরু হওয়ার পর দূরপাল্লার বাসগুলো বন্ধ থাকায় পরিবহন ব্যবসায় স্থবিরতা নেমে এসেছে বলে জানান বাসের টিকেট বিক্রেতারা।

একই চিত্র দেখা গেছে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালেও।

বাস টার্মিনাল
ছবির ক্যাপশান, বুধবার সকালে গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লার কোনো বাস ছাড়েনি

পুলিশ-বিজিবি’র টহল

ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড় এবং প্রবেশপথগুলোতে র‍্যাব-পুলিশের সতর্ক অবস্থান লক্ষ্য করা গেছে বলে জানান বিবিসির সংবাদদাতারা।

এছাড়া ঢাকা ও সাভারের কোথাও কোথাও বিজিবি-কেও টহল দিতে দেখা গেছে।

বুধবার সকালে সাভারে বিজিবি টহল
ছবির ক্যাপশান, বুধবার সকালে সাভারে বিজিবি-কে টহল দিতে দেখা গেছে

রাস্তায় আওয়ামী লীগ, নেই বিএনপি

বিবিসির সংবাদদাতারা জানান, ঢাকা ও এর আশপাশের জেলাগুলোর বিভিন্ন মোড়ে সরকারি দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা অবস্থান দেখা গেছে।

অনেক জায়গায় অবরোধবিরোধী মিছিল ও শান্তি সমাবেশ করেছে।

সকালে ঢাকার মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, গাবতলী, যাত্রাবাড়ি, মিরপুর সহ বিভিন্ন এলাকায় অবরোধ বিরোধী মিছিল করেছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।

এছাড়া সাভারের আমিনবাজার, হেমায়েতপুর এবং নারায়ণগঞ্জেও ছোট ছোট মিছিল করেছে সরকারি দলের নেতা-কর্মীরা।

এসময় তাদের কারো কারো হাতে লাঠি-সোটা এবং রড দেখা গেছে।

তবে ঢাকায় কোথাও বিএনপি'র কোন মিছিল দেখা যায়নি বলে জানান বিবিসি সংবাদদাতারা।

 অবরোধ বিরোধী মিছিল করেছে আওয়ামী লীগ
ছবির ক্যাপশান, বুধবার সকালে ঢাকার গাবতলী মোড়ে অবরোধ বিরোধী মিছিল করে আওয়ামী লীগ

মির্জা আব্বাস এবং আলাল গ্রেফতার

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস এবং যুগ্ম-মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালকে মঙ্গলবার রাতে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ।

গত ২৮শে অক্টোবরের নাশকতার মামলায় তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে সাংবাদিকদের জানান ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান হারুন অর রশীদ।

নয়াপল্টনে সতর্ক অবস্থানে পুলিশ
ছবির ক্যাপশান, বিএনপি'র নয়াপল্টন কার্যালয়ের সামনে পুলিশের এমন অবস্থান দেখা যাচ্ছে গত কয়েকদিন ধরেই

বিএনপি কার্যালয় বন্ধ, সামনে পুলিশ

গত কয়েকদিনের মতো বুধবার সকালেও বিএনপি’র নয়াপল্টন কার্যালয়ের মূল ফটকে তালা ঝুলতে দেখেন বিবিসি সংবাদদাতা।

পুলিশের সদস্যদেরকে কার্যালয়ের সামনে সতর্ক অবস্থানে দেখা যায়। তবে সেখানে বিএনপি নেতাকর্মীদের কাউকেই দেখা যায়নি।

প্রথম দিন যা ঘটেছিল

বিএনপি’র ডাকা টানা তিন দিনের অবরোধের প্রথম দিন মঙ্গলবারে বিভিন্ন জায়গায় বিএনপি নেতাকর্মীদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ হয়।

এর মধ্যে কিশোরগঞ্জে বিএনপি-পুলিশ সংঘর্ষে দুইজন কর্মী নিহত হয়েছে বলে দাবি করেছে বিএনপি। যদিও বিবিসি বাংলার কাছে বিল্লাল হোসেন নামে একজনের মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করেছিলেন কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার।

এছাড়া পুলিশের সাথে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার সময় সিলেটের দক্ষিণ সুরমায় একজনের মৃত্যু হয়েছে।

নিহত তিনজনকেই দলীয় নেতা দাবি করে তাদের মৃত্যুর জন্য পুলিশকে দায়ী করেছে বিএনপি।যদিও পুলিশ এসব মৃত্যুর দায় স্বীকার করেনি।

এছাড়া ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ এবং বগুড়ায় পুলিশের সাথে বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়। এসব সংঘর্ষের ঘটনায় বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়।

এছাড়া মঙ্গলবার ঢাকা, গাজীপুর ও চট্টগ্রামে বেশ কয়েকটি গাড়ি পোড়ানো এবং ভাংচুরের ঘটনা ঘটে।

সড়কে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে বিএনপির কর্মীরা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মঙ্গলবার নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে সড়ক অবরোধ করার সময় পুলিশের সাথে সংঘর্ষ হলে সড়কের ওপর আগুন জ্বালিয়ে দেয় বিএনপির কর্মীরা

যে কারণে অবরোধ

গত ২৮শে অক্টোবর বিএনপি’র সমাবেশে “হামলা, হত্যা, গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে” এবং সরকার পতনের একদফা দাবি আদায়ে ৩১ অক্টোবর থেকে ২রা নভেম্বর পর্যন্ত টানা তিন দিনের এই অবরোধ কর্মসূচি দেয় বিএনপি।

গত ২৯ অক্টোবর দলটির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী আহমেদ টানা তিন দিনের এই অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

বিএনপি তখন দাবি করেছিলো যে, ২৮ অক্টোবরের আগের পাঁচ দিনে সারা দেশে বিএনপি’র দুই হাজার ছয়শত নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ৪৫টি মামলাও দেয়া হয়েছে।

আর গেলো ২৮শে জুলাই থেকে এখন পর্যন্ত সারা দেশে দলটির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ৪৪২টি। যেখানে গ্রেপ্তারের সংখ্যা পাঁচ হাজার ছাড়িয়েছে বলেও দাবি করেছে দলটি।

বিএনপি বলছে, তাদের ভাষায় এসব গ্রেপ্তার, নির্যাতনের অবসান এবং সরকার পতনের দাবি আদায়ের জন্যই তাদের অবরোধের নতুন কর্মসূচি।

ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রোডের সকাল সাড়ে ৯টার চিত্র
ছবির ক্যাপশান, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রোডের সকাল সাড়ে ৯টার চিত্র