রুশ ওয়াগনার গ্রুপকে কেন 'অপরাধী সংগঠন' ঘোষণা করছে যুক্তরাষ্ট্র

রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে ওয়াগনার গ্রুপের কার্যালয়

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে ওয়াগনার গ্রুপের কার্যালয়

রুশ সেনাদের সহযোগী ভাড়াটে বাহিনী হিসেবে ইউক্রেনে যুদ্ধরত ওয়াগনার গ্রুপকে একটি ‘অপরাধী সংগঠন’ হিসেবে চিহ্নিত করতে যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ।

ইউক্রেনে বর্তমানে এই গোষ্ঠীর প্রায় ৫০,০০০ যোদ্ধা সক্রিয় রয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন কারবি।

ওয়াগনার গ্রুপের নেতা হচ্ছেন ইয়েভগেনি প্রিগোশিন – যিনি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের একজন মিত্র। মি. কারবি বলেন, গ্রুপটির যোদ্ধাদের ৮০ শতাংশই নেয়া হয়েছে কারাবন্দীদের মধ্যে থেকে।

ওয়াশিংটন থেকে বিবিসির সংবাদদাতা বার্ন্ড ডেবুসম্যান জুনিয়র জানাচ্ছেন, এই ওয়াগনার গ্রুপকে “বিভিন্ন দেশে সক্রিয় একটি অপরাধী সংগঠন” বলে ঘোষণার ফলে যুক্তরাষ্ট্র এর বিরুদ্ধে ব্যাপকভিত্তিক কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারবে।

আগামী সপ্তাহেই হোয়াইট হাউস এই গ্রুপ এবং তার সহযোগী নেটওয়ার্কগুলোর ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞার কথা ঘোষণা করবে বলে জানা গেছে।

অতীতে এই ওয়াগনার গ্রুপ সিরিয়া, লিবিয়া, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রসহ বেশ কিছু দেশে তপর ছিল।

সম্প্রতি পূর্ব ইউক্রেনের বাখমুট ও সোলেডার শহর দখলের লড়াইয়ে ওয়াগনার গ্রুপ বড় ভুমিকার পালন করে।

তা ছাড়া কয়েকদিন আগে উত্তর কোরিয়া থেকে রাশিয়ার ট্রেনে করে রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র আনার যে গোয়েন্দা ছবি প্রকাশ পেয়েছে – সেসব অস্ত্রশস্ত্র পরে ওয়াগনার বাহিনীই ব্যবহার করেছে বলে বলা হচ্ছে।

বিবিসি বাংলায় সম্পর্কিত খবর:
ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে ওয়াগনার গ্রুপের প্রধান ইয়েভগেনি প্রিগোশিন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে ওয়াগনার গ্রুপের প্রধান ইয়েভগেনি প্রিগোশিন

কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ওয়াগনার বাহিনী?

বিবিসির এক অনুসন্ধানে বলা হয়, চেচনিয়ায় যুদ্ধ করা একজন রুশ সেনা কর্মকর্তা দিমিত্রি উটকিন সম্ভবত এই বাহিনী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

তবে বর্তমানে এর প্রধান হচ্ছে ধনী ব্যবসায়ী ইয়েভগেনি প্রিগোশিন – যাকে পুতিনের রাঁধুনী বলা হয় কারণ একসময় তিনি ক্রেমলিনের জন্য খাবার সরবরাহ করতেন।

ক্রাইমিয়া দখলের জন্য রাশিয়ার ২০১৪ সালের যুদ্ধে ওয়াগনার গ্রুপের যোদ্ধারা প্রথম ভুমিকা পালন করে। এর পর ২০১৫ সালে সিরিয়াতে সরকারসমর্থক বাহিনীর পাশাপাশি থেকে যুদ্ধ করে ওয়াগনার বাহিনী, এবং সেসময় তারা তেলের খনিগুলোও পাহারা দিত।

 তা ছাড়া ওয়াগনার বাহিনী ভাড়াটি সৈন্যরা লিবিয়ায় জেনারেল খলিফা হাফতারের সহযোগী হিসেবে, এবং মধ্যআফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে হীরার খনি পাহারা দিতে কাজ করে।

ইয়েভগেনি প্রিগোশিন

ছবির উৎস, LEAKED VIDEO

ছবির ক্যাপশান, ওয়াগনার গ্রুপের যোদ্ধা হিসেবে নিয়োগের জন্য আনা কয়েদিদের সামনে ইয়েভগেনি প্রিগোশিন

পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালির সরকার ইসলামি জঙ্গী গ্রুপগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ওয়াগনার বাহিনীকে কাজে লাগাচ্ছে।

ধারণা করা হয়, সুদানে সোনার খনি পাহারা দেবার কাজ করছে ওয়াগনার বাহিনীর যোদ্ধারা।

সুদান ও মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে তাদের কর্মকাণ্ডের কারণে ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর বেশ কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। হোয়াইট হাউজের একজন মুখপাত্র রয়টার্সকে বলেছেন, পূর্ব ইউক্রেনে বাখমুট দখলের লড়াইয়ে ওয়াগনার গ্রুপ সক্রিয় থাকার কারণ হচ্ছে মি. প্রিগোশিন সেখানকার লবণ ও জিপসামের খনিগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে চান।

ওয়াগনার গ্রুপের যোদ্ধারা কারা?

মার্কিন সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, ইউক্রেনে যুদ্ধরত রুশ বাহিনীর প্রায় ১০ শতাংশ হচ্ছে ওয়াগনার গ্রুপের যোদ্ধা।

এর মধ্যে হাজার হাজার যোদ্ধা এসেছে রাশিয়ার কারাগারগুলোতে থাকা বন্দীদের মধ্যে থেকে।

প্রথমদিকে তাদের সৈন্য সংখ্যা ছিল মাত্র ৫,০০০ – যাদের অধিকাংশই ছিল বিভিন্ন রেজিমেন্টের সাবেক সৈন্য।

তবে যুক্তরাজ্যের কর্মকর্তারা বলেন, ক্রেমলিন নিয়মিত বাহিনীর জন্য লোক পেতে সমস্যায় পড়ার পর এই ওয়াগনার বাহিনী বড় সংখ্যায় সেনা নিয়োগ শুরু করে।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:
সিরিয়ায় ওয়াগনারের যোদ্ধা

ছবির উৎস, @RSOTM telegram group

ছবির ক্যাপশান, সিরিয়ায় ওয়াগনারের কয়েকজন যোদ্ধা

একজন কর্মকর্তা বলেন, রুশ শহরগুলোতে ওয়গনার গ্রুপের বিলবোর্ড দেখা যাচ্ছে এবং তারা প্রকাশ্যেই লোক নিয়োগ করছে । রুশ মিডিয়াতে তাদের দেশপ্রেমিক সংগঠন হিসেবে তুলে ধরা হয়।

ওয়াগনার গ্রুপের বিরুদ্ধে ২০২২ সালে ইউক্রেনের বুচা ও কিয়েভের নিকটবর্তী এলাকায় বেসামরিক লোকদের হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগ আছে।

জাতিসংঘ ও ফরাসী সরকার এর আগে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে ওয়াগনারের ভাড়াটে সৈন্যদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও ডাকাতির অভিযোগ আনে। এর পর ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

মার্কিন সামরিক বাহিনী ২০২০ সালে ওয়াগনারের যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলি ও তার আশপাশে ল্যান্ড মাইন ও অন্য বিস্ফোরক পেতে রাখার অভিযোগ আনে।

জানুয়ারি মাসে ওয়াগনার বাহিনীর একজন সাবেক কম্যান্ডার নরওয়েতে দলত্যাগ করে রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ার পর দাবী করেন, তিনি ইউক্রেনে যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হতে দেখেছেন।