মাঠ প্রশাসনের সাথে স্থানীয় সরকারের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব কোথায়?

স্থানীয় সরকার বিভাগ

ছবির উৎস, স্থানীয় সরকার বিভাগ

    • Author, মুন্নী আক্তার
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
    • Reporting from, ঢাকা

বাংলাদেশে প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং স্থানীয় সরকার প্রশাসনের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা ও বিতর্ক চলতে থাকলেও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে বিষয়টির সমাধান হচ্ছে না বলে মনে করেন স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, আইনগতভাবেই স্থানীয় পর্যায়ে একটি দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা কায়েম করে রাখা হয়েছে। একটি হচ্ছে উপজেলা নির্বাহী প্রশাসনের শাসন। আরেকটি হচ্ছে উপজেলা পরিষদের শাসন।

এ বিষয়টি আরো ভালভাবে সামনে আসে বাংলাদেশে গত ৬ই জানুয়ারি হাইকোর্টের একটি রুল জারির পর। হাইকোর্ট একটি রুল জারি করে জানতে চেয়েছে যে, উপজেলা পরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধির থেকে নির্বাহী কর্মকর্তার ক্ষমতা কেন বেশি হবে।

এই রুল জারির আগে বাংলাদেশ উপজেলা পরিষদ অ্যাসোসিয়েশন এই বিষয়টি সামনে এনে একটি রিট পিটিশন করে। যার জেরে রুল জারি করে আদালত।

এছাড়া এরআগেও বাংলাদেশে নানা ঘটনা স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমে এসেছে যার মাধ্যমে স্থানীয় এই দুই প্রশাসনের দ্বন্দ্ব সামনে এসেছে।

এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, ২০২১ সালের অগাস্টে বরিশাল সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মুনিবুর রহমানের সরকারি বাসভবনে জেলা ছাত্রলীগের কয়েকশ নেতা-কর্মীর হামলা। এ ঘটনায় অভিযোগের আঙুল ছিল বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লার দিকে। এ ঘটনায় স্থানীয় আওয়ামীলীগের বেশ কিছু নেতাকর্মীকে গ্রেফতারও করা হয়।

আরও পড়তে পারেন:
হাইকোর্ট একটি রুল জারি করে জানতে চেয়েছে যে, উপজেলা পরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধির থেকে নির্বাহী কর্মকর্তার ক্ষমতা কেন বেশি হবে।

ছবির উৎস, FARJANA KHAN GODHULY

ছবির ক্যাপশান, হাইকোর্ট একটি রুল জারি করে জানতে চেয়েছে যে, উপজেলা পরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধির থেকে নির্বাহী কর্মকর্তার ক্ষমতা কেন বেশি হবে।

এছাড়া ২০১৭ সালের জুলাই মাসে বরিশালের আগৈলঝড়া উপজেলার তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার গাজী তারিক সালমনের বিরুদ্ধে মামলা এবং তাকে গ্রেফতারের ঘটনার পর দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় এবং ক্ষোভ সৃষ্টি হয় জনপ্রশাসনে।

তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের ‘বিকৃত ছবি’ প্রকাশ করার অভিযোগ এনে মামলা করেছিলেন বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক সৈয়দ ওবায়েদ উল্লাহ যাকে পরে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

তখন মি. সালমন এক সাক্ষাৎকারে বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন যে, “আমি অবৈধ স্থাপনা করতে দেই নি আমি যতদিন সেখানে ছিলাম। এসব কারণে সেখানকার প্রভাবশালীরা আমার বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ ছিল। আমার অনুমান, তারা আমাকে হয়রানি করার জন্য বাদীকে দিয়ে এই মামলাটি করিয়েছে।"

কেন এই দ্বন্দ্ব?

সাবেক মন্ত্রীপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার মনে করেন, স্থানীয় উপজেলা পরিষদ এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মধ্যে যে দ্বন্দ্ব সেটা আসলে ক্ষমতার নয়। বরং আইন অনুযায়ী, দুই পক্ষের দায়িত্ব ভাগ করে দেয়া থাকলেও তারা সেটি যখন অতিক্রম করেন, তখনই বিভিন্ন ধরণের দ্বন্দ্ব সামনে আসে।

উপজেলা পরিষদ আইন অনুযায়ী, উপজেলা পরিষদের ক্ষমতা এবং কাজের পরিসর নির্ধারণ করা আছে। একই ভাবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাজের পরিসরও নির্ধারণ করা আছে। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে উপজেলা পরিষদের বাইরেও কাজের আওতা দেয়া আছে।

“এখানে যদি দুই পক্ষই নিজেদের সীমিত রাখে তাহলে দ্বন্দ্ব হওয়ার কোন কারণ থাকে না।”

মি. মজুমদারের মতে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার জবাবদিহিতার বিধান রয়েছে। আর এজন্যই তার দায়বদ্ধতা বেশি থাকে। কোনো কোনো উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান যদি এমন কোন কাজ করেন যা সরকারি বিধি বিরোধী হয় তাহলে উপজেলা কর্মকর্তা বিধিসম্মতভাবেই সেখানে আপত্তি তুলতে পারেন।

“সেটা যদি তোলেন সেটাকে অযৌক্তিক বলা যাবে না,” বলেন তিনি।

বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর:
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

তবে ঘটনা যদি উল্টো হয় তাহলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে স্থানীয় সরকারের কাছে উপজেলা চেয়ারম্যানরা অভিযোগ করতে পারেন বলে জানান তিনি।

এদিকে, বাংলাদেশ উপজেলা পরিষদ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবং পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ড. হারুন অর রশীদ হাওলাদার অবশ্য বলেন, আইনে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানদের ক্ষমতা দেয়া থাকলেও তা আসলে কাগজে কলমেই রয়ে গেছে। তা বাস্তবায়ন করা হয় না। কারণ এগুলো বাস্তবায়ন নির্ভর করে উপজেলা কর্মকর্তাদের উপরই।

উপজেলা পরিষদ আইনে উপজেলা পরিষদকে ‘প্রশাসনিক একাংশ’ হিসেবে স্বীকৃত দেওয়া হয়েছে। সংবিধানে ৫৯ অনুচ্ছেদ সুস্পষ্টভাবে ‘প্রশাসনের একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার’ নির্বাচিত পরিষদকে দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

“কন্সটিটিউশনাল ডাইরেকশন(সাংবিধানিক নির্দেশনা) এন্ড লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক ভায়োলেট করছেন ইতিবাচক মনোভাবের অভাব, এই মনোভাব কাদের? প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের। তারা সরকারের কর্মচারী না, তারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী।”

মি. হাওলাদার বলেন, উপজেলা পরিষদ হচ্ছে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসনব্যবস্থা যা কেন্দ্রীয় সরকারের বিকেন্দ্রীকৃত শাসনব্যবস্থার অংশ। কিন্তু স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচী ছাড়া আর কোন উন্নয়ন কর্মসূচী উপজেলা পরিষদে আসে না।

আইন অনুযায়ী, উপজেলা প্রশাসনের সব উন্নয়ন কাজই উপজেলা পরিষদে আসার কথা। কিন্তু বাস্তবে এটা হয়না বলে অভিযোগ করেন তিনি বলেন, স্থানীয় প্রশাসনের মনোভাবই এই অবস্থার জন্য দায়ী।

সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তারিক সালমন যার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল

ছবির উৎস, TARIK SALMON/FACEBOOK

ছবির ক্যাপশান, সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তারিক সালমন যার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল

ত্রিমুখী শাসন ব্যবস্থা?

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বলছেন যে, উপজেলা পর্যায়ে যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব দেখা যায় তা আসলে আইনি জটিলতার অংশ।

উনিশশো আটানব্বই সালের উপজেলা পরিষদ আইন অনুযায়ী, উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা করা হয়েছে এবং তিনি পরিষদকে সাচিবিক সহায়তা দেবেন বলে আইনে উল্লেখ করা হয়েছে।

উপজেলা পরিষদই একমাত্র স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান যার নিজস্ব কোন সচিব নেই।

এছাড়া এই পরিষদের উপদেষ্টা করার বিধান রয়েছে স্থানীয় এমপি বা সংসদ সদস্যকে। আইন অনুযায়ী, তার উপদেশ নেয়া এবং সরকারের সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে তাকে জানানো বাধ্যতামূলক।

আর নির্বাহী সব কাজের সচিব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হওয়ার কারণে সাংসদরা উপজেলা চেয়ারম্যানকে ছাপিয়ে সরাসরি নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে কার্যক্রম পরিচালনা করেন। যার কারণে আসলে উপজেলা চেয়ারম্যানের তেমন কোন ক্ষমতা থাকে না।

এছাড়া উপজেলা পরিষদ আইনে, উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব ও কাজের পরিসর নিয়ে যেসব বিষয় উল্লেখ করা আছে তা বেশিরভাগ সময়েই একাধিক অর্থ প্রকাশ করে। যার জন্য এই দুই কর্মকর্তা তাদের কাজের পরিধি সম্পর্কে বুঝতে পারেন না। আর সে কারণেই দেখা দেয় দ্বন্দ্ব।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা নির্দিষ্ট বেতনভূক্ত এবং তাদের একটি স্থায়ী পদ থাকে। যার কারণে যেকোন ধরণের সিদ্ধান্ত তাদের কাছেই আগে আসে। তারা আট-ঘাট বেধে রাখে এবং কোন কিছুতেই ছাড় দিতে চায় না।

অন্যদিকে চেয়ারম্যানরা স্থায়ী না হলেও জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হওয়ার কারণে নিজেদেরকে ক্ষমতার অধিকারী মনে করে। তবে কাজ করতে গিয়ে তারা প্রশাসনিক কাজ বুঝতে না পারার কারণে দুই পক্ষের মধ্যে এক ধরণের ভুল বোঝাবুঝি হয় বলে জানান তিনি।

এধরণের পরিস্থিতি উপজেলা, জেলা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে।

“এটাকে আমি দ্বৈত শাসন বলি। একটা দ্বৈত শাসন সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে।”

এছাড়া, স্থানীয় যারা জনপ্রতিনিধি বা এমপি রয়েছেন তারাও এক ধরণের শাসন পরিচালনা করেন বলে মনে করেন।

সব মিলিয়ে স্থানীয় উপজেলা পর্যায়ে অনেকটা ত্রিমুখী শাসন পরিচালিত হয়।

রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব আর দুর্নীতির কারণে এই সমস্যাগুলোর কোন সমাধান হয় না বলে মনে করেন স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা। কারণ, এই ত্রিমুখী শাসন ব্যবস্থা থেকে সব পক্ষই লাভবান হতে চায় এবং তারা নিজ নিজ জায়গা থেকে প্রাপ্ত সুবিধাও ভোগ করে থাকে। ফলে উপজেলা পর্যায়ে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব দিন দিন প্রকট হচ্ছে।