সরকার কেন কর্মকর্তাদের পরিবারের সাথে বাস বাধ্যতামূলক করতে চায়?

ঢাকায় চলতি বছর ডিসিদের সম্মেলন।

ছবির উৎস, PMO

ছবির ক্যাপশান, ঢাকায় চলতি বছর ডিসিদের সম্মেলন।
    • Author, কাদির কল্লোল
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশে জেলা প্রশাসকসহ মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পদে দায়িত্ব পালন করতে হলে স্ত্রী বা স্বামী এবং সন্তানসহ কর্মস্থলে বসবাস বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বিবিসিকে বলেছেন, জেলা উপজেলায় কোন কর্মকর্তা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকলে তার দায়িত্ব পালনে ঘাটতি দেখা দেয়।

মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনকে আরও গতিশীল করতে সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তবে সরকারের এমন পদক্ষেপ যৌক্তিক নয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

তারা বলেছেন, কোন কর্মকর্তার কাজ বিবেচনা না করে পরিবার কোথায় থাকছে, সেটা কর্তৃপক্ষের দেখার বিষয় নয়।

পরিবার নিয়ে কর্মস্থলে না থাকলে এখন জেলা প্রশাসকসহ মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনের অন্য কর্মকর্তাদের পদে নিয়োগ পাওয়া যাবে না।

মাঠের প্রশাসনের যে কোন পদের দায়িত্ব পেতে হলে সেই কর্মকর্তাকে আগেই অঙ্গীকার করতে হবে, যে তিনি সেখানে পরিবারসহ বসবাস করবেন।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বিবিসিকে বলেন, মাঠ পর্যায়ে কাজের গতি বাড়াতে সরকারের ভেতরে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী কয়েকমাস আগে এই নির্দেশ দিয়েছেন। তা এখন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলছিলেন, "বেশ কিছুদিন আগে আমরা প্রায় ২০জন ডিসি পরিবর্তন করেছি। দুই তিন মাস আগে তখন আলোচনায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন যে ডিসিদের পরিবার নিয়ে কর্মস্থলে থাকতে হবে। যারা পরিবার নিয়ে থাকতে পারবেন না, তাদের আমরা ডিসি বানাবো না।"

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সাথে প্রধানমন্ত্রী। (ফাইল ফটো)

ছবির উৎস, MOPA

ছবির ক্যাপশান, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সাথে প্রধানমন্ত্রী হাসিনা। (ফাইল ফটো)

আরও পড়তে পারেন:

"এটা প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট নির্দেশ আছে যে, যারা ডিসি হবেন, তাদের পরিবার নিয়ে কর্মস্থলে থাকতে হবে। মাঠপর্যায়ের সব কর্মকর্তাদের জন্য এটা প্রযোজ্য।"

স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলামও জানিয়েছেন যে, তার মন্ত্রণালয়ের অধীনে জেলা-উপজেলায় যেসব প্রকৌশলীর পদ রয়েছে, সেই পদগুলোতে এখন দায়িত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে একইভাবে পরিবারসহ কর্মস্থলে থাকার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে।

তবে মাঠ পর্যায়ের একাধিক সরকারি প্রকৌশলী এবং প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তার সাথে কথা হয়, তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, তাদের কর্মস্থলে ভাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার জন্য পরিবার ঢাকায় থাকছে।

এছাড়া বদলির চাকরিতে পরিবার নিয়ে বার বার জায়গা পরিবর্তন করতে তাদের সমস্যা হয়।

স্ত্রী ঢাকায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন, এমন কারণও রয়েছে কারও কারও ক্ষেত্রে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক নুসরাত জাহান চৌধুরী বলছেন, সরকারের এই পদক্ষেপ যৌক্তিক নয়।

"পরিবারের অন্যান্য যে সদস্য আছে, তাদেরও কিন্তু এখানে পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপার থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে তারা কোথায় কতটা সুবিধা নিয়ে থাকবে, সেটা তাদের পছন্দের বিষয়। এটা একান্ত ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিষয়। আমরা তাদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারি না।"

"সেখানে ঐ কর্মকর্তা কতটা কমিটমেন্ট নিয়ে কাজ করছেন, সেটাই বিবেচনার বিষয় হওয়া উচিত।"

যদিও সরকার বলছে, কর্মস্থলে পরিবারসহ বসবাস না করায় জেলা প্রশাসনে অনেক কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনে ঘাটতি হচ্ছে। কিন্তু এ ব্যাপারে কোন জরিপ সরকার করেনি।

ঢাকায় উচ্চপর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনের কেউ কেউ পরিবার ঢাকায় থাকায় কর্মস্থলে সাপ্তাহিক ছুটির দু'দিনে কর্মস্থলেই থাকেন না।

প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন জানান, বিভিন্ন সময় প্রশাসনের মাধ্যমে যে তথ্য সরকার পেয়েছে, তার ভিত্তিতে এমন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এটি যৌক্তিক বলেও তিনি দাবি করেন।

"কোন সার্ভে নাই। যখনই আমরা শুনছি অনেকেই কর্মস্থলে থাকেন না বিভিন্ন কারণে। এমন কিছু কারণ আছে যেমন বাচ্চা হয়তো এমন একটা জায়গায় পড়ে তার জন্য তার মাকে তার সাথে থাকতে হয়, সেটা আছে।"

কিন্তু কোন কর্মকর্তার পরিবার কোথায় থাকবে, এমন বিষয়ে কতৃপক্ষ হস্তক্ষেপ করতে পারে কিনা- এই প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী মি: হোসেন বলেন, "আসলে তিনি যাতে কোন টেনশনে না থাকেন। পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা মানে পরিবার এক জায়গায় রেখে এবং তিনি আরেক জায়গায় থেকে কাজে সমস্যা হয়।"

"তিনি যেনো পরিবারের সাথে সুন্দরভাবে বসবাস করে ভালভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন এবং মানুষের সেবা করতে পারেন। সেজন্য আমরা অবশ্যই এটি তাদের বলে দিচ্ছি। তারা যেনো সেভাবে থাকেন, সে ব্যবস্থা আমরা নিচ্ছি।"

এমন পদক্ষেপের কারণে জেলায় উপজেলায় উন্নয়ন কর্মকান্ডে গতি আসবে বলে তিনি মনে করেন।

তবে এনিয়ে বিশ্লেষকদের মনে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

বিবিসি বাংলায় আরও খবর: