ঈদের দিন গণপিটুনিতে দুই ভাই নিহত, কী হয়েছিলো নরসিংদীতে

ঈদের দিন সন্ধ্যায় ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলা নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন আপন দুইভাই।

পুলিশ জানিয়েছে, চোর সন্দেহে একজনকে গণপিটুনি দেয়া নিয়ে পাল্টাপাল্টি বিবাদে ওই দুই ভাইকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে স্থানীয়রা।

এর মধ্যে একজন ঘটনাস্থলেই মারা গেছেন, আর চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আনার পথে মৃত্যু হয়েছে অপরজনের।

ঘটনার পর প্রায় একদিন পেরিয়ে গেলেও ময়নাতদন্ত শেষ না হওয়ায় এখনও লাশ হস্তান্তর হয়নি পরিবারের কাছে।

এখনও এ ঘটনায় মামলা দায়ের হয়নি।

তবে, গণপিটুনির ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহে তিন ব্যক্তিকে গতকাল রাতেই অভিযান চালিয়ে আটক করেছে পুলিশ।

পলাশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনির হোসেন বিবিসিকে বলেছেন, এ ঘটনায় এখনও পর্যন্ত পরিববারের পক্ষ থেকে কোনও মামলা জমা পড়েনি।

বিকেলে তিনি জানিয়েছেন, "ময়নাতদন্ত শেষের দিকে। তারপর মরদেহ হস্তান্তর করা হবে এবং মরদেহ দাফন করার পর ভুক্তভোগীদের পরিবার আজই থানায় মামলা করতে পারে এবং পুলিশ সে মামলা গ্রহণ করবে।"

আরও পড়তে পারেন:

ঈদের দিন কী হয়েছিলো নরসিংদীতে?

পুলিশ জানিয়েছে, নিহত দুই ভাইয়ের নাম রাকিব মিয়া এবং সাকিব মিয়া। গতকাল সোমবার ঈদের দিন রাত আটটার দিকে তাদেরকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

নিহত দুই ভাইয়ের বাড়ি নরসিংদীর র করতেতৈল গ্রামে, তবে গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে পাশের গ্রাম ভাগদী'র কুড়ইতলী এলাকায়।

পুলিশ এবং স্থানীয় সংবাদদাতাদের সাথে কথা বলে জানা যাচ্ছে, ঘটনার সূত্রপাত ঈদের দিন মানে সোমবার সকালে।

ঈদের সকালে অটোরিকশার ব্যাটারি চুরি করতে এসেছে - এমন সন্দেহে করতেতৈল এলাকার এক ব্যক্তিকে মারধর করেন ভাগদীর স্থানীয় বাসিন্দা ও অটোরিকশা চালকরা।

স্থানীয় সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, পুলিশ গণপিটুনির খবর পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে এক ব্যক্তিকে উদ্ধার করে পলাশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।

গণপিটুনির ঘটনা জানার পর রাকিব মিয়া ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রতিবাদ জানান। তিনিও তখন মারধরের শিকার হন।

পুলিশ জানিয়েছে, রাকিব ভেবেছিলেন ভাগদীতে স্থানীয়রা তার চাচাকে পেটাচ্ছে। পরে জানা যায়, সকালে গণপিটুনির শিকার ব্যক্তি রাকিবের আত্মীয় ছিলেন না।

পুলিশ কর্মকর্তা মনির হোসেন বলেছেন, মারধরের শিকার হয়ে রাকিব মিয়া তখন তার গ্রামে ফিরে যান।

কিন্তু সন্ধ্যায় রাকিব তার ছোটভাই সাকিব মিয়া, তাদের বাবা-মা ও গ্রামের লোকজনকে নিয়ে ফের ভাগদী গ্রামে যান।

স্থানীয় সাংবাদিকদের মতে, রাকিব-সাকিবের সাথে ৩০-৩৫ জন মানুষ ছিল। তারা ভাগদী এলে সেখানকার স্থানীয়দের সাথে সংঘর্ষ শুরু হয়।

পুলিশ কর্মকর্তা মি. হোসেন বলেছেন, "তখন ভাগদী গ্রামের লোকজন মাইকিং করে যে করতেতৈল থেকে ডাকাত এসেছে। মসজিদের মাইকে ওই ঘোষণা শুনে স্থানীয়রা লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাদের আটক করে এবং তারপর গণপিটুনি দেয়।"

এ সময় তাদেরকে 'কুপিয়ে গুরুতর জখম' করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

সংবাদ পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ আসে। এরপর আহতদের প্রথমে নরসিংদী সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়।

কিন্তু পথেই ছোট ভাই সাকিব মিয়া মারা যান। রাকিবকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসতালে পাঠানো হয়। কিন্তু ঢামেকে নেয়ার পথে রাকিবের মৃত্যু হয়।

বিরোধের কারণ কী?

বর্তমানে ভাগদী গ্রামে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ওই এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

এই ঘটনায় আহত হয়েছেন নিহতদের বাবা আশরাফ উদ্দিন ও মা রাবেয়া খাতুনও। প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন তারা।

এদিকে, নিহত দুই ভাইয়ের পরিবারের সদস্যরা এখন ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তরের অপেক্ষায় আছেন।

পুলিশ বলছে, প্রাথমিক তদন্তে অটোরিকশার ব্যাটারি চুরি সংক্রান্ত বিবাদ থেকে পিটুনির জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।

ঘটনার পর নিহত দুই ভাইয়ের পরিবার থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল যে হামলাকারীরা তাদের কাছে আগে থেকে চাঁদা চেয়ে আসছিল।

যদিও, পুলিশ জানিয়েছে, চাঁদাবাজির অভিযোগ প্রসঙ্গে এখনও প্রমাণ পাননি তারা।

এদিকে, স্থানীয় সাংবাদিক আসাদুজ্জামান রিপন জানিয়েছেন, "মূল অভিযুক্ত ব্যক্তির সাথে রাকিবের আগে থেকে দ্বন্দ্ব ছিল। জানা গেছে যে, সাত বছর আগে ক্যারম বোর্ড খেলা নিয়ে এই দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছিলো।"

গণপিটুনি নিয়ে সংবিধান ও আইনে কী বলা আছে?

বাংলাদেশে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করার ঘটনা নতুন নয়। বিভিন্ন ইস্যুতে একত্রিত হয়ে কারো ওপর চড়াও হওয়া এবং তারপর গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলার বেশ কয়েকটি ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে ঘটেছে।

কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনানুযায়ী গণপিটুনি মানবাধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন।

মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা-১৯৪৮, এর তিন নম্বর অনুচ্ছেদে বলা আছে "প্রত্যেকের জীবন, স্বাধীনতা ও ব্যক্তি নিরাপত্তার অধিকার আছে" অর্থাৎ একজন মানুষ সুস্থ স্বাভাবিকভাবে তার জীবন যাপনের অধিকার রাখেন।

অনুচ্ছেদ পাঁচ অনুযায়ী – কারো প্রতি নির্যাতন, অত্যাচার, নিষ্ঠুরতা, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ করা যাবে না।

আর বাংলাদেশে সংবিধানে, অপরাধী-নিরপরাধী নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিককে আইনের আওতাও বিচার লাভ এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়া হয়েছে।

সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের সকল নাগরিক আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।

অনুচ্ছেদ ৩১ বলছে আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না যাতে কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনামে বা সম্পত্তির হানি ঘটে।

অনুচ্ছেদ ৩৫ অনুযায়ী, আইনের দৃষ্টিতে অপরাধী প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না এবং অপরাধের জন্য যতটুকু শাস্তি প্রাপ্য তার চেয়ে বেশি বা ভিন্ন কোনো শাস্তি দেয়া যাবে না।

এছাড়া ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৯ ধারা অনুযায়ী, অপরাধী ধরা পড়লে তাকে পুলিশের হাতে হস্তান্তর করতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণপিটুনির মতো ঘটনাগুলো বেশি দেখা যায় বাংলাদেশের মতো অর্থনৈতিক এবং সামাজিকভাবে পশ্চাৎপদ সমাজে।

মনোবিজ্ঞানীরা এই প্রবণতাকে 'মব সাইকোলজি' হিসেবে বর্ণনা করেন।