ভারতের জাতীয় সংগীতের সুরকার হিসেবে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে কেন?

ভারতের জাতীয় সঙ্গীতের সুরকার কে তা নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে কয়েকদিন ধরে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ভারতের জাতীয় সংগীতের সুরকার কে তা নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে কয়েকদিন ধরে
    • Author, অমিতাভ ভট্টশালী
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা

ভারতের স্বাধীনতা দিবস ১৫ই অগাস্ট থেকে গত দু-তিন ধরে নানা সামাজিক মাধ্যমে এবং মেসেজিং অ্যাপে কিছু মেসেজ ছড়ানো হচ্ছে, যাতে দেশটির জাতীয় সংগীত ‘জন গণ মন’-এর সুরকার নিয়ে ভুল তথ্য দেওয়া হচ্ছে।

ভারত সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক - যারা দেশটির জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীতের মতো প্রতীকের মর্যাদা রক্ষার দায়িত্বে রয়েছে, তাদের ওয়েবসাইটে এ নিয়ে পরিষ্কারভাবে লেখা আছে যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ও সংগীত আরোপিত ‘জন গণ মন’ নামে পরিচিত গানটির প্রথম স্তবকটিই জাতীয় সঙ্গীত।

রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞরা একাধিক প্রমাণ দিয়ে বলছেন, ‘জন গণ মন’ এর সুর রবীন্দ্রনাথের দেওয়া এবং বিষয়টি নিয়ে বিতর্কের কোনও অবকাশ নেই। বিবিসি বাংলাও এর স্বপক্ষে একাধিক প্রমাণ খুঁজে বের করেছে।

সম্প্রতি যেসব বিভ্রান্তিমূলক এবং ভুল তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, তার ভিত্তি হচ্ছে সুভাষ চন্দ্র বসুর সহযোগী ও আজাদ হিন্দ ফৌজের ক্যাপ্টেন রাম সিং ঠাকুরির একটি পুরণো দাবি। তার দাবি হচ্ছে, বর্তমানে যে সুরে জনগণমন গাওয়া হয়, সেটি তাঁর করা সুর।

মি. ঠাকুরি একটি বিখ্যাত গান, যা আজাদ হিন্দ ফৌজ এবং পরবর্তীতে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর অন্যতম মার্চিং সং হিসাবে বাজানো হয়, সেই ‘কদম কদম বাঢ়ায়ে যা’-এর রচয়িতা এবং সুরকার।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সুর দেওয়া 'জন গণ মন' ক্যাপ্টেন রাম সিং ঠাকুরির সুরারোপিত গান বলে চালানোর প্রচেষ্টার পিছনে হিন্দুত্ববাদীদের হাত আছে কী না, সেটাও একটা খতিয়ে দেখার বিষয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।

আজাদ হিন্দ বাহিনী কয়েকমাসের জন্য যে গানটিকে জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে গ্রহণ করেছিল, সেটিকে 'মূল জাতীয় সঙ্গীতের বিরল অডিও' বলে মেসেজিং অ্যাপে ভুল তথ্য ছড়ানো হচ্ছে

ছবির উৎস, social media screen grab

ছবির ক্যাপশান, আজাদ হিন্দ বাহিনী কয়েকমাসের জন্য যে গানটিকে জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে গ্রহণ করেছিল, সেটিকে 'মূল জাতীয় সঙ্গীতের বিরল অডিও' বলে মেসেজিং অ্যাপে ভুল তথ্য ছড়ানো হচ্ছে

কী ধরণের ভুল তথ্য ছড়ানো হচ্ছে?

এই প্রতিবেদকের কাছে স্বাধীনতা দিবসের সকালে একটি হিন্দি সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরের ছবি আসে হোয়াটসঅ্যাপ-এর মাধ্যমে। ।

প্রথম লাইনটা পড়েই চমকে উঠতে হয়। সেখানে দাবি করা হয়েছিল, “স্বাধীন ভারতের জাতীয় সঙ্গীত ‘জন গণ মন’ এর রচয়িতা নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ টেগোর (প্রতিবেদনটি ভাষা অপরিবর্তিত রাখা হল) -এর নামের সঙ্গে তো সবাই পরিচিত, কিন্তু এই জাতীয় সংগীতের অমর সুরের স্রষ্টা ঠাকুর রাম সিং-এর নাম ইতিহাসের পাতা থেকে কোথাও হারিয়ে গেছে।“

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

পরবর্তী দুই-তিন দিনে কলকাতার বিভিন্ন মহলে আরও বেশ কয়েকজনের কাছ থেকে জানা গেল, তারাও এধরনের কয়েকটি পোস্ট এবং মেসেজ পেয়েছেন, যার কোনোটিতে ক্যাপ্টেন রাম সিং ঠাকুরিকে জাতীয় সংগীতের সুরকার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

অথবা ‘শুভ সুখ চ্যৈন বরখা বর্সে’ শীর্ষক আজাদ হিন্দ বাহিনীর একটি গানের পুরনো রেকর্ডিংকে ‘মূল জাতীয় সংগীতের বিরল অডিও’ বলে লেখা হয়েছে। গানের রেকর্ডিংয়ের সঙ্গে বাংলায় কিছু তথ্য দেওয়া হয়েছে।

‘মূল জাতীয় সংগীতের বিরল অডিও’ বলে উল্লেখ করা ওই রেকর্ডিংসহ মেসেজটি এসেছিল কলকাতার সিনিয়র সাংবাদিক বিশ্বজিত ভট্টাচার্যের কাছে।

তিনি বলছিলেন, “আমার কাছে এক বন্ধু ওই মেসেজটি ফরোয়ার্ড করেছিলেন, তিনি আবার সেটা পেয়েছেন অন্য কারও কাছ থেকে। এই গানটা যে আজাদ হিন্দ বাহিনীর জাতীয় সংগীত ছিল সেটাও যেমন জানা ছিল, তেমনই লেফটেন্যান্ট কর্নেল লক্ষ্মী সায়গলের গাওয়া এই রেকর্ডিংটা আমি আগেও শুনেছিলাম। কিন্তু আশ্চর্য হলাম সেটিকে মূল জাতীয় সংগীতের বিরল অডিও – এই কথাগুলো পড়ে।“

“তখনই মনে হয় যে ভারতের জাতীয় সংগীত ‘জন গণ মন’-এর বদলে তথ্য বিকৃতি করে ‘শুভ সুখ চ্যৈন বরখা বর্সে’ কে কেন জাতীয় সংগীত বলা হচ্ছে? নিশ্চিতই কোনও একটা উদ্দেশ্য নিয়ে করা হচ্ছে এটা,” বলছিলেন মি. ভট্টাচার্য।

এরপরেই বিবিসি বাংলা বিষয়টি নিয়ে ইন্টারনেটে খোঁজ শুরু করে । পাওয়া যায় বহু ইউটিউব লিঙ্ক এবং পত্র পত্রিকার প্রতিবেদন, যেখানে জাতীয় সংগীতের সুরকার হিসাবে আজাদ হিন্দ বাহিনীর ক্যাপ্টেন রাম সিং ঠাকুরির নাম এসেছে।

সাদা-কালো ভিডিওতে ধারণ করা একাধিক ইউটিউব লিঙ্ক আছে, যেখানে মি. ঠাকুরি নিজেও ‘শুভ সুখ চ্যৈন বরখা বর্সে’-র সুর দেওয়ার দাবি করেছেন।

সুভাষ চন্দ্র বসু চেয়েছিলেন আজাদ হিন্দ বাহিনীর একটি জাতীয় সঙ্গীত হোক

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সুভাষ চন্দ্র বসু চেয়েছিলেন আজাদ হিন্দ বাহিনীর একটি জাতীয় সংগীত হোক

রবীন্দ্রনাথের সুরে ‘জন গণ মন’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবদ্দশায় ধারণ করা অন্তত দুটি রেকর্ড বিবিসি বাংলা খুঁজে বার করেছে, যেখানে ‘জনগণমন’ গাওয়া হয়েছে। তার একটিতে আবার বঙ্কিম চন্দ্র চ্যাটার্জীর ‘বন্দে মাতরম’ গানটির একটি অপ্রচলিত সংস্করণও রয়েছে।

ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত এই দুটি রেকর্ডের একটি ১৯৩৪-এ আর দ্বিতীয়টি ১৯৩৭ সালে ধারণ করা হয়েছিল। তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গানটি লিখেছিলেন অনেক আগে, ১৯১১ সালে।

প্রথম যে রেকর্ডটি ধারণ করা হয় ১৯৩৪ সালে, হিন্দুস্তান রেকর্ড প্রকাশিত সেই রেকর্ডের সংখ্যা এইএসবি ২৬২। ইউটিউবে গ্রামোফোনেটিক্স নামে একটি ইউটিউব চ্যানেলে সেটি পাওয়া যায়।

এখানে গানটি বৃন্দগান হিসাবে গাওয়া হয়েছিল, শিল্পীদের মধ্যে ছিলেন অমলা দত্ত, নন্দিতা দেবী, সুধীন দত্ত এবং শান্তি ঘোষ। সম্ভবত এই শান্তি ঘোষ হলেন রবীন্দ্র সঙ্গীত বিশারদ শান্তিদেব ঘোষ, যিনি বিশ্বভারতীর ছাত্র হিসাবে সরাসরি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে গান শিখেছিলেন। তিনি কোনও রবীন্দ্র সংগীত তার গুরুদেবের অনুমোদিত নয়, এমন সুরে গাইবেন, তা একপ্রকার অসম্ভব।

দ্বিতীয় যে রেকর্ডটি পাওয়া যায় ১৯৩৭ সালের, সেটিও ওই গ্রামোফোনেটিক্স ইউটিউব চ্যানেলেই পাওয়া যায়। এখানেও একই সুরে গাওয়া হয়েছে জন গণ মন’।

এই গানটির ওপরে ছবি হিসাবে হিন্দুস্তান রেকর্ডের একটি বিজ্ঞাপন ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে তাদের ‘ডিসেম্বর মাসের নতুন রেকর্ডে’র তালিকা ছাপানো রয়েছে। এইচ ৫৭০ নম্বর রেকর্ডের এক পিঠে ছিল বন্দেমাতরম ও অন্য পিঠে জন গন মন অধিনায়ক।

এই এলপি রেকর্ডের ছবি বিবিসিকে পাঠিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রায় সব গানের রেকর্ড যার সংগ্রহে আছে, সেই সংগ্রাহক মানস মুখোপাধ্যায়। ওই ছবিতে দেখা যাচ্ছে ‘বন্দে মাতরম’-এর সেই সংস্করণটি শিল্পীদের স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিখিয়েছিলেন।

এ থেকে বোঝাই যায়, যে রেকর্ডের প্রযোজনায় স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যুক্ত, সেই রেকর্ডেরই এক পিঠে ‘জনগণমন’ যে সুরে গাওয়া হয়েছে, সেটি তিনি নিজে শুনেছিলেন এবং অনুমোদনও দিয়েছিলেন।

রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ ও বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, লেখক রাম কুমার মুখোপাধ্যায় বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন যে ‘জন গণ মন’-র সুর যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেওয়া, তা নিয়ে বিতর্কের কোনও অবকাশ নেই।

'জনগণমন' গানটি ১৩১৮ বঙ্গাব্দে রচিত। ১৯১১ সালে কলকাতায় কংগ্রেসের অধিবেশনে গাওয়া হয় সেটি। রবীন্দ্রনাথের সমস্ত গানের সুর যে গ্রন্থাবলীতে লিপিবদ্ধ আছে, সেই স্বরবিতানের ১৬ নম্বর খণ্ডের ১৮০ পাতায় রয়েছে। প্রথমে গানের কথা আর পরের পাতায় গানের স্বরলিপি রয়েছে,” বলছিলেন মি. মুখোপাধ্যায়।

মি. মুখোপাধ্যায় বিশ্বভারতী প্রকাশিত প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় রচিত রবীন্দ্র জীবনীর দ্বিতীয় খণ্ড থেকে উদ্ধৃত করলেন, “কলিকাতার এই অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথের সদ্যরচিত গান ‘জনগণমন’ সরলাদেবী চৌধুরাণীর নেতৃত্বে গীত হইল।“

আবার গীতবিতানের যে অনলাইন সংগ্রহ রয়েছে, সেখানে ‘জন গণ মন’ সম্বন্ধে লেখা হয়েছে কংগ্রেসের অধিবেশনে ২৭ ডিসেম্বর গানটি প্রথম গাওয়া হয়। অনুষ্ঠানের আগে দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে শিল্পীরা একটি মহড়াও দেন হ্যারিসন রোডে প্রখ্যাত চিকিৎসক নীলরতন সরকারের বাড়িতে। এই গানের সম্বন্ধে পরের দিন ‘দ্য বেঙ্গলি’ সংবাদপত্রে খবর বেরয়, সঙ্গে গানটি আর তার অনুবাদও ছাপা হয়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নতুন গানের কথা এবং সুর ছাপার চল ছিল তখনকার পত্রপত্রিকায়।

তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় ‘জন গণ মন’ অবশ্য ব্রহ্ম সঙ্গীত হিসাবে প্রকাশিত হয়েছিল এবং সেবছরে ব্রাহ্মদের উৎসব ‘মাঘোৎসব’-এ গানটি গাওয়া হয়েছিল।

রবীন্দ্রসঙ্গীতের বিশেষজ্ঞরা বলেন, তার নিজের গানের সুর নিয়ে খুব কড়াকড়ি করতেন রবীন্দ্রনাথ। তাই তার জীবদ্দশায় যে সুরে ‘জন গণ মন’ গাওয়া হয়েছে অন্তত দুটি রেকর্ডে, কংগ্রেস অধিবেশনে, মাঘোৎসবে এবং তিনি নিজেও রাশিয়ায় গিয়ে ‘পাইওনিয়ার্স কমিউনে’ জনগণমন গেয়ে এসেছেন, সেই সুরটিই যে সবথেকে প্রামাণিক, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকে না।

ভারত সরকার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা এবং সুরারোপিত গানটিকেই যে জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে গ্রহণ করেছে, সেই তথ্য ভারত সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ওয়েবসাইটে একাধিকবার উল্লেখ করা রয়েছে।

তাই অন্য কেউ জাতীয় সংগীতের সুরকার বলে দাবি করলে তার গ্রহণযোগ্যতা থাকে কী না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।

তবে রাম সিং ঠাকুরি তো নিজেই একজন জাতীয় নায়কের মর্যাদা পেয়েছেন তার নিজস্ব গান ‘কদম কদম বাঢ়ায়ে যা’-এর কথা এবং সুরের জন্য। তাহলে কেন তাকে জাতীয় সংগীতের সুরকার বলে তুলে ধরার চেষ্টা কেন করা হচ্ছে কোনও কোনও মহল থেকে?

ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শান্তিনিকেতন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শান্তিনিকেতন

কেন বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে?

হিন্দুত্ববাদের গবেষক ও সাংবাদিক স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য বলছেন, “গত বেশ কিছু বছর ধরে এক অংশের হিন্দিভাষী লেখক এই দাবি করে চলেছেন আর মূলত হিন্দিভাষী গণমাধ্যমও তথ্য যাচাই না করেই তাঁদের দাবি প্রকাশ করে চলেছে।

“২০২১-এ এই দাবি নিয়ে প্রকাশিত রাজেন্দ্র রাজনের বই সে রাজ্যের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ করেন এবং ২০২২-এ দূরদর্শন হিমাচল তাঁকে নিয়ে তাদের বাগধারা অনুষ্ঠানের একটি এপিসোডও প্রচার করে। সেখানেও একই দাবি রাখা হয়"।

"রাম সিং ঠাকুরি হিমাচলের বাসিন্দা হলেও গোর্খা ছিলেন। ভারতীয় গোর্খাদের মধ্যে তাঁকে নিয়ে বিশেষ গর্ব আছে। মি. ঠাকুরিকে তুলে ধরার মধ্য দিয়ে গোর্খাদের হিন্দুত্ববাদীরা নিজেদের কাছাকাছি আনতে চাইছে, এরকম সন্দেহ করার কারণ আছে,” বলছিলেন মি. ভট্টাচার্য।

তার কথায়, “হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা বরাবরই জনগণমন-এর বদলে বন্দে মাতরমকে জাতীয় সংগীত হিসাবে দেখতে চেয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে এই গান পঞ্চম জর্জের উদ্দেশ্যে রচনা করেননি, তার প্রভূত প্রমাণ থাকা স্বত্বেও এই বিষয়টিকে ফিরিয়ে এনে তারা একাধিকবার বন্দেমাতরমকে জাতীয় সংগীত করার দাবি জানিয়েছে। এই গানটির সুর নিয়ে বিতর্কও ঠিক তাঁরাই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে চাগিয়ে তুলছেন কী না সেটা যদিও এখনও পরিষ্কার নয়।“

তার প্রশ্ন, “এটা বলতেই হবে, যে রাম সিং ঠাকুরির যা বাস্তবিক অবদান, তাতে তিনি এমনিতেই একজন জাতীয় নায়ক। কদম কদম বাড়ায়ে যা’র স্রষ্টাকে সম্মান জানানোর জন্য কোনও মিথ্যা প্রচার করার কী দরকার?”

ভারতর স্বরাষ্ট মন্ত্রকের ওয়েবসাইটে দেওয়া জাতীয় সঙ্গীত সংক্রান্ত আদেশ

ছবির উৎস, MoH, India

ছবির ক্যাপশান, ভারতর স্বরাষ্ট মন্ত্রকের ওয়েবসাইটে দেওয়া জাতীয় সংগীত সংক্রান্ত আদেশ

‘শুভ সুখ চ্যৈন বরখা বর্সে’ কাদের জাতীয় সংগীত?

‘শুভ সুখ চ্যৈন বরখা বর্সে’ আজাদ হিন্দ বাহিনীতে ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৪ এর মধ্যে পাঁচ থেকে ছয় মাস ‘আজাদ ভারতের জাতীয় সংগীত’ হিসাবে গাওয়া হত। ভারতের সরকারি টেলিভিশন দূরদর্শনে এ বছর ১৪ই অগাস্ট সকালে প্রচারিত একটি অনুষ্ঠানে লেখক রাজেন্দ্র রাজন জানিয়েছেন , বাহিনীর দায়িত্ব নেওয়ার পরে সুভাষ চন্দ্র বসুর মনে হয় যে একটা জাতীয় সংগীত থাকা উচিত।

ওই অনুষ্ঠানের যে ভিডিও দূরদর্শনের ইউটিউব চ্যানেলে দেওয়া হয়েছে, সেখানে মি. রাজন বলেছেন, “বাহিনী গঠিত হওয়ার পরে একটা কৌমি তারাণা (জাতীয় সঙ্গীত) থাকার দরকার ছিল। সেখানে লেফটেনান্ট কর্নেল লক্ষ্মী সায়গল ছিলেন। তার আসল নাম ছিল লক্ষ্মী স্বামীনাথন, বিয়ের পরে সায়গল পদবী হয় তারা। তিনি বৈঠকে বলেন যে তিনি টেগোরের (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের) গানটা শুনেছেন, ওই গানটিকেই জাতীয় সংগীত করা যেতে পারে।“

“কিন্তু গানটিকে সহজ করার দরকার ছিল, কারণ গানে সংস্কৃত আশ্রিত শব্দ ছিল। সিঙ্গাপুর রেডিওর দুজন স্ক্রিপ্ট রাইটার ছিলেন, মমতাজ হুসেইন আর আবিদ আলি সাফরাণী। তারা গানটিকে সহজতর করেন আর রাম সিংকে দেন সুরারোপ করার জন্য। এক সপ্তাহের মধ্যেই সুর লাগিয়ে ফেলেন তিনি। ২১ অক্টোবর ১৯৪৩ এ সংগীতটি তৈরি হয়ে যায়, যার মুখরাটা ছিল শুভ সুখ চ্যৈন বরখা বর্সে...।“

দূরদর্শনের ওই অনুষ্ঠানেই ক্যাপ্টেন রাম সিং ঠাকুরির একটি পুরণো সাদা কালো ভিডিও সাক্ষাতকার দেখানো হয়েছে, যেখানে মি. ঠাকুরি নিজেই বেহালা বাজিয়ে 'শুভ সুখ চ্যৈন বরখা বর্সে' গানটি গেয়েছেন।

ওই সুরটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সুরারোপিত 'জন গণ মন' এর সঙ্গে প্রায় এক, তফাৎ শুধু লয়ে।

মি. ঠাকুরি যে সুরে শুভ সুখ চ্যৈন গানটি বাজিয়েছেন আর গেয়েছেন, সেটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সুর করা ‘জন গণ মন’-এর থেকে সামান্য দ্রুত লয়ে এবং এই একটাই ফারাক।

আর বাংলা ও হিন্দি দুটো ভাষাই যারা জানেন, তাদের কাছে এটা বোঝা খুবই সহজ যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জন গণ মন’র সহজতর অনুবাদ কখনই ‘শুভ সুখ চ্যৈন বরখা বর্সে’ নয়।

ইতিহাসবিদরা বলছেন সুভাষ চন্দ্র বসু একটু দ্রুত লয়ের কোনও সুর চাইছিলেন, যেটার সঙ্গে সামরিক বাহিনী প্যারেড করতে পারবে।

কিন্তু ‘শুভ সুখ চ্যৈন’ আজাদ হিন্দ বাহিনীর ‘জাতীয় সংগীত’ হিসাবে গৃহীত হওয়ার কয়েক মাস পরে তিনি নিজেই ‘জন গণ মন’-কে ফিরিয়ে এনেছিলেন বলে দূরদর্শনের ১৪ই অগাস্টের ওই অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন লেখক রাজেন্দ্র রাজন।

তার কথায়, “সুভাষ চন্দ্রের মনে হয় যে শুভ সুখ চ্যৈন গানটির মুখরাটা পরিবর্তন করা দরকার। যেন ঠিক আবেগটা জাগাতে পারছে না। একটা বৈঠকে, তারিখটা ছিল পয়লা এপ্রিল, ১৯৪৪, শনিবার, সেখানেই সিদ্ধান্ত হয় যে ‘জন গণ মন’ই মুখরা থাকবে। এই তথ্য আজাদ হিন্দ গেজেটেও উল্লেখিত আছে।“

স্বরবিতানে জন গণ মন-র সুর লিপিবদ্ধ রয়েছে

ছবির উৎস, Visva Bharati

ছবির ক্যাপশান, স্বরবিতানে জন গণ মন-র সুর লিপিবদ্ধ রয়েছে

কে এই রাম সিং ঠাকুরি?

দূরদর্শনের ১৪ই অগাস্টের অনুষ্ঠানে যে লেখক রাজেন্দ্র রাজন হাজির হয়েছিলেন, তিনি রাম সিং ঠাকুরির সম্বন্ধে একটি বই লেখেন দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করে। সেই বইটি ২০২১ সালে প্রকাশিত হয়।

রাম সিং ঠাকুরির জন্ম হিমাচল প্রদেশে হলেও তিনি জাতিতে ছিলেন গোর্খা। খুব কম বয়সে তিনি গোর্খা রেজিমেন্টের ব্যান্ডের সদস্য হিসাবে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে তিনি মালয়-থাইল্যান্ড সীমান্ত অঞ্চলে মোতায়েন ছিলেন।

জাপানী সেনাবাহিনী ১৯৪১ সালের ডিসেম্বরে ব্রিটিশ বাহিনীকে পিছু হঠতে বাধ্য করে এবং প্রায় দুশো ব্রিটিশ সেনা সদস্যকে যুদ্ধ বন্দী করে নেয়, যাদের মধ্যে মি. ঠাকুরিও ছিলেন।

এরপরে জাপান যখন যুদ্ধবন্দী ভারতীয়দের আজাদ হিন্দ বাহিনীর হাতে তুলে দেয়, সেই সূত্রেই মি. ঠাকুরি যোগ দেন সুভাষ চন্দ্র বসুর নেতৃত্বাধীন বাহিনীতে এবং বাহিনীর সংগীত পরিচালক হয়ে ওঠেন।

মি. ঠাকুরিকে দার্জিলিংয়ে আমন্ত্রণ করে নিয়ে আসা হয় সুভাষ চন্দ্র বসুর জন্মশতবর্ষের এক অনুষ্ঠানে, ১৯৯৭ সালের ২৩ জানুয়ারিতে।

রেডিফ.কম সংবাদ পোর্টালের ২২শে ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭ সালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী কলকাতার একটি সংবাদপত্রে সেই সময়ে দার্জিলিং পাহাড়ের প্রশাসন চালাতো যে গোর্খা হিল কাউন্সিল, তারা সুভাষ চন্দ্র বসুর জন্মশতবর্ষ উদযাপনের একটি বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করে রাম সিং ঠাকুরিই ‘সেই গোর্খা, যিনি জাতীয় সংগীতের সুর দিয়েছিলেন’।

এনিয়ে সেই সময়ে বেশ বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। জাতীয় সংগীতের সুরকার রাম সিং ঠাকুরি, এই দাবীর প্রেক্ষিতে বিখ্যাত রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী সুবিনয় রায় সংবাদমাধ্যমে যে মন্তব্য করেছিলেন, তা নিয়ে মানহানির মামলা দায়ের করা হয়েছিল দার্জিলিংয়ের আদালতে।

কলকাতার দ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকার ১২ই মে, ২০০৩ সালের একটি প্রতিবেদনে সেই মামলার খবর ছাপা হয়েছিল। সেখানেই মামলাটির প্রেক্ষাপট হিসাবে লেখা হয় যে ১৯৯৭ সালের ১৬ই এপ্রিল অল গোর্খা স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (যেটি সেই সময়ে দার্জিলিং পাহাড় প্রশাসনের ক্ষমতায় থাকা জিএনএলএফের ছাত্র সংগঠন) সুবিনয় রায়ের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা দায়ের করে।

ওই প্রতিবেদনেই লেখা হয়েছে যে ১৯৯৭ সালে অল গোর্খা স্টুডেন্টস ইউনিয়নের আমন্ত্রণেই দার্জিলিং-এ এসে মি. ঠাকুরি দাবী করেছিলেন যে ‘শুভ সুখ চ্যৈন’ গানটির সুর তার করা।

পরবর্তীকালে রেডিফ.কম পোর্টালের সাংবাদিক শরৎ প্রধানকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে মি. ঠাকুরি দাবী করেন যে রবীন্দ্রনাথের মূল বাংলাটি জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে বেছে নেওয়া হলেও সিঙ্গাপুরে “আমি যে সুরটি দিয়েছিলাম, সেটিকে জাতীয় সঙ্গীতের জন্য আনুষ্ঠানিক ভাবে গ্রহণ করা হয়।“

মি. রাম সিং ঠাকুরির সঙ্গে আলাপচারিতা ও দীর্ঘ গবেষণার পরে লেখক রাজেন্দ্র রাজন একটি বই প্রকাশ করেন।