ডানপন্থীদের বিদ্রোহ ও নজিরবিহীন ভোটে মার্কিন কংগ্রেসের স্পিকার অপসারিত

যুক্তরাষ্ট্রে রিপাবলিকানদের ভেতরে অতি-ডানপন্থীদের বিদ্রোহে কংগ্রেসের স্পিকার পদ থেকে অপসারিত হলেন ক্যাভিন ম্যাকার্থি। দেশটির হাউজ অব রেপ্রেজেন্টেটিভ বা প্রতিনিধি সভার কোন স্পিকারের এভাবে অনাস্থা ভোটে পরাজিত হওয়ার ঘটনা দেশটির ইতিহাসে এই প্রথম।

চূড়ান্ত ফলে ২১৬-২১০ ভোটে হেরে গেছেন ক্যালিফোর্নিয়া থেকে কংগ্রেসম্যান হিসেবে নির্বাচিত হওয়া কংগ্রেসের নিম্নকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ রিপাবলিকান দলের এই নেতা।

সরকারি সংস্থাগুলোর জন্য তহবিল নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ বা সেনেটে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সমঝোতা করার পর দলের অতি রক্ষণশীলরা তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন।

তবে এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ রিপাবলিকান দলের নেতা হিসেবে কে তার উত্তরসূরি হবেন তা এখনো নিশ্চিত নয়।

মি. ম্যাকার্থিকে অপসারণে প্রক্রিয়া শুরুর জন্য সোমবার রাতে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ফ্লোরিডার রিপাবলিকান নেতা ম্যাট গেইটজ।

ইউক্রেনকে তহবিল যোগানো অব্যাহত রাখতে হোয়াইট হাউজের সঙ্গে গোপন চুক্তির জন্য স্পিকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলেন মি. গেইটজ।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রিপাবলিকান দলের আইন প্রণেতাদের সঙ্গে এক সভায় মি. ম্যাকার্থি জানান যে স্পিকার পদের জন্য তিনি আর লড়বেন না।

পরে তিনি তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী মি. গেইটজের তীব্র সমালোচনা করে তাকে ‘মনোযোগ আকর্ষণকারী’ হিসেবে অভিহিত করেন।

“আপনারা জানেন যে পুরো বিষয়টি ব্যক্তিগত,” মি. ম্যাকার্থি বলছিলেন এক সংবাদ সম্মেলনে। “এর সাথে অর্থ ব্যয়ের (তহবিল) কোন সম্পর্ক নেই”।

মি. ম্যাকার্থি বলেন যেসব কট্টরপন্থীরা তাকে উৎখাত করেছে তারা ‘রক্ষণশীল’ নয়।

মি. গেইটজ সহ কয়েকজন ডানপন্থী তাকে সমর্থন করতে অপারগতা প্রকাশ করায় গত জানুয়ারিতেই পনের দফা ভোটাভোটির পর স্পিকার হয়েছিলেন মি. ম্যাকার্থি।

রিপাবলিকান দলের মধ্যে মি. গেইটজসহ আটজন তাকে অপসারণের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। দলের বাকী ২১০ জন তার পক্ষেই ভোট দিয়েছেন।

তবে এবার ডেমোক্র্যাটরাও নিজ দলের মধ্যে মি. ম্যাকার্থিকে উৎখাতের প্রচেষ্টার সঙ্গে হাত মেলান।

প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাট দলীয় নেতা হাকিম জেফরিস তার সহকর্মীদের কাছে পাঠানো চিঠিতে মি. ম্যাকার্থিকে উদ্ধারের জন্য ভোট না দেয়ার কথা জানান।

ওয়াশিংটনের একটি এলাকার থেকে নির্বাচিত দলের বাম ঘরানার কংগ্রেসওমেন প্রমিলা জয়পাল ভোটের আগে সাংবাদিকদের বলেছেন “ অদক্ষতার কারণে তাদের পতনের দিকে যেতে দিন”।

ভোটের পর দুজন ডেমোক্র্যাট আইন প্রণেতাকে রিপাবলিকান দলের কোন্দল নিয়ে হাসাহাসি করতে দেখা যায়।

“গৃহযুদ্ধ শুরু হতে দিন,” এভাবেই মন্তব্য ছুঁড়ে দেন একজন।

পরিপূর্ণ হাউজে ভোটের ফল ঘোষণার সময় বেশির আইন প্রণেতা চুপ ছিলেন। ২২১-২১২ ভোটের সামান্য ব্যবধান নিয়ে প্রতিনিধি পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে রিপাবলিকানদের।

আরকানসাসের রিপাবলিকান স্টিভ ওম্যাক ঘোষণা করেন, “ হাউজ স্পিকারের পদ শূন্য ঘোষণা করা হলো”।

ভোটের আগে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সামাজিক মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ এ এক পোস্টে লিখেন- নিজেদের পরিবর্তে ‘উগ্র বাম ডেমোক্র্যাটদের’ বিরুদ্ধে দলের লড়াই করা উচিত।

হাউজ রিপাবলিকান কনফারেন্স চেয়ারওম্যান এলিস স্টেফানিক মি. ম্যাকার্থিকে একজন ‘সুখী যোদ্ধা’ হিসেবে অভিহিত করেন।

তবে উদারপন্থী রিপাবলিকান হিসেবে পরিচিত ন্যান্সি মেইস মি. ম্যাকার্থির বিরুদ্ধে ভোট দেয়ার বিষয়টি অনেক বিশ্লেষকের দৃষ্টি কেড়েছে।

পরে সাউথ ক্যারোলাইনার এই আইন প্রণেতা বলেছেন , “আমি এমন একজন স্পিকারের প্রত্যাশী ছিলাম যিনি আমেরিকান জনগণকে সত্যি বলবেন। যিনি সৎ হবেন এবং কংগ্রেস ও উভয় দলের প্রতি বিশ্বস্ত হবেন”।

তবে এখন মি.ম্যাকার্থিকে অপসারণের পর মি. গেইটজকে সরিয়ে দেয়ার জন্য তার সহকর্মীরা উদ্যোগ নিতে পারে কি-না এমন বিষয়ে মি. গেইটজ বলেছেন , “তারা আমাকে বরখাস্ত করতে চাইলে জানানো উচিত যে কখন তারা ভোট করবে”।

তবে এখন এটা পরিষ্কার নয় যে অস্থায়ী স্পিকার পূর্ণ ক্ষমতা নিয়ে অফিস চালাতে পারবেন কি-না, নাকি তিনি শুধু নতুন স্পিকার নির্বাচনের বিষয়টিই দেখভাল করবেন।

একজন অন্তর্বর্তী স্পিকার কতদিন থাকতে পারবেন কিংবা কতদিনের মধ্যে নতুন নির্বাচন করতে হবে তা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোন কিছু বলা নেই।

ওদিকে মি. ম্যাকার্থির জায়গায় কে আসবেন তাও এখনো পরিষ্কার নয়। লুজিয়ানার রিপাবলিকান আইন প্রণেতা স্টিভ স্কেলিস ও মিনেসোটার টম এমারের নাম শোনা গেলেও তাদের দিক থেকে কোন আগ্রহ এখনো দেখা যায়নি।

হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারিন জিন পিয়েরে এক বিবৃতিতে বলেছেন যে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ‘আশা প্রকাশ করেছেন যে হাউজ দ্রুতই একজন স্পিকার নির্বাচিত করতে সক্ষম হবে’।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্টের পরেই স্পিকারের অবস্থান। কংগ্রেসের নিম্নকক্ষের অগ্রাধিকার ঠিক করা, কমিটিগুলোর কাজ ঠিক করা এমনকি হোয়াইট হাউজের এজেন্ডাগুলো পাশ করানো কিংবা ঠেকিয়ে দেয়ার কাজও তিনি করে থাকেন।

এর আগে রিপাবলিকান দুজন স্পিকার- পল রায়ান ও জন বোয়েনার – দলের অতিরক্ষনশীল সহকর্মীদের সাথে বিবাদে জড়িয়ে কংগ্রেস ছেড়েছেন।

এর আগে ২০১০ ও ২০১৫ সালে স্পিকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবের ইতিহাস থাকলেও সেগুলো তখন সফল হয়নি।