জাহানারা আলমের যৌন হয়রানির অভিযোগ, অস্বীকার অভিযুক্ত মঞ্জুরুলের, বিসিবি কী বলছে?

ছবির উৎস, Getty Images
জাতীয় নারী ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ও পেসার জাহানারা আলম এক গুরুতর অভিযোগ এনেছেন, যেটিকে বাংলাদেশের ক্রিকেটের অন্যতম 'জঘন্যতম ঘটনা' বলছেন কেউ কেউ।
২০২২ সালের নারী ক্রিকেট বিশ্বকাপ চলাকালে দলের কয়েকজন কর্মকর্তার দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার হয়েছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন জাহানারা আলম।
সম্প্রতি ক্রীড়া সাংবাদিক রিয়াসাদ আজিমকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ৩২ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার বলেন, সে সময় দলের নির্বাচক ও ম্যানেজারের দায়িত্বে থাকা মঞ্জুরুল ইসলামসহ একাধিক কর্মকর্তা তার ও তার সতীর্থদের সাথে 'অশোভন আচরণ' করেছেন।
জাহানারার দাবি, দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত সেই বিশ্বকাপে মঞ্জুরুল ইসলাম প্রায়ই খেলোয়াড়দের উৎসাহ দেওয়ার নামে শারীরিকভাবে স্পর্শ করতেন, এমনকি আলিঙ্গন বা বুকে টেনে ধরতেন।
বর্তমানে চীনে অবস্থান করা ৪৬ বছর বয়সী মানজুরুল ইসলাম অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ 'ভিত্তিহীন' বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেয়া এক বক্তব্যে তিনি বলেন, "সবই মিথ্যা। দলের অন্যান্য মেয়েদেরও জিজ্ঞেস করতে পারেন।"
বাংলাদেশের হয়ে ১৯৯৯ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত ১২টি টেস্ট ও ৩৪টি ওয়ানডে খেলা সাবেক বামহাতি পেসার মঞ্জুরুল ইসলাম অবসরের পর বিভিন্ন কোচিং ও ব্যবস্থাপনা দায়িত্বে ছিলেন।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের হয়ে ১৩৫টি আন্তর্জাতিক সাদা বলের ম্যাচ খেলেছেন জাহানারা আলম। ওয়ানডেতে ৪৮ টি ও টি-টোয়েন্টিতে ৬০টি উইকেট নিয়েছেন মিজ আলম।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বিসিবির বিরুদ্ধেও অভিযোগ এনেছেন এই নারী ক্রিকেটার। বলেছেন, বিসিবিকে লিখিতভাবে বিষয়টি জানিয়েছিলেন, কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তবে এবার জাহানারা অভিযোগ জনসম্মুখে আসার পর বিসিবি একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। বোর্ড জানিয়েছে, ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তারা প্রতিবেদন জমা দেবে।
এক বিবৃতিতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড জানিয়েছে, তারা 'নিরাপদ, সম্মানজনক ও পেশাদার' পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বিসিবির ভাইস-প্রেসিডেন্ট শাখাওয়াত হোসেন বলেন, "এটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। সঠিকভাবে তদন্ত করতেই হবে।"
বিসিবির চার পদক্ষেপ
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের সাবেক সদস্যের যৌন হয়রানির অভিযোগকে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বিসিবি। দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর বোর্ড এমন প্রতিক্রিয়া জানায়।
বিসিবি জানায় বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি অভিযোগগুলো বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখবে এবং আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তাদের তদন্ত প্রতিবেদন ও সুপারিশ জমা দেবে।
এক বিবৃতিতে বোর্ড বলেছে, খেলোয়াড় এবং সংশ্লিষ্ট সবার জন্য নিরাপদ সম্মানজনক এবং পেশাদার পরিবেশ নিশ্চিত করতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মন্তব্য, অনুমান বা ভিত্তিহীন প্রতিবেদন থেকে বিরত থাকার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিশেষ করে গণমাধ্যমকে অনুরোধ করেছে বিসিবি। সংস্থাটির দাবি আগাম মন্তব্য তদন্ত প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিসিবির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বোর্ডের শীর্ষ পর্যায় থেকে চারটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে-
১। সিইওকে স্পষ্ট করতে হবে তিনি ভুক্তভোগীর কাছ থেকে কোনো লিখিত অভিযোগ পেয়েছিলেন কি না এবং কখন পেয়েছিলেন। অভিযোগ পেয়ে থাকলে কেন পদক্ষেপ নেননি তা ব্যাখ্যা করতে হবে।
২। যেসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তারা যদি এখনো বিসিবিতে কর্মরত থাকেন তবে তাদের অবিলম্বে সাময়িক বরখাস্ত করতে হবে।
৩। সিইওকে আইন বিভাগের সহায়তায় দুই সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করতে হবে এবং অগ্রগতির প্রতিবেদন বোর্ডে দাখিল করতে হবে। তদন্তের ভিত্তিতে ভুক্তভোগীকে আইনি পদক্ষেপের পরামর্শ দিতে হবে।
৪। নারী খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুনর্মূল্যায়নের জন্য সিইওকে ক্রিকেট অপারেশন্স এবং মহিলা বিভাগের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে হবে এবং দুই সপ্তাহের মধ্যে এর প্রতিবেদন বোর্ডে জমা দিতে হবে।
জাহানারার পাশে দাঁড়িয়েছেন যারা
বাংলাদেশের পুরুষ ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবাল বলেছেন জাহানারা আলমের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর তিনি বিভিন্ন মাধ্যমে আরও কিছু অনিয়মের তথ্য জানতে পেরেছেন।
শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেয়া এক স্ট্যাটাসে নারী ক্রিকেটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন যে যারা যেকোনো সময়ে হেনস্তা বা অপমানজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন তারা যেন নির্ভয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
তামিমের মতে দেশের ক্রিকেট বিশেষ করে বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে এ ধরনের ঘটনা সামনে আনা জরুরি। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন সবাই অভিযোগ জানাতে এগিয়ে এলে তিনি এবং অন্য সিনিয়ররা তাদের পাশে থাকবেন।
তামিম ইকবাল বলেন এই ধরনের অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত করতে হলে তদন্ত সম্পূর্ণভাবে স্বাধীন হওয়া উচিত।
"বিসিবি ইতোমধ্যেই একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বটে, তবে আমি মনে করি, এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ কিংবা সরকারি পর্যায়ে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করা উচিত, যেখানে বিসিবি সংশ্লিষ্ট কেউ থাকবেন না, যাতে বিন্দুমাত্র পক্ষপাতের সুযোগ না থাকে। যত দ্রুত সম্ভব এই কমিটি গঠন করা উচিত ও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ব্যাপারটিকে দেখা উচিত। দ্রুততার সঙ্গে তদন্ত শেষ করে দোষী যে-ই হোক, যার যতটুকু দায় থাকুক, উপযুক্ত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে," লিখেছেন জাতীয় পুরুষ ক্রিকেট দলের সাবেক এই অধিনায়ক।
জাহানারার এই ঘটনায় কথা সাবেক আরেক অধিনায়ক মাশরাফী বিন মোর্ত্তজাও। ফেসবুকে তিনি লিখেছেন, "বাংলাদেশের ক্রিকেট ও গোটা ক্রীড়াঙ্গনের স্বার্থে জাহানারা আলমের প্রতিটি অভিযোগ বিসিবি গুরুত্ব দিয়ে দেখবে আশা করি।"
"আশা করি, বিসিবির তদন্ত কমিটি পুরোপুরি প্রভাবমুক্ত থেকে কাজ করবে এবং অভিযোগের সত্যতা পেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে, যেন এসবের পুনরাবৃত্তি আর কখনো না হয়। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন নিরাপদ হোক সবার জন্য," লিখেছেন মি. মোর্ত্তজা।
এদিকে, একটি বেসরকারি টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন জাহানারা আলম চাইলে সরকার পক্ষ থেকে আইনগত সহায়তা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান ক্রীড়াঙ্গনে নারী খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করবে এবং অভিযোগের প্রকৃত সত্য উদঘাটনে সব ধরনের সহায়তা প্রদান করবে।
জাহানারার প্রতি সংহতি জানিয়েছে ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ কোয়াব। সংগঠনটি বলেছে অভিযোগগুলোর দ্রুত এবং নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি এবং এ প্রক্রিয়ায় জাহানারাকে তারা সর্বোচ্চ সহায়তা প্রদান করবে।








