বান্দরবানে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথ অভিযান, দু’জন কুকি-চিন নেতা আটক

ছবির উৎস, KAMOL DAS
- Author, মুকিমুল আহসান
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে বান্দরবানের রুমা ও থানচিতে ব্যাংক লুট ও সশস্ত্র হামলার চারদিন পর সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যে যৌথ অভিযান শুরু হয়েছে, তাতে সশস্ত্র সংগঠন কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট বা কেএনএফ-এর প্রধান সমন্বয়ক-সহ দু'জন নেতা আটক হয়েছেন।
এখনও থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে ওই এলাকায়। আতঙ্কে বহু পর্যটক বান্দরবান ছেড়ে চলে গিয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে রোববার বান্দরবানে সফর করেছেন বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউদ্দিন আহমেদ। পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, পার্বত্য এলাকায় শান্তি আলোচনার আড়ালে 'সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে' জড়িয়েছে কুকি চিন।
এই সশস্ত্র গোষ্ঠীকে রুখতে যৌথ অভিযানের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতেই যে তার সফর, সে কথাও সেনাপ্রধান সাংবাদিকদের জানান।
সেনাপ্রধান মি. আহমেদ বলেন, "কিছু অস্ত্রও উদ্ধার করা হয়েছে। একটা প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বান্দরবানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সক্ষম সেনাবাহিনী।"
ওই ঘটনায় আইনশৃংখলা বাহিনীর মোট ১৪টি অস্ত্র লুট হয়েছিল। তবে গত রোববার যে উদ্ধার হয়েছে সেগুলো একই অস্ত্র কি না, সেটি এখনও নিশ্চিত করা যায়নি বলেও জানান সেনাপ্রধান।
ব্যাংকে হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় রুমা ও থানচি-সহ আশেপাশের এলাকায় আতঙ্কে অনেকে বাড়িঘর ছেড়ে গেছে বলে এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন। আইনশৃংখলা বাহিনীর কড়াকড়ির কারণে নিজ এলাকায় চলাচলেও হয়রানির মুখে পড়তে হচ্ছে বলেও জানান স্থানীয়রা।
এই পর্যটন এলাকায় সরকারের পক্ষ থেকে কোনও নিষেধাজ্ঞা আনুষ্ঠানিকভাবে জারি করা না হলেও এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্কে পর্যটকশুন্য হয়ে পড়েছে বান্দরবান।
রুমা উপজেলার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা দিদারুল আলম বিবিসি বাংলাকে বলেন, “গত বুধবারের পর থেকে কোনও পর্যটক আসেনি রুমা উপজেলায়।”
পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এলাকায় আইনশৃংখলা বাহিনীর টহল বাড়ানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।

ছবির উৎস, KAMOL DAS
আতঙ্কে ব্যাংক ও অফিস কার্যক্রম বন্ধ
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
থানচি, রোয়াংছড়ি ও রুমা উপজেলায় সোনালী ও কৃষি ব্যাংকের তিনটি করে মোট ছয়টি শাখা রয়েছে। এই দুটি ব্যাংক ছাড়া অন্য কোনও ব্যাংকের শাখা নেই এই তিন উপজেলায়।
গত সপ্তাহে সশস্ত্র গোষ্ঠীর ডাকাতির ঘটনার পরই লেনদেন বন্ধ করে দেওয়া হয় এসব ব্যাংকের শাখাগুলোয়।
স্থানীয়রা জানাচ্ছেন গত বুধবারের পর থেকে কেউ ব্যাংকে কোনও ধরণের কাজ করতে পারছে না। লেনদেন করতে না পারায় অনেকে নানা ধরনের ভোগান্তিতে পড়ছেন বলেও জানান স্থানীয়রা।
বাজারে ও পথেঘাটে থমথমে ভাব বিরাজ করছে। দোকানপাট খুললেও লোকসমাগম নেই।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ইমন মারমা বিবিসি বাংলাকে বলেন, “বাজারে দোকানপাট খুললেও ব্যাংকগুলো বন্ধ রয়েছে। কিছু জরুরি কাজ থাকলেও সারার কোনও উপায় দেখছি না।"
ব্যাংক ছাড়াও এই এলাকার সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও বন্ধ রয়েছে।
রুমা ও থানচি এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, অস্ত্রধারীদের এই আতঙ্ক অন্যান্য অফিসগুলোতেও রয়েছে। ওই দিনের পর থেকে উপজেলা প্রশাসন ও সরকারি জরুরি সেবা প্রতিষ্ঠান বাদে সব ধরনের প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে থানচিতে।
থানচির স্থানীয় সাংবাদিক অনুপম মারমা বিবিসি বাংলাকে বলেন, "সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যখন দেখল ব্যাংকে এমন একটা ঘটনা ঘটেছে, তারপর থেকেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শাখা অফিসগুলো তাদের কার্যালয় বন্ধ রেখেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অনেকে এলাকা ছেড়ে চলেও গেছেন।"
গত বুধবারের ঘটনার পর বান্দরবান-রুমা পথে মানুষের চলাচলও কমে যায়। প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছিল সড়ক যোগাযোগ। গত দু'দিনে তা একটু একটু করে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।
রুমা উপজেলার ভারপ্রাপ্ত ইউএনও দিদারুল আলম বিবিসি বাংলাকে বলেন, “এখন রুমায় মানুষজনের মধ্যে স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে। আইনশৃংখলা বাহিনীর টহল আছে। চেকপোস্টগুলো সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।”
তবে বান্দরবানের রুমা ও থানচিতে ব্যাংক লুট ও হামলার ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে সেখানকার বাসিন্দারা।
জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। এরই মধ্যে নিরাপত্তার কথা ভেবে অনেক পরিবারের নারী ও শিশুদের পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে অন্য জায়গায়।

ছবির উৎস, RIAZ RAIHAN
'কম্বাইন্ড অপারেশন' শুরু
তিনটি ব্যাংকে লুটপাট ও ব্যাংক ম্যানেজারকে অপহরণের পর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রোববার বান্দরবানে যান সেনাপ্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ। সকালেই তিনি বান্দরবান রিজিয়নের সিনিয়র অফিসারদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
পরে তিনি সাংবাদিকদের জানান, "শান্তি আলোচনা শুরুর পর তাদের বিশ্বাস করেছিলাম, কিন্তু তারা যেহেতু বিশ্বাসভঙ্গ করেছে, সুতরাং আর ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। বান্দরবানে বিচ্ছিন্নতাবাদী দমনে কম্বাইন্ড অপারেশন শুরু করেছে যৌথ বাহিনী।"
সেনাপ্রধান আরও বলেন, "শান্তি আলোচনার আড়ালে কুকি-চিন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছে। তারা তাদের উদ্দেশ্য জাহির করে ফেলেছে। আমরা সেনাবাহিনী, র্যাব ও পুলিশ-সহ সবাই মিলে সমন্বিতভাবে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করব।"
এসময় তিনি জানান, গতকাল (শনিবার) রাতে কিছু সন্ত্রাসীকে ধরতে বাহিনী সক্ষম হয়েছে। অভিযানে কিছু অস্ত্রও উদ্ধার করা হয়েছে।
তার কথায়, "একটা প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বান্দরবানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সক্ষম সেনাবাহিনী।"
অভিযান কতখানি কার্যকর হচ্ছে তা নিয়ে একটা ব্যাখ্যাও দেন সেনাপ্রধান।
তিনি এসময় বলেন, "আমি আপনাদের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে চাই, বাংলাদেশের জনগণের শান্তির জন্য, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য যা যা করণীয়, প্রধানমন্ত্রীর কড়া নির্দেশ সেটাই করতে হবে। সেটা বাস্তবায়নে আমরা সক্ষম হব বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।"
যৌথ অভিযান কেমন হবে তা জানিয়ে সেনাপ্রধান বলেন, “যৌথ অভিযানে নেতৃত্ব দিয়ে দায়িত্ব পালন করতে যা যা প্রয়োজনীয়, স্থানীয় কমান্ডারদের সাথে সেগুলো সমন্বয় করতে আমি এসেছিলাম। সেগুলোর সমন্বয় করা হয়েছে।”

ছবির উৎস, KAMOL DAS
দুজন কেএনএফ নেতা যেভাবে আটক
ব্যাংক ডাকাতি ও অস্ত্র লুটের ঘটনায় বান্দরবানের থানচি ও রুমা থানায় আলাদা আলাদা মামলা দায়ের করা হয়েছে। ওই ঘটনায় জড়িতদের ধরতে চলছে অভিযান।
থানচি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন বিবিসি বাংলাকে বলেন, “থানচিতে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের তাণ্ডবের ঘটনায় দুটি মামলা হয়েছে। হামলাকারীদের শনাক্ত করে গ্রেফতার করতে অভিযান চালাচ্ছে যৌথ বাহিনী। থানচিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা-সহ থানচি বাজার ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।”
বান্দরবানের রুমা উপজেলায় ম্যানেজারকে অপহরণ ও অস্ত্র লুটের ঘটনায় ৪টি মামলা করা হয়েছে। ঐ ঘটনায় হামলাকারীদের চিহ্নিত করে গ্রেফতারের চেষ্টা চালাচ্ছে যৌথ বাহিনী।
রবিবার সকালে বান্দরবানে বিশেষ অভিযান চালিয়ে কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের দুইজন নেতাকে আটক করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ান (র্যাব)।
আটককৃত এই দু'জন হলেন কেএনএফের প্রধান সমন্বয়ক রোয়ান লিন বম ও চেওসিম বম। তারা রোয়াংছড়ি দুর্নিবার পাড়া ও সুয়ালক শ্যারণ পাড়া গ্রামের বাসিন্দা।
রোববার বিকেলে র্যাব ১৫-র কোম্পানি কমান্ডার লে. কর্নেল এসএম সাজ্জাদ হোসেন এ তথ্য জানান।
র্যাব জানায়, রোয়াংছড়ি উপজেলায় জুরভাং পাড়া, খামতাং পাড়া, পাইনক্ষিয়াং পাড়া এবং রৌনিন পাড়া এলাকাগুলোয় সশস্ত্র কেএনএফ সদস্যদের নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন চেওসিম বম ও রোয়ান লিন বম।
আইনশৃংখলা বাহিনী আরও বলছে, কেএনএফ শীর্ষ নেতা নাথান বমের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে এই দুই ব্যক্তির।
এই দুই নেতা আটক হলেও গত দুই বছর ধরে নিজেকে আড়ালে রেখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের সাবেক ছাত্র নাথান বম। ব্যাংকে এই হামলা ও লুটপাটের নেপথ্যে তার সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ছবির উৎস, RIAZ RAIHAN
গোটা এলাকা পর্যটকশুন্য
দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন এলাকা বান্দরবান। প্রতি বছর ঈদ মৌসুম এবং পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার পর্যটক আসেন এই বান্দরবানে।
বান্দরবানের দুর্গম এলাকাগুলোতে সশস্ত্র সংগঠনগুলোর আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় গত বছরের একটা লম্বা সময় ধরে পার্বত্য অঞ্চলে পর্যটকদের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেয় সরকার।
গত জানুয়ারি মাসে এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। তার মাত্র দুই মাসের মাথায় বান্দরবানে এই ব্যাংক লুট ও সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটল।
তবে এই ঘটনার পরে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া না হলেও গত চারদিনে পর্যটকশুন্য হয়ে পড়েছে এলাকা। রুমা কিংবা থানচি কোনও জায়গায় নতুন করে কোনও পর্যটক আসেননি।
যারাও ছিলেন তারাও এরই মধ্যে এলাকা ত্যাগ করেছেন বলে জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
বান্দরবানে ঘুরতে আসা পর্যটকদের জন্য ট্যুর গাইড হিসেবে দায়িত্ব পালন করে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। সেই ট্যুর গাইডদের অ্যাসোসিয়েশন বলছে, ওই ঘটনার পর শুধুমাত্র থানচিতে এখনও পর্যন্ত প্রায় ৫০টি ট্যুর গ্রুপ তাদের ট্যুর বাতিল করেছে।
ট্যুর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ম্যানুয়াল মারমা ইমন বিবিসি বাংলাকে বলেন, “প্রতি ঈদের সময় বিভিন্ন গ্রুপ দল বেঁধে বান্দরবান ঘুরতে আসে। এবার ঈদের আগে অন্তত ৫৫ টি গ্রুপ এ পর্যন্ত বুকিং দিয়েছিল। কিন্তু ওই ঘটনার পর এর মধ্যে ৫০টি গ্রুপই ট্যুর ক্যান্সেল করেছে।"
একই অবস্থা রুমা উপজেলায়। উপজেলা প্রশাসন বলছে, ওই ঘটনার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো কোনও বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়নি। কিন্তু তারপরও কোনও পর্যটন এখনও আসছেন না বান্দরবানে।
রুমা উপজেলার ভারপ্রাপ্ত ইউএনও দিদারুল আলম বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও সিদ্ধান্ত নেই নাই। তবে পরিস্থিতির কারণে পর্যটক আসছে না। তবে সরকারের পক্ষ থেকে শিগগিরই নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি আসতে পারে।”











