নিজ দল ছেড়ে এমপি হওয়ার মরিয়া চেষ্টা কতটা নৈতিক?

আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে

ছবির উৎস, BBC/Shyadul Islam

ছবির ক্যাপশান, আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে

বাংলাদেশের আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দল বিলুপ্ত করে কিংবা নিজের দল ছেড়ে কিছু রাজনৈতিক নেতার বড় দলে সামিল হওয়ার প্রবণতা অনেকেরই দৃষ্টি কেড়েছে।

এসব নেতারা বড় একটি দলে যোগ দিয়েই নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য মনোনয়ন পাওয়ায়- অনেকেই একে 'এমপি হওয়ার জন্য মরিয়া চেষ্টা' হিসেবেই বিবেচনা করছেন।

কিন্তু নির্বাচনকে সামনে রেখে নীতি ও আদর্শ একপাশে রেখে 'যে কোনো মূল্যে এমপি হওয়ার' প্রকাশ্য এই চেষ্টা কতটা নৈতিক সেই প্রশ্নও তুলছেন অনেকে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সংসদের এমপি হওয়া মানে ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির মালিক হওয়া এবং সে কারণেই যে কোনো প্রকারে এমপি হওয়ার একটা প্রবণতা দেখা যায় বলে তারা মনে করেন।

তবে এমন কয়েকজন সম্ভাব্য প্রার্থী ও কয়েকটি দল বলছে, বাংলাদেশের নির্বাচনে প্রতীক গুরুত্বপূর্ণ এটি সত্যি কিন্তু নির্বাচন কমিশন জোটবদ্ধ দলগুলোর জন্য নিজ দলীয় প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া বাধ্যতামূলক করে দেওয়ার কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

তারা এটিকে 'অনৈতিক' না বলে একটি কৌশল হিসেবে বর্ণনা করছেন।

প্রসঙ্গত, আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

বাংলাদেশে সামরিক সরকারগুলোর সময়ে প্রায়শই দলবদলের ঘটনা ঘটতো। পরে রাজনৈতিক বিভিন্ন সময়ে কৌশল হিসেবে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করেছে অনেক দল। কিন্তু নির্বাচনের আগে নিজ দলই বিলুপ্ত করে বড় দলে যোগ দেওয়া- এবার নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:
রাশেদ খানের বিএনপিতে যোগদান নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে

ছবির উৎস, BNP MEDIA CELL

ছবির ক্যাপশান, রাশেদ খানের বিএনপিতে যোগদান নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে

এমপি হওয়ার চেষ্টা ও নৈতিকতা

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

গত অক্টোবরে সরকার গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ বা আরপিওতে সংশোধনী এনে নির্বাচনে নিবন্ধিত একাধিক দল জোটভুক্ত হলেও ভোট করতে হবে নিজ নিজ দলের প্রতীকে-এমন ধারাও যুক্ত করা হয়।

মূলত এরপরেই বিএনপির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে পথ চলা কিছু ছোটো দলের নেতাদের মধ্যে দল ছেড়ে বিএনপিতে বিলীন হওয়ার প্রচেষ্টা দেখা যায়।

বিএনপির অনেক দিনের মিত্র দল বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (বিএলডিপি) এর চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম দল বিলুপ্ত করে দলের নেতা–কর্মীদের নিয়ে গত ৮ই ডিসেম্বর বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। এরপর তাকে লক্ষ্মীপুর–১ আসন থেকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেয় দলটি।

এরপর ২৪শে ডিসেম্বর এলডিপি (অলি) এর মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদ পদত্যাগ করে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দেন। তার দলের চেয়ারম্যান অলি আহমদ পরে জানান যে মি. আহমদ দলের নিজস্ব এক বৈঠকে অংশ নেওয়ার পর তাকে কিছু না জানিয়েই বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন।

এরপর বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সৈয়দ এহসানুল হুদা-ও তার দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দিয়ে কিশোরগঞ্জের একটি আসনে বিএনপি প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন পেয়েছেন।

এ ছাড়া নিজ দল ত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন এনপিপির চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ ও জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন-এনডিএমের চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ।

ফরিদুজ্জামান ফরহাদ নড়াইল-২ ও ববি হাজ্জাজ ঢাকা-১৩ আসন থেকে বিএনপির প্রতীকে বিএনপির দলীয় প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিবেন বলে জানিয়েছেন।

তবে ববি হাজ্জাজ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন যে এনডিএম চেয়ারম্যান হয়েও বিএনপির প্রার্থী হওয়াটা পুরোটাই একটা 'রাজনৈতিক কৌশল'।

এসব প্রার্থী ও নেতারা ছাড়াও বিএনপির নেতাদের সাথে এ বিষয়ে কথা বলে যে ধারণা পাওয়া গেছে তাহলো মূলত ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনের মাধ্যমে জয় নিশ্চিত হবে এবং ভোটের অনুপাতে পরে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনের সময় ধানের শীষের অনুকূলে বেশি ভোট দেখানো যাবে- এ দুটি কারণেই জোটবদ্ধ কিংবা সমমনা দলের নেতাদের সরাসরি বিএনপিতে এনে মনোনয়ন দিচ্ছে বিএনপি।

আরপিওতে পরিবর্তন এনে নিবন্ধিত দলগুলোর প্রার্থীদের দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করার বিধান করা হয়েছে এবার

ছবির উৎস, BBC/MUKIMUL AHSAN

ছবির ক্যাপশান, আরপিওতে পরিবর্তন এনে নিবন্ধিত দলগুলোর প্রার্থীদের দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করার বিধান করা হয়েছে এবার

তবে বিএনপির সমর্থন পাওয়া গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকী, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক এবং নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না জানিয়েছেন যে, তারা নিজ দলীয় প্রতীকেই নির্বাচন করতে আগ্রহী।

তবে এভাবে দল বিলুপ্ত করে বা দল ছেড়ে এসে বেশি আলোচনা হয়েছে গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খানকে নিয়ে। তিনি বিএনপিতে যোগ দিয়ে ঝিনাইদহ-৪ আসনের মনোনয়ন পেয়েছেন।

মি. খান বিবিসি বাংলাকে বলেছেন যে তাকে যে আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে সেটি বিএনপি অধ্যুষিত এলাকা। "সেখানে নির্বাচনে জেতার জন্য ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করতে হবে বলে মনে করেছি," বলেছেন তিনি।

কিন্তু গণ অধিকার পরিষদের মতো একটি নতুন তারুণ্যনির্ভর রাজনৈতিক দলের একজন শীর্ষনেতার এমপি হওয়ার জন্য এভাবে দল ছেড়ে বিএনপি যোগ দেওয়ার ঘটনায় পুরো বিষয়টিই নতুন করে আলোচনায় উঠে আসে।

তার বিদায়ের পর গণ অধিকার পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হওয়া হাসান আল মামুন অবশ্য বলছেন, "প্রক্রিয়াটি দৃষ্টিকটু হলেও গণ অভ্যুত্থানের পরের সংসদে তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হোক সেটি তারা চান। নির্বাচনে মার্কা গুরুত্বপূর্ণ-এটি বিবেচনায় নিয়ে রাজনীতির বাস্তবতায় রাশেদ খানকে বিএনপিতে যেতে হয়েছে"।

তিনি বলেন, গণ অধিকার পরিষদ বা এনসিপির মতো নতুন দলগুলো এখন নিজ প্রতীকে নির্বাচন করে জয়ী হবার মতো সাংগঠনিক ভিত্তি জনভিত্তি তৈরি করে পারেনি বলেই কিছু কৌশল গ্রহণ করতে হচ্ছে।

অর্থাৎ এ থেকে অনেকটাই পরিষ্কার যে হয়তো বিএনপি ও গণ অধিকার পরিষদের সমঝোতার ভিত্তিতেই মি. খান বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন, যাতে করে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে তিনি জয়ী হয়ে সংসদে যেতে পারেন।

নিজ দলীয় প্রতীকের পরিবর্তে বিএনপির প্রতীকেই নির্বাচন করতে দল ছেড়ে বা দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন বিএনপির সাথে জোটে থাকা বেশ কিছু দলের নেতারা

ছবির উৎস, AFP via Getty Image

ছবির ক্যাপশান, নিজ দলীয় প্রতীকের পরিবর্তে বিএনপির প্রতীকেই নির্বাচন করতে দল ছেড়ে বা দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন বিএনপির সাথে জোটে থাকা বেশ কিছু দলের নেতারা

'মার্কার জন্য বড় দলের কাছে ছোটো দলের আত্মসমর্পণ'?

দল ছেড়ে বা দল বিলুপ্ত করে বিএনপির মতো বড় দলে মিশে নির্বাচন করার এ চেষ্টাকে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ 'মার্কার জন্য বড় দলের কাছে ছোটো দলের আত্মসমর্পণ' হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। আবার কেউ বলছেন 'ক্ষমতার ভাগ নিশ্চিত করতেই এমপি হতে চাইছেন ছোটো দলের নেতারা'।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমেদ বলছেন, ছোটো দলগুলোর নির্বাচনে জয়ের বিষয়ে নিজেদের ওপর আস্থা নেই কিন্তু এসব দলের নেতারা এমপি হওয়াটা নিশ্চিত করতে চান বলেই এমন দৌড়ঝাঁপ চলছে।

"তারা জানেন যে নিজেরা দলীয়ভাবে জিততে পারবেন না। সেজন্যই দল বিলুপ্ত করে বা দল ছেড়ে বিএনপিতে যাচ্ছেন। আসলে রাজনীতি করতে গেলে ক্ষমতার ভাগ চায় সবাই। আর সবাই জানে যে সংসদে ঢুকলেই থাকবে অর্থ, বিত্ত ও প্রতিপত্তির হাতছানি। আবার এই নির্বাচনটায় যে সুযোগ সামনে আর তা নাও হতে পারে। এ জন্যই নীতি ও আদর্শহীনতার এ চর্চা দেখা যাচ্ছে নির্বাচনকে ঘিরে," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন মি. আহমদ।

আরেকজন বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলছেন মনোনয়ন ও নির্বাচন নিয়ে যা হচ্ছে তাতে বহুদলীয় গণতন্ত্রই হোঁচট খাচ্ছে কারণ ছোটদল গুলো আত্মসমর্পণ করছে মার্কার কাছে।

"তবে নির্বাচন কমিশনের একটি ভ্রান্ত নীতির কারণেই এটি হচ্ছে। নিজ দল বা জোটের প্রধান দলের প্রতীকে নির্বাচন করার সুযোগ আগের মতো রাখা হলে এমন দৃষ্টিকটু চর্চা দেখা যেতো না। আর এমপির কাজ আইন প্রণয়ন করা হলেও বাংলাদেশে একজন এমপি একটি এলাকার নিয়ন্ত্রক হয়ে যান। সে কারণেই নিজের দল বিলুপ্ত করে হলেও এমপি হওয়ার প্রতিযোগিতা দেখা যাচ্ছে। কারণ জয়ের জন্য মার্কা এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।